ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

৩০ জানুয়ারি। দিনটি ছিলো ১০ বছরের শিশু রোকসানার হত্যাকারী নরপিশাচের ফাঁসিরর দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি। ছবিতে দেখা যায়, বাসস্ট্যান্ডে মেইন রোডের পাশে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ। ছবি নিতাই বাবু।

নারায়ণগঞ্জ সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন গোদনাইলের একটা এলাকা আরামবাগ। সেই এলাকায় ছিলো রোকসানাদের বসবাস। রোকসানার পুরো নাম, রোকসানা আক্তার। বয়স ছিলো মাত্র ১০ বছর। লেখাপড়া করতো তৃতীয় শ্রেণিতে। স্কুল ছিলো বাসার নিকটেই। রোকসানা আক্তারের বাবার নাম আশরাফুল ইসলাম। সে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। মা কারিনা বেগম একজন গার্মেন্টসকর্মী। ৩ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে রোকসানা ছিলো সবার ছোট। দশটা শিশুদের মতোই রোকসানাও পাড়া-মহল্লায় আর স্কুলে হেসে-খেলে বেড়াতো। প্রতিদিনের মতো গত ২৩ জানুয়ারি স্কুলের উদ্দেশ্যে সকালে বাসা থেকে বের হয়। সাথে ছিলো তার পছন্দের স্কুলব্যাগটি। যেই স্কুলব্যাগটি রোকসানার মা নিকটস্থ চৌধুরী বাড়ি মার্কেট থেকে কিনে দিয়েছিল। সেদিন বাবা ছিলো ঘরে শোয়া, মা ছিলো গার্মেন্টসে। দুপুর ১ টায় লান্সের সময় রোকসানার মা বাসায় এসেছে, দুপুরের খাবার খেতে। প্রতিদিন মা-বাবা, ভাইবোন সবাই মিলেমিশেই দুপুরের খাবার খেতো।

আজ আর রোকসানা ঘরে নেই। সবার ধারনা ছিলো যে, হয়তো স্কুলে যে কোনো ব্যাপারে দেরি হচ্ছে। আসবে হয়তো কিছুক্ষণ পর। অভাগী মা রোকসানার জন্য দুপুরের খাবার আদালা করে রেখে চলে গেলো গার্মেন্টসে। দুপুর ঘনিয়ে বিকাল পর্যন্তও রোকসানার কোনও খবর নেই। স্কুলে গিয়ে খবর নিলো রোকসানার। স্কুলের শিক্ষকরা জানালো স্কুলে আসেনি। তাহলে কোথায় গেল রোকসানা? মায়ের কাছে ফোন করে জানানো হলো। শুরু হলো খোঁজাখুঁজি আর মাইকিং। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নেওয়া হলো খোঁজখবর। কোথাও রোকসার সন্ধান মেলেনি। এরমধ্যে রোকসানার স্কুল ব্যাগটি বাসার সামনে পরিত্যক্ত একটা জায়গায় পাওয়া যায়। স্কুল ব্যাগটি পেয়েই সন্দেহ আরও ঘনিভূত হতে থাকে। সারাদিন সারারাত আর রোকসানা বাসায় ফেরেনি।
ছবিতে মানববন্ধনে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। তাদের মুখে হত্যাকারী নরপিশাচের ফাঁসির দাবি।

পরদিন ২৪ জানুয়ারি। ঠিক বিকালবেলা রোকসানাদের বাসায় কে-বা কাহারা ফোন করে। মোবাইল ফোনে ৬ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে ঠিকানাবিহীন,পরিচয়বিহীন অপরিচিত কণ্ঠস্বরে। এরপরই ২৪ জানুয়ারি রোকসানার বাবা নিকটস্থ সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় জিডি করে। রোকসানার বাবা জিডিতে উল্লেখ করে, ‘আমার মোবাইলে ফোন করে ৬ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে। আমি দাবীকৃত ৬ হাজার টাকা দিতে রাজি হয়েছি। কিন্তু কার কাছে দিবো, আর কোথায় গিয়ে দিবো সেটা আমায় জানায়নি। তাই আমি আপনাদের সাহায্য পেতে আসেছি।’
থানায় জিডি করার পর পুলিশ যথেষ্ট চেষ্টা করেছে, রোকসানাকে জীবিত উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু না, পুলিশও পারেনি রোকসানাকে জীবিত উদ্ধার করতে। উদ্ধার করেছে রোকসানার মরা লাশ।

লাশ পাওয়া যায় গত ২৬ জানুয়ারি শুক্রবার সকালে। সোনারগাঁ থানাধীন মোগরাপাড়া ইউনিয়নের কাইকারটেক ব্রীজের ঢাল থেকে, রোকসানার লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশ ছিলো বস্তাবন্দী। হাত পা ছিলো দড়ি দিয়ে বাঁধা। মুখ ছিলো স্কচটেপ দিয়ে আটকানো। শরীরের বিভিন্ন অংশে ছিলো আঘাতের চিহ্ন। ধারনা করা হয়, রোকসানাকে শ্বাসরোধে করে হত্যা করা হয়েছে। এরপর এই খবর আসে রোকসানার পরিবারের কাছে। একটা মেয়ের লাশ! রোকসানার বাবা-মা লাশ দেখতে সেখানে যায়। লাশ দেখে তাঁরা নিজের মেয়ে বলে দাবি করে। তারপর নিয়ে যাওয়া হয় নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালের মর্গে। হাসপালের করনীয় কাজ সম্পন্ন করার পর, রোকসানার লাশ আসে আরামবাগ এলাকায়। শুরু হয় কান্নাকাটি, আর আহাজারি। জড়ো হতে লাগলো তার সহপাঠিসহ আরামবাগ এলাকার সর্বস্তরের মানুষ। নেমে আসে শোকের ছায়া। রোকসানার শোক ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ সাইট ফেসবুকে। ধিক্কার জানানোসহ প্রতিবাদে মুখর হতে থাকে পুরো নারায়ণগঞ্জ। প্রতিবাদ জানাতে থাকে, সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন গোদনাইলের সর্বস্তরের মানুষ। আর বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক অঙ্গসংগঠন।

ভিডিওতে দেখা যায় মানববন্ধনে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে রোকসানার হত্যার প্রতিবাদ জানাচ্ছে, সম্মিলিত গোদনাইল এলাকাবাসী। ভিডিওটা নিজের মোবাইল দিয়ে ধারণকৃত।

এই শোকের মধ্যেই গত ২৯ জানুয়ারি রোকসানার হত্যাকারী নরপিশাচকে আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ে। নারায়ণগঞ্জের অনেকগুলো আঞ্চলিক পত্রিকায় হত্যাকারীকে আটকের খবর প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত খবরে প্রতিবাদের ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকে। শোক আর প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে আরামবাগ এলাকাতেও। ডাক দেওয়া হয় মানববন্ধনের। মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়, গোদনাইল ২ নং ঢাকেশ্বরী বাসস্ট্যান্ডে। সময় নির্ধারণ করা হয়, ৩০ জানুয়ারি সকাল ১১টা। সকাল সাড়ে দশটার মধ্যের ২ নং ঢাকেশ্বরী বাসস্ট্যান্ডের রাস্তার দুইপাশে মানুষ জড়ো হতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো বাসস্ট্যান্ড লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। মানববন্ধন কর্মসূচিতে যোগ হয়, রোকসানার স্কুলের সহপাঠিরাও। সবার হাতে ছিলো প্রতিবাদলিপি ব্যানার। মুখে ছিলো ঘাতকের ফাঁসির দাবিতে স্লোগান। মানববন্ধনে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের জ্ঞানীগুণীজনরা সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা দেন।

তাদের বক্তৃতায় বলা হয়, ‘রোকসানা তুমি আজ শুধু তোমার বাবা-মায়ের নও। তুমি আজ আমাদের সকলের রোকসানা। জানি তোমার ঘাতক নরপিশাচের ফাঁসি না হলে তোমার আত্মা শান্তি পাবে না।’ আমাদের আত্মাও শান্তি পাবে না। শান্তি পাবে না গোদনাইল তথা পুরো নারায়ণগঞ্জবাসীর আত্মা।’

বক্তৃতায় আরও অনেকে বলেন, ‘এই নরপিশাচের ফাঁসি না হলে, আরও এমন অনেক নরপিশাচ জন্ম নেবে। তখন রোকসানার মতন আরও এমন অনেক শিশুর জীনব বিপন্ন হবে। আমরা সম্মিলিত সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকাবাসী রোকসানার ঘতক নরপিশাচের ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই।’ মানববন্ধনে উপস্থিত সবার শ্লোগানই ছিলো, রোকসানার ঘাতকের ফাঁসি চাই দিতে হবে।