ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

একটা মহল্লার দোকানে থাকা টেলিভিশন। টেলিভিশন দেখার জন্য দোকানটিতে সবসময়ই ভিড় থাকে। টেলিভিশনে চলতে থাকে বিভিন্ন চ্যানেলের বিভিন্ন অনুষ্ঠান। কিন্তু বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) কেউ ভুলেও দেখে না। এমনকি রিমোট কন্ট্রোলের কত নম্বর বাটনে চাপ দিলে বিটিভি চ্যানেল আসবে, দোকানদার তাও জানে না।

১৯২৬ সালে প্রথম সাদাকালো টেলিভিশন আবিষ্কার হয়। আর আমাদের দেশে টেলিভিশন আসে ১৯৬৪ সালে। তাও তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের আমলে। নাম ছিল ইস্ট পাকিস্তান টেলিভিশন। আমার জন্ম ১৯৬৩ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে। তার মানে হলো, এই বঙ্গদেশে টেলিভিশন আসার বছরখানেক আগেই আমার জন্ম। একটু বোঝার বয়স হতেই টেলিভিশন দেখা শুরু করেছি। সেই দেখা শুরু হয়েছিল, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে। তখন আমরা সপরিবারে থাকতাম, নারায়াণগঞ্জ বন্দর থানাধীন আদর্শ কটন মিলে।

তখন কিন্তু এদেশের কেউ রঙিন টেলিভিশন চোখেও দেখেনি। এই বঙ্গদেশে রঙিন টেলিভিশনের আগমন ঘটে, ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে। সেসময় আকাশ প্রযুক্তি ডিশ-এন্টেনাও ছিল না। সাদাকালো টেলিভিশনের পর্দায় যা দেখতাম, তা শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশন নামের বিটিভি থেকে সম্প্রচার হওয়া অনুষ্ঠানগুলোই দেখতাম।

আদর্শ কটন মিলে টেলিভিশন ছিল না। বন্দর থানাধীন লক্ষ্মণখোলা এলাকায় জনতা ক্লাবে একটা সাদাকালো টেলিভিশন ছিল। আর একটা ছিল, শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিমপাড় চিত্তরঞ্জন কটন মিলের ক্লাবে। মানুষের ভিড়ে লক্ষ্মণখোলা জনতা ক্লাবে দেখার সুযোগ না হলে, চলে আসতাম শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিমপাড় চিত্তরঞ্জন কটন মিলের ক্লাবে। তখন এদেশে বড়বড় নেতাদের ক্যাডার নামের কোনও অস্তিত্ব ছিল না। ছিল মাস্তান বা রুস্তমের রাজত্ব।

যেসব রুস্তমরা একটু বেশি বাহাদুরি দেখাতো, তাদের বলতো পাইন্না রুস্তম। ওইসব রুস্তমদের গলায় বাঁধা থাকতো একটা রুমাল। অনেক রুস্তমদের হাতেও রুমাল বাঁধা থাকত। তাঁরা থাকতো বড়বড় সরদারদের অনুগত। মানে হলো সরদারদের চামচা। আর সরদার মানে ডাকাত সরদার, মিলের লাইন সরদার, চোরের সরদার, হাট-বাজারের সরদার। প্রত্যেক এলাকায় সরদারদের গৃহপালিত পশুর মতো রুস্তম বা পাইন্না রুস্তম থাকতো। ওইসব রুস্তমদের জ্বালায় ঠিকমত টেলিভিশন দেখতে পারতাম না। কারণ প্রতিটি ক্লাবেই ক্যারাম বোর্ড থাকতো। বেশিরভাগ সময়ই রুস্তমরা ক্লাবের মাঝখানে ক্যারাম খেলায় ব্যস্ত থাকতো। রুস্তমদের রুস্তমিতে আর ঠিকমত টেলিভিশন দেখা হতো না।

আবার রুস্তমদের একটু ডিস্টার্ব হলে, গালিগালাজসহ মারধরও করতো। সেই সময়ে টেলিভিশন দেখতে গিয়ে রুস্তমদের অনেক মার খেয়েছি। তবু বিটিভির অনুষ্ঠান দেখেছি। বিটিভি ছাড়া তখন অন্যকোনো চ্যানেল ছিল না। আর অন্যকোনো চ্যানেলের ব্যাপারে কারোর কোনও ধারনাও ছিল না।

একবার সারা দেশে জিকির উঠেছিল যে টেলিভিশন এন্টেনারের সাথে সিলভারের বাটি না হয় সিলভারের সরা লাগাতে হবে। সরা না হয় বাটি লাগালে নাকি ভারতের অনুষ্ঠান দেখা যায়! সেই জিকিরে ঢাকাসহ সারাদেশে একযোগে শুরু হয়েছিল, সরা আর সিলভারের বাটি লাগানো।

সিলভারের বাটি আর সরা লাগিয়ে তখন কিছুদিন ভারতীয় দূরদর্শন দেখেছে দর্শক। তারপরও কিন্তু বিটিভিই ছিল মানুষের একমাত্র দেখার চ্যানেল। বিকাল ৫টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্যদিয়ে শুরু হতো বিটিভির অনুষ্ঠানমালা। শেষ হতো রাত ১১টায় বাংলা সংবাদ শিরোনামের পর। কোনো কোনোদিন রাত ১১টায় বাংলা শিরোনাম সংবাদের শেষ পর্যন্তও বসে থাকতাম টেলিভিশনের পর্দার দিকে চোখ রেখে। ভাবতাম খবরের পর হয়তো আরও কিছু দেখাবে। কিন্তু না, বাংলা সংবাদ শিরোনাম শেষ হবার পরই টেলিভিশন চালক, টেলিভিশনের সুইচ অফ করে দিতো। মন খারাপ করে বাসায় চলে আসতাম।

বাসায় আসলে হতো বিপদ। বড়দা না হয় বাবার হাতে খেতে হতো মার। না হয় থাকতে হতো না খেয়ে। টেলিভিশন দেখতাম মনের সুখে, বাসায় এসে মরতাম মার খেয়ে, নাহয় মরতাম ক্ষুধার জ্বালায়। তবু টেলিভিশনে বিটিভির অনুষ্ঠান দেখতাম। আগের দিনের মার খাওয়ার কথা ভুলে গিয়ে, পরদিন আবার মনের আনন্দে টেলিভিশনের সামনে গিয়ে বসতাম। তখন সপ্তাহের সাতদিনই রাত ৮টার বাংলা সংবাদের পর একটা করে ইংরেজি ছায়াছবি থাকতোই। আরও থাকতো প্রতিমাসে একদিন পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি। থাকতো বাংলা নাটক, নৃত্যানুষ্ঠান, সাপ্তাহিক সিরিজ বাংলা নাটকের পর্ব।

ইংরেজি ছায়াছবিগুলো সম্প্রচার করা হতো একঘন্টা করে। একেকটা ইংরেজি সিরিয়াল একবছর দেড়বছর সময় ধরেও চলতো। যেমন ছিল, হাওয়াই ফাইভ, সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান, বায়োনিক ওম্যান  সহ আরও কিছু ইংরেজি সিরিজ ছায়াছবি। লেখাপড়া গোল্লায় গেলেও ইংরেজি সিরিজগুলো দেখতেই হতো।

আর বাংলা সাপ্তাহিক ধারাবাহিক নাটকগুলো একেকদিন একেকটা করে দেখানো হতো। ওইসব ধারাবাহিক নাটকগুলোর মধ্যে ‘সংশপ্তক’ ‘কোথাও কেউ নেই’ ছিল অন্যতম। সে সময় অনেক ধারাবাহিক নাটকই প্রচুর জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। যেমন ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘ভাঙনের ‘শব্দ শুনি’, ‘আমি তুমি সে’ ইত্যাদি। আরও অনেক নাটক ছিল, সেগুলোর নাম আর এখন মনে পড়ছে না।

চেষ্টা করতাম, রাত ৮টার আগেই টেলিভিশনের সামনে থাকতে। কোনরকম লেখাপড়া শেষ করেই, টেলিভিশনের সামনে ওঁত পেতে থাকতাম। টেলিভিশন দেখার জন্য ওঁত পেতে শুধু আমিই থাকতাম না, থাকতো সেই সময়ের আমার মতো টেলিভিশন পাগল আরও অনেকেই। এখন আর ওইরকম টেলিভিশন পাগল খুব কমই আছে।

সেই সময় মানুষের ভিড়ে অনেকসময় টেলিভিশনের সামনে জায়গা পেতাম না। জায়গা হতো দূরে, আর না হয় গাছের ডালে। টেলিভিশন দূর থেকে বেশি ভালো দেখা যায় না। তাই সবসময় টেলিভিশনের সামনেই বসার জায়গা রাখার চেষ্টা বেশি থাকতাম। তখনকার দিনে টেলিভিশন আর বিটিভি যে মানুষের কাছে কত স্বাদের বিনোদন ছিল, তা আর লিখে বোঝানো যাবে না। মানুষ ক্লাবের সামনে গাছের উপরে বসেও বিটিভির অনুষ্ঠানমালা উপভোগ করতো।

একদিন টেলিভিশন দেখতে গিয়ে আমাদের সমবয়সীদের সাথে লেগে যায় হট্টগোল। সেই গোলযোগের সূত্র ধরেই আদর্শ কটন মিলে আসে শ্রমিক কর্মচারীদের জন্য ১৭ ইঞ্চি সাদা-কালো টেলিভিশন। সেই থেকে কাউকে আর মিলের বাইরে গিয়ে টেলিভিশন দেখতে হতো না। মিলের শ্রমিক কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা মিলের ভেতরেই টেলিভিশন দেখতো।

শহরের রাস্তার পাশে থাকা প্রতিটি টিঅ্যান্ডটির খুঁটিতে আর বৈদ্যুতের খাম্বায় পেঁচানো ডিশ অ্যান্টেনার তার। ছবিটি নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের পেছন থেকে তোলা।

বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) নিয়ে অনেক কথাই বললাম। মূল কথা এখনো বলা হয়নি। বলতে চাই বর্তমান ডিজিটাল যুগের বিটিভি ও আকাশ প্রযুক্তি ডিশ অ্যান্টেনা নিয়ে। আকাশ প্রযুক্তির যুগে স্যাটেলাইট সংযোগ সবার ঘরে। আর তাই শহরের রাস্তার ধারে বিদ্যুতের খাম্বায় কেবল সংযোগের জট।

প্রথম প্রথম গ্রাহকদের কার আগে কে সংযোগ দিবে এই নিয়ে ডিশ ব্যবসায়ীরা থাকতো ব্যস্ত। সময়সময় এসব ডিশ অ্যান্টেনার সংযোগ দেওয়া নেওয়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে হানাহানি হতেও দেখা যেতো। তবে এখন আর তা হয় না। এখন যার যার মহল্লাভিত্তিক একটা নির্ধারিত সীমানা নির্ধারণ করা আছে। যার যার নির্ধারিত সীমানায় গ্রাহকদের ডিশ অ্যান্টেনার সংযোগ দিচ্ছে।

গ্রাহকও ডিশ অ্যান্টেনার সংযোগে আজ ঘরে বসেই টেলিভিশনে প্রায় অর্ধশত চ্যানেলে অনুষ্ঠান দেখছে। এরমধ্যে বছরখানের ধরে নতুন করে শুরু হয়েছে, টেলিভিশনে ইন্টারনেট সংযোগের আগমন। ডিশ অ্যান্টেনার সাথে চলছে ওয়াইফাই সংযোগ। কম্পিউটার, ল্যাপটপের মতন এখন টেলিভিশনেও ইউটিউবসহ বিশ্বের যে কোনো সামাজিক যোগাযোগ সাইটে যেতে পারে, দেখতেও পারবে। আর কী চাই!


নারায়ণগঞ্জ চাষাঢ়ায় তারের জট

বাংলাদেশ টেলিভিশন ২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৪ হতে সাদাকালো সম্প্রচার শুরু করেছিল। বর্তমানে সেই আগেকার সাদাকালো টেলিভিশন এখন আর চোখেই পড়ে না। সাদাকালো টেলিভিশনের যুগ শেষ হয়ে, এখন রঙিন টেলিভিশনের যুগ। সাদাকালো টেলিভিশন এখন আর কেউ দেখেও না। নাই বললেই চলে। এইতো ২০০৫ সালেও ঘরে ঘরে সাদাকালো টেলিভিশনের ছড়াছড়ি ছিল। ছিল ফিলিপস, নিপ্পন, ন্যাশনাল প্যানাসনিকসহ আরও অনেক ব্র্যান্ডের টেলিভিশন।

বর্তমানে রাস্তাঘাটে, দোকানে, মার্কেটে, বাসে, লঞ্চ-স্টিমারে টেলিভিশন থাকে। থাকলে কী হবে? সবাই দেখে দেশের বাইরের চ্যানেলের অনুষ্ঠান। বর্তমানে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই স্যাটেলাইটের অর্ধশত চ্যানেলে একটার পর একটা বাংলা ছায়াছবি দেখাচ্ছে। সাথে থাকে ভারতীয় চ্যানেলগুলোতে শতাধিক হিন্দি ছায়াছবি। এমনকি এই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলে কেউ দেশের জরুরি সংবাদটুকুও শোনে না।

তাহলে দর্শক কি দিনদিন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল বিটিভি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে? এভাবে মানুষের মন থেকে কি বিটিভি হারিয়ে যাচ্ছে?

বর্তমানে তাই মনে হচ্ছে। তাই যদি হয়, তাহলে এখন থেকেই এ ব্যাপারে রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। না হয় এভাবে চলতে থাকলে একদিন দেশের মানুষ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি বা বিটিভি ওয়ার্ল্ড এর কথা একেবারে ভুলেই যাবে।