ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

কিছু কথা সব সময়ই এক। কিছু চাহিদা সর্বদা একই পথ ধরে হাঁটে। দু’ টুকরো রুটির নিরাপত্তা আর শান্ত দাওয়ায় নির্বিঘ্ন বিশ্রামের আশাতেই মানুষের সমাজবদ্ধ হওয়া, রাষ্ট্র গঠন। পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষ দ্বারা মানুষ যতটা ক্ষতিগ্রস্ত অন্য কোন পশু প্রাণির দ্বারা কখনোই নয়। মানুষের অবাধ স্বাধীনতার পথে মানুষই বড় বাধা। পৃথিবীর নোংরামি বুঝতে হলে তাই সবচাইতে আগে বুঝতে হবে মানুষ। হেলাল হাফিজের লাইন দু’টো প্রায়ই উচ্চারিত হয়-

“নিউট্রন বোমা বোঝ
মানুষ বোঝ না!”
(অশ্লীল সভ্যতা, হেলাল হাফিজ)

ভাবতে ভালোই লাগে পৃথিবীর দেশে দেশে এত আইন, শৃঙ্খলিত বাহিনী, বন্দীশালা কেবলমাত্র মানুষের জন্য। পানশালার চাইতেও বন্দীশালার পরিমান ঢের অধিক। সমাজবদ্ধতার প্রথম ধাপেই মানুষের কাছে চলে এসেছে ক্ষমতা আর স্বার্থচরিতার্থের জিয়ন কাঠি যা আজ অবধি সে যত্নে লালন করছে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে। ভালো মন্দ, ভালোবাসা ঘৃণা, প্রেম পশুত্ব, অর্থ মনুষত্ব এসবের দ্বন্দ মানুষ যুগে যুগে নিজের প্রয়োজনেই সৃষ্টি করেছে আর সমাজবদ্ধতায় এনেছে বিভক্তি। মানুষ তার প্রয়োজনেই তৈরী করেছে ভালমন্দের মাপকাঠি আর নিজের প্রয়োজনকে অলঙ্কায়িত করেছে নানান বিশেষণে। রুটির প্রয়োজনের পেছনে হাটতে হাটতে মানুষ সন্ধান করেছে নিজস্ব মনোরঞ্জনের নানাবিধ খেলনা। আর তাকেই সে নাম দিয়েছে শিল্প, সাহিত্যসহ বিভিন্ন উপনামে। রফিক আজাদের ক্ষুধা ও শিল্প কবিতার মতো তার কাছে গোলাপের পরিবর্তে রুটি আর সব্জির গন্ধ বারবার ফিরে আসে।

“একাকী তদন্ত সেরে ফিরে এলো
আমার কুকুর;
বললো সে, ‘প্রভু,
মানুষ আসলে ফুল পছন্দ করে না; তার চেয়ে
রুটি ও সব্জির গন্ধ ওরা বেশি ভালোবাসে! তবু
‘গোলাপ, গোলাপ’ কান্না করা ওদের স্বভাব,
একজন গোলাপসুন্দরী একঘন্টাব্যাপি শুধু
এই কথা আমাকে বোঝালো।”
(ক্ষুধা ও শিল্প, রফিক আজাদ)

একতাবদ্ধ থাকার জন্য যে রাষ্ট্রের জন্ম, নিজস্ব স্বকীয়তার জন্য পৃথিবীতে যে বিভক্তি, আন্দোলন, রক্তপাত, সীমাহীন নৈরাজ্য সে রাষ্ট্র কি তাকে কখনোই কাঙ্খিত আবাসন দিতে পেরেছে? বিশুদ্ধ রাষ্ট্র চিন্তা, কিংবা সমাজ ব্যবস্থা মানুষের পক্ষে আজ অবধি তৈরী করা সম্ভব হয়নি। গণতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, সমাজতন্ত্রের মতো যত ব্যবস্থা মানুষ প্রয়োগ করেছে সমাজব্যবস্থায় তার সবগুলোই নিজস্ব দোষে দুষ্ট হয়েছে। মানুষ তত্ত্বকথা চিন্তা করেছে, রাষ্ট্র তা প্রয়োগ করেছে জনসাধারণের উপর। আর তার ফলোশ্রুতিতে শানকির ভাত মাটিতে ছড়িয়েছে, রাস্তায় রক্ত ঝরেছে, সম্ভ্রম ধুলোয় লুটিয়েছে। পশুর মতোই আশ্রয়ের খোঁজে মানুষকে তাই রাষ্ট্রের গন্ডি ছেড়ে এক সময় বেরিয়ে পড়তে হয়েছে। কাঙ্খিত আবাসন ছেড়ে তাকে জীবন রক্ষার জন্য ছুটতে হয়েছে।

“দু টুকরো রুটি কিংবা লাল শানকি ভরা
এবং নক্ষত্রকুচির মতন কিছু লবনে কনা
দিগন্ত শান্ত দাওয়ায় আমাকে চাওনি তুমি দিতে
তাই এই দীর্ঘ পরবাস।
জীবনকে শ্বাপদসংকুল করে তুলেছো
এবং আমার প্রতি পদক্ষেপের ওপর
তোমাদের তাক- করা বন্দুকের নল।
ঝোপে ঝাড়ে সরীসৃপের মতন বুকে
নিরাপদ নিভৃত কুটির খুঁজতে হয়েছে আমাকে
তাই এই দীর্ঘ পরবাস।”
(তাই এই দীর্ঘ পরবাস, শহীদ কাদরী)
বাঘের তাড়া খাওয়া হরিণের নিজস্ব আবাসন ছেড়ে দিগ্বিদিকশুণ্য ছুটে যাওয়া, নতুন বনে তার মনোভাব সবটা আমরা জানতে না পারলেও মানুষ বরাবরই তার পরবাসের আর্তনাদ জানিয়েছে শহীদ কাদরীর মতোই-

“কোন নির্বাসনই কাম্য নয় আর-
কাম্য নয়
কাম্য নয় আর-”
(কোন নির্বাসনই কাম্য নয় আর, শহীদ কাদরী)

রাষ্ট্রের এমন দুরাবস্থা আমরা মানুষেরা, সাধারণ মানুষেরা যাদের সামান্য আহারের চিন্তা, স্বাভাবিক কাম আর নিরাপদ নিদ্রার নিশ্চয়তাতেই যারা তৃপ্ত তারা কখনোই চাইনি। বিশেষ করে শামসুর রাহমানের মতো করে অন্তত বলতে চাইনি-

“এই এক সময়,যখন কেউ কারো সামনে সহজে
মুখ খুলতে চায় না।বন্ধুতার সাজ পরে বস্তুত
ক’জনে আততায়ীর অব্যর্থ আঙ্গিক
ভেতরে লুকিয়ে রেখে চারপাশে আনাগোনা করে,তার হিসেব
মেলাতে গিয়ে বারবার-
ভুল হয়ে যায় ।এই এক সময়,কেউ কারো, আস্থাভাজন নয়।”
(এই এক সময়, শামসুর রাহমান)

আমরা, সাধারনেরা, যাদেরকে পৃথিবীর ইতিহাস মনে রাখেনি, রাখেনা, রাখবে না, বারবার প্রশ্ন করেছি এমন একটা নষ্ট পৃথিবী, সামাজিক ব্যবস্থা কি আমাদের কাম্য ছিল? কার দোষে, কাদের আকাঙ্ক্ষার চাপে আমাদের মুখের কথাগুলো উচ্চস্বরে ঝংকারিত না হয়ে থেমে গেল। আমরা এর উত্তর পেয়েছি- মানুষ। দ্বিপদী, আমাদেরই মতো। পৃথিবীর ইতিহাস তাদের মনে রেখেছে, রাখবে বহুকাল। তারা পরাক্রমশালী বাঘের মতো আর আমরা হরিণ শাবকের মতো কেবলি পালিয়ে বেড়িয়েছি রাজপথ থেকে, নিজস্ব আবাসন থেকে, আলিঙ্গন থেকে আর ইতিহাসের পাতা থেকে। আমরা তাই অনায়েসেই বুঝতে শিখেছি রাজপথের মিছিলে, বন্দুকের নলে, অশ্রু ফোঁটায় যে রাষ্ট্রের শিখা জ্বলে উঠেছে তাতে আমরা কেবলি পতঙ্গ হয়ে আছি মৃর্ত্যুতে শিখার তেজ পরখ করার জন্য।

“এতো বড় রঙ্গ যাদু
এতো বড় রঙ্গ!
নিজেই আগুন জ্বেলে
আবার
নিজেই হই পতঙ্গ!”
(রঙ্গ, প্রেমেন্দ্র মিত্র)

বাঁচবার জন্যে যে একতাবদ্ধের স্বপ্ন দেখা, এর বিভক্তিতে আশাহত অনেকেই সমর সেনের মতো মৃর্ত্যুতে পরস্পরের মিতালির স্বপ্ন দেখে।

“মৃর্ত্যু হয়ত মিতালি আনে
ভবলীলা সাঙ্গ হলে সবাই সমান
বিহারের হিন্দু আর নোয়াখালির মুসলমান
নোয়াখালির হিন্দু আর বিহারের মুসলমান।”
( জন্মদিন, সমর সেন)

মৃর্ত্যু কিন্তু মানুষের ভেদাভেদ দূর করে না। যদি তাই হতো তাহলে কারো কবরে চাঁটাইয়ের বেড়া আর কারো শ্বেত পাথরে ঘেরা থাকত না। কিংবা কারো মৃতদেহ পথে জৈব সার আর কারো শব যাত্রায় লাখো মানুষের ঢল আর পৃথিবীময় তার প্রচার ঘটতো না।

বিশুদ্ধ ভালোবাসার মতো তাই বিশুদ্ধ কোন রাষ্ট্র নেই মানুষের জন্য। নিজের তাগিদেই তাকে দাঁড়াতে হবে, পায়ের আঙ্গুলে ভর করে উচ্চতা বাড়াতে হবে। ঠিক একদিন দিগ্বিদিক পালাবে ডোরাকাটা বাঘ।

“আমি আবার বললাম, ঐ দ্যাখো হরিণ শাবকের তাড়া খেয়ে
দিশেহারা ডোরাকাটা বাঘগুলো
দিগ্বিদিক
পালাচ্ছে ছুটে।
তুমি ম্লান হেসে বললে, ‘এমন সুদিন কখনো কি আসবে?’
(বিব্রত সংলাপ, শহীদ কাদরী)