ক্যাটেগরিঃ জানা-অজানা

আমরা মানুষ, স্রষ্টার প্রেরিত শ্রেষ্ঠ জীব। আমরা মাতৃগর্ভ থেকেই দু্ই হাত, দুই পা নিয়ে জন্মেছি। আমরা মরণশীল। মৃত্যু আমাদের দৈনন্দিন জীবন চলার মাঝে যেকোনো সময়। জন্মের পর থেকেই আমরা নানারকম কুমন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে পড়ি। আবার কেউ কুমন্ত্রণাকে বধ করে স্রষ্টার ধ্যানেই মত্ত থাকে। কেউ জপে হরি নাম, কেউ করে জিকির-আজকার। স্রষ্টাকে সন্তুষ্ট করার জন্য কেউ করে মূর্তিপূজা, কেউ আবার মসজিদে গিয়ে পড়ে নামাজ। আবার কেউ যায় গির্জায়, কেউ যায় বুদ্ধুদেবের মঠে।

আমাদের সমাজে আছে অবিচার, অত্যাচার কুসংস্কার। আছে সুবিচার, সুবিচারক ও সুন্দরভাবে জীবন গড়ার কৌশল। আগেকার সময়ে মানুষের শিক্ষার হার ছিল কম, কুসংস্কারে মানুষ ছিল বেশি বিশ্বাসী। মনগড়া কথা একবার প্রচার করতে পারলেই হলো। সেটা বিধান মনে করে অনেকেই পালন করতো। এখনও অনেক অনেক মানুষেই, কুসংস্কারকে ধর্ম বাক্য মনে করে। যা গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে যেখানে সেখানে এরকম দেখা যায়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও অনেকরকম কুসংস্কার আছে। তবে আমাদের দেশেই কুসংস্কার কথাগুলো বেশি পালন করে থাকে। বলছিলাম, আমাদের দুই হাত আর দুই পা নিয়ে কিছু কথা।

 

কিছুদিন আগে সকালবেলা এক চা-দোকানে বসে চা পান করছিলাম। এমন সময় এক লোক দোকানদারকে চা এর মূল্য দিচ্ছে। লোকটার ডানহাতে চা-এর কাপ। বামহাতে ৫ টাকার একটা কয়েন। দোকানদারকে বলছে, ‘চায়ের দামটা  রাখেন।’ লোকটা বামহাতেই ৫ টাকার একটা কয়েন দোকানদারকে দিতে চাচ্ছে। কিন্তু দোকানদার ওই লোকের দেওয়া ৫ টাকার কয়েনটা আর নিচ্ছে না। কাস্টমার লোকটা যতবার ৫ টাকার কয়েনটা দিতে চাচ্ছে ততবারই দোকানদার না দেখার ভ্যান করছে। একপর্যায়ে কাস্টমার কয়েনটা দোকানদারের সামনে ফেললো। মুহূর্তেই লেগে গেল হট্টগোল, রাগারাগি, গালাগালি।

কারণ, বাম হাত বলে যতো কথা। বাম হাত মানেই হচ্ছে অশুচি আর অপবিত্র বা নাপাক। বামহাতে দেওয়া কোনকিছু নাকি গ্রহণ করতে নেই। গ্রহণ করলেই ভাগ্যের উপড় অলক্ষ্মী ভর করে বসবে। তাই দোকানদার কাস্টমারকে বলেই ফেললো, ‘এই মিয়া, আপনের কি ডান হাত নাই? বা’হাতে টেকা দিলেন কেন? টেকাডা উডান কইতাছি? সকালবেলাই কুফা লাইগা গেলগা।’

লোকটা মুহূর্তেই থ’ বনে গেল। দোকানদারের কথা শুনে, লজ্জায়, পড়ে লোকটা আবার কয়েনটা উঠায়। তারপর ডানহাতে কয়েনটা দোকানদারকে দেয়। ডানহাতের টাকা পাবার পরও দোকানদার বকবক করতে করতে বলছে, ‘লেহাপড়া হিগছে? আচার-বিচার কিচ্ছু জানে না। মাইনষের কাছে কয়, আমি শিক্ষিত!’

দোকানদারের এসব কথা শুনে আমিও অক্কার মা ঠক্কা হয়ে গেলাম। কিন্তু লোকটির পক্ষ নিয়ে কিছুই বলতে পারিনি। কারণ, দোকানদারকে এসব বুঝানো বড় মুশকিল হবে, তাই কিছু বলিনি।

এসব কুসংস্কার কথা বহু আগে থেকেই আমাদের সমাজে প্রচলিত। যা অহরহ, নিত্যদিনের ঘটনা রটনা। আমাদের এই বঙ্গদেশে বাম হাতটা যেন একটা অভিশাপ। বামহাত দিয়ে আমাদের মলদ্বার পরিষ্কার করি বা ধোয়ামোছা করি। এজন্যই আদি যুগ থেকেই আগেকার বুড়োরা আমাদের নানান কথা শিখিয়ে গেছেন। বামহাত দিয়ে এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। যা আমরা এখনও সেসব কথা ঘরে বাইরে সবাই মেনে চলি। কিন্তু কেউ এর সত্য মিথ্যা যাচাই করে দেখে না। যেমন কথায় আছে, ‘চাঁদে একটা বটগাছ আছে। সেই বটগাছের নিচে এক বুড়িমা বসে বসে সূতো কাটছে।’ আবার অনেকেই বিশ্বাস করছে, ‘পৃথিবীটা একটা গরুর শিঙের উপরে আছে। কিছুদিন পরপর, এক শিং থেকে আরেক শিঙে অদলবদলও করে থাকে। এই অদলবদল করার সময়ই নাকি পৃথিবীতে ভূমিকম্প অনুভূত হয়।’ আরও অনেক বানানো কথা আমাদের সমাজের মানুষ এখনও বিশ্বাস করে বসে আছে।

এখন কথা হলো, ডানহাত কার, আর বামহাতটাই-বা কার? আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছে, তারা বামহাতি। পবিত্র ডানহাত থাকতেও তারা বামহাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। খাদ্য খাওয়া থেকে আরম্ভ করে দৈনন্দিন জীবনের সব কাজই বামহাতেই করে থাকে। আবার ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের কবলে কারোর অঙ্গহানিও হয়ে যায়। তখন বামহাতই তার জীবন চলার একমাত্র  হাতিয়ার হিসেবে সঙ্গী হয়ে থাকে। যা-ই করুক, এই বামহাত দিয়েই তাকে করতে হয়। এ ছাড়া আর তার কোনও উপায় নেই বলে আমার বিশ্বাস। যা-ই হোক, এবার আসল কথায় আসি।

আসল কথা হলো আমি একজন মানুষ। ডানহাত বামহাত নিয়েই আমি জন্মেছি। কোনও পবিত্র কাজে যেমন দু’হাত ব্যবহার করি, তেমনি অপবিত্র কাজেও দু’হাতই ব্যবহার করি। যেমন: আমি যদি কোনও মন্দিরে গিয়ে জোড়হাত করে প্রণাম করি, তাহলে কি আমার সেই প্রণাম করা বিফলে যাবে? সম্মানিত মুসলমান ভাইয়েরা দু’হাত তুলে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করে। তাহলে এখানে বামহাত ছাড়া কি মোনাজাত হবে? যার একহাত নেই বা বামহাত নেই তার হবে। আর যার দু’হাতই আছে, তাদের কি হবে? তখন কেন এই অপবিত্র বামহাত নিয়ে কথা ওঠে না? আমি যখন আমাদের পুরোহিত বা গুরু-মহাগুরুদের প্রণাম করি, তখন কেন তারা আমার প্রণাম গ্রহণ করে? তারা তখন বলতে পারে না, বামহাত নামিয়ে প্রণাম করো? যখন আমি মন্দিরে দেবতার বিগ্রহে দু’হাত ভরে ফুল দেই, তখন মন্দিরে থাকা পুরোহিত বাধা দেয় না কেন? এসব প্রশ্ন শুধু করেই গেলাম, সদুত্তর পেলাম না। পাইনি এর কোনও লিখিত শাস্ত্র বিধান। অথচ এইরূপ কুসংস্কারাচ্ছন্ন নিয়ম-কানুন নিয়ে ঘটে যায় কত অঘটন!

আবার ডান পা, আর বাম পা নিয়েও আমাদের সমাজে বহু নিয়ম বলবত আছে। এই রীতি দেখা যায়, একজন পিতা তার ছেলের জন্য পাত্রী দেখতে গেলে। ছেলের সাথে থাকা সবাই প্রথমে মেয়ের পায়ের দিকেই তাকায়। মেয়ের ডান পা, না বাম পা আগে চলে, সেটা সবাই ফলো করে। পায়ের ঘটন মোটা না চিকন, সেটাও দেখে। এই পায়ের সাথে নাকি লক্ষ্মীশ্রী সংযুক্ত? মেয়েদের বেলা বাম পা নাকি লক্ষ্মীবান? ছেলেদের বেলায় ডান পা হলো লক্ষ্মীবান। মেয়েদের পায়ের গোড়ালি (গোছা) মোটা হলেও মহা বিপদের আশংকা আছে। সেই মেয়ে নাকি অলক্ষ্মী। আসলে এসব কিছুই না, সবই আগের দিনের মানুষের মনগড়া কথা। যা আমরা এখনও অক্ষরে-অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করি। কিন্তু বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির দুনিয়ায়, একটু সত্য-মিথ্যা যাচাই করে দেখি না। কুসংস্কার কথার  নিয়মের একটু হেরফের হলেই, লেগে যায় খটকা। হয়ে যায় মারামারি, হাতাহাতি। ভেঙ্গে যায় একজন অসহায় পিতার মেয়ের বিয়ে, ভেঙ্গে যায় স্বপ্ন।

 

অনেক সময় হাত ও পায়ের আঙুল নিয়েও নানান কথা শোনা যায়। কারোর হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলের সাথে ছোট একটা আঙুল থাকলেই, সে ভাগ্যবান। তাকে বলে, ‘একুশ আঙুলা’। দু’হাতে দুটো আঙুল বেশি থাকলে বলে, ‘বাইশ আঙুলা’। যার এরকম আঙুল আছে, তিনি নাকি মহা-ভাগ্যবান ব্যক্তি। মেয়েদের বেলায় থাকলে তো আর কথাই নেই। ওই মেয়ে পরের ঘরে গিয়ে নাকি মহা-লক্ষ্মী বনে যাবে। কাউকে আবার রাগ করে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখালেই সর্বনাশ! সাথে সাথেই একশন, রিঅ্যাকশন। হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল নাকি ঝগড়া বাঁধায়? আবার দেখা যায়, হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে মানুষকে সন্তুষ্টিও করে। কেউ আবার বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে, সঠিক বলে মনের ভাবও প্রকাশ করে। তাহলে আমরা এখন কোনটা বিশ্বাস করবো? আর কোনটা অবিশ্বাস করবো? কোনটা মানবো, আর কোনটা মানবো না? প্রশ্ন শুধু প্রিয় পাঠকের কাছেই রেখে গেলাম।