ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

পৃথিবীর সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ফুল হলো স্রষ্টার উপহার। গাছ থেকেই ফুল, ফুল থেকে ফল। গাছ দেয় সুশীতল ছায়া, খাবার, জ্বালানি, বাসস্থান তৈরির কাঠ। অনেক সময় দুর্যোগ মোকাবেলায়ও বিশেষ ভূমিকা রাখে। আবার আমাদের সুন্দর পৃথিবীর ভারসাম্যও রক্ষা করে। গাছ আমাদের ফল দেয় অথচ নিজে খায় না। আমাদের চারপাশে এমনও কিছু গাছ আছে যেগুলো আমাদের ফল উপহার দিয়েই মৃত্যুবরণ করে। কিছু গাছ আছে যেগুলোতে ফল হয় না, এগুলো শুধু জ্বালানি কাজেই ব্যবহৃত হয়। কিছু গাছে কেবল ফুলই হয়, খাবার উপযোগী ফল হয় না। এগুলোকে ফুলগাছ বলে। ফুলের মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতি আছে। কোনটি সুগন্ধি, আবার কোনটির তেমন গন্ধ নেই।

তবে ফুলের কদর দুনিয়া জুড়ে। ফুল ছাড়া হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কোনও পূজার্চনাই হয় না। শুধু পূজার্চনা কেন, অতিথি আপ্যায়নে, বিয়েবাড়িতে, জন্মদিনে, সভা-সমাবেশে, বিশেষ কোনো দিবসে ফুল লাগবেই। নানা প্রজাতির ফুলের মধ্যে অনেক অবহেলিত ফুলও আছে। যেগুলোকে বলা হয়, ‘বুনোফুল’। যেসব ফুলের হয়তো নিজস্ব কোনো নাম নেই, শুধু ‘বুনোফুল’ নামেই সবার কাছে পরিচিত। বনে, জঙ্গলে, রাস্তার ধারে এসব দৃষ্টিনন্দন ফুল ফুটে থাকে। বুনোফুল মানুষের কাছে অবহেলিত হলেও এরা স্রষ্টার নির্দেশ মেনে পৃথিবীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য সবমসময়ই ফোটে।

অথচ ফুলগুলো কোনো পূজার্চনায়ও লাগে না। যেন সৃষ্টিলগ্ন থেকেই স্রষ্টার আদেশে অবহেলিত হয়ে আছে তারা। মনে হয় স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা নিজেই বারণ করে করে দিয়েছে যে, এসব ফুল কোনো দেবতার মন্দিরে নিও না! আর কোনো পূজায়ও ব্যবহার করো না! তাই হয়তো দেব-দেবীর পূজার্চনায় বুনোফুল দেয় না কেউ। অনেক টাকা ব্যয় করে বাজার থেকে কিনে আনে বিভিন্ন ফুল। গোলাপকে খোঁপায় বাঁধে, রজনীগন্ধা কিনে একে-অপরকে দেয় উপহার। কিন্তু বনফুলের মধ্যেও যে অনেক সুন্দর ফুল আছে, সেগুলোকে মানুষ পায়ে দলে মুড়িয়ে দেয়। তবুও বুনোফুল ফোটে, পৃথিবীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। রাস্তার পাশে, বনে-জঙ্গলে অজস্র বুনোফুল ফোটে। কে আদর করলো, আর কে করলো না তাতে বুনোফুলের কিছুই যায় আসে না।

 

ছবি: রাস্তার পাশে ফুটে থাকা বুনোফুল

এমন ফুটন্ত বুনোফুলের মাঝে যেন আমাদের সমাজের কিছু অবহেলিত মানুষকেও দেখতে পাই। অনেকের জীবনটাই পথের ধারে ফুটন্ত বুনোফুলের মতো। তারা সুন্দর, সুশ্রী, জ্ঞানী, সুশিক্ষিত, হৃদয়বান, পরোপকারী হয়েও সবসময়ই অবহেলিত। সেসব অবহেলিত বুনোফুলের মাঝে আমিও এক বুনোফুল। বুনোফুলের মতোই এই নশ্বর সংসারে বসবাস করে গেলাম। বুনোফুল যত সুন্দর আর যত দৃষ্টিনন্দনই হোক না কেন, মানুষ সেই বুনোফুলের গন্ধ নেয় না, খুব যত্ন করে খোঁপায়ও বাঁধে না। তবু বেঁচে আছি অবহেলিত বুনোফুলের মতো অবহেলিত হয়ে। আমার মতো আরও কোটি বুনোফুল এই সমাজে জন্মলগ্ন থেকেই যেন অবহেলিত, ঘৃণিত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত। তবু আমাদের মতন অবহেলিত মানুষদের এতে কিছু যায় আসে না। বুনোফুলের মতনই স্রষ্টার কৃপায় বেঁচে আছি সকলের মাঝে। পৃথিবী যতদিন থাকবে, পথের ধারে আমার মতো অবহেলিত মানুষ নামের বুনোফুলও জন্ম নেবে, ফুটবে।

রাস্তার ধারে ফুটন্ত বুনোফুল যখন দেখি, তখন একটা গান গাইতে থাকি আপন মনে। গানটা হলো-

“নাম না জানা অনেক ফুলই পথের ধারে ফোটে।

জীবনটা যায় ঝরে ঝরে
ফুলদানি না জোটে।

দু’পায়েতে মাড়িয়ে গেলেও
নেই যে অভিমান।

তোমরা যতই আঘাত করো।”

দ্র: ছবিটি নিজের মোবাইল দিয়ে তোলা।