ক্যাটেগরিঃ দিবস প্রসঙ্গ

 

আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। যা ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ নামে পরিচিত। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও এই বিশেষ দিবসটি পালিত হচ্ছে।

ভালোবাসা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ আর আকাঙ্ক্ষিত একটি আবেদন, যা শুধু অন্তরেই থাকে, চোখে দেখা যায় না। ভালোবাসা অনুভূতির কারণেই, একে অপরকে খুব কাছে টানে। প্রাণিজগতের অন্যান্য সব প্রাণীর মাঝেই ভালবাসা পরিলক্ষিত। তবে মানুষের ভালোবাসা থেকে পৃথিবীতে অনেক নজির সৃষ্টি হয়েছে। যা পৃথিবীর অন্যকোন প্রাণী থেকে ভালোবাসার তেমন কোনও নজির সৃষ্টি হয়নি। তাই ভালোবাসা নামের অজানা অদেখা অব্যক্ত অনুভূতিকে মহিমান্বিত করতেই প্রতিবছর একটি দিনকে ঘোষণা করা হয়েছে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’। যা আমরা বলে থাকি ‘ভালোবাসা দিবস’। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিনটি ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ। বাংলা ফাল্গুন মাসের ঠিক ২ তারিখে এই বিশেষ দিনটি পালিত হয়ে আসছে। তবে এই ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস বর্তমানে কমবেশি সবারই জানা। এর ইতিহাস নিয়ে রশি টানাটানি করতে চাই না। চাচ্ছি ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে নিজ এলাকায় এই দিবসটি উদযাপন নিয়ে কিছু লিখতে।

গোদনাইল চৌধুরী বাড়ি মার্কেটের সামনে ফুলের দোকান।

এই দিবসটি বিশেষ করে শহরাঞ্চলেই বেশি জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে থাকে। আগেকার সময়ে গ্রামাঞ্চলে এই দিবসটির নামগন্ধও ছিল না। ইদানিংকালে গ্রামাঞ্চলেও এর ছোঁয়া লেগেছে। ছোটবেলা এই ভালোবাসা দিবসের নামও শুনিনি। আর এখন এই ভালোবাসা দিবসটি ছেলে বুড়ো সবার মাঝেই পরিলক্ষিত। তাই ফেব্রুয়ারি মাস শুরুতেই ভালোবাসা দিবসের গুঞ্জন শোনা যায়। কে কাকে কী দিবে, কে কার কাছ থেকে কী নেবে। এসব নিয়ে চলে বিস্তর আলোচনা, গবেষণা। কোনকোন জায়গায় এই দিবসটিকে কেন্দ্র করে উঠতি বয়সের যুবকরা গান-বাজনারও আয়োজন করে থাকে। আর এই ভালোবাসা দিবসটিতে আদান-প্রদানে জন্য যা লাগে, তা হলো ফুল। ফুল ছাড়া এই দিবসটি উদযাপন হবে তা ভাবাই যায় না। পৃথিবীর সব দেশের মতো আমাদের দেশেও ভালোবাসা প্রকাশের একমাত্র পদ্ধতি হলো ফুল। ফুলের প্রতি সবারই কম-বেশি দুর্বলতা থাকে। প্রিয়জনকে শুভেচ্ছা জানাতে হলে, একমাত্র ফুল দিয়েই শুভেচ্ছা জানাতে হয়।

তাই ভালোবাসা দিবসের আগের দিন কমবেশি সবাই ফুল কিনে নেয়। সেই ফুল ভালোবাসা দিবসে কেউ দিবে মাকে। কেউ দিবে বাবাকে। কেউ দিবে আদরের ছোট ভাই-বোনদের। কেউ আবার ফুল নিয়ে গোপনে রেখে দেয় মনের মানুষটিকে দিতে। ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকাল বেলা থেকেই শুরু হয় ফুল বেচাকেনার ধুম। ফুল বেচাকেনার ধুম দেখা যায় নারায়ণগঞ্জ সিটি ১০ নং ওয়ার্ড গোদনাইল চৌধুরী বাড়িতেও। এলাকাটি নীট গার্মেন্টসের জন্য সুখ্যাতি। এলাকাজুড়ে রয়েছে শতাধিক নীট গার্মেন্টস, ডাং ও বিভিন্নরকমের শিল্প কারখানা। এলাকার স্থায়ী বসবাসকারীদের সাথে মিলেমিশে আছে, দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ। চৌধুরী বাড়ি বাজার হলো, অত্র এলাকার মানুষের কেনাকাটা করার একমাত্র স্থান। সন্ধ্যারর পরপর গার্মেন্টসগুলোর ছুটি হয়। আসা যাওয়ার মধ্যস্থল হলো, এই চৌধুরী বাড়ি বাজার বা মার্কেট। একেতো পহেলা ফাল্গুন, ঋতুরাজ বসন্তের আগমন। আবার রাত পোহালেই ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস। এই দিবসটিতে ফুলের বিকল্প আর কিছুই নেই। ফুল ছাড়া এই বিশেষ দিবসটি উদযাপন করাই যাবে না।

ছবি: গোদনাইল চৌধুরী বাড়ি 

তাই যে যা-ই কিনছে না কেন, আগে কিনছে ফুল। মার্কেটের সামনে রাস্তার পাশে বসেছে ফুলের দোকান। নানারকম ফুলের ফরসা সাজিয়ে বসেছে দোকানদাররা। প্রতিটি ফুলের দোকানেই ক্রেতার ভিড়। ভালোবাসার জিনিসের সাথে দামের কোনও প্রশ্ন নেই। চাই মনোমতো সুন্দর জিনিস। তাই ফুল বিক্রেতারাও তাদের ইচ্ছেমত দাম নিচ্ছে। প্রতিটি বড় গোলাপের দাম ৩০ টাকা। ছোট ও মাঝারি সাইজের গোলাপ ২০ থেকে ২৫ টাকা। ভালোবাসার বিনিময়ে এই দাম খুবই নগণ্য। একটি গোলাপের সাথে একটা গাঁদাফুল আর দু’একটা অন্য ফুল দিয়ে দোকানদার তোড়া বানিয়ে দিচ্ছে। একটা ফুলের তোড়ার দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা। চলছে ধুম বেচাকেনা।

এই দিনে ফুলের পরই শুভেচ্ছা জানায় কার্ড দিয়ে। কার্ডের মাধ্যমে যেমন কারো ভালোবাসা প্রকাশ করা যায়, তেমনি ভালোবাসার গভীরতাও জানানো যায়। আমাদের দেশে ভ্যালেন্টাইন কার্ডে ভালোবাসা প্রকাশের বিভিন্ন ধরনের কবিতাও লেখা থাকে। তাই চৌধুরী বাড়ি বাজারের লাইব্রেরিগুলোতে প্রচণ্ড ভিড়। আবার কেউ দিয়ে থাকে ডায়রি। উপহার হিসেবে কাউকে কিছু দিতে, ডায়েরির চাহিদাও কম নয়। প্রিয় মানুষটির যদি স্মৃতিকথা লেখার অভ্যাস থাকে, তাহলে তার জন্য ডায়রি হলো সবচাইতে প্রিয়। প্রিয় বন্ধুটি ডায়রিতে সুখ-দুঃখের স্মৃতি লিপিবদ্ধ করে রাখতে পারে। অনেকে লাইব্রেরি থেকে নানারকমের ডায়রিও কিনছে, প্রিয় মানুষটিকে দেওয়ার জন্য। অনেকে বিখ্যাত লেখকদের বইও উপহার দিয়ে থাকে। যারা বই পড়তে পছন্দ করেন তাদের জন্য চমৎকার উপহার হচ্ছে বই। অনেকে তাদের পছন্দমত বইও কিনছে। এই ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষে চৌধুরী বাড়ি বাজারের লাইব্রেরিগুলোতেও চলছে ধুম বেচাকেনা।

ছবি: গোদনাইল চৌধুরী বাড়ি থেকে তোলা

তবে কারো কারো পছন্দের তালিকায় থাকে পোশাক। ঠিক তেমনি আজকাল ছেলে-মেয়েরা পোশাকের ব্যাপারে খুব আগ্রহী। তাই ভালোবাসা দিবসে ফ্যাশন হাউজগুলোতে অনেক ভিড় দেখা যায়। প্রতিটি ফ্যাশন হাউজগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষণীয়। এছাড়াও ভালোবাসা দিবসে প্রিয় মানুষটিকে অনেকে বিভিন্ন শোপিস, ছবির ফ্রেম, চাবির রিং, কলম, সফট টয়েস, মোবাইল ফোন, জুয়েলারি, পারফিউম ইত্যাদিও দিয়ে থাকে। কেউ আবার দোকান থেকে কারিকারি চকলেটও কিনে নিচ্ছে, প্রিয় বন্ধুদের দিতে। আগেকার সময়ে এই দিবসটির তেমন কোনও কদর ছিলো না। এখন এই দিনটি সার্বজনীন উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এর সাথে অনেকে এই দিবসটির সমালোচনাও করছে। তবু থেমে নেই এই ভালোবাসা দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। থেমে নেই ভালবাসার মানুষকে ফুল দেওয়া, গ্রিটিংস কার্ড দেওয়া, চকলেট দেওয়া, অলংকারসহ নানা উপহার দেয়া।

যারা এই বিশ্ব ভালোবাসা দিবস নিয়ে সমালোচনায় লিপ্ত। তাদের কাছে ছোট্ট একটা প্রশ্ন। পৃথিবীতে যদি মা দিবস, বাবা দিবস, নারী দিবস, পুরুষ দিবস, এই দিবস, সেই দিবস থাকতে পারে, তাহলে ভালোবাসা দিবস থাকলে ক্ষতি কী? ভালোবাসা ছাড়া কি মানুষ আছে? একজন কাফেরেরও হৃদয় আছে, মন আছে, ভালোবাসা আছে। তাই ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালোবাসা দিবস নিয়ে সমালোচনাকারীদের জন্য এখানে ভালোবাসার একটা গানের লিংক দিলাম। 

‘ভালোবাসা ছাড়া আর আছে কী?…’

কেউ কেউ বহাল রেখেছে, দূরে কোথাও গিয়ে একান্তে সময় কাটানোর রীতি। বিভিন্ন দেশে এই ভ্যালেন্টাইন দিবসটিকে বিভিন্ন নামেও বলে থাকে। তা আর আমার এই লেখা প্রকাশ করলাম না। তা বর্তমান যুগের ছেলে বুড়ো সবাই জানে। তবে আমাদের দেশে কিছু মানুষে এই ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ বা ভালোবাসা দিবসটিকে আপত্তিকর নামেও বলতে শুরু করেছে। যা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। দুঃখ হয় এই কারণে যে, পৃথিবীতে ভালোবাসা ছাড়া সবই মিছে। আমরা এই পৃথিবীটাকেও ভালোবাসি। ভালোবাসা আছে বলেই, আজও বেঁচে আছি এই পৃথিবীতে। অথচ স্বল্পসংখ্যক কিছু মানুষ এই বিশেষ দিবসটির বিপক্ষে। যারা এই দিবসটির বিপক্ষ নিয়েছে, তাদেরও হৃদয় আছে, মন আছে, ভালোবাসা আছে। তবু তারা এই দিবসটির বিপক্ষে। যাই হোক আশা করি শত প্রতিকূলতা ছিন্ন করে এই ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালোবাসা দিবস দিনেদিনে সবার হৃদয়ে জাগ্রত হবে। পরিশেষে সবাইকে ভালবাসা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে, আশা করি বছরের প্রতিটি দিনেই ভালবাসা দিবিসের মতো ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ুক সবার মনে।