ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

বছরের শুরুতেই অনেক নতুন নতুন ক্যালেন্ডার বাজারে বিক্রি হয়। নানান রঙের, নানান কোম্পানির, নানান ব্যাংকের, নানান ইন্স্যুরেন্সের ক্যালেন্ডার। ইংরেজি ক্যালেন্ডারে জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি মাস গত হলেই আসে মার্চ। আজ বৃহস্পতিবার শুভাগমন হলো সেই স্মরণীয় মার্চের।

মার্চ মাস মানেই হচ্ছে আমাদের দেশের এক স্মরণীয় মাস। মার্চ জুড়ে আছে বাংলার অনেক ইতিহাস, তা ছেলে-বুড়ো সবারই জানা। ৭ই মার্চ, ২৫শে মার্চ- মার্চের কালরাত, গণহত্যা, ২৬শে মার্চ। মার্চ মানেই হচ্ছে নতুন একটি দেশ গড়ার ইতিহাস। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রমনায় একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। জনসভায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই ভাষণের মাধ্যমেই মার্চের ইতিহাস শুরু।

 

 

ঐ ভাষণে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহবান জানান। যেই ভাষণটিকে কিনা পৃথিবীর ১২টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে! সেই ভাষণকে ইউনেস্কো ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আর বিশ্ব দেয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনীতির কবি হিসেবে স্বীকৃতি।

অতঃপর স্বাধীনতার ঘোষণা। এই স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়েও আমাদের দেশে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যায়। কেউ বলে অমুক, কেউ বলে তমুক। যাইহোক, স্বাধীনতার ঘোষণার সাথে সাথেই আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে পাকিস্তান সরকার। চলে ২৫শে মার্চের কালরাতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক জ্বালাও-পোড়াও খতম করার কত কাণ্ড! শুরু হয় গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা সহ নারকীয় হত্যাকাণ্ড। আরও কতকিছু ঘটেছিল এই স্মরণীয় মার্চ মাসে! তাই এই মার্চকে রক্তাক্ত অগ্নিঝরা মার্চও বলা হয়।

ঐ ৭ই মার্চ রমনার জনসভায় শীতলক্ষ্যা নদী পাড়ের সকল শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই জনসভায় লাখো মানুষের মধ্যে আমার বাবাও ছিলেন। সেদিন ঢাকার আশেপাশের সকল শিল্পপ্রতিষ্ঠানই বন্ধ ছিল। শুনেছিলাম বাবার মুখে। তখন আমার বাবা শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের একটা কাপড়ের মিলে চাকরি করতো। তখনকার সময়ে এই মার্চ মাস থেকেই আমরা হয়ে পড়ি বিপদগ্রস্ত। বাবার মিল বন্ধ, চাকরি নেই। বড়দার শরণার্থী হয়ে ভারতে অবস্থান। আমাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে তখন কষ্টের আর শেষ ছিল না।

তাই এই মার্চ মাসটা যেন মনের মধ্যেখানে চুম্বকের মতন লেগে আছে। তাই মার্চ মাসের আগমনেই ঐসব অতীত হওয়া দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে যায় বাবার কথা। রাজাকারদের হাতে প্রাণ হারানো এক মামার কথা। কানে বাজে মেশিনগান আর এলমজির গুলির শব্দের আওয়াজ। চোখে ভাসে হাটবাজারে লাগানো আগুনের ধোঁয়া, আর আগুনের লেলিহান শিখা। তখন ছিলাম চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ুয়া ছাত্র। বাবা নারায়ণগঞ্জ থেকে বাড়িতে চলে আসে। সময়টা তখন ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি। যুদ্ধের কারণে মিল বন্ধ। বাবার পকেট খালি। স্থানীয় সহকর্মীদের কাছ থেকে ২০ টাকা কর্জ করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। অনেক কষ্ট করে খালি হাত পা নিয়ে গ্রামের বাড়িতে আসে। বাবা বাড়িতে এসে জেঠার আর মায়ের কাছে সব কথা বললেন। আমরা সবাই শুনলাম। কিন্তু বাড়িতে এসেও নিরুপায়! হাতে টাকা-পয়সা নেই, সংসারে খাবার নেই, কোথাও কোনও দিনমজুরের কাজও নেই।

তখন এই দেশে টাকার খুবই অভাব ছিলো। তখন জিনিসের দামও যেমন সস্তা ছিল, টাকার দামও অনেক ছিলো। সংসারে খানেওয়ালা ছিলাম ৫জন। বাবার পকেট শূন্য। মায়ের শেষ সম্বল একজোড়া কানের দুল ছিলো। সেই কানের দুল বন্দক রেখে কিছু টাকা সংগ্রহ করা হলো। তাও মাত্র ৬০ টাকা। তখনকার সময়ে সোনা গহনা কেউ রাখতেও চাইতো না। তবু মানুষের হাতে পায়ে ধরে, মায়ের কানের দুলটা বন্দক রাখে। এই ৬০ টাকা থেকে ৫০ টাকার ধান কিনে বাবা মুড়ির ব্যবসা শুরু করে। গ্রামের আরও অনেকেই মুড়ির ব্যবসা করতো। একদিন বাবার সাথে মুড়ি নিয়ে নিকটস্থ একটা বাজারে যাই। বাজারটির নাম আমিষাড়া বাজার। বজরা রেলস্টেশন থেকে ৩ মাইল পশ্চিমে এই আমিষাড়া বাজার অবস্থিত।

সকাল দশটার মতো বাজে। বাবা বিক্রি করার জন্য মুড়ির বস্তা বাজারে রাখলো। এমন সময় হৈচৈ শোনা যাচ্ছে। পাকবাহিনী বাজারে হানা দিয়েছে। রাস্তার ধারে কয়েকটা দোকানে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। এই খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্রই বাজারের মানুষ এদিক-সেদিক ছোটাছুটি শুরু করে দিলো। বাজারটিতে একেক পণ্যের একেক সাইট ছিলো। বাবার সাথে মুড়ি বিক্রেতা আরও অনেকেই ছিলো। সবাই সবার মুড়ি বস্তা নিয়ে পালাতে শুরু করে দিলো। বাবা আর পালাতে পারছে না, মুড়ির বস্তাটার জন্য। হুড়াহুড়ির কারণে মুড়ির বস্তাটা কেউ আর বাবার মাথায় উঠিয়ে দিচ্ছে না। বাপ-ছেলে দুইজনেই মুড়ির বস্তাটা নিয়ে অনেক পারাপারি করলাম। কিন্তু মুড়ির বস্তাটা বাবার মাথায় আর উঠিয়ে দিতে পারলাম না। তখন বস্তাটা ধরেই বাবা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে ঝাপটে ধরে কাঁদতে শুরু করলাম। মনের ভেতরে ভয়, শুধুই ভয়।

 

২৫ মার্চের কালরাতে পাকবাহিনীর গণহত্যা। ছবি- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

 

২৫ মার্চের কালরাতে পাকবাহিনীর গণহত্যা। ছবি- ইত্তেফাক

পাকবাহিনীরা গুলি করে মানুষকে মেরে ফালে, তাই এতো ভয়। বাবা এক হাতে বস্তা আরেক হাতে আমাকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের শেষ সম্বল শেষ করে মুড়ির চালান। সেজন্য বাবা মুড়ির বস্তা রেখেও পালাতে পারছে না। এরমধ্যে পুরো বাজার জনশূন্য হয়ে গেল। সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেলো। বাজারের কয়েকটা দোকানে লাগানো আগুনের তাপ শরীরে লাগতে শুরু করলো। চারজন পাকবাহিনী বাবার সামনে এসেই রাইফেলের বাঁট দিয়ে বাবাকে আঘাত করলো। বাবা মুড়ির বস্তা ছেড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। পাকবাহিনী আমার দিকে বড়বড় চোখ করে কয়েকবার তাকালো। আমি বাবাকে ধরে কান্নাকাটি শুরু করে দিলাম। তারা আর আমাকে কিছুই বললো না সোজা বাজারের দিকে চলে গেল। আমার কান্নাতে হয়তো তাদের মায়া লেগেছিল। তাই তারা আমাকে কিছু না বলে সোজা বাজারের ভেতরে চলে গেল। এর কিছুক্ষণ পরই পাকবাহিনী তাদের সাঁজোয়া যান নিয়ে বাজার ত্যাগ করলো। সেদিন আর আমাদের সব মুড়ি বিক্রি হলো না। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাবা কয়েক সের মুড়ি বিক্রি করে, কোনরকম বাড়ি চলে এলাম।

রাইফেলের আঘাতে বাবা পুরোপুরিভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাবা রাইফেলের বাঁটের আঘাতে, ৬/৭দিন আর বাজারে যেতে পারেনি। তখন আমাদের গ্রামে তেমন কোনও নামিদামি ডাক্তারও ছিল না। পুরো গ্রামে কেবল একজন মাত্র ডাক্তার ছিলো, তাও হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। সেই ডাক্তারের ঔষধ মেশানো জলপড়া খেয়ে ক’দিন পর বাবা সুস্থ হলেন। আবার শুরু করে দিলেন মুড়ি নিয়ে জীবনসংগ্রাম। বড়দাদা শরণার্থী হয়ে ভারত ভ্রমণে। বড়দাদার জন্য মায়ের কান্নাকাটিতে বাতাস ভারী হতে লাগলো। কিন্তু বড়দার আর কোনও খবরও নেই। সেসময়ে এই বঙ্গদেশে মোবাইলের আগমন হয়নি। যা-ই সংবাদ পেতো, তা শুধু রেডিওর সংবাদ, আর চিঠির মাধ্যমে। কিন্তু চিঠি দিবে কে, আর পাবেই বা কে? পোস্টঅফিসও বন্ধ। ট্রেন বন্ধ, ব্যাংক বন্ধ, লঞ্চ-স্টিমার সবই বন্ধ।

এসবের কারণে বড়দার খবরাখবর একেবারেই ছিল না। মা আমার বড়দার জন্যই শুধু কাঁদতো। নোয়াখালী চৌমুহনীর উত্তরে বজরা রেলস্টেশনের পশ্চিমে মাহাতাবপুর গ্রামেই ছিল আমাদের বসতবাড়ি। বজরা পাকা সড়ক থেকে আমাদের গ্রামে আসার জন্য কোনও পাকা রাস্তা ছিল না। ছিলো সরু একটা মাটির রাস্তা। সেসময় ওই মাটির রাস্তা দিয়ে দু’একটা গরুর গাড়ি আসা-যাওয়া করতো। তাই পুরো যুদ্ধের সময়ও পাকবাহিনী আমাদের গ্রামে আসতে পারেনি। যাকিছু টুকিটাকি অত্যাচার-অবিচার করেছে, তা কেবল পার্শ্ববর্তী গ্রামের রাজাকাররা করেছে। মাহাতাবপুর গ্রামে ছিলো হিন্দু জনবসতি। পুরো গ্রামে মুসলমান বাড়ি ছিল মাত্র দুটি, তাও খরিদ সূত্রে ছিল তারা মালিক। সারাদেশে তখন মুক্তিবাহিনীর জয়জয়কার। সময় তখন মে মাস ১৯৭১ সাল। আমাদের বাড়িটি ছিল গ্রামে প্রবেশদ্বারের প্রথম বাড়ি। আমাদের বাড়ির পরেই পার্শ্ববর্তী গ্রাম ‘হিলমুদ’।

হিলমুদ গ্রামের পরেই বজরা বাজার ও রেলস্টেশন। তাই আমাদের বাড়িটা ছিল মুক্তিবাহিনীদের পছন্দের বাড়ি। আমার দুই জেঠা ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি পুলিশ। মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আমাদের বাড়িতে আসতো। এসেই আমার দুই জেঠার সাথে বসে গল্প করতো। মাঝেমাঝে চা’র আড্ডা হতো। বাড়িতে থাকা মুড়ির মোয়া, নারিকেল কোরা সহ মুড়ি তাদের দেওয়া হতো। তারা আনন্দের সাথে খেতো আর জেঠা মহাশয়ের সাথে কথা বলতো। সময়সময় জেঠার সাথে বসে বসে নিজেও তাদের কথা শুনতাম। মা চা বানিয়ে দিতেন, সেই চা তাদের এনে দিতাম। সেসব হৃদয়বান মুক্তিযোদ্ধাদের কথা কোনদিন ভুলবো না। পাকবাহিনী আর রাজাকার বাহিনীদের ভয়ে অনেক মানুষই গ্রাম ছেড়ে শরণার্থী হয়ে ভারত চলে গেছে। আমাদের তেমন টাকা-পয়সা ছিল না বিধায় আমরা নিজ গ্রামেই থেকে যাই।

আমাদের ভরসাই ছিল একমাত্র হৃদয়বান মুক্তিযোদ্ধারা। সেসব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সুনজরের কারণে, রাজাকার আর পাকবাহিনীরা গ্রামের একটা বাড়িতেও ক্ষতি করতে পারেনি। এভাবে চলতে চলতে কেটে গেল দীর্ঘ ৮ মাস। সময় তখন নভেম্বর ১৯৭১ সাল। রেডিওর শুধু সংবাদ ছিল বিবিসি, আর আকাশবাণী কোলকাতার বাংলা সংবাদ। পুরো গ্রামে এক বাড়িতে ছিলো একটা ওয়ান ব্যান্ডের রেডিও। প্রতিদিন সন্ধ্যার পরপর মায়ের সাথে ঐ বাড়িতে গিয়ে রেডিওর খবর শুনতাম। মুক্তিবাহিনীদের কাছেও একটা রেডিও ছিলো, যা দিয়ে তারা খবর শুনতো। তখন চারিদিকে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জয়জয়কার। জাগায় জাগায় ঘটতে লাগলো পাকবাহিনীর পরাজয়, আর পিছু হঠার খবর। সামনেই ডিসেম্বর মাস। পুরো ডিসেম্বর মাসই ছিল সবচেয়ে বেশি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। কুকুর পাগল হলো যেমন এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি করে মানুষকে কামড়ায়, ঠিক সেই অবস্থাই হয়েছিল পাকবাহিনীদের বেলায়। তারা ঠিক হিংস্র জানোয়ারের মতো হিংসাত্মক হয়ে উঠলো। নিরস্ত্র সাধারণ মানুষদের গুলি করে মারতে লাগলো।

তাদের মুখে ছিলো শুধু ইদুর কাঁহা (হিন্দু)? মুক্তিবাহিনী কোন আদমি হ্যাঁ? এটাই ছিল তাদের প্রথম জিজ্ঞাসা। হিন্দুদের বেশি খুঁজতো এই কারণে যে, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে পার্শ্ববর্তী ভারত সহযোগিতা করছিল, তাই। আমাদের বীর বাঙালিরা ভারত গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করার ট্রেনিং নিয়ে আসছে, তাই। তাই পাকবাহিনীদের প্রথম শত্রুই ছিলো ভারত ও হিন্দু। রাস্তাঘাটে পাকবাহিনীরা চেকপোস্ট বসিয়ে মুক্তিবাহিনী আর হিন্দুদের খুঁজতো। যাকেই ধরতো, আগেই জিজ্ঞেস করতো, ‘তুমি হিন্দু না মুসলমান?’ যদি বলতো, আমি মুসলমান। তাহলে আদেশ আসতো, ‘কলমা পড়ে শোনাও।’ কলমা পড়ে শোনানোর পরও বলা হতো, ‘কাপড়া উঠাও।’ কাপড় উঠিয়ে দেখানোর পরই ওরা নিশ্চিত হতো লোকটি হিন্দু না মুসলমান। হিন্দু হলে মরণ অনিবার্য। আর মুসলমান হলেও তবু সন্দেহ থেকেই যেতো।

সন্দেহ শুধু একটাই, তা হলো- সাধারণ মানুষ, না মুক্তিবাহিনী? অনেক সময় সাধারণ মানুষকে মুক্তিবাহিনী সন্দেহ করে মেরেও ফেলেছে ঐ হিংসাত্মক পাকবাহিনী। আবার অনেকসময় একটু স্বাস্থ্যবান মানুষদেরও ধরে নিয়ে মেরে ফেলতো। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে দেশীয় রাজাকারবাহিনীও হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড শুরু করে দিলো। কার বাড়িতে কয়টা যুবতী মেয়ে আছে, সেসব তালিকা পাকবাহিনীদের কাছে পৌঁছাতে লাগলো। সময়সময় পাকবাহিনীদের মনোরঞ্জনের জন্য, বাড়ি থেকে জোরপূর্বক যুবতী মা-বোনদের তুলে নিয়ে যেতো। এসব দেশীয় আলবদর-রাজাকাররাই পাকবাহিনীদের সবকিছু শিখিয়েছিলো। অচেনা রাস্তাঘাট চিনিয়ে দিয়েছিলো। হিন্দুদের কিভাবে চেনা যায়, সেটা শিখিয়েছিল। ডিসেম্বরের আগমনের সাথে সাথে পাকবাহিনী সহ তাদের দোসররাও মানুষ খেকো রাক্ষসের মতন হয়ে উঠলো।

ডিসেম্বরের প্রথম থেকে এভাবে চলতে চলতে একসময় সারাদেশেই পাকবাহিনী পরাজয় বরণ করতে লাগলো। ১৫ ডিসেম্বর দেখেছি, মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গ্রামের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো থেকে রাজাকারদের হাত বেঁধে রাস্তা দিয়ে নিয়ে যেতে। সেই দৃশ্য দেখার জন্য গ্রামের অনেক মানুষের মধ্যে আমিও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। মা-বাবা বড়দিদিদের সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে জয়বাংলা ধ্বনি শুনেছি। গ্রামের হাজার হাজার মানুষের মুখেও শুনেছি জয়বাংলা বাংলার জয়। যা-ই দেখেছি বা শুনছি, সবকিছুই ১৯৭১ সালের স্মরণীয় মার্চ মাস থেকে শুরু করে। তাই প্রতিবছর মার্চ মাস আসলেই মনে পড়ে সেই রক্তাক্ত অগ্নিঝরা মার্চের কথা।