ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

মোবাইল ফোন

 

বর্তমানে সেলফোন ছাড়া যেন জীবনই চলে না। শহরে কিংবা গ্রামে-গঞ্জে সব জায়গায় মানুষের জীবনসঙ্গী এই মোবাইল। আগেকার সময়ে সারাদিন একটা ওয়ান ব্যান্ড রেডিওর পেছনে ঘুরে বেড়াতাম। যার কাছে একটা রেডিও ছিল, সে ছিল বন্ধুদের মধ্যে সেরা বন্ধু। সে আমলে একটা ওয়ান ব্যান্ডের রেডিও দিতে না পারায় অনেক মেয়ের বিয়ে পর্যন্ত হয়নি। এরপর শুরু হয় টেপ রেকর্ডারের যুগ। টেপ রেকর্ডার ছিল স্বপ্নে পাওয়া একটা গায়েবি জিনিস। গান শোনার জন্য, বিবিসির সংবাদ শোনার জন্য, কথা রেকর্ড করার জন্য দিনরাত তার পেছনে থাকত মানুষের ভীড়। সেই যুগ পেরিয়ে আমরা এখন পা রেখেছি ডিজিটাল তথা কম্পিউটার, ল্যাপটপ আর মোবাইলের যুগে। এই যুগে আর ওয়ান ব্যান্ডের রেডিও কেউ ব্যবহার করে না, বিয়ে-শাদীতে আর রেডিও দাবি করে না, একটা কেমি ঘড়ির জন্য কেউ আর কাঁদে না। দশ গ্রাম পেরিয়ে ভিন্ন গ্রামে গিয়ে কেউ টেলিভিশন দেখে না, প্রতি ঘরে ঘরেই এখন আছে বিশাল পর্দার কালার টেলিভিশন।

এসবের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে প্রিয় জিনিস হলো মোবাইল ফোন। বর্তমানে মোবাইল ফোন বিহীন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিছুদিন আগেও মোবাইল ফোন ছিল মানুষের স্বপ্ন। দূরদেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনের সাথে কথা বলতে ছুটতে হতো টেলিফোন এক্সচেঞ্জে, নাহয় ফোন-ফ্যাক্সের দোকানে। এই কষ্ট এখন লাঘব করে দিয়েছে মোবাইল। বলা যায় মোবাইল ফোন এখন মানুষের জীবন। এই জীবন বাঁচানো মোবাইল ফোনেরও কিন্তু একটা জীবন আছে। সেটা হলো- সিম কার্ড, যেটা ছাড়া মোবাইলে কথা বলা যায় না। এই সিম কার্ড সংগ্রহ করতে হলে রেজিস্ট্রেশন, আঙুলের ছাপ, ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সহ কড়া নিয়মাবলী মানতে হয়।

খুবই দরকারি এই মোবাইল বিশেষ যত্ন করে রাখার পরও অনেক সময় হারিয়ে যায়, চুরি হয়, ছিনতাই হয়। কেউ হয়তো ফেরৎ পায়, অনেকে পায় না। কেউ আবার মোবাইল ফোন উদ্ধারের জন্য থানায় গিয়ে জিডি করে পুলিশের সাহায্য নেয়। ফোন খোয়া গেলে আরেকটা মোবাইল ফোন নেয়, সিম কার্ডও তুলে নেয় নতুন করে। কেউ আবার গাফিলতি করে আর সিম কার্ড তোলে না, নতুন সিম নেয়। কিন্তু সমস্যা হলো ঐ সিমটি না তোলায় ব্যবহারযোগ্য ঐ সিম কার্ডটি থেকে যায় দুস্কৃতকারীর কাছে। আমরা তো জানিই, দুষ্কৃতকারীরা থাকেই মানুষের ক্ষতি করার ধান্ধায়। ফলে ঐ সিম কার্ডের সাহায্যে দুষ্কৃতকারীরা নানারকম অপকর্ম করতে থাকে।

 

 সিম কার্ড। নিজ মোবাইল দিয়ে তোলা ছবি।

 

বর্তমানে তথ্য-প্রযুক্তির যুগে অপকর্ম করে কেউ পার পায় না, ধরা পড়ে যায়। সিম ব্যবহার কোন দুষ্কৃতিকারী করে অপরাধ করলে তদন্তে বেরিয়ে আসে সিম কার্ডের নম্বর ও এর মালিকের পরিচয়। তখন শুরু হয় অনুসন্ধান। রেজিস্ট্রেশন করা সিম কার্ড, তাতে হাতের আঙুলের ছাপ আছে, ছবি আছে, ভোটার পরিচয়পত্রের ফটোকপি আছে, ঠিকানা আছে। এসব সূত্র ধরে সিম কার্ডের প্রকৃত মালিককে খোঁজা হয়। আসলে কিন্তু সিম কার্ডের প্রকৃত মালিক অপরাধ করেনি! ফলে অপরাধ করে চোর বা দুষ্কৃতকারী, আর বিনা দোষে দোষী হয় হয় নির্দোষ মানুষ।

হ্যাঁ, উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো বাস্তবরূপ নিয়েছে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন গোদনাইলের আরামবাগ এলাকায়। ঘটনা ঘটেছে, ১০ বছরের এক স্কুল ছাত্রী নিখোঁজ, অতঃপর লাশ উদ্ধার নিয়ে। মেয়েটির নাম রোকসানা আক্তার। জানা যায়, রোকসানা গত ২৩ জানুয়ারি স্কুলের উদ্দেশ্যে সকালে বাসা থেকে বের হয়। সারাদিন শেষে রাতেও আর বাসায় ফেরেনি রোকসানা। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় মাইকিং করেও রোকসানার সন্ধান পাওয়া যায়নি। এরমধ্যে রোকসানার স্কুল ব্যাগটি বাসার সামনে পরিত্যক্ত এক জায়গায় পাওয়া যায়। স্কুল পেয়ে সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। আত্মীয়-স্বজনদের বাসাবাড়িতে অনেক খোঁজাখুঁজি করা হয়। কিন্তু রোকসানাকে আর পাওয়া যায় না।

পরদিন, ২৪ জানুয়ারি বিকালে রোকসানার বাসায় কে বা কারা ফোন করে। মোবাইল ফোনে ৬ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। এরপর ঐদিনই রোকসানার বাবা নিকটস্থ সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় জিডি করে। রোকসানার বাবা পুলিশকে জানান, তার মোবাইলে ফোন করে ছয় হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে। দাবিকৃত ছয় হাজার টাকা দিতে তিনি রাজি হয়েছেন, কিন্তু কার কাছে, কোথায় সে টাকা দিবে সেটা জানায়নি। তাই সে পুলিশের সাহায্য নিতে থানায় গিয়েছে। থানায় জিডি করার পর পুলিশ যথেষ্ট চেষ্টা করেছে রোকসানাকে জীবিত উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু পুলিশ পারেনি রোকসানাকে জীবিত উদ্ধার করতে, উদ্ধার করেছে তার লাশ। ২৬ জানুয়ারি শুক্রবার সকালে সোনারগাঁ থানাধীন মোগরাপাড়া ইউনিয়নের, কাইকারটেক ব্রীজের ঢাল থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় রোকসানার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রোকসানার হাত-পা দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। মুখ ছিল স্কচটেপ দিয়ে আটকানো। শরীরের বিভিন্ন অংশে ছিল আঘাতের চিহ্ন। ধারণা করা হয়, রোকসানাকে শ্বাসরোধে করে হত্যা করা হয়েছে। খবর পেয়ে রোকসানার বাবা-মা লাশ দেখে তাদের মেয়েকে সনাক্ত করে। তারপর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালের মর্গে।

রোকসানা আক্তারের বাবার নাম আশরাফুল ইসলাম। সে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। মা কারিনা বেগম একজন গার্মেন্টস কর্মী। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে রোকসানা ছিল সবার ছোট। রোকসানা গোদনাইল সরকারী প্রাথমিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিলো। লাশ পাবার পরই পুলিশের মোবাইল ট্র্যাকিং আরও জোরদার হয়, সাথে শুরু হয় অন্যান্য গোয়েন্দা তৎপরতা।

এদিকে ১৫ দিন আগে একই এলাকার এক ছেলের মোবাইল ফোন চুরি হয়। আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে চুরি হওয়া মোবাইলের সিম কার্ড সে আর তোলেনি। সেই সিম কার্ডের নম্বরেই ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল রোকসানার বাবার কাছে। সেই মোবাইল ফোনের নম্বরের সূত্র ধরে ২৬ জানুয়ারি রাতে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় প্রকৃত সিম কার্ডের মালিককে। ওই ছেলের সাথে আরও এক স্টুডিও মালিককেও ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। কিন্তু সিম কার্ডের প্রকৃত মালিক তো নির্দোষ! ভুল শুধু তার গাফিলতি আর আর্থিক দুরাবস্থা কারণে। যদি চুরি হওয়া মোবাইলের সিম কার্ডটি সময়মত তুলে নিতো, তাহলে আজ তার এই পরিণতি হতো না। নিরীহ গরিব ছেলেটিকে বিনা দোষে দোষী হয়ে থানা কারাগারে যেতে হলো!

তাই বলছি, বর্তমান যুগে দৈনন্দিন জীবন চলার সাথী মোবাইল ফোনের একটা সিম কার্ড খুবই মূল্যবান সম্পদ। ‘বিনামূল্যের’ সম্পদ হলেও এর সাহায্যে চলে আমাদের সার্বক্ষণিক কাজ। কথাবার্তা, মেসেজ আদান-প্রদান সহ টাকা-পয়সা লেনদেন হয়ে থাকে সবসময়। তাই যখন যার মোবাইল ফোন হারিয়ে যায় বা চুরি হয়ে যায় দেরি না করে সাথে সাথে নিকটস্থ কাস্টমার কেয়ার থেকে সিম কার্ড তুলে নেওয়া দরকার। সময় অতিক্রম হলেই যেকোনো সময় বিপদের সম্মুখীন হতে পারে। কথায় আছে, ‘সময় খারাপ হলে নাকি দুর্বা বনেও সাপের কামড় খেতে হয়।’ তাই সাবধানতা জরুরী।

হয়তো অনেকেই জানেন না সিম কার্ড হারিয়ে গেলে কী করা উচিৎ? বিপদ থেকে বাঁচতে তাই এখনই জেনে নিন…..:

☛ যদি আপনার মোবাইল ফোনটি সিম কার্ড সহ হারিয়ে যায় বা চুরি হয়ে যায়, তাহলে সবার আগে সার্ভিস প্রোভাইডারের কাছে ফোন করে আপনার ফোন নম্বরটি বন্ধ করে দিন। তাহলে আর কেউ আপনার সিম কার্ডটি ব্যবহার করতে পারবে না।

☛ সিম কার্ড হারালে অবশ্যই পুলিশের কাছে অভিযোগ জানান। থানায় গিয়ে জিডি করুন। যদি কেউ আপনার মোবাইল বা সিম কার্ডটি চুরি করে থাকে, তাহলে সে আপনার সিম থেকে কোনও খারাপ কাজ করলে ধরা পড়ে যাবে। আপনি নিরাপদ নির্দোষ থেকে যাবেন।

যাইহোক, এলাকার সম্মানিত কমিশনার সাহেবের আপ্রাণ চেষ্টায় গত ২৮ জানুয়ারি রাতে ছেলেটি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা থেকে ছাড়া পায়। আজ যদি ছেলেটি মোবাইল ফোনটি চুরি হওয়ার পর থানায় জিডি করে রাখতো এবং যদি সিম কার্ড তুলে রাখতো, তাহলে ছেলেটির আজ এই পরিস্থিতির শিকার হতে হতো না। বিনা দোষে দোষী হতো না। শীতের রাতে কারাগারের কষ্ট করতে হতো না। তাই মোবাইল ফোন চুরি হয়ে গেলে, সবকিছুর আগে মোবাইল ফোনের চিন্তা না করে যথাসময়ে আপনি আপনার সিম কার্ড তুলে নিবেন। সময়মত সিম কার্ড সংগ্রহ করুন, নিরাপদে থাকুন। সুস্থ ও সুন্দর জীবন-যাপন করুন।