ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, সেলুলয়েড

oggatonama-nirob-blog

মানুষ কখনো কখনো তার নিজের সামাজিক আরোপিত মর্যাদার প্রচলিত কাতারের বাইরে গিয়ে বৃহৎ মানুষ হয়ে উঠে। এই নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা কেবল মানুষেরেই থাকে। ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তৌকির আহমেদ পরিচালিত বাংলাদেশী বাংলা ভাষার চলচ্চিত্র অজ্ঞাতনামার একটি দৃশ্যে উল্লেখিত সংলাপটি আমার মনে যথেষ্ট রকমের ছাঁপ ফেলে গেছে। চলচ্চিত্রের কাহিনীতে আমরা দেখতে পাই একজন প্রবাসী ও তার পরিবারের খুব সাদামাটা একটি গল্প।

অজ্ঞাতনামা শব্দের অর্থ হচ্ছে যার পরিচয় অজানা বা পরিচয়হীন। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ বিদেশে পাড়ি দেয় অনৈতিক পন্থায়। দালালদের খপ্পড়ে পড়ে সরল বাঙ্গালী তরুন বা যুবকটি যে স্বপ্ন নিয়ে ভিনদেশের পথে পাড়ি জমিয়েছিলো, সে স্বপ্ন বেশিরভাগ সময়েই থেকে যায় অধরা। নিজের নাম , পরিচয়ও কখনো গোপন করতে হয়। অজানা পরিচয়ের  আড়ালে লুকোতে গিয়ে তাদের গায়ে লেগে যায় অজ্ঞাতনামার অভিধা। একজন মানুষের সবচে বড়ো সম্বল তার স্বপ্ন। স্বপ্ন ছিনতাই হয়ে যাওয়া এই মানুষগুলোর গল্প চলচ্চিত্রের পর্দায় ফুঁটিয়ে তোলার কাজটি আগে কখনো এমন দারুনভাবে হয়েছে কিনা, আমার জানা নেই।

চলচ্চিত্রে আমরা দেখি, ফজলুর রহমান বাবুর ছেলে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার পর বেশকিছুদিন ধরেই তার সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। থানার ওসির কাছে খবর আসে আব্দুল হাকিম নামে একজন আজমান শহরে দুর্ঘটনায় মারা গেছে। খোঁজ নিয়ে দেখা যায় আবুল হায়াতের ছেলে ৩ দিন আগে মারা গেছে। কিন্তু আবুল হায়াত গতকালও তার ছেলের সাথে ফোনে যোগাযোগ করেছে!  সমস্যা টা হয় ঠিক তখন। পর্দায় আবির্ভাব ঘটে রমজান দালাল রূপী শহিদুজ্জামান সেলিমের। লাশের নাম আর পিতার নাম নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি হয়। ফজলুর রাহমান বাবু তার ভাতিজা ও রামজান দালাল কে সাথে নিয়ে লাশ আনার জন্য রওনা দেয় ঢাকায়।

oggyatnama

একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশ সংক্রান্ত জটিলতা এই চলচ্চিত্রের মূল আলোচ্য হলেও আমার মনে হয়েছে, এখানের কাহিনীর জমিনে আরো অনেক কাহিনী লুকিয়ে আছে। ওপেনিং শটে দেখতে পাই সবুজ তার দাদার সাথে বাজার থেকে ফিরছে। হাতে চড়কি। পথে একটি কবুতর মৃত পড়ে আছে রাস্তায়। সবুজ জানতে চাইছে, দাদা, মরলে কী হয়? মরলে কি উড়তে পারে? গান গাইতে পারে? মরলে উড়তে পারা কিংবা গান গাইতে পারা আর সবুজের হাতের কাগজের চড়কির ধীরলয়ে উড়তে থাকার সাথে আকাশের সাদা বিমানের উড়ে চলার একটা সহজ সমান্তরাল মিল খুঁজেতে চেয়েছেন পরিচালক। সাথে রেখেছেন পাখিটির কবর দেয়ার দৃশ্য। অনেকাংশে মনে হয়েছে, বাংলাদেশের মৃতপ্রায় শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বেহাল অবস্থার জানান দিতে চেয়েছেন তিনি।

কেফায়েত প্রামাণিকের ছেলে আছিরুদ্দিন প্রামাণিকের মৃত্যু পরবর্তী তার লাশ ফেরৎ আনার প্রহসনের দৃশ্যে আমার বারবার মনোযোগ কেড়েছেন কেফায়েত প্রামাণিক। ট্রাকে বসে থাকার পুরোটা সময় তার চোখের সেই দুর্বোধ্য দৃষ্টি আমাকে অবাক করেছে। একজন বাবার সেই দৃষ্টি যেনো বলতে চাইছিলো, এই ব্যবস্থা পাল্টানো দরকার। আছিরুদ্দিনদের এইরকম অজ্ঞাতনামার পরিচয়ে হারিয়ে যেতে দেয়া চলবে না।

একটি দৃশ্যে ভোর হতে দেখা যায়। নৌকায় লাশের কফিন। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে, আমার সোনাজাদুর মুখ, জগতের সবচে সুন্দর..আমার সোনাজাদুর ছোঁয়া, সবচে নরোম…। হতবিহব্বল বাবা হাতে ধরে আছেন কফিনের শরীর। ইঞ্জিনচালিত নৌকার শ্যালো মেশিন মাঝে মাঝেই কেশে উঠে ধোঁয়া ছাড়ছে। সেই ধোঁয়া যেনো একজন অসহায় বাবার কলজেপোড়া আগুনের উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছিলো প্রকৃতিতে।

কেফায়েত প্রামাণিকের নাতি সবুজকে আমরা দেখতে পাই পাড় ধ্বসে যাওয়া একটি অংশে কলাপাতার ঠোঙা দিয়ে বানানো নৌকা ভাসিয়েছে। সাধারণ অর্থে হয়তো একটি ছোট্ট শিশুর খেলায় দৃশ্যই মনে হবে। কিন্তু, আমার কাছে মনে হয়েছে, এই যে জীবনের অনিশ্চিত ও তথৈবচ অবস্থা, সেটাই হয়তো এঁকে দেখাতে চেয়েছেন নির্মাতা।

ছবির গল্পে চরিত্রের একটি পজেটিভ অর্থে অদ্ভূত মিশ্রণ এনেছেন পরিচালক। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পুত্রহারা পিতা কেফায়েত প্রামাণিক (ফজলুর রহমান বাবু), দালাল বা আদম পাচারকারী (শহীদুজ্জামান সেলিম), বিদেশে যেতে মরিয়া বিধবা (নিপুন) পুলিশ ( শতাব্দী ওয়াদুদ, মোশাররফ করিম)। ছিলেন আব্দুল হাকিমের বাবা (আবুল হায়াত)। চলচ্চিত্র ও নাটক দুই জগতের মানুষই আছেন লিষ্টে। তাদের সেরাটা দেয়ার চেষ্টাও তারা করেছেন।

আর্টফিল্মের ব্যাপারে একটি অভিযোগ সবসময়ই করে থাকেন দর্শক। দুর্বোধ্যতা ও যথেষ্ট এন্টারটেইনিং এলিমেন্ট এর অভাব। এই অভাব এখানে ছিলো না বললেই চলে। শহীদুজ্জামান সেলিম ও মোশারফ করিমের নিজেদের মাঝে কথার লড়াই, দালালের চরিত্র, পুলিশ মোশাররফ করিম সবাই উৎরে গেছেন যার যার জায়গাতে। সাবলিল ডায়গল সাধারণ শ্রেণীর দর্শককেও ধরে রাখতে পারবে বলে মনে হয়েছে।

আর্টফিল্মের ট্রাডিশন্যাল ধারা ( !!! ) অনুসরণ করার তাগিদেরই হয়তো স্বল্প বাজেটে চলচ্চিত্রটি তৈরীর চেষ্টা হয়েছে। এই বাজেটস্বল্পতা অনেক ক্ষেত্রেই চলচ্চিত্রের গতিকে ব্যহত করছে বলে মনে হয়েছে। চলচ্চিত্রের লোকেশন বাছাইয়ের ক্ষেত্রে পরিচালক মন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। দূরান্তের কোন চরগ্রামে দৃশ্যায়ন হওয়ার সুবাদে স্বাভাবিকভাবেই গ্রাম-বাংলার সহজাত রিফ্লেকশন ঘটেছে চলচ্চিত্রের সারাটা সময় ধরে। গ্রাম, এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া পায়েচলা পথ, ফসলী জমি, নদী, রাতের ঝুম বৃষ্টিতে পুলিশের নৌকা, গঞ্জের বাজার, মানুষ সবকিছুই সহজ করে তুলে ধরতে চেয়েছেন। কিন্তু, আমার মনে হয়েছে, সিনেমাটোগ্রাফিতে ব্যতিক্রমী কিছু দেখতে পাই নি।

ছবির দৈর্ঘ্য কম রাখার ব্যাপারটি প্রশংসার যোগ্য। কালার কারেকশান, সিন/শট ডিস্ট্রিবিউশন, ভিজুয়াল স্টোরিটেলিং সবকিছুতে অনেকাংশে খাপছাড়া ভাব ও ক্ষেত্রবিশেষ তাড়াহুড়ার ছাপ ছিলো। অপ্রয়োজনীয় দৈর্ঘ্যর দৃশ্য পীড়া দিয়েছে কখনো কখনো। লো কনট্রাস্ট কালার টোন, শব্দের আবহ বিষন্ণতা তৈরী করেছে পুরোটা চলচ্চিত্র জুড়েই। মনে হচ্ছিলো, জীবন এখানে শুধুই সমস্যায় জর্জরিত। স্বাভাবিক জীবনের প্রতিফলনের চেয়ে ইচ্ছাকৃত চেষ্টার বাড়াবাড়ি চোখে লেগেছে। এক্সিস ক্রসের মতো টেকনিক্যাল বৈসাদৃশ্যের উপস্থিতি দেখেছি। ডায়লগ এন্টারটেইনিং হলেও অহেতুক কৌতুককর করার চেষ্টা হয়েছে বলে মনে করছি।

টেলিফিল্ম আর ফিল্ম হয়ে ওঠার দ্বান্দ্বিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি তৌকির আহমেদ। বিষয়বৈচিত্রে ইমোশনাল ট্রিটমেন্ট থাকার কারণে সহজেই সিনেমা হিসেবে দর্শকের দৃষ্টিতে পার হয়ে গেলেও নিরপেক্ষভাবে ঠিক সিনেমার জায়গাতে কতোটা সফলতা পেয়েছে অজ্ঞাতনামা, সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যায়।

শেষের দিকের দৃশ্যে পিকআপে শহরের রাস্তায় লাশবাহী কফিনের বাড়িতে ফেরা। আদম ব্যাপারী, আংশিক অসৎ পুলিশ, কেফায়াত প্রামাণিক ও তার সহযাত্রী সবার চোখে বিষন্ণতার ছাঁপ দেখে বুঝতে পারি, আছিরুদ্দিন ভিনদেশ থেকে না ফিরলেও একজন মানুষ ফিরছে তার জন্য একটুকরো মাটির সন্ধানে।

সমাজের শ্রেণী-প্রথা, জাত-ধর্মের বিভেদ এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আগরবাতির কাঠি সুগন্ধ ছড়ায় অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির কফিনে। ক্রমশ ঝাপসা হতে থাকা নিয়নবাতির শহরে একজন সাধারণ কেফায়াত প্রামাণিক হয়ে ওঠেন পরিপূর্ণ একজন মানুষের মডেল। আদম পাচারের অজ্ঞাতনামা এক গল্প তখন হয়ে ওঠে চিরায়ত মানুষের মনোজাগতিক এক বয়ান।