ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো পরীক্ষার্থীদের যেকোনো পরীক্ষার আগমনী বার্তা। চারদিকে আর কোনও বার্তা নেই, খবর নেই, শুধু খবর একটাই। তা হলো প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার বার্তা। খবরের কাগজে, টেলিভিশনের টকশোতে, ইন্টারনেটভিত্তিক অনলাইন নিউজগুলোতে, সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোতে শুধু এই খবরই বেশি দেখা যায়। এসব খবরের মধ্যে বেশি রটানো হয় বর্তমান যুগের স্বাদের ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে। কিন্তু কেউ এই ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র স্বচক্ষে দেখেছে কিনা মনে হয় না। আসলে ঘটনাটা কতটুকু সত্যি তা অনেকেই অনুমান করতে পারে না। না পারার কারণেই, ‘চিলে কান নিয়ে গেছে’ শুনে চিলের পেছনে দৌড়ানোর মতো কাণ্ড বলে মনে হয়।

ঘটনাটা মনে হয় এমন, অনেকদিন আগের কথা। সেসময় নারায়ণগঞ্জ নগর খাঁনপুর মাকে নিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকতাম। নগর খাঁনপুর অনেক বড় মহল্লা। মহল্লার মাঝখান দিয়ে রাস্তা। রাস্তার পাশে মস্তবড় এক পুকুর। হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসতি বেশি। আগেকার সময়ে মাস্তান বা রুস্তমের যুগ ছিলো। ক্যাডারের নাম গন্ধও ছিলো না। রুস্তমদের রুস্তমিতে মানুষ ভয় পেত। তাদের গলায় একটা রুমাল সবসময় বাঁধা থাকতো। এটা ছিলো রুস্তম বা মাস্তানদের ফ্যাশন। অনেক রুস্তমদের সাথে ড্রেগার (ছুরি) বা খুর থাকতো। এই খুরের ভয়তে মানুষ কাঁপতো। চোরের উপদ্রবও বেশি ছিলো। চোরের উপদ্রবে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠতো। সময়সময় মানুষের বাড়িতে ডাকাতিও হতো।

নগর খাঁনপুরে আমরা সমবয়সী ১০/১২ জন বন্ধু ছিলাম। যেকোনো পূজাপার্বণে আমাদের ভূমিকা বেশি ছিলো। মহল্লার সবাই আমাদের বিশ্বাসও করতো। তখন এই বঙ্গদেশে ঝিনঝিনা রোগের নতুন আগমন। ঝিনঝিনা রোগের ওষুধ ছিলো শুধু পানি ঢালা। ঠিকমত পানি ডালতে পাড়লেই ঝিনঝিনা রোগ নিরাময় হয়ে যেত। মহল্লার কাউকে ঝিনঝিনা রোগে ধরলেই আমাদের ডাক পড়তো। আমরা ঝিনঝিনা রোগীকে কোলে করে নিয়ে যেতাম পুকুরপাড়ে। রুগীকে পুকুরপাড়ে থাকা সিঁড়ি ঘাটলায় বসিয়ে কলসে কলসে পানি ঢালতাম। এক থেকে দেড় ঘণ্টা পানি ঢালতে পাড়লেই রোগ মুক্ত হয়ে যেতো। এভাবে সেসময় অনেক ঝিনঝিনা রুগীকে আমরা ভালো করে দিয়েছিলাম। মহল্লার মানুষ আমাদের এইরূপ সেবামূলক কাজ দেখে আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট। ঝিনঝিনা রোগ হ্রাস পেলো।

ঝিনঝিনা গেলো, শুরু হলো মহল্লায় চোরের উপদ্রব। মহল্লার মানুষ আমাদের ডাক দিয়ে একটা দায়িত্ব দিলো। দায়িত্ব হলো, রাত দশটার পরে পুরো মহল্লা পাহারা দিতে হবে। বিনিময়ে মহল্লাবাসী আমাদের রাতজাগার খরচাদি দিবে। চা-বিস্কুট, বিড়ি-সিগারেট সহ জনপ্রতি দশ টাকা করে দিবে। আমরা সংখ্যায় ছিলাম ১২ জন। ১২০ টাকা প্রতি ঘর থেকে ম্যানেজ করে দেওয়া হবে। এনিয়ে কেউ কৃপণতা করতে পারবে না। আমরা রাজি হয়ে গেলাম। পাহারা দেওয়া শুরু হলো। পুকুরপাড়ে থাকা বড় একটা তিনতলা বিল্ডিং-এর উপরে বসে আমরা পাহারা দিতাম। ওই বিল্ডিং-এর উপর থেকে পুরো মহল্লাই দেখা যেতো। তাই আমরা ওই বিল্ডিংটাকেই বেছে নিয়েছিলাম। যাতে চোর ধরতে সুবিধা হয়। মহল্লাবাসী আমাদের তিনটে টর্চ-লাইটও কিনে দিয়েছিলো। সারাদিন নিজেদের কাজকর্ম করতাম। রাতে ওই বিল্ডিং-এর উপরে চোর ধরার নামে আড্ডা দিতাম।

একদিন, দুইদিন, তিনদিন… এভাবে ১০/১২ দিন পার হয়ে যাচ্ছে। অথচ একটা চোরও ধরা পড়ছে না। প্রতিদিন কিন্তু চুরি হচ্ছেই। এখন আস্তে আস্তে মহল্লার মানুষ আমাদের উপরে ক্ষেপছে। ক্ষেপে যাবারইতো কথা। কারণ, প্রতিদিন ১২০ টাকা সহ চা-বিস্কুট বাবদ আরও ১০ টাকার মতন দেওয়া হয়। তারপরও মহল্লায় চুরি হচ্ছে। লোকের প্রশ্ন, ওরা সারারাত কী করে? কারোর গাছের পেয়ারা নেই। কারোর নারিকেল নেই। কারোর পেঁপে গাছে পেঁপে নেই। তাহলে শুধু শুধু ওদের টাকা দিয়ে লাভ কী? এভাবে চলছে মানুষের কানাঘুষা কথা, আর হাকাহাকি। মহল্লার মানুষের এমন কানাঘুষা দেখে আমরা হাসি। হাসি এই কারণে, এসবতো প্রকৃত চোরে চুরি করে না। এগুলো আমরাই গাছ থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে, সারারাত জেগে বসে বসে খাই। তাই আমরা লোকের কথায় মোটেও রাগ করতাম না। আমাদের ডিউটিও বন্ধ করি না। আমরা সবাইকে আশ্বস্ত করতাম, চোর আমরা ধরবোই ধরবো।

সব বন্ধুরা বুদ্ধি করলাম, কীভাবে মানুষের কাছে বিশ্বস্ত হওয়া যায়। তখনকার সময়ে অনেকেই বাথরুমে যাবার জন্য, পিতলের বদনা ব্যবহার করতো। এই বদনাগুলো থাকতো ঘরের বাইরে, খোলা জায়গায়। এই বদনা দিয়েই কাজ করতে হবে। কাজটা হলো, ঘরের বাইরে আর বাড়ির ভেতরে যা পাওয়া যাবে, সব বস্তায় ভরা হবে। তারপর বস্তাটা রাস্তার পাশে রাখতে হবে। এই কাজটা করার সময় কেউ যেন না দেখে। বস্তাটা আমাদের সাথের একজন রাস্তার সাইডে রেখে আসবে। আর তখনই আমরা লাঠি নিয়ে দৌঁড়াবো। মুখে থাকবে চোর চোর আওয়াজ। মহল্লার মানুষও ঘুম থেকে উঠে আসবে। আমরা বস্তা ধরে বলবো, চোর বেটায় ভয়ে বস্তা রেখে পালিয়েছে। লোকেও বিশ্বাস করবে। এরপর যেই কথা সেই কাজই হয়ে গেলো। পুরো মহল্লার বাথরুমের পিতলের বদনা হলো দুই বস্তা। একজন রাস্তার পাশে রেখে দিয়ে চলে এলো। সাথে সাথে আমরা লাঠি, শাবল, দা, কোদাল নিয়ে, চোর চোর বলে হইচই শুরু করলাম।

মহল্লার সব মানুষ ঘুম থেকে সজাগ হয়ে রাস্তায় চলে এলো। আমরা বলাবলি করছি, এদিক দিয়েই চোর বেটা পালিয়েছে। ঈশ! আর একটুর জন্য চোর বাটাকে ধরতে পাড়লাম না! আমাদের সাথে সুর মিলিয়ে মহল্লার আরও অনেকেই বললো, ‘আমিও দেখেছি চোরকে দৌড়ে চলে যেতে।’ কেউ বলছে, ‘ঈশ আমার চোখের সামনে দিয়ে গেল। ইচ্ছা করলে ধরতে পাড়তাম। কিন্তু আমি ঘুম থেকে উঠে এসেছিতো, প্রস্তুত ছিলাম না। তাই ধরতে পারিনি।’ এমন আরও অনেকেই বললো। আসলেতো এখানে কোনও চোরই আসেনি। তবু লোকের এমন অবাস্তব কথা শুরু হয়ে গেলো। কথায় আছে, ‘চোর গেলে বুদ্ধি পাকে।’ হলোও তেমন কাণ্ড! যেখানে কোনও চোরই আসেনি, সেখানে মহল্লাবাসীর চোখের সামনে দিয়ে চোর গেলো!

মহল্লাবাসী দুই বস্তা মালামাল দেখতে পেলো। বস্তার ভেতরে কী? সবার মুখে একই কথা শুরু হলো, বস্তায় কী? দেখতে চাই দেখতে চাই। আমরা বলছি যা-ই আছেতো আছে, তা সকালবেলা দেখানো হবে। এখন কেউ বাথরুমে যাবে, দেখে বদনা নেই। বাথরুমে যাবার বদনা খুঁজে পাচ্ছে না। এভাবে একজন, দুইজন, তিনজন করতে করতে মহল্লার কোরোর বাড়িতেই, বাথরুমে যাবার বদনা খুঁজে পাচ্ছে না। তখন সবাই বস্তা খোলার অনুরোধ করলো। বস্তা খুললাম। বস্তার ভেতরে মহল্লার সবার বাড়ির বাথরুমের পিতলের বদনাগুলো। সবাই বলতে লাগলো, দেখো চোরের কাণ্ড! ওরা ক’জন আছে বলে কিছু নিতে পারে না। তাই আজ শর্টকাটে বদনাগুলো বস্তায় ভরেছে। ভাগ্যিস ওরা আছে বলে রক্ষা। নাহয় এগুলোও যেতো। এরপর রাস্তার উপরেই বস্তা ঢেলে দিলাম। যার যার বদনা সে সে বেছে নিলো। চুরি করলাম আমরা ক’জন। ঘটলো কী আর রটলো কী? আমরাই ঘটালাম কাণ্ড, আমরাই রয়ে গেলাম সাধু মানুষ। হয়ে গেলাম সবার পছন্দের। তখন থেকে নগর খাঁনপুর মহল্লায় আমাদের তেলেসমাতির বাহাদুরি আরও একধাপ বেড়ে গেলো। আমরা হয়ে গেলাম মহল্লার হিরো।

এমনই হিরো বনে আছে বর্তমানে কথিত প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী নামের সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো। আর কিছু ইলেকট্রনিক মিডিয়া কর্মীরা। এসবের সাথে যোগ হয়েছে, কিছু কানাঘুষা করা অসাধু মানুষ ও সরকারের বিপক্ষীয় অঙ্গসংগঠন। যারা সকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটাতে চায়। এই ফাঁসের পেছনে আরও আছে, যেখান থেকে প্রশ্নপত্র ছাপানো হয়; সেখানকার কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীগণ। তাদের যোগসাজশেই প্রশ্নপত্রের কপি পাচার হয়ে পড়ে ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন সাইটে। এরপর অনেকেই এব্যাপারে বুঝে না বুঝে স্বাদের ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়ে ছড়াচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব। এমন কয়েকজন স্ট্যাটাস দেওয়া ব্যক্তির স্ট্যাটাসে আমি মন্তব্যও করেছি। মন্তব্যে লিখেছি, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে শুনে আপনি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। আপনি নিজে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েছেন? প্রত্যুত্তর পেলাম, না। তাহলে স্ট্যাটাস দিয়ে আরও দশজনকে জানালেন কেন? প্রত্যুত্তর পেলাম, ফেসবুকে দেখলাম তাই। আরও কিছু লিখে জিজ্ঞেস করতাম, কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। কারণ, ওই ব্যক্তি আমাকে ব্লক করে রেখেছে তাই। এমন আরও অনেককেই প্রশ্ন করেছি, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র দেখেছেন কি না? উত্তর পেলাম, শুনেছি মাত্র, স্বচক্ষে দেখিনি।

অনলাইন বিবিসি বাংলা নিউজে একটা খবর পড়লাম। তা নিচে খবরের হুবহু কপি সহ লিংক দিলাম।

“পরীক্ষা চলার সময় এবং পরীক্ষা শেষে শুনি যে সেন্টারে আমাদের স্কুলের কেউ এবং অন্য স্কুলের কেউকেউ বলাবলি করছে, রাতেই তারা প্রশ্ন পেয়েছে। একজন নিজের বন্ধুকে বলছিল রাতে যেটা পাঠাইছিলি, সেটাই আসছে।”

এখানে কেউ যদি তাদের জিজ্ঞেস করতেন, “কেউ কেউ কোনও মানেই হয় না। তোমরা কেউ পেয়েছ কি না?” কিন্তু এমন প্রশ্ন কেউ তাদের জিজ্ঞেস করেনি। তাহলে এখানে কী বোঝা যাচ্ছে? যতটুকু বোঝা যায়, তা হলো, ‘চিলে কান নিয়ে গেল রে…!!’ এখন দৌড়াতে থাক, চিলের পিছনে পিছনে।

আবার একই নিউজের খবর:

প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে রোববার থেকে হৈচৈ এবং উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে পুলিশ আজ (মঙ্গলবার) ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

এই ছয়জন থেকে কতটুকু সত্যতা মিলেছে, তা এখনো জানা যায়নি। শেষমেশ যা পাওয়া যেতে পারে তা হলো, “আমরা ফেসবুকে পেয়েছি, তাই নিজেরাও স্ট্যাটাস দিয়ে জানিয়েছি বা প্রচার করেছি।” তবে বিষয়টি এখনো তদন্তকারীদের তদন্তের আওতায় আছে। তদন্তে কী বেরিয়ে আসে তা পরে জানা যাবে।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে আগাগোড়া থেকেই বলে আসছে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। আর ফাঁস হবার কোন প্রকার লক্ষণও নেই। যা হচ্ছে, তা গুজব রটানো মাত্র। ওইসব রটানো ঘটানো চক্রান্তকারীদের আইনের আওতায় এনে, বিচারের মাধ্যমে ওদেরকেই ফাঁসি দেওয়া দরকার। কিন্তু তা না করে আমাদের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী কী করে যে বললেন, “এবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে, পরীক্ষা বন্ধ!” মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর কথায় বোঝা যায়, তিনি হয়তো জানেন বারাবরই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী যদি বলতেন, “প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। হতেও পারে না। তারপরও যখন রটানো, ঘটানো ঘটনা সাজানো হচ্ছে। তাহলে আমরা দেখছি, কোন সাইট থেকে এসব করা হচ্ছে।” তাহলেই ফাঁসকারী ফেসবুক গ্রুপ সহ মিডিয়া কর্মীরাও চুপ হয়ে যেত। বন্ধ হয়ে যেত প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী ফেসবুক গ্রুপটি। কিন্তু দুখের বিষয়, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর এমন কথায় ওইসব চক্রান্তকারীরা আরও জোরদার হয়ে উঠেছে। শুরু করে দিয়েছে, পরীক্ষা চলাকালীন সময়ও এসব গুজব ছড়ানো। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য পরে পরীক্ষা বাতিলের সম্ভাবনাও নাকচ করে দিয়েছেন।

.

এই প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে এমনই একটা খবর পড়লাম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে।

সংবাদ শিরোনাম ছিল এরকম, “বাংলা দ্বিতীয় পত্রও ফাঁস হল, সেই প্রশ্নে পরীক্ষাও হল।”
প্রথম পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার পর দ্বিতীয় পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের বিজ্ঞাপন এল ফেইসবুকে। পরীক্ষা শুরুর পৌনে এক ঘণ্টা আগে সেই প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল হল। ফাঁস হওয়া সেই প্রশ্ন মিলে যাওয়ার পর কর্মকর্তারা বরাবরের মতই বললেন, বিষয়টি তারা ‘দেখবেন’।

বিষয়টি অবশ্যই সরকারের দেখার বিষয়। জানার বিষয়। তদন্ত করে দেখার বিষয়। হট্টগোল সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জরুরি বিষয়। আমাদের দেশে যতটুকু না ঘটে, তার চেয়েও বেশি রটে যায়। তাইতো অনেক সময় অনেকেই বলে, আমরা নাকি হুজুগে বাঙালি! ফেসবুকে কে বা কারা, কোন গ্রুপ একটা প্রশ্নপত্র আপলোড করেছে। সেটাকেই অরিজিনাল প্রশ্নপত্র বলে প্রচার করা হচ্ছে। ফেসবুকের গুজবের কারণে আমাদের দেশে শুধু প্রশ্নপত্রতেই আগুন লাগেনি। আগুন কয়েকবার কয়েক গ্রামেও লেগেছিল। গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল, এই ফেসবুক গুজবের কারণে। সেটা এই বঙ্গদেশের সবাইর মনে আছে। সেটা মনে থাকা সত্ত্বেও, আমরা ফেসবুকে একটা প্রশ্নপত্র পেয়ে সেটাকে শেয়ারের উপরে শেয়ার করে যাচ্ছি। আসলে কিন্তু ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র কেউ দেখেওনি। অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবকরাও ফেসবুক ব্যবহার করে। তারাও মনে হয় এই ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র চোখেও দেখেনি। মিডিয়া কর্মীরাও ফেসবুকের স্ট্যাটাসের তালে তালে, প্রশ্ন ফাঁসের খবর প্রচার করা শুরু করলো।

সরকারের পক্ষ থেকেও শুধু বলতে লাগলো, বিষয়টি দেখা হচ্ছে। কিন্তু কার্যত এর সঠিক অনুসন্ধান করার কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না বলে মনে হয়। সরকার ইচ্ছে করলে ১০০০ ফুট মাটির নিচ থেকেও, একজন অপরাধীকের ধরে আনতে পারে। আর যেই প্রশ্নপত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে তৈরির পর বিলিবন্টন করা হয়, সেই প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের ধরতে পারে না, এমনটা মেনে নেওয়া যায় না। ধরতে পারে না এমনটা বিশ্বাসও করা যায় না। বিশ্বাস করা যায় না যে, একটা দুইটা প্রশ্নপত্র ফাঁস হবার করণে, দেশের ৮,৫৫১ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২০,৩১,৮৯৯ জন শিক্ষার্থীর হাতেই প্রশ্নপত্র পৌঁছে যাবে। এটা অবিশ্বাসই থেকে গেলো।

প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা, কিছু উত্তর-প্রত্যুত্তর।

প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে কয়েকজন এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করলাম, প্রতিবছর এরকম প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার বিষয়ে তোমাদের অভিমত কী?

তারা বললো, এসব শুধুই রটানো খবর। আসলে এর কোনও হাদিসই নেই।

তার মানে হলো, সবাই এই গুজবই শুনেছে মাত্র। কেউ আর ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র হাতে পায়নি বা স্বচক্ষেও দেখেনি।
কেউ আবার বলছে, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্ন ফাঁসকারীদের ধরে দেওয়ার জন্য পাঁচলাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। তারপরও আমরা এটা বিশ্বাস করি না। যেহেতু আমরা পাইনি, দেখিনি। এখন আপনার কাছে যদি এর কোনও সন্ধান থাকে আমাদের বলুন। আমরা একটু ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র দেখতে চাই।

বললাম, যেখানে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নিজেই, প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের ধরে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছে। সেখানে আপনারা বলছেন, এটা বিশ্বাস করি না। তাহলে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী পুরস্কার ঘোষণা দিলো কেন?
বললেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। তবু দেশজুড়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এখন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এটাই বোঝাচ্ছে যে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি তবু বলছে ফাঁস হয়েছে। তাহলে ধরিয়ে দিন ফাঁসকারীদের। ধরতে পাড়লে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। যদি ধরে দিতে পারে বা ধরা পড়ে, তাহলে বোঝা যাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ধরা না পড়া পর্যন্ত সবই গুজব রটানো কাণ্ড ছাড়া আর কিছুই নয়।

তাদেরকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, যদি সত্যি সত্যি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েই যায়। আর যদি প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্র ধরা পড়ে যায়। তখন আপনারা কী বলবেন?

_তখন আর কিছুই বলার থাকবে না। শুধু বলবো, চোর গেল, আর বুদ্ধি পাকলো। কারণ, পরীক্ষার আগে আর চলাকালীন সময়ে যখন ফাঁসকারী চক্র ধরতে পরলো না, এখন ধরে আর লাভ কী হয়েছে? পরীক্ষাতো হয়েই গেছে। আগামী পরীক্ষার আগে হয়তো আবার শুরু হয়ে যাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস।

অনেক সাধারণ মানুষ বললেন, এটা বর্তমান সরকারের সুনাম ক্ষুন্ন করার একটা অংশবিশেষ। কারণ, বর্তমান সরকারের করা উন্নয়ন দেখে একশ্রেণীর অসাধু মানুষের মাথা নষ্ট। তাই তারা নানারকম ফন্দিফিকির করে সরকারে সুনাম ক্ষুন্ন করার চেষ্টায় সর্বদাই লিপ্ত রয়েছে।

কিছুসংখ্যক অভিভাবককে জিজ্ঞেস করলাম, শোনা যায়, প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হবে। এবিষয়ে আপনাদের অভিমত কী? বললেন, পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়ার কোনও মানেই হয় না। আর এটা হবেও না। কারণ, আগেকার সময়ে মেট্রিক পরীক্ষা, আইএ, বিএ পরীক্ষায়ও অনেকে নকলের উপর ভরসা রেখে পাস করেছে। অনেকে পরীক্ষা কেন্দ্রে নকল সহ ধরাও পড়েছে। তাই বলে কী পরীক্ষা বন্ধ হয়েছিল? একজনের নকল দেখে কী সবাই পরীক্ষা দিয়েছিল? যারা নকলে বিশ্বাসী, তারাই নকল খুঁজে বেড়ায়। তাদের জন্যই আজকের এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অন্যতম কারণ।

কয়েকজন শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলাম, শোনা যাচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে, আপনাদের অভিমত কী? উত্তর পেলাম, এসব ভুয়া খবর। গুজব খবর। ফেসবুক খবর, ফেসবুক গুজব।