ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

পূর্বের পর্বের লেখা (পর্ব-১৩)

শেষ পর্ব:
পরদিন সকলে ঘুম থেকে উঠে চলে গেলাম গ্যারেজে। সারাদিন হেসে খেলে কাজ করলাম মনের অনন্দে। হাসি খেলি যা-ই করি, কিন্তু মনে শান্তি নেই। পকেটে য়াকা নেই তো শান্তিও নেই। আমি এখন পয়সার অভাবে সিগারেট কিনতে পারি না। ৭৫ নয়য়া দিয়ে শালপাতার এক প্যাকেট বিড়ি কিনে সারাদিন চলি। চা চলে মেজো ভাগিনার ইচ্ছার উপরে। ও যখন চা পান করে, তখন চায়ের পেয়ালায় একটু চুমুক দিতে পারি। না হয় অনেক সময় এমনিতেই কেটে যায়। থাকি কাজের ধান্ধায়ই বেশি। গাড়ি মেরামতের সময় গাড়ি থেকে কিছু বাতিল গ্রিজ বের হয়। এগুলো পুরানো হেলপার নিয়ে নেয়। গ্যারেজ লাইনে এই বাতিল গ্রিজের অনেক দাম। গ্যারেজ লাইনে কয়েকজন গ্রিজওয়ালা আছে। ওরা গাড়িতে গ্রিজ লাগায়। প্রতি গাড়ি ১০ টাকা। ওরা গ্যারেজে গ্যারেজে ঘুরে ওই বাতিল গ্রিজগুলো সংগ্রহ করে। একটা গাড়ির চার চাকা খোলা হলে, ওই গাড়ি থেকে অনেক বাতিল গ্রিজ বের হয়। প্রতি এক কৌটা গ্রিজ ১০ টাকা। প্রতিদিন দুই একটা গাড়ির চাকা খোলা হলে, দুই-তিন কৌটা গ্রিজ হয়ে যায়।

আমি যেই গ্যারেজে কাজ করি, আমার সাথে আরও একজন পুরানো হেলপার আছে। এই বাতিল গ্রিজগুলো ঐ হেলপারই নিয়ে নেয়, আমাকে দেয় না। আমি একদিন মালিকের কাছে আবদার রাখলাম যে, বাতিল গ্রিজগুলোর অর্ধেক পরিমাণ আমাকে যেন দেওয়া হয়। কারণ, আমার বিড়ি সিগারেটের অভ্যাস আছে, তাই। মালিক রাজি হলেন। আমার মেজো ভাগিনাকে আর পুরানো হেলপারটাকে বলে দিলেন, বাতিল গ্রিজ যেন আমাকে অর্ধেক দেয়। যেই কথা সেই কাজ। অর্ধেক গ্রিজ পেয়ে গেলাম। সারাদিন যদি এক কৌটা গ্রিজ পেয়ে যাই, তা হলে আর ঠেকায় কে? ১০ টাকা ভারাতের বাড়িতে অনেককিছু। এভাবে গাড়ির গ্যারেজে মেজো ভাগিনার সাথে অনেকদিন কাজ করলাম। যতক্ষণ গ্যারেজে থাকি, ততক্ষণই ভালো থাকি। গ্যারেজ থেকে দিদির বাড়িতে ঢুকলেই শুরু হয় অশান্তি। আমি এখন দিদির বাড়ির একটা বোঝা। না পারে রাখতে, না পারে তাড়াতে। আমি সবকিছুই টের পাচ্ছি। তারপরও বড় ভাগিনা সময় সময় বলে ফেলে, কী মামা বাংলাদেশ যাবে না? আমার কোনও উত্তর নেই। কারণ, নিজের পকেটে টাকা নেই, সহ্য তো করতেই হবে; আর ওদের নানারকম কথাও শুনে থাকতে হবে।

এভাবে নানাজনের নানান কথা শুনতে শুনতে নিজের কান দুটো একেবারে ঝালাপালা হয়ে ওঠল। ভাবছি এখন থেকেই নিজেকে গুটিয়ে নিতে হবে। না হয় আগামীতে আরও অনেক কটুকথা আমাকে শুনতে হবে। কানাইর ঠিকানায় একটা চিঠি দিলাম। কিন্তু সেই ছিঠির কোনও উত্তর পাইনি। হয়তো চিঠিখানা ওর হস্তক্ষেপ হয়নি। এমনও হতে পারে যে, চিঠির ঠিকানা লেখা ভুল ছিল। এদিকে নিজের স্ত্রীও সপ্তাহে একটি করে চিঠি দিতে লাগলে। স্ত্রীর চিঠি পাবার পর আর কিছুই ভালো লাগতো না। রেখে যাওয়া ছেলেমেয়ে দুটির জন্য সবসময়ই মন কাঁদতো। অনেক সময় চিঠি পড়তাম আর কাঁদতাম। একদিন আমার মেজো ভাগিনার সাথে বাংলাদেশ আসার বিষয় নিয়ে আলাপ করলাম। কীভাবে আসবো, টাকাই বা পাবো কোথাও? এসব নিয়ে। মেজো ভাগিনা বলল, বাংলাদেশ যাবার টাকা আমি তোমাকে দিবো। আমি তাতে নারাজ! আমি যুক্তি আর বুদ্ধি দিলাম। বুদ্ধিটা হলো, গ্যারেজে একটা গাড়ি আসার পর, সেই গাড়িতে অনেক রকমের পার্টস লাগানো হয়। সেসব পার্টসের প্যাকেটে যেসব কুপনগুলো থাকে, তা আমি নিয়ে জমাবো। এতে করে অল্পকিছুদিনের মধ্যেই আমার যাবার টাকা হয়ে যাবে। তোমাদের পকেট থেকে আর একটা টাকাও আমাকে দিতে হবে না।

আমার কথা শুনে ভাগিনা বাবাজি রাজি হয়ে গেল। গ্যারেজের পুরানো হেলপারকে বলে দিলেন, আজ থেকে পার্টসের প্যাকেটগুলো সব আমার মামাই নিবে। কারণ, আমার মামা বাংলাদেশ যাবার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন তাই। ভাগিনার কথা শুনে গ্যারেজ মালিক সহ সবাই রাজি হয়ে গেলেন। ব্যস, শুরু করে দিলাম কুপন সংগ্রহ করা। প্রতিদিন পার্টসের প্যাকেটের কুপনগুলো আমি আমার শোবার ঘরে নিয়ে রেখে দিতাম। জমতে লাগলো পার্টসের ভেতরকার কুপনগুলো। অন্যদিকে সংগ্রহ হচ্ছে, গাড়ির চাকার ভেতরে থাকা গ্রিজগুলো। গ্রিজগুলো বিক্রি করে যেই টাকা পেতাম, তা দিয়ে সারাদিনের পকেট খরচটা চলতো। আর সপ্তাহে ১০০ টাকা বেতনের টাকা দিয়ে ঘুরতাম, সিনেমা দেখতাম। কখনও যেতাম ভুটান ফুলসিলিং, কখনও ভুটান সামচি, কখনও শিলিগুড়ি, কখনও যেতাম গুমটু। এভাবে কেটে গেল অন্তত দুই-তিন মাস।

হঠাৎ এদিন স্ত্রীর একটা চিঠি পেয়ে জানতে পারলাম যে, শিলিগুড়িতে আমার এক খুড়া শ্বশুর থাকে। শিলিগুড়িতে ওনার নিজের বাড়ি। চিঠি পেয়ে ভাবলাম, তা হলে তো, সেখানে গিয়ে একটু দেখতে হয়? কিন্তু যাবো কী করে? আমিতো সেই জায়গা চিনি না। অবশ্য চিঠিতে খুড়া শ্বশুরে বাড়ি ঠিকানা দেওয়া ছিল। তবুও একা যেতে কেমন যেন ভয় পাচ্ছিলাম। আলাপ করলাম মেজো ভাগিনার সাথে। শিলিগুড়ি দেশবন্ধু পাড়া কীভাবে যেতে হয়, তা নিয়ে। মেজো ভাগিনা বলল, দেশবন্ধু পাড়া আমার কাকা খুব ভালো করে চিনে মামা। তুমি কোনও চিন্তা করবে না, দেশবন্ধু পাড়া তুমি যাবে এটাই নিশ্চিত। ভাগিনার কাকা মানে, আমার বেয়াইমশাই। সেও এই গ্যারেজ লাইনেই গাড়ির চেসিস-এর কাজ করে। আমার সাথেও তার ভালো সম্পর্ক আছে।

সাথে সাথে বেয়াইমশাইয়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, শিলিগুড়ি দেশবন্ধু পাড়া আপনি চেনেন কি না? বেয়াই বললেন, চিনি, তবে কেন? বললাম, সেখানে আমার খুড়া শ্বশুরের বাড়ি আছে। সেখানে আমাকে যেতে হবে। বেয়াইমশাই জিজ্ঞেস করল, সেখানে গিয়ে কী হবে? বললাম, যেকোনো একটা কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। কী কাজ করবেন? বায়াইমশাই জিজ্ঞেস করলেন। বললাম, আমি যেকোনো কাজই করতে পারবো দাদা। রিকশা থেকে শুরু করে দিনমুজুরদের করা যেকোনো কাজ। আমার খুড়া শ্বশুর যদি আমার প্রতি সদয় হয়, তা হলে তিনি একটা ব্যবস্থা করে দিবেন বলে আমি আশা রাখি। আমার কথা শুনে বেয়াইমশয়াই আমাকে দেশবন্ধু পাড়া নিয়ে যেতে রাজি হলেন। তারিখ নির্ধারণ হলো, কোনদিন আমরা দেশবন্ধু পাড়ার উদ্দেশে রওয়ানা হবো। রওয়ানা হবো সামনের রবিবার সকালবেলা। যাতায়াত ভাড়া সব আমারই বহন করতে হবে। এই খবর আমার বড়দি শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। মনে মনে বলতে লাগলেন, এই বুঝি মথার বোজাটা নামলো! ঘরের সবাই খুশি! ভাগ্নি জিজ্ঞেস করল, মামা তুমি কবে শিলিগুড়ি যাচ্ছো? বললাম, আগামী রবিবার যাচ্ছি! বেশ ভালো, সেখানেই থেকে যেও মামা। শিলিগুড়ি জায়গাটা খুব সুন্দর! সেখানে তোমার মন বসবে। আমার ভাগ্নি আমাকে কেন বলছে, সেটাতো আমি জানি। আমি হলাম ওদের সংসারের বর্তমান জঞ্জাল তাই।

শনিবার রাতেই গ্যারেজ মালিকের কাছ থেকে সপ্তাহের বেতন ১০০ টাকা নিয়ে নিলাম। গ্রিজ বিক্রির টাকা ছিল, প্রায় ৫০ টাকার মতো। এভাবে মোট ১৭৫ টাকার মতো সাথে নিয়ে রবিবার খুব সকালবেলা দিদির বাড়ি থেকে বেয়াইমশাই সহ শিলিগুড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম। গেলাম দেশবন্ধু পাড়া। ঠিকানা মতো খুড়া শ্বশুরকে খুঁজে বের করলাম। বললাম, আমার বর্তমান দুরবস্থার কথা। কিন্তু আমার এই দুরবস্থায় খুড়া শ্বশুর কোনও সহযোগিতা করতে পারবে না বলে জানিয়ে দিলেন। বললেন, এসেছো যখন চার-পাঁচদিন থাক, বেড়াও। কিন্তু কোনও কাজের ব্যবস্থা এখানে হবে না। এই কথা শুনে আমি আর খুড়া শ্বশুরে ওখানে দেরি করলাম না। বেয়াইমশাইকে সাথে নিয়ে সোজা বীরপাড়া চলে এলাম।

দিদির বাড়িতে প্রবেশ করার সাথে সাথে দিদি সহ সবার মনটা যেন কেমন হয়ে গেল! ভালো কী মন্দ কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল না। নিজের ভাবেই নিজের শোবার ঘরে চলে গেলাম। একটু পর বাড়ি থেকে বের হয়ে সোজা বীরপাড়া বাজারে গেলাম। বাজারে গিয়ে মনের দুঃখে সিনেমা দেখে অনেক রাতে ঘরে ফিরলাম। অন্যদিন আমার দেরি হলে বড়দি অপেক্ষা করত। আজ আর কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকেনি। তবে বাড়ির গেইটটা আমার জন্য ঠিকই খোলা রেখেছে। আমি যেই ঘরে থাকি, সেই ঘরের ভাড়াটিয়া ছেলে দুইজনও সেদিন আগেভাগে খেয়েদেয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পরেছে। রাত আনুমানিক দশটার মতন বাজে। ঘরের দরজার কাড়া নাড়া দিলাম। ওরা ঘুম থেকে উঠে দরজা ঘুলল, আমি ঘরে গেলাম। জিজ্ঞেস করল, মামা তুমি কোথায় গিয়েছিলে? বললাম, সিনেমা দেখে এলাম। সে রাতে আর খাওয়া-দাওয়া হলো না, কাউকে আর ডাকও দিলাম না। না খেয়েই ঘুমিয়ে পরলাম।

পরদিন ঘুম থেকে উঠে কাজ করার জামা পেন্ট পরে সোজা গ্যারেজে চলে গেলাম। দিদির বাড়িত সকালের খাবারটাও সেদিন খাইনি। খাবোই বা কী করে? আমি যেন এখন অপরিচিত একজন মানুষ! মেজো ভাগিনা জিজ্ঞেস করল, রাতে তুমি কোথায় গিয়েছিলে? বললাম, সিনেমা দেখতে বীরপাড়া গিয়েছিলাম। মেজো ভাগিনাকে বললাম, তোমার জানামতে ভারত বর্ডার পার করার কোনও দালাল আছে? বলল, কেন মামা? বললাম, থাকলে বলো, আমি বাংলাদেশ যাবার প্রস্তুতি নিয়ে নেই। এখানে আর আমার ভালো লাগে না মামা। মেজো ভাগিনা বলল, পরিচিত দাদাল আছে, তবে খবর নিতে হবে। বললাম, ঠিক আছে মামা তুমি খবর নিয়ে যোগাযোগ করো, আমিও রেডি হয়ে যাই। মেজো ভাগিনা সেইদিনই দালালের খবরাখবর নিয়ে নিলো। আমিও গ্যারেজ থেকে রাতে বাড়ি এসে জমানো কুপনগুলো বের করলাম। আমার সাথে ভাড়াটিয়া ছেলো দুটোও লেগে গেল, কুপন ভাজ করার জন্য। ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করল, মামা এগুলোর টাকা দিয়ে তুমি কী করবে? বললাম, বাংলাদেশ যাবার খরচটা সামাল দেওয়ার জন্যই কুপনগুলো রেখেছিলাম মামা। হিসাব করে দেখি কত টাকা হয়েছে। যাবার মতো টাকা হয়ে গেলে, আগামী দু’একদিনের মধ্যেই তোমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছি মামা। আমার কথা শুনে ওদের মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল।

মন খারাপের মধ্যেই কুপনগুলোর হিসাব মেলাচ্ছে। কুপনগুলো ভাঙ্গালে মোটমাট ২৬০০ টাকার মতন হবে। একজন জিজ্ঞেস করলো, মামা তোমার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে কত টাকার মতো লাগতে পারে? বললাম, তা আমার জানা নেই, তবে এই ২৬০০ টাকায় হবে যাবে আশা করি। ওদের বললাম, মামা তোমরা কেউ আমার দিদির কাছে বলবে না যে, আমি বাংলাদেশ যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি। যেদিন রওয়ানা হবো, ঠিক সেদিনই আমার বড়দি জানবে। এর আগে নয়। ওরা বলল, ঠিক আছে মামা তা-ই হবে। আর যাবার দিন আমরা দুইজনে তোমাকে কিছু টাকা দিবো, তুমি সেই টাকা দিয়ে তোমার ছেলেমেয়ের জন্য কিছু কিনে নিবে। আমি বললাম, না মামা, তা আমি নিবো না। এটা আমার ওয়াদা। আমার নিজের কষ্টের টাকা খরচ করেই, আমি আমার দেশে যেতে চাই। তোমরা শুধু আমার জন্য একটু আশীর্বাদ করবে, তা-ই আমার হবে। পরদিন কুপনগুলো পার্টসের দোকানে বুঝিয়ে দিয়ে নগদ টাকা নিয়ে নিলাম।

দুইদিন পরই বর্ডার পার করে দেওয়ার দালাল রেডি হয়ে গেল। যিনি দালাল রেডি করেছেন, তার নাম নন্দলাল। আমার বড়দি’র বাড়ির পাশেই তাদের বাড়ি। বাংলাদেশের মোহাম্মদপুরও তাদের বাড়ি আছে। নন্দলালই আমাকে নিয়ে যাবে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন দালালদের বাড়ি। আসার দিন বড়দি জোর করে আমার স্ত্রীর জন্য একটা ভারতীয় শাড়ী ব্যাগের ভেতরে ভরে দিলেন। আমার জন্য দিলেন এক পিছ শার্টের কাপড়। আসার সময় বীরপাড়া রবীন্দ্র নগর কলোনির বড়দিদির বাড়ির আশেপাশের বাড়ির অনেক পুরুষ মহিলাও উপস্থিত ছিলেন। আমার মাওইমা ছিকেন, বেয়াইন সহ ভাড়াটিয়া ছেলে দুইজনও ছিলেন। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসলাম গ্যারেজ লাইনে। যেই গ্যারেজে কাজ করতাম, সেই গ্যারেজ মালিকের কাছ থেকেও বিদায় নিলাম। গ্যারেজ লাইনে থাকা সব দোকানদারদের কাছ থেকেও বিদায় নিয়ে নন্দলাল আর আমি ভারত-বাংলাদেশ বর্ডার যাবার জন্য রওয়ানা দিলাম।

গেলাম বর্ডার সংলগ্ন এলাকায়। নন্দলালের পরিচিত দালাল।নন্দলালও এই দালালের মাধ্যমে ভারত থেকে বাংলাদেশ আসে। আবার বাংলাদেশ থেকে ভাততে যায়। ভারতীয় ২৬০০ টাকা ভাঙ্গানে হলো। বাংলাদেশি টাকা পেলাম মোটমাট ২৮০০ টাকা। সাথে যাওয়া নন্দলাল দালালকে বর্ডার পার করে দেওয়ার বিনিময় দিলেন ৯০০টাকা। বাদবাকি বাংলাদেশি ১৯০০ টাকা আমার কাছে বুঝিয়ে দিলেন। নন্দলাল দালালকে বলেন, আমি এখানে থাকতে থাকতেই তাকে বর্ডার পার করে দিন! দালাল বললেন, এখন পার করা হবে না, বর্ডার নিরাপদ নয়। রাতে পার করা হবে, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। এতক্ষণ পর্যন্ত দেরি করা যাবে না, তাই নন্দলাল আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। যেই নন্দলাল চলে গেলেন, তখনই দালালরা আমাকে ভয় দেখানো শুরু করে দিল। আমার কাছ থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে গেল। বলল, বি.এস.এফ যেকোনো সময় আসতে পারে। ব্যাগ সাথে থাকলে বিপদ হবে। আমার সাথে থাকা টাকাগুলো জোরপূর্বক কেড়ে নিয়ে, আমাকে একটা খালি ঘরে বন্দি করে রাখল। খাবার নেই, একটা বিড়িও নেই। আমি যেন এক কারাগারে বন্দি অবস্থায় আছি। সন্ধ্যার অনেক পর ঘরের দরজা খুলে আমাকে বলল, চলুন তাড়াতাড়ি! দশ মিনিটের মধ্যেই বর্ডার পার হতে হবে, না হয় মহাবিপদের সম্মুখীন হতে হবে। বললাম, আমার টাকা আর ব্যাগ কোথাও? বলল, সব আছে, তাড়াতাড়ি আসেন!

নিরুপায় হয়ে রাতের অন্ধকারে দালালদের সাথে হাঁটতে শুরু করলাম নির্জন গ্রামের ফসলি জমির উপর দিয়ে। প্রায় আধাঘণ্টা হাঁটার পর একটা বাড়ির পিছনে আমাকে বসতে বললেন, আমি বসলাম। ওরা আমার ব্যাগটা আমার সামনে রেখে বলল, আমরা এখন বাংলাদেশের ভেতরে আছি। এই বাড়িটা হলো বাংলাদেশি দালালের বাড়ি। আমরা বাড়ি থেকে দালালকে ডেকে আনছি, আপনি একটু অপেক্ষা করুন! এই বলেই ওরা বাড়ির পাশ দিয়ে কোথায় যে গেল, তা আর আমি জানি না। আমি বোকার মতন অনেকক্ষণ বসে রইলাম। কিন্তু কারোর কোন সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। তখনই আমার সন্দেহ হলো যে, ওরা আমাকে এখানে রেখে পালিয়েছে। সারাদিনের না খাওয়া ক্লান্ত শরীরে ব্যাগটা নিয়ে ভয়ে ভয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলাম। ডাক দিলাম, বাড়িতে কেউ আছেন? একজন মহিলা বের হলেন। পরপর ঘর থেকে আরও দুইজন পুরুষও বের হলেন। আমি বাড়ির উঠানে বসে আছি। একজন লোক আমার সামনে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোত্থেকে এলেন? খুলে বললাম সবকিছু, তাঁরা সকলে শুনলেন। অনুরোধ করলাম, আমাকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দিতে। কিন্তু ওরা পৌঁছে দেওয়ার বিনিময় চায়। যা চায় তা আমার কাছে নেই। আমার হাতে একটা ইন্ডিয়ান হাতঘড়ি ছিল। বললাম, বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে আমার হাতের ঘড়িটা আপনাদের দিয়ে দিব। এ ছাড়া আমার কাছে আর কিছুই নেই।

ওরা আমার ব্যাগ সহ সারা শরীর তল্লাশি করে কিছুই যখন পায়নি, তখন ওদের একটু মায়া মায়া ভাব হলো। আমাকে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল। ভাত নেই, একমুঠো চাল ভেজে সামনে এনে দিল। খেতে পারলাম না। এক গেলাস জল পান করে বসে রইলাম রাত পোহানোর আশায়। রাত শেষে সকাল হলো। ওরা আমাকে বাংলাদেশের বুড়িমারী স্থল বন্দর নিয়ে এলো। ওরা আমাকে বুড়িমারী একটা বাস কাউন্টার দিখিয়ে দিয়ে চলে গেল। বিনিময়ে আমার হাতের ঘড়িটা ওরা নিয়ে গেল। আমি ধীরেসুস্থে বাস কাউন্টারের ভেতরে প্রবেশ করলাম। বাস কাউন্টারে দায়িত্বে থাকা ম্যানেজার আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করল, আপনি কোথায় যাবেন? বললাম, দাদা আমিতো যাবো ঢাকা। তবে আমি দুর্ঘটনার শিকার! বললেন, কোথায় এবং কীভাবে? সবকিছু খুলে বললাম, ম্যানেজার সাহেব শুনলেন। আমাকে হোটেলে নিয়ে খাওয়ালেন। ঢাকা পর্যন্ত একটা সিট দিয়ে দিলেন। সাথে ১০০ টাকাও দিলেন। কনট্রাক্টরকে বলে দিলেন, রাস্তায় কিছু খাবার কিনে দিতে। গাড়ি ছাড়ল সন্ধ্যার সময়। ঢাকা গাবতলি পৌঁছলাম সকাল ৮ টায়। গাবতলি থেকে আসলাম সদরঘাট। লঞ্চে চড়ে গেলাম, আমার শ্বশুরবাড়ি । শ্বশুরবাড়িতেই আমার স্ত্রী আর ছেলেমেয়ে থাকত। যাওয়ার সময় ওদের জন্যও কিছু কিনে নিতে পারিনি, গেলাম খালি হাতে। তবুও আমাকে দেখে ওরা খুব খুশি। বলতে লাগলো, আমাদের বাবা এসেছে। অথচ আমি ভারত গেলাম কাজের আশায়, দেশে ফিরলাম নিঃস্ব হয়ে।