ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

পূর্বের লেখা (পর্ব-১২)

পর্ব-১৩:

দিদির বাড়িতে ভাড়া থাকা ব্যাচেলর ছেলে দুজনের রুমে গেলাম। ওরা কেউ ঘরে নেই। দুপুরের খাবার খেয়ে আবার ওদের কাজে চলে গেছে। বড়দি আমার সামনে এসে বলল, মনে হয় অনেক টাকা সাথে করে এনেছিস? দিদির কথা শুনে আমি বললাম, কেন? দিদি বললেন, যেখানে তিন টাকা খরচের ভয়ে কেউ রিকশায় চড়ে না, সেখানে তুই বীরপাড়া বাজার থেকে রিকশা চড়ে এখানে আসলি?এতেই বোঝা যায় বাংলাদেশ থেকে আসার সময় অনেক টাকা সাথে করে এনেছিস।

আমি আমতা আমতা করে বললাম, না মানে, গুমটু থেকে আসতে দেরি হয়েছে তো। তাই রিকশায় চড়ে তাড়াতাড়ি আসলাম। গুমটুর কথা শুনে বড়দি অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল, কিন্তু কিছুই বলল না। শুধু বলল, যা স্নানঘর থেকে স্নান করে আয় শিগগির। এই কথা বলে সোজা রান্না ঘরের দিকে চলে গেল।

আমি স্নানঘর থেকে স্নান করে ঘরে ঢুকতেই দিদি বলল, তাড়াতাড়ি আয়, ভাত খাবি। বড়দির কথা মত একটু তাড়াহুড়ো করেই খাবার  ঘরে আসলাম। আমাকে খাবার দিয়ে আমার সামনেই বসে রইল। একটু পরে জিজ্ঞেস করল, গুমটু কেন গিয়েছিস? আর কীভাবেই বা গেলি? তুই এখানে এসেছিস মাত্র দুই দিন হল, এর মধ্যেই তো সব ওলট-পালট করতে শুরু করছিস।

বড় দিদির কথা শুনে আমি বললাম, কেন দিদি কী হয়েছে? ভুটান তো দেখার মতো জায়গা। কী সুন্দর পরিবেশ! কী সুন্দর তাদের সামাজিক আচার-আচরণ, আমি সুযোগ পেলে প্রতিদিনই গুমটু থেকে ঘুরে আসব। আমার কথা শুনে দিদি বলল, সাথে যে কয়টা টাকা আছে, তা শেষ হয়ে গেলে দেশে ফিরবি কী করে? যেতে টাকা লাগবে না? এভাবে খরচ না করে, টাকাগুলো আমার কাছে দে, আমি রেখে দেই।

দিদির কথায় তেমন কান দিলাম না। ঝটপট খেয়ে ঘরে গেলাম। ভাবছি এখানে হয়তো বেশি দিন থাকা যাবে না। কানাইর ওখানেও থাকা সম্ভব না। এখানে থাকতে হলে আমাকে কাজ করে খেতে হবে। কিন্তু কী কাজ করব? এখানে কাজের খুবই অভাব। যা আছে তার মুজুরি সামান্য। একজন রিকশা চালক সারা দিন রিকশা চালিয়ে ১৫ থেকে ২০ টাকা আয় করে। অবশ্য, দ্রব্যমূল্যের দিক দিয়ে তা ঠিক আছে, কিন্তু এতে আমার তো মন ভরছে না। বাংলাদেশে প্রতিমাসে বেতন পেতাম পাঁচ হাজার টাকা। এখানে ৫ হাজার টাকা তো স্বপ্নের ব্যাপার। আমার কথা কেউ বিশ্বাসও করে না যে, আমি পাঁচ হাজার টাকা বেতনে কাজ করে এসেছি। তা না করুক, কিন্তু এখন আমার তো একটা কিছু করতে হবে।

এসব ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যার পরে গ্যারেজ লাইনে গেলাম। ছোট ভাগিনার দোকানে গিয়ে বসলাম। চা পান করে, মেজো ভাগিনার গ্যারেজে গেলাম। গ্যারেজ মালিক আমাকে বসতে দিলেন, আমি বসলাম। চা পান করার জন্য অনুরোধ করলেন, আমি বারণ করলাম। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাতের পালা। মেজো ভাগিনা কমলা বোঝাই একটা বড় লড়ির (ট্রাক) কাজ করছে। ও লেখাপড়া একেবারে জানেই না। অথচ ভারতের সব কয়টা প্রদেশের ভাষাই ওর মুখস্থ! গাড়ির মিস্ত্রির কাজও শিখেছে বেশ। চলন্ত অবস্থায়ও গাড়ির রোগ নির্ণয় করতে পারে। বলে দিতে পারে, গাড়ির সমস্যাটা কী? বেতন তেমন একটা পায় না। বেতন মাত্র ভারতীয় ১২০০ টাকা। তাও সেখানে অনেক কিছু। ভাগিনা গাড়ির নিচে শুয়ে শুয়ে কাজ করছে। আমি সামনে গিয়ে বসলাম। আমাকে দেখে হাসছে, আবার নিজের কাজও করছে। ওর কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত, আমি ওর সামনেই বসে রইলাম। কাজ শেষ করে গাড়ির নিচ থেকে ওঠে আমার সামনে এসে বলল, পারবে মামা? আমি বললাম, কী পারতে হবে আমাকে? ভাগিনা আবারও বলল, আমি যেই কাজটি করলাম, তুমি এই কাজটি করতে পারবে? বললাম, শিখতে শিখতেই শেখা যায় মামা, না পারার কিছুই নেই।

মেজো ভাগিনার সাথে অনেক্ষণ বসে থাকলাম। রাত আনুমানিক আটটার মতো বাজে। ছোট ভাগিনা ওর দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে গেছে অনেক আগেই। রাস্তা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। গাড়ি-ঘোড়ার চাপ তেমন একটা নেই। এমনিতেই সেখানে রাত আটটার পর দোকানপাট বেশি খোলা থাকে না। খানিক পর মেজো ভাগিনার গ্যারেজও বন্ধ হয়ে যাবে। ভাবলাম ঘুরে আসি বীরপাড়া বাজার থেকে। ভাগিনাকে বললাম, আমি বীরপাড়া বাজারে যাব। আমার কথা শুনে মেজো ভাগিনা হেসে বলল, এত রাতে বাজারে যাবে মানে? বাজারে গিয়ে কী করবে শুনি? বললাম, ভালো লাগছে না, তাই।

আমার কথায় আর ভাগিনা বাধা দিল না। আমি সোজা বীরপাড়া বাজারে চলে গেলাম। বাজার থেকে ঘুরে ফিরে রাত ১০টার দিকে বাড়ি ফিরলাম। আমি বাদে সবার খাওয়া-দাওয়ার পর্ব প্রায় শেষ। বাকি শুধু আমার বড়দি। আমার দেরি করে বাড়িতে ফেরা নিয়ে বড়দি ভাল-মন্দ তেমন কিছু আর জিজ্ঞেস করেনি। শুধু ভাত খেতে বললেন। আমি ভাত খেয়ে সোজা ভাড়াটিয়াদের ঘরে চলে গেলাম। ঘরে গিয়ে ওদের সাথে বসে অনেক্ষণ গল্প-গুজব করে শুয়ে রইলাম।

এভাবে প্রায় একমাস কাটালাম। নিজের পকেটে যা ছিল, তা পুরোপুরি ভাবে শেষ। এখন আমার কাছে বিড়ি সিগারেট কিনে খাবার টাকাও নেই। সিগারেটের দাম বেশি, বিড়ির দাম কম। শাল পাতার বিড়ি, দেখতে খুব সুন্দর। এক প্যাকেট বিড়ি নাম মাত্র এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা। তাও ছোট ভাগিনার কাছ থেকে চেয়ে নিতে হয়। মাঝে মাঝে ভীষণ লজ্জাও লাগে, যখন বিড়ি দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। তারপরও নিরুপায় হয়েই ভাগিনাদের কাছ থেকে দু-এক টাকা চেয়ে নিতে হয়। কোনও সময় পাওয়া যায়, আবার অনেক সময়ই পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় নিজেকে খুব অসহায় মনে হতে লাগল। এভাবে শুয়ে বসে খেতে খেতে বড় দিদির কাছে আমি এখন একটা মাথার বোঝো হয়ে গেলাম। ভাগিনাদের কাছেও একটা বোঝা। মোট কথা, আমি সবার কাছে একটা মহা ঝঞ্ঝাট। আমি দেখতে পাচ্ছি যে, দিন দিন আমার প্রতি ওদের অন্য রকম আচার-ব্যবহার। এরকম আচার-ব্যবহার টের পেয়ে কাজের সন্ধান করতে লাগলাম।

কিন্তু অনেক জায়গায় ঘুরাঘুরি করেও কোথাও একটা কাজের ব্যবস্থা করতে পারিনি। শেষ অবধি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমার খুড়ো শ্বশুরের বাড়িতে যাব। খুড়ো স্বশুরের বাড়ি বীরপাড়া থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে। সেই শিলিগুড়ি শহরের পাইপ লাইন, দেশবন্ধু পাড়ায়। সেখানে যেতে হলে আসা-যাওয়া বাবদ ভারতীয় টাকা ৫০ টাকার প্রয়োজন। কিন্তু আমার কাছে ৫০টি পয়সাও নেই। যাতায়াত ভাড়া নেই বলে, সেই মুহূর্তে আর শিলিগুড়ি যাওয়া হয়নি। দিদির বাড়িতেই অযত্নে-অবহেলায় দিন কাটাচ্ছি। কিন্তু এভাবে তো চলা যায় না, অন্য কেউ চলতে পারলেও, অন্তত আমি চলতে পারব না। শেষমেশ উপায়ন্তর না দেখে মেজো ভাগিনার গ্যারেজে সকাল-সন্ধ্যা আসা-যাওয়া শুরু করে দিলাম। গ্যারেজে আরও দুইজন হেলপার আছে। ওরা যেভাবে কাজ করে আমিও সেভাবে কাজ করতে লাগলাম। গ্যারেজ মালিক সন্তুষ্ট হয়ে প্রতিদিন সকাল বেলা গ্যারেজ খোলার দায়িত্ব আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। বেতন ধরা হলো, প্রতি সপ্তাহে ১০০ টাকা। খাওয়া-দাওয়া চলবে দিদির বাড়ি।

প্রথম সপ্তাহের বেতন পেলাম। বেতন দেওয়া হত প্রতি শনিবার সন্ধ্যা বেলা। গ্যারেজে কাজ করার শুরু থেকেই আমার মনের মধ্যে একটা বাসনা ছিল। বাসনা হলো, আমার বড় দিদির শ্বাশুরিকে (মাওই মা) একটা ধুতি দান করা। বেতন হিসেবে গ্যারেজ মালিক ভুটানের একটা ১০০ টাকার নোট আমার হাতে ধরিয়ে দিল। নোটখানা দেখে ভীষণ লজ্জা লাগল। কিন্তু করার তো কিছু নেই। কারণ আমি তখন একেবারেই নিঃস্ব, তাই চুপচাপ টাকাটা প্যান্টের পকেটে ভরে রাখলাম। গ্যারেজ বন্ধ করে দিদির বাড়ি গিয়ে স্নান করলাম। জামা-কাপড় পড়ে বীরপাড়া বাজারে গিয়ে, ৬০ টাকা দামের একটা ধুতি-কাপড় কিনে আনলাম। ষাট টাকা আমাদের দেশে কিছু না হলেও, ভারতের বাজারে অনেক কিছু। যে দোকান থেকে ধুতি কিনেছি, সেই দোকানের সেরা ধুতি। ধুতি সাথে নিয়ে বাজার থেকে পায়ে হেঁটে দিদির বাড়িতে এলাম। পায়ে হেঁটে আসলাম টাকার জোড় নেই বলে।

বাড়ি এসে ধুতিটা আমার বড়দির হাতে দিয়ে বললাম, দিদি ধুতিটা আমি মাওই মার জন্য এনেছি। মাওই মাকে ডেকে এনে তার হাতে দিয়ে দিন। আমার নেওয়া ধুতিটা দেখে বড় দিদি কেমন যেন বিহ্বল হয়ে গেল, কিন্তু কিছুই বলল না। দিদির হাতে ধুতিটা বুঝিয়ে দিয়ে ভাড়াটিয়া ছেলেদের ঘরে গিয়ে বসলাম। ওরা দুইজন বসে বসে টেলিভিশন দেখছিল। আমাকে দেখে বসতে দিল। আমি ওদের সাথেই বসলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি বাড়িতে অনেক মহিলার অনাগোনা। ভাটিয়া একজন বলল, মামা তুমি ধুতিটা কত টাকা দাম দিয়ে এনেছ?
বললাম, মাত্র ষাট টাকা। কিন্তু কেন? ভাড়াটিয়া ছেলেটি বলল, তুমি দারুণ একটা ধুতি এনেছ মামা। এসব দামি ধুতি এক জায়গায় আসা-যাওয়ার সময় ব্যবহার করে। তোমার পছন্দ আছে মামা।

বড়দি মাওই মাকে বাড়ি ডেকে এনে ধুতি কাপড়টা পড়িয়ে দিয়ে বলল, আমার ভাইকে একটু আশীর্বাদ করবেন। সবাই আমাকে মাওই মার সামনে নিয়ে গেল। আমি মাওই মাকে নমস্কার দিলাম, তিনি আমার মাথা মুছে আশীর্বাদ করল। সবাই তখন বলাবলি শুরু করে দিল, দেখ এ হচ্ছে জয় বাংলার লোক, মনের জোড় আছে।

আমার দিদি, জামাইবাবু সহ বাড়ির সবাই তখন মহা খুশি। তাদের এই খুশি দেখে মনে মনে ভাবছি, মাত্র ষাট টাকার কাপড়ে এতো খুশি। টাকা থাকলে তো আরও কিছু দেখিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু এখন তো আমি একেবারেই নিঃস্ব। দেখাব আর কী করে?

চলবে…