ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

নদীতে আর খালবিলে যাদের জীবনযাপন, তারা বেদে সম্প্রদায়। নৌকাতে ঘুরে ঘুরেই তাদের চলে জীবনসংগ্রাম। তারা ভিনগ্রহ থেকে আসা কোনও এলিয়েন নয়। তারা আমাদের মতন রক্তমাংসে গড়া মানুষ। বেদে সম্প্রদায়ের লোকজন আমাদের কাছে বাদিয়া বা বাইদ্যা নামে পরিচিত। ওরা ভ্রাম্যমাণ একটি জনগোষ্ঠী। ওদের জীবন ও জীবিকা সবই নৌপথে ভ্রমণের মাঝেই চলতে থাকে। ওরা দলবদ্ধভাবে বসবাস করে থাকে। আগে নদীনালা খালবিলে দেখা যেত ওদের নৌকার বহর। এসব বহরকে অনেকেই বেদের বহর বলতো, এখনো বলে। বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের গায়ের রঙ ও আকৃতি বাঙালিদের মতোই। ওরা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। অধিকাংশ বেদেই চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত। ওরা প্রাচীনকাল থেকেই পরোপকারী। তাই মানুষের উপকারের জন্য ওরা আগে থেকেই চিকিৎসাকে বেশি প্রধান্য দিয়ে আসছে। ওদের পেশাই যেমন চিকিৎসা।

তাই তাবিজ কবচ, ঝাড়ফুঁক, যাদুটোনার মন্ত্র, সাপের বিষ নামানো সহ নানারকম রোগের হাতুড়ে চিকিৎসা ওরা করে থাকে। রাস্তাঘাটে চলাফেরার মধ্যে কোনও মরা পশুপাখির হাড়গোড় দেখলেই, ওরা ওদের ব্যাগে ভরে রাখে। যেকোনো মরা পশুপাখির হাড়গোড় ওদের কাছে সবসময় সংরক্ষিত থাকে। এই মরা পশুপাখির হাড়গোড় হলো, ওদের একমাত্র চালান। যা দিয়ে ওরা ওদের চিকিৎসা শাস্ত্রে ব্যবহার করে থাকে। বেদে সম্প্রদায়ে মধ্যেও বিভিন্ন উঁচুনিচু গোত্রও আছে। জাত আছে। গোষ্ঠী আছে। একেক গোত্রের একেক নিয়মকানুন আছে। গোত্র বা গোষ্ঠী দেখেশুনেই ওদের বিবাহ সাদি হয়ে থাকে। আগেকার সময়ে বেদে সম্প্রদায়ের পুরুষেরা অলসমানুষ হিসেবেই বিবেচ্য হতো। বেদে সম্প্রদায়ের পুরুষরা সারাদিন তাস খেলেই দিন কাটাতো। আর বেদে সম্প্রদায়ের মেয়েরা সারাদিন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতো। আর সাপখেলা দেখানো সহ বিভিন্নরকম হাতুড়ে চিকিৎসা করে অর্থ উপার্জন করতো।

বেদে সম্প্রদায়ের কাহিনী, গল্প এদেশের বইপস্তকেও অনেক লেখা আছে। বেদে নিয়ে আমাদের দেশে অনেক চলচ্চিত্রও নির্মাণ হয়েছে। এনিয়ে আর বেশিকিছু লিখতে হবে না।

 

একজন বেদে সম্প্রদায়ের লোক। সুন্দর পেন্ট শার্ট পঢ়ে হাতে হ্যান্ডমাইক নিয়ে নেচে গেয়ে বাতের মহৌষধ প্লাস্টিকের চুড়ি বিক্রি করছে। ছবিটি গত কয়েকদিন আগে নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন গোদনাইল লক্ষ্মীনারায়ণ বাজার সংলগ্ন রসূলবাগ এলাকা থেকে তোলা।

আমি লিখতে চাইছি ওদের বর্তমানে বেঁচে থাকার কথা। ওরা এখন নৌকার বহর ছেড়ে শহরের আনাচেকানাচে, রেললাইনের পাশে থাকার কথা। মানুষের বাড়িতে বাসা ভাড়া করে থাকছে সেই কথা। ওরা এখন ওদের ঐতিহ্য হারিয়েও, ঐতিহ্যকে কীভাবে ধরে রাখতে চাইছে, বলতে চাচ্ছি সেই কথা।

কোনো এক সময় বিক্রমপুর শ্বশুরবাড়ি যখন যেতাম, দেখতাম বেদেদের সারিবদ্ধভাবে থাকা নৌকার বহর। ওরা সবসময় দলবদ্ধভাবে থাকতো। এখন আর ওদের ওইরকম দল নেই। নৌকার বহর নেই। দলছুট হয়ে মিশে যাচ্ছে বাঙালিদের সাথে। থাকছে মিলেমিশে। যেমনটা থাকছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটা অংশ, হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষেরা। আগেকার সময়ে ওদের পোশাকাই ছিল ভিন্নরকম। এখন আর হরিজন সম্প্রেদায়ের ভিন্নরকম পোশাক নেই। কোমরে জলপান করার জগ বাঁধা নেই। হাতুলিতে রাখা ঝাড়ু নেই। হাতে বালতি নেই। রাস্তাঘাটে মদ্যপ অবস্থায় আর ওদের বেশি দেখা যায় না। ওরা সেই আগের মতন অশিক্ষিত নয়। ওরা এখন আমাদের চেয়েও ভালো শিক্ষিত। হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ যেমন শিক্ষিত সমাজে মিশে গেছে, তেমনিভাবে মিশে যাচ্ছে বেদে সম্প্রদায়ের মানুষও। ওদের দেখে কেউ চিনতেই পারবে না যে, এই লোকটা বেদে সম্প্রদায়ের।

কয়দিন আগে গোদনাইল লক্ষ্মীনারায়ণ বাজার সংলগ্ন এলাকায় দুইজন লোকের আগমন। দুইজনের হাতেই সাইডব্যাগ। পড়নে ফুলপ্যান্ট, সুন্দর স্ত্রি করা জামা, পায়ে চামড়ার জুতা, চোখে কালো চশমা, হাতে দামি ঘড়ি। এসেই একটা চা দোকানে বসলো। দুইজনেই চা পান করলো। কিছুক্ষণ মানুষের আনাগোনা ফলো করলো। এরপর চা দোকান থেকে দুইজনে উঠে গিয়ে এক জায়গায় দাঁড়ালো, ব্যাগ খুললো, বিক্রির জন্য সাথে আনা মালগুলো বের করলো। কিছুক্ষণ হ্যান্ডমাইকে হ্যালো হ্যালো করে, মাইক সচল করলো। মানুষ জমাট হলো। আড়াআড়িভাবে দুইজন দুইদিকে দাঁড়ালো। শুরু করে দিলো বাতের ব্যথা নিরাময়ের কবিগান। ওদের কবিগান আর নাচ দেখে, মানুষ আরও জমাট হতে লাগলো। মাইকে গান গাওয়ার তালেতালে ঔষধও বিক্রি করতে লাগলো।

ঔষধ হলো সোয়াবিন তেলের ড্রামের মুখে থাকা একটা ওয়াসার। দেখতে হুবহু মহিলাদের হাতের চুড়ি। এগুলো বাত রোগ নিরাময়ের জন্য নাকি বড় উপকারী। ওরা দুইজনে অনেকক্ষণ গানের তালে তালে এই বিশেষ ধরনের চুড়ি বিক্রি করলো। প্রতিটি চুড়ির মূল্য ১০ টাকা। ওদের কাছ থেকে অনেক মানুষেই কিনে নিয়েছে। বিক্রি করার পর আবার দুইজনে দোকানে এসে বসলো।

সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা থাকেন কোথায়?_নদীর ওপারে লাঙ্গলবন্দ ব্রহ্মপুত্র নদীর পাড়ে। আপনারা কি বেদে সম্প্রদায়ের লোক? _হ্যাঁ আমরা বাইদ্যা। আপনারা কি নৌকায় বসবাস করেন? _হ্যাঁ আমরা এখনো নোকায় থাকি। তবে আমাদের মধ্যে অনেকেই নৌকা ছেড়ে পরের বাড়িতে বাসা ভাড়া করে থাকছে। আমরাও একসময় নৌকা ছেড়ে দিবো। আপনাদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ওরা কী করে? _স্ত্রী আমাদের মতনই হাট বাজারে ঘুরেফিরে তাবিজ কবচ বিক্রি করে। সাপের খেলা দেখায়। ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে। আপনারা অন্যকোন কাজেকর্ম করতে পারেন না? _করি, রাজ যোগালি কাজ করি। সময়সময় রিকশা চালাই। মাঝেমধ্যে বাপদাদার করা কাজ নিয়ে বাইর হই। আগের মতন এখন আর আমাদের চাহিদা নেই। মানুষ এখন আমাদের বেশি বিশ্বাস করে না। আমাদের মধ্যেও খারাপ মানুষ আছে। তাদের কারণেই, আজ বাইদ্যাদের কেউ সামনে ভিড়তে দেয় না। অনেকে আমাদের দেখলে ঘৃণাও করে। অন্য দৃষ্টিতে তাকায়।

পাঠকদের জন্য আমি একটি ভিডিও করেছি। ভিডিওটা নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন গোদনাইল লক্ষ্মীনারায়ণ বাজার সংলগ্ন রসূলবাগ এলাকা থেকে ধারণকৃত। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে প্যান্ট-শার্ট পড়ে একজন শিক্ষিত মানুষের বেশে দুইজন দু’দিকে দাঁড়িয়ে প্লাস্টিকের চুড়ি বিক্রি করছে।

এবার আসি নিজের দেখাশোনা কথায়। যা আগে নিজের চোখে দেখেছি। এই বঙ্গদেশে বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা একসময় ঘুরে ঘুরে তাবিজ কবচ বিক্রি করে বেড়াতো। ওরা বাতের ব্যথা নিরাময় করার জন্য মানুষের হাত পা কেটে, সিঙ্গা লাগিয়ে রক্ত চুষে আনতো। পাড়া মহল্লায় গিয়ে চিৎকার করে ডাক দিতো, ‘সিঙ্গা লাগাইবেন…সিঙ্গা।’

বেদে মহিলাদের ডাক শুনে বুড়ো বুড়িরা বাড়িতে ডেকে নিয়ে যেতো। বসতে দিতো। কেউ দাঁতের পোকা ফেলাত। কেউ ছোট শিশুদের জন্য তাবিজ কবচ নিতো। কেউ কোমর ব্যথার কটকট মাছের হাড় নিতো। কেউ বাতের ব্যথা নিরাময়ের জন্য ওদের কাছ থেকে তেল কিনে শিশি ভরে রাখতো। কেউ আবার লাগাতো সিঙ্গা।

তখনকার সময়ে এই ওঝা-বৈদ্য বা বাইদ্যাদের চিকিৎসায় মানুষ বিশ্বাসী ছিল। তখন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার খুবই কম ছিল বিধায়, এই ওঝা বৈদ্যদের চাহিদা ছিলো। ওরা সাপের খেলা দেখাতো। আবার সাপে কাটা মানুষের শরীর থেকে সাপের বিষ তুলে আনতো। সাপে কাটা মানুষকে ভালোও করতো। কাউকে সাপে দংশন করলে প্রথমেই স্মরণ করা হতো এই বেদেদের। তন্নতন্ন করে খুঁজে বের করা হতো তাদের। তখন এতো এতো নামীদামী ডাক্তার ছিলো না। এঁদের উপরেই মানুষের ভরসা ছিলো।

আর সাপ নিয়ে বেশি মেতে থাকতো বেদে সম্প্রদায়ের মহিলারা। হাটে-বাজারে, পাড়া-মহল্লায়, যেখানে সেখানে বেদেনীরা সাপের ঝুড়ি বা বাক্স নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। এখনো মাঝেমধ্যে সময় অসময় রাস্তাঘাটে সাপের বাক্স বা ঝুড়ি সহ ওদের দেখা যায়। তবে আগের মতন দলবদ্ধভাবে নয়। এখন ওরা ওদের পুরানো ঐতিহ্য রক্ষা করার জন্য কোনকোন সময় একা একাই সাপের বাক্স নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ওরা সাপ তাড়ানোর তাবিজ কবচও মানুষকে দিয়ে থাকে। মানুষ বিশ্বাসও করে। আগেকার সময়ে সাপের খেলা দেখিয়ে ওরা গৃহিণীদের কাছ থেকে চাল নিতো। কেউ টাকাপয়সাও দিতো। এখন আর ওদের সাপের খেলা মানুষ বেশি দেখে না। ওরাও দিনদিন জনশূন্য হয়ে পড়ছে।

ঐতিহ্য রক্ষা করা আর বেঁচে থাকার তাগিদে বেদে সম্প্রদায়ের একজন মহিলা সাপের বাক্স নিয়ে ঘুরছে পাড়া-মহল্লায়। আগের মতন কেউ আর ওদের ডাক দেয় না। ছেলেপেলেও ওদের সামনে বেশি ভীড় করে না।

ওরা যেভাবে চিকিৎসা করতো, মানুষ ওদের ওই পদ্ধতিতে বিশ্বাসী ছিল। কিছুকিছু মানুষ এখনো আছে, বেদেদের চিকিৎসায় বিশ্বাসী। কিন্তু বেদেদের চিকিৎসায় বিশ্বাসী আগের মতন এতো লোক আর নেই। তাই বেদেরাও বসে নেই। বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা অনুসরণ করছে, অন্য পন্থা। তাঁরা এখন বেছে নিয়েছে অন্যরকমভাবে কামাই রোজগারে পথ। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ওইসব চিকিৎসা বাদ দিয়ে বহুরকম কাজ করেও দিনাতিপাত করছে। কেউ আবার বাপদাদার ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

যেই দুইজন লোক বাতের ব্যথার মহৌষধ প্লাস্টিকের চুড়ি নিয়ে এসেছে, তারাও বেদে সম্প্রদায়ের। তারাও চাইছে তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে। কিন্তু পারবে কিনা জানি না। কারণ, দিনদিন মানুষ সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করছে। তাই সেই আগের মতন ওঝা বৈদ্যদের দেখা মেলে না। বাদ পড়ে যাচ্ছে ওইসব বেদে সম্প্রদায়ের হাতুড়ে চিকিৎসা। নিশ্চিহ্ন হয়েও কোনরকমভাবে বেঁচে আছে বেদে সম্প্রদায়। তারা তাদের ঐতিহ্য রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবু বেদেরা টিকে থাকতে পারবে কিনা জানা নেই। চাই ওরা টিকে থাকুক, বেঁচে থাকুক আমাদের পাশে। ওদের হাতুড়ে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ নাইবা করলাম। ওদেরকে তো পাশে দেখতে পেলাম!