ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানাধীন উত্তর লক্ষণখোলা খেয়াঘাট সংলগ্ন এলাকার একটা গাঁদাফুলের ক্ষেত। 

প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণগঞ্জের প্রধান নদী শীতলক্ষ্যা। রূপসী বাংলার কোন এক সময়ের খরস্রোতা নদী। এর পানি যেমন ছিলো স্বচ্ছ, তেমন ছিলো মিষ্টি। আগেকার সময়ে বিদেশিরা নাকি এই নদীর পানি দিয়ে ঔষধ তৈরি করতো। আবার বিদেশি জাহাজের নাবিকরা খাবারের জন্য এই শীতলক্ষ্যার পানি নিয়ে যেতো। সাগরের মাঝপথে শীতলক্ষ্যার মিঠাপানি পান করেই তৃষ্ণা মেটাতো। এখন আগের মতন শীতলক্ষ্যার স্বচ্ছ আর মিঠাপানি পানি নেই। এখন শীতলক্ষ্যা নদীতে কালো কুচকুচে পানি। পানিতে ডাইং আর নীট গার্মেন্টসে কাপড় রং করা বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত। এই পানি শোধন না করে কেউ পান করে না। যদি ভুলবশত পান করে, নির্ঘাত মৃত্যু অনিবার্য। কেউ করেও না মরণের ভয়ে।

আবার নেই আগের মতন নদীর প্রস্থতা। শীতলক্ষ্যা নদী এখন শুকিয়ে মরা একটা খালের মতন হয়েছে। ছোটবেলায় নদীতে স্নান করার সময় সমবয়সীদের সাথে সাঁতার দিয়ে নদী পার হতাম। সাঁতার দিয়ে আর আসতাম না। আসতাম খেয়ানৌকা দিয়ে। কারণ, সাঁতার দিয়ে নদী পার হয়েই দম যায় যায় অবস্থা। তাই আর সাঁতার দিয়ে আসার ক্ষমতা হতো না। আসতাম খেয়ানৌকায় চড়ে। এখন মনে এপার-ওপার থেকে মানুষ, হাতে হাত মেলাতে পারবো। এপারের মানুষ হাত বাড়ালেই ওপারে থাকা মানুষের হাত ছুঁতে পারবে। সরকার কর্তৃক বহুবছর ধরে এখন আর নদী খনন করা হয় না। খনন না করার কারণে, নদীর পাড় জেগে চড়ের মতন হয়ে গেছে। পদ্মা মেঘনার যেমন চড় জাগে, ঠিক তেমন। চড় জেগে নদীর পাড় হয়েছে অনেক চওড়া। আগে শীত মৌসুমে নদীর পাড়ে নানারকম সবজি সহ ধানের চাষও করা হতো। শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের সবজি দিয়েই শহরবাসীর প্রতিদিনের সবজির চাহিদা মিটতো। আর ধান ছিলো নদী পাড় ঘেঁষা মানুষের জন্য এক্সট্রা জোগান।

এখন আগের মতন ওইরকম সবজি আর ধান চাষ কেউ করে না। করলেও আগের মতন ফলন হয় না। সারাবছর নদীতে থাকা ডাইং গার্মেন্টসে বিষাক্ত কেমিক্যালের কারণে মাটিও বিষাক্ত হয়ে থাকে। নদীর পানিও কালো, পাড়ের মাটিও কালো বর্ণের হয়ে থাকে। এই মাটির কোনও উর্বরতা নেই। ফসলের বীজ রোপণ করলেও ফলন হয় না। তাই আর কেউ নদীর পাড়ে চাষাবাদ করতে চায় না। শুষ্ক মৌসুমে পুরো নদীর পাড় এমনিতেই খালি পড়ে থাকে। ইদানীংকালে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড়ের কিছু মানুষ একটা নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। সেটা হলো, গাঁদা ফুল সহ বিভিন্ন ফুলের চাষ। প্রথমপ্রথম হাতে গোনা অল্পসংখ্যক মানুষ কয়েকরকমের ফুলের চাষ শুরু করে। এরমধ্যে বিভিন্ন জাতের গাঁদা ফুলের চাষই বেশি দেখা যায়। গাঁদা ফুলের বিভিন্নরকম জাতের মধ্যে রয়েছে, চাইনিজ গাঁদা, রাজ গাঁদা, আফ্রিকান গাঁদা ও ফরাসি জাতের গাঁদা। তবে এখানে বেশি ফলন হচ্ছে, হলুদ, লাল, কমলা, গাঢ় খয়েরি, লাল হলুদের মিশ্রণের ফুলগুলো।

নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানাধীন উত্তর লক্ষণখোলা খেয়াঘাট সংলগ্ন এলাকার একটা গাঁদা ফুলের ক্ষেত।

ভাবতে অবাক লাগে! যেখানে নীট গার্মেন্টসের বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত মাটিতে সবজিই ফলন হতো না। সেখানে গাঁদা ফুল ছিলো একটা স্বপ্নের ব্যাপার। মানুষের চেষ্টায় আর পরিশ্রমে ফুল চাষ এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। বছর দু’এক ধরে গাঁদা ফুল শীতলক্ষ্যা নদী পাড়ের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। এমনিতেই নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানাধীন এলাকায় আরও অনেক বছর ধরেই গাঁদা ফুলের চাষ হতো। তবে নদীর পাড়ে নয়। হতো কৃষকের ফসলি জমিতে। নদীর পাড়ে যে, গাঁদা ফুলের ফলন ভালো হবে, তা আর এলাকার মানুষ আগে কখনো ভাবেনি। দু’একজনের দেখাদেখি এখন এলাকার অনেকেই নদীর পাড়ে গাঁদা ফুল সহ বিভিন্নরকমের ফুলের চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। তাই নদী পাড় ঘেঁষা বন্দর এলাকা হতে শুরু হয়েছে ফুলের চাষ। শেষ হয়েছে, কুড়িপাড়া খেয়াঘাট পর্যন্ত। এই বিশাল দৈর্ঘ্য নদী পাড়ে অসংখ্য ছোটখাটো শিল্পপ্রতিষ্ঠানও আছে। এর ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু পরিত্যক্ত জায়গা আছে, সেসব জায়গাতেই ফুলের চাষ করা হছে। শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড়ে এখন শুধু নানারকম ফুলের ক্ষেত। দেখে মনে হয়, এ যেন এক স্রষ্টার তৈরি ফুলের বিছানা। মন চায় এই ফুলের বিছানায় শরীরটাকে একটু লেলিয়ে দেই। কিন্তু তা আর হয় না, শুধু দেখেই মন জুড়াই। চাষ করা নানারকম ফুলের মধ্যে গাঁদা ফুলের ক্ষেতই বেশি।

গাঁদা ফুলের ক্ষেতের মাঝেমাঝে আছে ছোটখাটো শীতকালীন সবজি ক্ষেত। তবে কৃষকের দৃষ্টি শুধু গাঁদা ফুলের দিকেই বেশি। কারণ, শীত মৌসুমে ফুলের চাহিদা থাকে প্রচুর। আর বর্তমান ডিজিটাল যুগে যেকোনো আচার-অনুষ্ঠান, বিয়ে, জন্মদিন, পূজাপার্বণ ফুল ছাড়া আর শুদ্ধ হয় না। ফুল লাগবেই লাগবে। এছাড়াও কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, রাজনৈতিক সভা, মিছিলের শোভাযাত্রায়, হরিনাম সংকীর্তনে, ওয়াজ মাহফিলে, মন্দিরে, মাজারে, বিশেষ কোনও দিবসে ফুল লাগবেই। ফুল ছাড়া হবেই না। ফুল ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের আচার-অনুষ্ঠানে লেগেই থাকে। ফুলের প্রতি কোনও জাত-বেজাতের নিয়মাবলী নেই। ফুলের প্রয়োজনীয়তা সকলের জন্যই সমান।

 

তাই শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরাও ফুল চাষের দিকেই বেশি খেয়ালি। নদী পাড়ে যার আয়ত্বে যতটুকু জায়গা আছে, সে ততটুকু জায়গাতেই ফুলের চাড়া রোপণ করছে। বন্দর থানাধীন এলাকা, উত্তর লক্ষণখোলা খেয়াঘাট সংলগ্ন নদীপাড়ে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এর দক্ষিণে সোহাগপুর টেক্সটাইল। উত্তরে সাবেক ১নং ঢাকেশ্বরী কটন মিলস্। এর মধ্যখানের পরিত্যক্ত জায়গাতেই, ছোটবড় শ’খানেক ফুলের ক্ষেত। নদী পাড়ে কৃষকের চাষ করা এসব ফুলের সৌন্দর্যে মন কেড়েছে অনেক মানুষের। তাই প্রতিদিন বিকালবেলা শত শত ছেলে বুড়ো ছুটে আসে নদীর পাড়ে। গাঁদা ফুলসহ নানারকম ফুলের ক্ষেতের কিনারে বসে আড্ডা দেয়।

এমনিতেই বিকালবেলা স্কুলকলেজ বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুলকলেজ থেকে এসেই ফুলের ক্ষেতের সামনে ঘুরেফিরে সময় কাটায়। ক্ষেতে ফোঁটা ফুল আর মানুষের আগমনে পুরো নদীর পাড় যেন মেলায় পরিণত হয়। মানুষের আগমনের সাথে সাথে নানারকনের দোকানও বসে। ঝালমুড়ি, চটপটি, বুট-বাদাম সহ আরও অনেকরকমের খেলনার দোকান। আবার একই সময়ে এখান থেকেই, নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন জায়গায় ফুল সরবরাহ হচ্ছে। ফুল নিতে প্রতিদিন ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইকারও আসছে।

এসব ফুলের ক্ষেত থেকে প্রতিদিন বিকালবেলা ফুল তোলা হয়। বিকাল থেকেই শুরু হয় ফুল কেনা-বেচা। প্রতি একহাজার ফুল প্রকার-আকার ভেদে ৮০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শীতকালীন সময়ে এমনিতেই বিয়েশাদী আর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বেশি হয়। ফুলের চাহিদাও থাকে বেশি। শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের ফুল চাষে নারায়ণগঞ্জবাসীর সেই চাহিদা পূরণ হচ্ছে। এই এলাকার কৃষকরাও ফুলের চাহিদা পূরণেও অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। সাথে বাড়িয়ে দিয়েছে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের সৌন্দর্য। মানুষকেও দিচ্ছে আনন্দ। সব মিলিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড় এখন যেন ফুলের বিছানা!