ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

২৪ মার্চ ২০১৮, ১০ চৈত্র ১৪২৪ বাংলা শনিবার, দিবাগত রাত থেকে শুরু হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পুণ্যস্নান। এই পবিত্র স্নানকে সারাবিশ্বে বলে লাঙ্গলবন্দ স্নান বা অষ্টমী স্নান। প্রতি বছর চৈত্রমাসের অষ্টম তিথিতে এই অষ্টমী স্নান শুরু হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এই পবিত্র স্নান উপলক্ষ্যে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীদের সমাগম ঘটে। অনেক পুণ্যার্থী পুণ্য লাভের আশায় বিদেশ থেকেও আসে। অষ্টমী স্নানকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসক থেকে গ্রহণ করা হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুণ্যার্থীদের সবধরনের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে অনেক সেচ্ছাসেবী সংঘটনও এগিয়ে আসে। জায়গায় জায়গায় বসে তথ্যানুসন্ধান কেন্দ্র। সাথে থাকে সাহায্যকেন্দ্রও। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে কেউ পথহারা হলে বা হারিয়ে গেলে সাহায্যকেন্দ্র থেকে সাহায্য নেওয়া হয়। স্নান শুরু হবার দুইদিন আগে থেকেই লাঙ্গলবন্দ স্নান এলাকার আশপাশ ভরে যায় অস্থায়ী দোকানপাটে। প্রায় দুই কিলোমিটার জুড়ে লাঙলবন্দ অষ্টমী স্নান এলাকাটি।

প্রতি বছরই পুণ্যার্থীদের সমাগমে পুরো এলাকাটি মুখরিত হয়ে ওঠে। সবসময়ই এই পবিত্র অষ্টমী স্নানের তিথি আরম্ভ হয় চৈত্রমাসে। এই চৈত্রমাস হলো সূক্ষ্ম মৌসুম, বৃষ্টিও হয় খুব কম। নদীর জল থাকে স্বাভাবিকের চেয়ে কম। নদীতে জোয়ারভাটা না থাকার কারণে, নদীর জলও থাকে ঘোলা। তারপরও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এ যেন, কৈলাস পর্বতের সন্নিকটে থাকা মানস সরবরের পবিত্র জল। তাই পুণ্যের আশায় পুণ্যার্থীরা ব্রহ্মপুত্র নদের জলে স্নান করে। সেই জল আবার বোতলে ভরেও অনেকে নিয়ে যেতে দেখা যায়।সমাগত ভক্তবৃন্দের জন্য স্নান সম্পন্ন করাকে সহজ করার জন্য বিভিন্ন সময়ে ঘাটগুলির পাশাপাশি সেখানে রয়েছে ১০টি মন্দির ও কয়েকটি আশ্রম।

ঐতিহ্যবাহী রাজঘাট, সামনে আছে মহিলাদের কাপড় পাল্টানোর ঘর।

পুণ্যস্নানে আগত ভক্তদের থাকার জন্য আশ্রম।

এই রাস্তার ধারে বসে বিভিন্ন রকমের জিনিসের দোকান, সামনে স্নান করার স্নানঘাট।

অন্নপূর্ণা ঘাট

নতুন সংস্কার করা পাঠানকালি স্নানঘাট।

পাঠানকালি স্নানঘাটের সাথে পূজা দেওয়ার মন্দির।

ঐতিহ্যবাহী প্রেমতলাঘাট।

এরকম ছোটবড় আরও অনেক ঘাট আছে, যা পোস্টে দেওয়া সম্ভব হয়নি। উপরে শুধু ঘাটগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে। ছবিগুলো গতবছর অষ্টমী স্নান শুরু হবার কয়দিন আগের তোলা।

কীভাবে আসবেন?
ঢাকা বিভাগ: ঢাকা থেকে কুমিল্লা অথবা চট্টগ্রামগামী বাসে করে, নাহয় নিজেদের পরিবহনে করে লাঙলবন্ধ ব্রিজের সামনে নামতে হবে। লাঙলবন্ধ ব্রিজের সামনে নামলেই তীর্থস্নান উপলক্ষ্যে সেখানে দেখা যাবে লক্ষলক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগম। লাঙলবন্ধ ব্রিজ থেকে সোজা দক্ষিণে দুই কিলোমিটার পর্যন্তই লাঙলবন্ধ অষ্টমী স্নান।

চট্টগ্রাম বিভাগ: চট্টগ্রাম বিভাগের পুণ্যার্থীদের ঢাকা আসতে হবে না। ঢাকা আসার ২০ কিলোমিটার আগেই লাঙলবন্ধ তীর্থস্থান অবস্থিত। পথিমধ্যেই লাঙলবন্ধ ব্রিজ। লাঙলবন্ধ ব্রিজের সামনে নামলেই পৌঁছে গেলেন, লাঙলবন্ধ তীর্থস্থান।

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ: রাজশাহী রংপুর বিভাগের পুণ্যার্থীদের আগে আসতে হবে রাজধানী ঢাকা। ঢাকা থেকে কুমিল্লা অথবা চট্টগ্রামগামী বাসে করে, নাহয় নিজেদের পরিবহনে করে লাঙলবন্ধ ব্রিজের সামনে নামতে হবে। লাঙলবন্ধ ব্রিজের সামনে নামলেই তীর্থস্নান উপলক্ষ্যে সেখানে দেখা যাবে লক্ষলক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগম। লাঙলবন্ধ ব্রিজ থেকে সোজা দক্ষিণে দুই কিলোমিটার পর্যন্তই লাঙলবন্ধ অষ্টমী স্নান।

খুলনা বিভাগ: খুলনা বিভাগের পুণ্যার্থীদেরও আগে রাজধানী ঢাকা আসতে হবে। ঢাকা থেকে কুমিল্লা অথবা চট্টগ্রামগামী বাসে করে, নাহয় নিজেদের পরিবহনে করে লাঙলবন্ধ ব্রিজের সামনে নামতে হবে। লাঙলবন্ধ ব্রিজের সামনে নামলেই তীর্থস্নান উপলক্ষ্যে সেখানে দেখা যাবে লক্ষলক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগম। লাঙলবন্ধ ব্রিজ থেকে সোজা দক্ষিণে দুই কিলোমিটার পর্যন্তই লাঙলবন্ধ অষ্টমী স্নান।

বরিশাল বিভাগ: বরিশাল বিভাগের পুণ্যার্থীদের আগে রাজধানী ঢাকা আসতে হবে। ঢাকা থেকে কুমিল্লা অথবা চট্টগ্রামগামী বাসে করে, নাহয় নিজেদের পরিবহনে করে লাঙলবন্ধ ব্রিজের সামনে নামতে হবে। লাঙলবন্ধ ব্রিজের সামনে নামলেই তীর্থস্নান উপলক্ষ্যে সেখানে দেখা যাবে লক্ষলক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগম। লাঙলবন্ধ ব্রিজ থেকে সোজা দক্ষিণে দুই কিলোমিটার পর্যন্তই লাঙলবন্ধ অষ্টমী স্নান।

সিলেট বিভাগ: সিলেট বিভাগের পুণ্যার্থীদের ঢাকা যেতে হবে না। ঢাকা আসার ১০ কিলোমিটার আগে কাঁচপুর ব্রিজ। কাঁচপুর ব্রিজের সামনে থেকে সিএনজি অথবা অন্য যেকোনো গাড়ি চেপে লাঙলবন্ধ ব্রিজের সামনে যাওয়া যায়। সেখানে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি অনুসরণ করলেই হবে।

ময়মনসিংহ বিভাগ: ময়মনসিংহ বিভাগের পুণ্যার্থীদের আগে আসতে হবে রাজধানী ঢাকা। ঢাকা থেকে কুমিল্লা অথবা চট্টগ্রামগামী বাসে করে, নাহয় নিজেদের পরিবহনে করে লাঙলবন্ধ ব্রিজের সামনে নামতে হবে। লাঙলবন্ধ ব্রিজের সামনে নামলেই তীর্থস্নান উপলক্ষ্যে সেখানে দেখা যাবে লক্ষলক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগম। লাঙলবন্ধ ব্রিজ থেকে সোজা দক্ষিণে দুই কিলোমিটার পর্যন্তই লাঙলবন্ধ অষ্টমী স্নান।

দূরদূরান্ত থেকে যারা আসবেন তাদের জন্য কিছু কথা। নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ থানাধীন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এই তীর্থস্থান এলাকায় কোনপ্রকার আবাসিক হোটেল নেই। তবে এই লাঙলবন্ধ তীর্থস্থান এলাকার বসবাসকারীরা তীর্থ উপলক্ষ্যে নিজেদের বাসগৃহ ভাড়া দিয়ে থাকে। একটা ঘর সহ যাবতীয় সবকিছু সুবিধা নিয়ে দুই-তিন দিনের জন্য ভাড়া মাতে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। তাই বিদেশ থেকে কেউ অষ্টমী স্নানের দুইদিন আগে আসলেও কোনও সমস্যা হয় না।

বছর শেষে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এই তীর্থ উপলক্ষ্যে পুরো তীর্থস্থান ঘিরে থাকে অনেক টাউট-বাটপারের দল। সেসব টাউট-বাটপার আপনাকে সহজসরল ভেবে আপনা কাছে আসবে। আপনাকে সবধরনের সহযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দিবে। আপনি ওইসব টাউট-বাটপারদের থেকে দূরে থাকবেন। আপনার প্রয়োজনে সেখানে বসা আছে শতশত সেচ্ছাসেবী সংঘটনের মানুষ। আপনি যেকোনো প্রয়োজনে তাদের শরণাপন্ন হতে পারেন। কোনও অবস্থাতের টাউট-বাটপারদের সহযোগিতা নিবেন ন। তাদের সহযোগিতা নিতে গেলেই, আপনাকে সবকিছুই হারাতে হবে। কাজেই ওইসব দুষ্কৃতিকারীদের থেকে সাবধান!!

এই পবিত্র অষ্টমী স্নানের লগ্ন শুরু হয়েছে  ১০ চৈত্র সকাল ১০টা থেকে। থাকবে ১১ চৈত্র সকাল ৮টা পর্যন্ত। লগ্নের শুরুতে আগত পুণ্যার্থীরা হুড়াহুড়ি করে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কার আগে কে স্নান করবে এই হলো পুণ্যার্থীদের লক্ষ্য। কিন্তু তা করা মোটেও ঠিক নয়। কারণ এবার লগ্নের সময়সীমা থাকবে ১২ ঘণ্টা। এই দীর্ঘ সময় হাতে থাকতে হুড়াহুড়ি না করে, ধীরেসুস্থে স্নান করাই ভালো। তাড়াতাড়ি আর হুড়াহুড়ির কারণে অনেকসময় মহাবিপদের সম্মুখীন হতে হয়।

প্রতিটি ঘাটে সারিবদ্ধভাবে পুরোহিত বসা থাকে। কারোর পূর্বপুরুষদের নামে পিণ্ড দিতে চাইলে, ওইসব পুরোহিতদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া যাবে। আর স্নানঘাটের সামনেই ফুল, দুর্বা, ফলফলারি পাওয়া যায়। যার যার পছন্দমত ফুল ও ফল কিনে ব্রহ্মপুত্র নদীতে দিতে পারবেন। প্রতিবছর চৈত্রমাসের এই পবিত্র অষ্টমী স্নান হলো, হিন্দু ধর্মাবলম্বী তথা ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য এটি একটি পবিত্র স্থান। তাই হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মাবলম্বীদের সমাগম ঘটে। দূরদূরান্ত থেকে অনেক পুণ্যার্থী আসে পুণ্যলাভের আশায়। প্রতিবছরের মতন এবারও লক্ষ পুণ্যার্থীর শুভাগমনে মুখরিত হয়ে ওঠবে, নারায়ণগঞ্জ জেলার লাঙলবন্ধের পবিত্র তীর্থস্থানটি।