ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

আগেকার সময়ে ফুটপাত কাকে বলে তা অনেকে জানতো না। ফুটপাতে থাকা নানারকম সুস্বাদু খাবারের সাথে কেউ বেশি পরিচিতিও ছিল না। ‘ফুটপাত’ হলো শহরের রাস্তার পাশে মনুষের হাঁটার সরু একটা রাস্তা। ফুটপাত যা-ই ছিল তা শুধু শহরের রাস্তার পাশেই ছিল, গ্রামের মানুষ খুব প্রয়োজন ছাড়া শহরে যেতো না। টাকা-পয়সার খুবই মূল্য ছিল। গোদনাইল চৌধুরী বাড়ি থেকে নারয়ণগঞ্জ বাস ভাড়া ছিল মাত্র ৩০ পয়সা! আর এখন সেই ভাড়া রিকশায় ৪০-৫০ টাকা, আর বাস-অটোতে ১০-১৫ টাকা। যেখানে আগে অনেকে ৩০ পায়সা ভাড়া দিয়ে বাসে চড়ে নারায়ণগঞ্জ আসতো না, পায়ে হেঁটে আসা-যাওয়া করতো। তাই তাদের শহরের রাস্তার পাশে থাকা ফুটপাতের খাবারের দিকে তাকাবার ফুসরত ছিলো কই? আসলেই ঐসব ফুটপাতের দিকে আগেকার মানুষের তাকানোর সময়ও ছিল না। কিন্তু শহরে ফুটপাতে নানারকম জিনিস ও খাবার নিয়ে বসে থাকে অনেক ফেরিওয়ালা।

তা ফুটপাতে থাকা হরেক রকমের খাবারের মধ্যে সুস্বাদু একটি খাবারের নাম হলো শন পাপড়ি। আর এই সুস্বাদু শন পাপড়ি একমাত্র ফুটপাতেই পাওয়া যায়। আগেরকার সময়ের লোকেরা এই শন পাপড়ি দেখেনি, হয়তো নাম শুনেনি। এখন ফুটপাতে অহরহ পাওয়া যায়। কিন্তু ডিজিটাল যুগের হরেক রকম রেস্টুরেন্টীয় খাবারের ভীড়ে এই সুস্বাদু খাবার হয়তো অনেকে ঠিকভাবে চেনেন না।

ডিজিটাল যুগে হাজার রকমের খাবারের অনেক ভীড়। তাই শন পাপড়ির মতন একটা সুস্বাদু খাবারের খবরও কেউ হয়তো জানে না। সবাই এখন চলে যায় বড় বড় চাইনিজ রেস্টুরেন্টে। যেখানে থাকে বিশাল সাইজের টিভি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র, ডিম লাইট, জানালায় থাকে কালো গ্লাস। আরও আছে অনেক অনেক নামীদামি হোটেল। যেসব হোটেলগুলোতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভীড় লেগেই থাকে। হালিম, তুন্দল রুটি, কাবাব, গ্রিল, বিরিয়ানি সহ আরো অনেক প্রকার খাবার এসব হোটেলে পাওয়া যায়। অন্যদিকে এসব নামীদামি হোটেলগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে চলে রাস্তার পাশে ফুটপাতে থাকা বাহারি রকমের খাবারগুলো।

 

নিজ হাতে তৈরি সুস্বাদু শন পাপড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন

 

এসব খাবারের মধ্যে আছে- হালিম, চটপটি, ফুসকা, ঝালমুড়ি, বুট-বাদাম, ঘুগনি পুরি, আলু পুরি, পেঁয়াজু, সিঙ্গারা, নুডলস, রোল, মোগলাই, পরটা সহ আরও অনেক কিছু। এসবের মধ্যে বাড়তি স্বাদের যেই খাবারটি যোগ হয়েছে সেটার নাম, শন পাপড়ি।

এই শন পাপড়ি তৈরি করে বুটের ডালের গুড়ো দিয়ে। সাথে থাকে দুধ, চিনি, সয়াবিন তেল ও সামান্য পরিমান ডালডা। এই শন পাপড়ি খেলে ক্ষুধার জ্বালা মেটে না, তবে মুখের রুচি বাড়ায়। মুখে দিলেই সাথে সাথে গলে যায়। খেতে খুবই মজাদার ও সুস্বাদু। দেখতে হুবহু বাংলার সোনালি আঁশ পাটের মতন। সবসময়ই জটা ধরে থাকে। তবে সবসময়ই টাটকা। প্রতি কেজি শন পাপড়ি ২৫০ টাকা। কোনো কোনো জায়গায় দাম আরও বেশি। এগুলো আবার ছোট ছোট বিস্কুটের মতন করে প্যাকেটজাতও করা হয়। যা পান-সিগারেটের দোকানে পাওয়া যায়। প্রতি পিচ মাত্র দুই টাকা। এগুলো স্কুল পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা কিনে খায়। আর ফুটপাতে কেজি দরে যেগুলো বিক্রি হয় সেগুলো মানুষে শখ করে বাসাবাড়িতে নিয়ে যায়। প্রতিদিন বিকাল বেলা টিফিনের সময় মুড়ির সাথে মিশিয়ে খায়।

গত কয়েকদিন আগে থেকে ফলো করছি একজন শন পাপড়ি বিক্রেতার দিকে। প্রতিদিন বড় একটা ডালায় সাজিয়ে চৌধুরী বাড়ি বাজারের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে। লোকটির সামনে সবসময়ই ভীড় লেগেই থাকে। মানুষ যার যার নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কিনে বাসায় যাবার সময়ই এখানে ভীড় করে। উদ্দেশ্য, বাসায় বাচ্চাদের জন্য সুস্বাদু শন পাপড়ি কেনা।

সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এগুলোর নাম কী?
– শন পাপড়ি।

এগুলো কি আপনি নিজে তৈরি করেন?
– হ্যাঁ, আমি নিজেই এগুলো তৈরি করি।
এগুলো কী দিয়ে তৈরি করে থাকেন, একটু জানাবেন কি?
– এগুলো বুটের ডালের গুড়ো দিয়ে তৈরি করে থাকি।
শুধুই বুটের ডাল, নাকি এর সাথে আরও কিছু আছে?
– আছে! এর সাথে আছে, দুধ, চিনি, সোয়াবিন তেল, ডালডা, কিচমিচ ও কিছু মসলা।
প্রতিদিন কত কেজি পর্যন্ত বিক্রি করতে পারেন?
– চার থেকে পাঁচ কেজি।
প্রতি কেজি সান পাপড়ির মূল্য কত?
– ২৫০ টাকা। কেউ যদি এক কেজির বেশি নেয়, তবে কিছু কম রাখি।
কেমন ইনকাম হয়?
– হ্যাঁ, ভালোই হয়। এই দিয়ে থাকছি, খাচ্ছি, চলছি-ফিরছি।
কোথায় থাকেন?
– চৌধুরী বাড়ি তাঁতখানা বউবাজার সংলগ্ন একটা বাড়িতে।
আপনার নামটা জানতে পারি?
– আমার নাম আফতাব উদ্দিন।
ছেলেমেয়ে সহ খানাওয়ালা ক’জন?
– কেবলমাত্র দুইজন মেয়ে। ছেলে নেই।
আপনার বাপ-দাদার ভিটেমাটি কোথায়?
– কিশোরগঞ্জ।
এখানে কতদিন যাবত?
– পাঁচবছর হবে।
আগে কী কাজ করতেন?
– আমি দেশে কৃষিকাজ করতাম। এখন আগের মতন শরীরে শক্তি নেই। তাই পরিবার পরিজন নিয়ে এই নারায়ণগঞ্জ শহরে চলে এসেছি।
প্রতিদিন এই চৌধুরী বাড়ি বাজারেই বিক্রি করেন?
– না, এখানে মাঝেমধ্যে আসি। আমি প্রতিদিন শহরে গিয়ে বিক্রি করি। আজ শরীরটা বেশি ভালো নয় বিধায় এখানে এসেছি।

ফুটপাতে থাকা এসব আধুনিক খাবার দেখে আগেকার কথা মনে পড়ে যায়। আগে চার আনার বাবুল বিস্কুট কিনলে অনেকক্ষণ খেতে পারতাম। আরও ছিল তক্তি বিস্কুট। বাজারে গেলে আগে চাই তক্তি বিস্কুট। তক্তি দেখতে হুবহু কাঠের তক্তার মতনই ছিল। কিন্তু এই বিস্কুটগুলো খেতে খুবই মজা লাগতো। যেমন ছিল সুস্বাদু, তেমন ছিল মানুষের কাছে এর চাহিদা। এখন আর ঐসব তক্তি-ফক্তি দেখা যায় না। এখন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে মানুষ পরিচিত হচ্ছে নতুন নতুন খাবারের সাথে। ফুটপাতে এসব নতুন খাবেরের মধ্যে থাকছে আফতাব উদ্দিনের সুস্বাদু শন পাপড়িও।

জয় হোক আফতাব উদ্দিনের মতো খেটে খাওয়া মানুষদের, জয় হোক মানবতার।