ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

একসময় একটা ওয়ান ব্যান্ড রেডিওর পেছনে সারাদিন ঘুরে বেড়াতাম। যার কাছে একটা রেডিও ছিলো, সে ছিলো যেন সবার পাতের প্রসাদ! ক্যামেরা তো কেউ কোনোদিন চোখেও দেখেনি। বিয়ে-শাদীতেও ছেলেপক্ষের দাবি থাকতো একটা রেডিও, একটা বাইসাইকেল, আর ঘড়ি। ঘড়ি আর টাই ছিল শিক্ষিতের প্রতীক। তাও কেমি ঘড়ি। মেট্রিক পাস পড়ুয়া লোকে এই কেমি ঘড়ি হাতে দেওয়ার উপযুক্ত ছিল। আর ওকালতি পড়ুয়া মানুষের গলায় টাই বাঁধা থাকতো। আর এখন যেকেউ গলায় টাই বাঁধতে পারে! ঘড়ির চলতো অনেক আগে থেকেই পুরোনো হয়েছে। ঘড়ি নিয়ে আরও অনেক কথা ছিল। তা না বলে এবার বলবো হালের মোবাইল ফোন নিয়ে কিছু কথা।

 

গুলিস্তানের এক ফুটপাতে অস্থায়ী মোবাইলের দোকান

 

এখন ডিজিটাল যুগ। এই যুগে ছোট একটা যন্ত্রের ভেতরে ঘড়ি সহ সবকিছুই থাকে, যার নাম মোবাইল। এর ভেতরে থাকে, ক্যামেরা, ভিডিও প্লেয়ার, ভিডিও রেকর্ডার, মিউজিক প্লেয়ার, মিউজিক রেকর্ডার, দেশ-বিদেশ বিনা তারে কথা বলার সুবিধা, বার্তা আদান-প্রদান সহ আরও কতকিছু! একসময় একটা মমোবাইল ছিল স্বপ্নের ব্যাপার। অথচ এই মোবাইল এখন সবার হাতে হাতে। মোবাইল এখন আলু-পটলের মতো কেজি দরেও বিক্রি হয়! শহরের ফুটপাতে যেমন করে তরকারি বিক্রি হয়, তেমন করে মোবাইলও বিক্রি হতে দেখা যায় ঢাকা সহ বিভাগীয় শহরের রাস্তার পাশে।

এখন আর কেউ একটা ঘড়ির জন্য কাঁদে না। কেউ একটা ক্যামেরারর জন্য আফসোস করে না। ওয়ান ব্যান্ড রেডিওর পেছনে সারাদিন কেউ ঘুরেও বেড়ায় না। দেশ-বিদেশে জরুরি বার্তা প্রেরণের জন্য টেলিগ্রাফ অফিসে গিয়ে আর লাইন ধরে না। দূরদেশে থাকা প্রিয়জনের সাথে কথা বলার জন্য আর টেলিফোন এক্সচেঞ্জে যায় না। কম দামি আর বেশি দামি যা-ই হোক না কেন, একটা মোবাইলের ভেতরেই থাকে সবকিছুর সুবিধা! মানুষের এক সময়ের স্বপ্ন এখন ফুটপাতেই হচ্ছে রূপায়ন। ভবিষ্যতে ফেরিওয়ালারা মাথায় করে পাড়া-মহল্লায় ঘুরেঘুরে এই মোবাইল বিক্রি করবে। হয়তো সেদিন বেশি একটা দূরে নয়, নিকটেই। এতক্ষণ বললাম মোবাইলের জয়জয়কার সময় নিয়ে, এবার স্বপ্নের টেলিভিশন নিয়ে কিছু বলতে চাই।

কোনো এক সময়ের স্বপ্নের টেলিভিশন এখন শহরের রাস্তার পাশে ডাস্টবিনেও দেখা যায়। যেমন আগে দেখা যেত জাপান, কোরিয়া, আমেরিকা, আর লন্ডনের রাস্তার পাশে থাকা ডাস্টবিনে। এসব শুনতাম বিদেশ থেকে আসা মানুষের কাছে। ওইসব ডাস্টবিন থেকে আমাদের দেশের বিদেশ ফেরত অনেকে টেলিভিশন কুড়িয়ে সাথে করেও আনতো শুনতাম। আর এখন আমাদের দেশেই যত্রতত্র টেলিভিশন দেখা যায়। আগেকার দিনে সাদা-কালো টেলিভিশন দেখতে মানুষ কত ভীড় করতো, আর এখন রঙিন টেলিভিশন দেখার জন্যও মানুষ ভীড় করে না! ঘরে-বাইরে সর্বত্রই বড় বড় পর্দার টেলিভিশন চোখে পড়ে। এখন সাতগ্রাম ডিঙিয়ে কেউ অন্য গ্রামে গিয়ে টেলিভিশন দেখে না, দেখতে হয়ও না।

আগে দেখা যেতো, দুই-চারটা গ্রামের মধ্যে একটা বাড়িতে টেলিভিশন থাকতো। তাও ছিলো সাদা-কালো টেলিভিশন। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জন লোগি বেয়ার্ড ১৯২৬ সালে প্রথম সাদা-কালো টেলিভিশন আবিষ্কার করেন। আমাদের দেশে টেলিভিশন আসে ১৯৬৪ সালে। টেলিভিশন আসে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের মাধ্যমে। সে সময় এটি পাকিস্তান টেলিভিশন নামে পরিচিত ছিল। যা বর্তমান (বিটিভি) বাংলাদেশ টেলিভিশন নামে পরিচিত। এটি ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৪ হতে সাদা-কালো সম্প্রচার শুরু করে। এই টেলিভিশন দেখা নিয়ে যে কতো মারামারি হয়েছে, তা আর লিখে শেষ করা যাবে না। শেষ করতে চাই বর্তমানে টেলিভিশনের জয়জয়কার সময় নিয়ে।

বর্তমানে সেই আগেকার সাদা-কালো টেলিভিশন এখন আর চোখেই পড়ে না। সাদাকালো টেলিভিশনের যুগ শেষ হয়ে, এখন রঙিন টেলিভিশনের যুগে আমরা। এইতো ২০০৫ সালেও ঘরে ঘরে সাদা-কালো টেলিভিশনের ছড়াছড়ি ছিল। ব্যান্ডগুলো ছিল ফিলিপস, নিপ্পন, ন্যাশনাল প্যানাসনিক সহ আরও কয়েকটি। আর এখন টেলিভিশন কোম্পানির অভাব নেই। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন রকম ব্যান্ড। কতো রকমের উন্নতমানের নিত্য নতুন কোম্পানি।

১৯৭৬-৭৭ সালের কথা। তখন আদর্শ কটন মিলে বসবাস। পুরো মিলের ভেতরে কোনো ফ্যামিলি বাসায় টেলিভিশন ছিল না। মিল কর্তৃপক্ষ থেকেও ছিল না। একটা টেলিভিশন ছিল লক্ষ্মণখোলা জনতা ক্লাবে, আরেকটি ছিল শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড় চিত্তরঞ্জন কটন মিলে। প্রতিমাসে একটি করে বাংল পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি সম্প্রচার হতো টিভিতে। যেদিন পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি সম্প্রচার হতো, সেদিন বিকাল থেকেই আর শান্তি নেই। সবাই ছায়াছবির কথাটাই স্মরণে রেখে সন্ধ্যার আগেই জনতা ক্লাবের সামনে মানুষ ঘুরঘুর করতো। উদ্দেশ্য একটাই, তা হলো টেলিভিশনের খুব সামনে জায়গা নিতে হবে। অনেক সময় কার আগে কে বসবে, এই নিয়ে চলতো মারামারি। টেলিভিশন দেখার জন্য কেউ কেউ বাড়ি থেকে পিঁড়িও নিয়ে আসতো। ক্লাবের সামনে বিশাল জায়গা মুহূর্তেই কানায় কানায় ভরে যেতো। অনেকে জায়গা না পেয়ে গাছের উপরে উঠে টেলিভিশন দেখতো।

টেলিভিশন দেখার জন্য মিলের শ্রমিক-কর্মচারীদের সন্তানরা মিলের বাইরে গিয়ে মারামারি করতো। এটা শ্রমিক-কর্মচারী প্রতিনিধিদের নজরে আসলে তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মিল কর্তৃপক্ষ ১৭ইঞ্চি সাদা-কালো একটা টেলিভিশন শ্রমিক কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ দেয়। মিল কর্তৃপক্ষ টেলিভিশন কিনে আনার পরও টেলিভিশন চালু করতে দেরি হয়। দেরি শুধু লাইসেন্সের জন্য। লাইসেন্স করতে দুইদিন দেরি হয়। লাইসেন্স করা সম্পন্ন হবার পরই টেলিভিশন দেখার সুযোগ হয়। সেই থেকে মিলের ভেতরে থাকা কোনও ছেলেপেলে আর বাইরে গিয়ে টেলিভিশন দেখতো না। মিলের ভেতরে বসেই উপভোগ করতো সাদাকালো টেলিভিশনে সম্প্রচার হওয়া অনুষ্ঠানগুলো।

তখনকার সময়ে সাদা-কালো টেলিভিশনই মানুষ মনের সুখে দেখতো। এদেশে রঙিন টেলিভিশন আসবে তা মানুষ কোনদিন ভেবেও দেখেনি। যতদূর জানা যায়, ১৯৮০ থেকে বিটিভি রঙিন সম্প্রচার শুরু করে। সে সময় বাজার থেকে টেলিভিশন কিনে আনার পরপরই লাইসেন্স করতে হতো। বিটিভির সম্প্রচার দেখতে হলে সরকারের নীতিমালা মেনে চলতে হতো। প্রতি মাসেমাসে সরকার ঘোষিত নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হতো। এখনও সেই নিয়ম বলবত থাকা সত্ত্বেও কেউ ওইসব লাইসেন্সের ধার ধারে না। অনেকে হয়তো টেলিভিশনের লাইসেন্সের কথা জানেও না। মার্কেট থেকে একটা টেলিভিশন কিনে আনতে পাড়লেই টেলিভিশন দেখা শুরু। কে দেখে বিটিভির অনুষ্ঠানমালা, আর কে ভাবে লাইসেন্সের কথা? আর লাইসেন্স করার দরকার হবেই বা কেন? কেউতো এখন আর বিটিভির অনুষ্ঠান উপভোগ করে না, দেখে কেবল বিদেশি অনুষ্ঠান। হিন্দি, তামিল, ইংরেজি সহ আরও বহুরকমের চ্যানেল!

 

লক্ষ্মীনারায়ণ বাজারের একটা চা-দোকানে রঙিন টেলিভিশন

 

একসসময় হাতে গোনা কয়েকটা ফ্যামিলি বাসায় রঙিন টেলিভিশন থাকতো। তখন আকাশ প্রযুক্তি ডিশ-অ্যান্টেনা ছিলো না। দেশের মানুষ যা দেখতো, তা কেবল বিটিভির সম্প্রচার করা অনুষ্ঠানগুলোই। এখন অনেকেই হয়তো জানে না যে, বিটিভি চ্যানেল রিমোটের কত নম্বরে। জানে না এই কারণে যে, বর্তমানে ডিশ-অ্যান্টেনায় প্রায় শ’খানেক চ্যানেল থাকে। এই আকাশ প্রযুক্তির কারণে আমাদের দেশের মানুষ এখন সিনেমা হলেও যায় না। দোকানে বসে বা বাসায় বসেই অর্ধশত চ্যানেলে মন মাতানো ছবি দেখে। যার যেটা পছন্দের, সে সেটাই দেখতে পারছে।

বর্তমানে প্রতিটি চা-দোকানেই আছে রঙিন টেলিভিশন। এমনকি ফুটপাতে থাকা একটা পিঠার দোকানেও দেখা যায়। দেখা যায় প্রতিটি মার্কেটে, দোকানে, প্রতিটি অফিসে, লঞ্চ-স্টিমারে, বাসে, টেক্সিতে, রেলগাড়িতে রঙিন টেলিভিশন। তাই রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে চা-পান করার জন্য গেলে আগে চোখ পড়ে রঙিন টেলিভিশনের পর্দায়। বর্তমান যুগের এসব ব্যয়বহুল টেলিভিশন নষ্ট হয়ে গেলে চলে যায় মেকারের (মেরামতকারী) কাছে। এসব টেলিভিশন মেরামত করার মেকারও এখন কম নয়। যত্রতত্র মোবাইল মেকার, টিভি মেকার। যেগুলো জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করতে পারে, সেগুলো চলে। আর যেগুলো জোড়াতালি দিয়েও কাজ হয় না, সেগুলো চলে যায় ভাংচুরের দোকানে, না হয় রাস্তার পাশের ডাস্টবিনে।

বহু আগেই তো হাতঘড়ি অদৃশ্য হয়ে গেছে। হারিয়ে যাবে মোবাইল ফোনও। এভাবে হয়তো একদিন এই টেলিভিশনও হারিয়ে যাবে। আসবে নিত্য নতুন অত্যাধুনিক অন্যকিছু। সেসব দেখার অপেক্ষায় আছি।