ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

লেখায় তেমন গভীরতা নেই। সে যা লিখে তা তো উপন্যাস হয় না, সেটা অপন্যাস। তাছাড়া বাজারে লুঙ্গির চাইতে গামছা একটু বেশিই চলে। রিপিটেশন, শুধু রিপিটেশন।

কথাগুলো সবই হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে।

১৯ তারিখ রাতে হুমায়ূন আহমেদ এর মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পরপরই দেখলাম টিভি চ্যানেলগুলো টকশোয়ের আয়োজন করে ফেলেছে। অনেকেই সেদিন হুমায়ূন বন্দনা করেছে। কেউ কেউ হুমায়ূনের কথা বলতে গিয়ে নিজের ঢোল পেটাতে কার্পণ্য করেনি। সেদিন টকশোয়ে হুমায়ূন আহমেদের কথা বলতে বলতে জনৈক এক লেখক জানালেন যে হুমায়ূন আসলে একটা বয়সের, ওই বয়স পার হলে হুমায়ূন আর পড়া হয় না। তার কথা শুনে মনে হল, বিজ্ঞ পাঠকেরা কেবল তাদের, আর উঠতি বয়েসের কিশোর- কিশোরীরা কেবল হুমায়ুনের স্বস্তা লেখা পড়ে। আমি সে বিজ্ঞ লেখকের বেশ কিছু লেখা পড়েছি, সে বিষয়ে আজ কিছু বলব না। তবে শিশ্ন জাগানিয়া লেখা লিখে যারা জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটে হুমায়ূন তাদের জন্য বড় বিপত্তির কারণ ছিল।
গত বইমেলায় অন্যপ্রকাশের স্টল থেকে বহু কষ্টে ‘রঙপেন্সিল’ কিনে ভিড় ঠেলে বের হয়েছি। একটু ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে প্যাকেট খুলে দেখছি বইয়ের বান্ডিং ঠিক আছে কিনা। পাশেই দু’টা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল লক্ষ্য করিনি। আমার হাতে হুমায়ুনের বই দেখে নাঁক সিঁটকিয়ে একজন আরেকজনকে বলছে, ও হুমায়ুনের বই। ব্যাপক আনন্দ পেয়েছিলাম ওদের কথা শুনে। বয়স কত আর হবে ১৮-১৯, এত তাড়াতাড়ি সাহিত্যের সমঝদার পাঠক হয়ে উঠেছে আর জেনে ফেলেছে হুমায়ূনকে অস্বীকার করা মানেই বোদ্ধা পাঠক।

অনেকেই হুমায়ূনের সাথে ব্যাক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করছে। আমি সাহিত্যের অত বড় পাঠক নই, তাছাড়া আমার সাথে প্রথিতযশা কবি সাহিত্যিকের পরিচয়ও নেই। আমি কেবল বলতে পারি মধ্যবিত্ত ঘরের এক দরিদ্র পাঠক কীভাবে হুমায়ূনের লেখা, নাটক আর সিনেমায় আবিষ্ট হয়েছিল।

হুমায়ূনের লেখা তখনো আমার হাতে আসেনি। আমি কেবল জানতাম, ‘তুই রাজাকার’ সংলাপ, ডাক্তারের বোকামি, শালা দুলাভাইয়ের খুনসুটি আর রহিমার মা ও কাদেরের উদ্ভট কান্ডকারখানা দেখানো হয় টিভিতে। আমাদের বাসায় তখন টিভি নেই। অন্যের বাসায় যেতে হয় টিভি দেখতে। আমাদের পরিবারের মতো আরো অনেক পরিবারই আসে নির্দিষ্ট বাসায় টেলিভিশনে বহুব্রীহি দেখতে। একসাথে অনেকগুলো পরিবার সপ্তাহের নির্দিষ্ট সময়ে অপেক্ষা করি মামা, আনিস আর কাদেরকে দেখার জন্য।আমরা তখনই জানি টেলিভিশনে হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখানো হয়। আর হুমায়ূন আহমেদ মানেই দারুণ কিছু। বাকের ভাইয়ের কথা বললে কেবল রিপিটেশনই হবে, এ সম্পর্কে বহু লোক বহু জায়গায় বলেছে। নাটকের একটা চরিত্রের জন্য মানুষের যে ভালোবাসা, মুনার একাকিত্বের যে হাহাকার বাংলা নাটকের ইতিহাসে কখনো তা ঘটেনি, আর হয়তো ঘটবেও না। ‘কোথায় কেউ নেই’ নাটকের যে প্রভাব আমার মধ্যে পড়েছিল ছেলেবেলায়, আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করি বড় হয়েও সে গন্ডি থেকে আমি বের হতে পারিনি। বুয়েটে আমার যখন মন খারাপ থাকত, কম্পিউটারে চলত বহুব্রীহি, মামার সেই পাগলামো অনেকটাই মলমের মতো কাজ করতো। আর মাঝে মধ্যে দেখতাম ‘কোথায় কেউ নেই’ নাটকের শেষ দৃশ্যগুলো। ব্যক্তিগত মন ভালো না লাগাটা দূর হয়ে কেবল থাকত বাকের ভাইয়ের জন্য কষ্ট আর মুনার একাকিত্বের বেদনা।

ছোট মির্জার কথা মনে পড়ে কিংবা হানিফের খুক খুক কাশির শব্দ ‘অয়োময়’ নাটকের। নান্দাইলের ইউনুস, হঠাৎ একদিনের সেই মাস্টারের কথা, চিকন খেজুরের কাঁটা দিয়ে চোখ তোলা কিংবা ঘরে কেরসিন না থাকার বিরাট ইতিহাস আমার প্রায়ই মনে পড়ে। সপ্তাহের বিশেষ দিনে তিতলি ভাইয়া- কঙ্কা ভাইয়ার ডাক শুনার জন্য আমরা টেলিভিশনের সামনে জড়ো হতাম।

হুমায়ূনের নাম আমি শুনেছি নাটকের সৌজন্যে। বন্ধুরা কেউ কেউ বলেছে একআধটুকু। আমি একটা অক্ষরও পড়িনি স্কুল পাশের আগে।

কলেজে আমার এক বন্ধু ছিল হুমায়ূন ভক্ত। ও বাথরুমে বসে গল্পের বই পড়ত। আমার সে বন্ধুর সুবাদে আমার হাতে আসতে থাকে হুমায়ূনের বই। শার্টের ভেতরে লুকিয়ে লুকিয়ে গল্পের বই নিয়ে বাসায় ঢুকতাম। তার বেশির ভাগই হুমায়ূন, তার সাথে সুনীল, সমরেশ। শেষের কবিতা পড়েছি আরো অনেক পড়ে। হুমায়ূন পড়তে পড়তে আমি লক্ষ্য করলাম আমি জোৎস্না ভালোবাসি, বৃষ্টি পড়লে আমার ভিজতে ইচ্ছে করে। ‘ময়ূরাক্ষী’ পড়ে স্তব্দ হয়ে বসে রইলাম। ময়ূরাক্ষীর শেষ ক’টা লাইন এখনো আমার মুখস্ত, “আমাকে তো আর দশটা সাধারণ ছেলের মতো হলে চলবে না। আমাকে হতে হবে অসাধারণ। আমি সারাদিন হাঁটি। আমার পথ শেষ হয় না। গন্তব্যহীন যে যাত্রা তার কোন শেষ থাকার তো কথাও নয়।”

মিসির আলি বিষয়ক প্রথম বই পড়লাম ‘আমিই মিসির আলি’। হুমায়ূন পড়তে পড়তেই এক সময় গোর্কি, তলোস্তয়, দস্তোয়েভস্কি, তারাশঙ্কর, বিভুতিভূষণ। হুমায়ূনের লেখা পড়েই প্রথমে যেটা মনে হলো, লোকটা বেশ সহজ করে লেখে। বাক্যগুলো জড়িয়ে যায় না। পড়তে পড়তে খেই হারাতে হয় না। ‘নন্দিত নরকে’ পড়লাম অনেক পড়ে। ‘ওমেগা পয়েন্ট’ আমার পড়া প্রথম সায়েন্স ফিকশান। হুমায়ূনের এই লেখাগুলোকে অনেকেই সায়েন্স ফিকশান বলে মানতে নারাজ। আমি বলি সায়েন্স ফিকশানের সংজ্ঞা আমি জানি না, কিন্তু এগুলো বিজ্ঞানের খুব কাছের গল্প। যেমনটা ‘নন্দিত নরকে’, ‘তেতুল বনে জোছনা’, ‘আকাশ জোড়া মেঘ’, ‘বৃষ্টি ও মেঘমালা’, ‘ মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘ রূপার পালঙ্ক’, ‘ পেন্সিলে আঁকা পরী’, ‘ যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ’, ‘জয়জয়ন্তী’ , ‘চাঁদের অলোয় কয়েকজন যুবক’ আমাদের চারপাশের খুব কাছের গল্প।

‘জোৎস্না ও জননীর গল্প’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘মাতাল হাওয়া’, ‘অপেক্ষা’, ‘ এই সব দিন রাত্রি’ বাংলা সাহিত্যের এক অনবদ্য সৃষ্টি।

আত্মজীবনী লেখায় সে নতুন স্টাইলের জন্ম দিয়েছে। ‘আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই’, ‘কিছু শৈশব’, ‘কাঠপেন্সিল’, ‘বলপয়েন্ট’, ‘ফাউন্টেনপেন’, ‘রংপেন্সিল’ সবগুলোই সেন্স অফ হিউমারে পরিপূর্ণ আর সুখপাঠ্য।

হুমায়ূনের লেখা পড়তে পড়তে আমি সন্ধান পেলাম আহমেদ ছফার, সে আরেক মুগ্ধতার গল্প।

হুমায়ূনের সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘ আগুনের পরশমনি’ আর শ্রাবণ মেঘের দিন’ আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়েছে।

কালের গর্ভে কে টিকে থাকবে, কে হারিয়ে যাবে বিস্মৃতির অন্তরালে এর বিচার ভার সময়ের। অপন্যাস বলে যে বা যারা নাক সিঁটকেছেন, তাকে কিংবা তাদেরকে ক’জনা মনে রাখবে তার দায়দায়িত্বও সময়ের। আমি শুধু এটা বলতে পারি হুমায়ূন ছিল এক মুগ্ধতার আবেশ। বইয়ের কালো অক্ষরে কিংবা টিভি স্ক্রিণে হুমায়ূন আটকে রাখতো পাঠক আর দর্শককে। সে মুগ্ধতার অবসান ঘটল। চান্নি পসর রাতের জন্য যে হাহাকার সে জীবদ্দশায় করেছে প্রকৃতি তাকে তা দেয়নি। চাঁদহীন রাতেই তার প্রস্থান ঘটেছে। রাজনৈতিক ধ্বজাধারী লেখক অনেকেই আছেন। কিন্তু রাজনৈতিক লেবাস না পড়ে রাজনীতির কথা বলার লোক হুমায়ূনই ছিল। এসব কারণেই তাঁর জন্য আমাদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা।