ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

মাজিম উদ্দিন সাহেবের দুই ছেলে। দুই ভাই হলেও এদের স্বভার চরিত্র বিপরীতমুখী। আজ বাড়িতে বাচ্চাকাচ্চা গিজগিজ করছে। এরা তার নাতি নাতনি। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন হয়েছে। অল্প বয়সেই সব ক’টা মেয়েকে বিয়ে দিতে পেরে মাজিম উদ্দিন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। একথা মনে করে মাজিম উদ্দিন মনের সুখে নিজের অজান্তেই সাদা পাকা দাঁড়িতে হাত বুলায়। মেয়েরা বাপের বাড়ি এসেছে। এদের আবার বিচিত্র স্বভাব, অকারণে সারাক্ষণ ছাগলের মতো পান চিবায়। কোন মেয়ের সাদা দাঁত দেখবার উপায় নাই, মুখ লাল করে সবক’টা মাঝ ঘরে গালগপ্পে মশগুল। দুই ছেলেই আজ বাড়িতে। ছোটটাকে ছেলেপুলে ঘিরে ধরেছে; দুইটা কাঁধে চড়েছে; আরেকটা কোলে ওঠার জন্যে হাত বাড়িয়ে আছে, আরেকজন ‘মামা গান গাও’ বলে চিৎকার করছে। পোলাপানগুলারে ধমক দিলেই পালিয়ে যায়; কিন্তু তার ছোট ছেলে বলদ চরিত্রের। ধমকা ধমকির মধ্যে সে নাই, মনে হচ্ছে সেও মজা পাচ্ছে। মাজিম উদ্দিন ধমক দিতে গিয়েও থেমে যায়, কারণ বাচ্চাগুলোকে সে নিজেও খুব পছন্দ করে। মাজিম উদ্দিনের বড় ছেলে তার রুমে দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছে। তার এই ছেলে রাশভারি প্রকৃতির, ছেলেপুলে তার কাছে খুব একটা যায় না। তার কানের কাছে ট্রানজিস্টার।

আমার মামার একখানা রেডিও ছিল। রেডিওর গায়ে আবার সুন্দর একটা কভার থাকত। মামা যখন রাজশাহীতে থাকতো তখন কিশোরগঞ্জ গেলে মনের সুখে আমি সেটা নিজের কাছে রাখতে পারতাম। কিন্তু মামার বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি থাকলে সে যখন বাড়িতে থাকত তখন নানাবাড়ি গেলে সেটা নিয়ে নাড়াচাড়া করা যেত না। কারণ মামা সারাক্ষণ রেডিও নিজের কাছে রাখতো, তাছাড়া আমরা ভাইবোনেরা বড় মামাকে খুব ভয় পেতাম। সহজে তার কাছে ঘেঁসতাম না। অন্যদের চেয়ে আমি বোধ হয় তার কাছে একটু বেশি যেতাম; সেকারণেই রেডিও ধরতে না পারলেও মামার রুমে গিয়ে শুনতে পারতাম। বেশিরভাগ সময়ই মামা রেডিওর ভলিউম খুব কমিয়ে রাখতো, বোধ করি নানার ভয়ে। তখন আমাদের গ্রামের মতোই কিশোরগঞ্জের অধিকাংশ গ্রামে কারেন্ট ছিল না। রাত নেমে এলে কুপি বাতির আলোয় মামার রুমে যেতাম রেডিও শুনার জন্যে। তখন আমাদের গ্রামে বোধ হয় কারো টিভি ছিল না, নানা বাড়ি এলাকায় অনুমানিক দু’মাইল দূরে এক বাড়িতে টিভি ছিল। আমরা তখন গাজীপুরে থাকি, স্কুল ছুটি হলেই কিশোরগঞ্জ চলে যাই। বড় মামা না থাকলে রেডিও নিয়ে ঘুরে বেড়াই, আর কোন বার বড় মামাকে পেয়ে গেলে রেডিওর দিকে মন খারাপ করে তৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়ে থাকি।

আমাদের গাজীপুরের বাসায় কবে প্রথম ট্রানজিস্টারের আগমন ঘটেছে সে সন তারিখ সঠিক আমার মনে নাই। তবে সেটা ঘটেছিল ছোট মামার কল্যাণে। আমাদের বাসায় তখন টিভি নাই, আমরা তখন সরকারী কোয়ার্টারে থাকি। এলাকার অনেক বাসাতেই তখন টিভি প্রবেশ করেনি। ধীরে ধীরে কিছু লোকজন সাদা কালো টেলিভিশন কিনতে শুরু করলো। ১৯৯৪ সালে আমার ছোট বোনের জন্মের কিছুদিন পরেই বোধ হয় বাবা হঠাৎ একদিন রেডিও হাতে হাজির হলো। সকালে বাবা অফিসে চলে গেলে রেডিও চলতে থাকতো তার ফিরে আসার আগ পর্যন্ত যতক্ষণ বাসায় থাকতাম। বাংলাদেশ বেতারে কখন কোন অনুষ্ঠাণ হবে আমি মুখস্থ রাখতাম। স্কুল থেকে ফিরে বাসায় পড়তে বসলেও পড়ার টেবিলে অল্প ভলিউমে চলতো রেডিও। ঢাকা-ক, ঢাকা-খ, ঢাকা-গ থেকে প্রচারিত হতো অনুরোধের আসর গানের ঢালি, মানিক চান্দের কিসসা, সিনেমার বিজ্ঞাপণ, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক নাটিকা, দূর্বার, ছায়াছবির গানের অনুষ্ঠাণ। এই ছিনেমার বিজ্ঞাপণের অনুষ্ঠানটা প্রথমে দশ মিনিট করে হতো, পরে তা সংক্ষিপ্ত করে পাঁচ মিনিট করা হয়। এই অনুষ্ঠাণের সুবাদে ঢাকায় কবে কোন সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে, কোনটার নায়ক নায়িকা কে, সিনেমার কাহিনীর ষাট শতাংশ আমার মুখস্থ থাকতো। এছাড়াও ঢাকা বেতার ও খুলনা বেতার কেন্দ্র থেকে খুব সুন্দর নাটক প্রচারিত হতো। দুপুর দু’টা থেকে তিনটা পর্যন্ত বিভিন্ন প্রোডাক্টের সৌজন্যে প্রচারিত হতো গানের অনুষ্ঠান, ১৫ থেকে ২০ মিনিট স্থায়ী হতো এক একটি অনুষ্ঠান, যতদূর মনে পড়ে নামগুলো ছিল কোন একটা প্রোডাক্টের নাম দিয়ে অমুক সঙ্গীতমালা টাইপের। মানিক চান্দের কিসসা হতো সন্ধ্যার দিকে মানে যখন পড়তে বসার সময়। বহু সাধনা করতে হতো সেটা শুনার জন্যে, বাবা বাসায় না থাকলে শুনতে পারতাম আর বাসায় উপস্থিত থাকলে কেবলই মন খারাপ করে বই নিয়ে পড়ার টেবিলে বসে থাকা। বাবা শুনতো বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকার খবর আর রাতে ঘুমানোর সময় লো-ভলিউমে চালু থাকতো রেডিও। এখনও মনে পড়ে সেই স্মরণীয় মূহুর্ত, বাংলাদেশ- কেনিয়ার আই সি সি ক্রিকেট খেলা সরাসরি রেডিও ধারাভাষ্যে মালেশিয়ার কোয়ালালামপুর থেকে ১৩ এপ্রিল ১৯৯৭ সালে বাঙালিকে আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে দিল। রেডিওতে বাংলাদেশের জয় শুনে রাস্তায় রাস্তায় লাল, নীল রং নিয়ে বেরিয়ে পড়লো ছেলেপেলে। এর মধ্যে বাসায় টিভি চলে এসেছে আর আমার ছোট বোনটাও জিনিসপত্র ছোড়াছুড়ির মজা বুঝে গেছে। ইতিমধ্যে সে দু’বার রেডিও আছাড় দিয়ে এর পেটের নাড়িভুড়ি এক প্রকার নাড়িয়ে দিয়েছে। বাবা দু’বার সারিয়ে আনলেন, কিন্তু এর পরেরবার আর শেষ রক্ষা হলো না।

এর অনেক বছর পর, মানুষের ঘরে রঙ্গীণ টিভি চলে এসেছে। মেয়েরা হিন্দি সিরিয়াল আর স্টার জলসার মেকআপ আর শাশুড়ি বউয়ের চুলাচুলি দেখা শুরু করে দিয়েছে, আমরা বোম্বের নায়ক নায়িকাদের আপন করে নিয়েছি, রেডিওর আবেদন আর মানুষের মধ্যে নেই। বহুদিন পর বুয়েটে আমার রুমমেট তানভীর ভাইয়ের কাছে দেখতে পেলাম রেডিও। তিনি অবশ্য বিবিসি শুনার কাজেই সেটা ব্যবহার করতেন। তানভীর ভাইয়ের রেডিওর একটা অদ্ভুত রোগ ছিল, আমরা কিছুতেই ওটার চ্যানেল ঠিক করতে পারতাম না, কিন্তু উনি চড়থাপ্পড় মেরে ঠিক বিবিসি ধরে ফেলতেন। তানভীর ভাইয়ের সাথে শুনা হতো বিবিসির রাতের খবর। পাশের রুমের সুমিত ভাইয়ের একটা রেডিও ছিল। সুমিত ভাই হলো আমাদের ডঃ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি রেডিওতে জার্মান বেতার শুনতেন। অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলি, সুমিতভাইকে ভাষাবিদ বলার কারণ, সুমিত ভাই একবার ঠাকুর মার ঝুলি কিনে এনেছিলেন সেটার জার্মান অনুবাদ করবেন বলে। আহমদ ছফা ‘ফাউস্ট’ অনুবাদ করে জার্মান সাহিত্যকে বাংলায় পরিচিত করেছিল আর সুমিত ভাইয়ের হাত ধরে ঠাকুর মার রূপকথা বাংলা থেকে জার্মান যেতে পারতো। পরে অবশ্য তিনি সেটা সম্পন্ন করেছিলেন কিনা জানা যায় নি, আমি তার কাছ থেকে ‘ঠাকুর মার ঝুলি’ নিয়ে বুড়ো বয়সে ভালো আনন্দ পেয়েছি।

১৯৩৯ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের অল ইন্ডিয়া রেডিওর সম্প্রচারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বেতার কার্যক্রমের যাত্রা শুরু (তখন অবশ্য সেটা বাংলাদেশ ছিল না)। পরে ১৯৬২ সালে সেটা স্থানান্তরিত হয় শাহবাগে। আর একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অবদানের কথা না বললে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে, চরমপত্র, উদ্দীপনামূলক আর গোবিন্দ হালদারের সেই সব গভীর দেশাত্মবোধক গান শুনিয়ে মানুষকে সাহস যুগিয়েছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। বাংলাদেশের মানুষের কাছে যে যন্ত্রটা তাদের বিপদের দিনে সবচেয়ে প্রিয় ও আপন ছিল তার প্রথমটা হলো মিলিটারী বদের জন্যে রাইফেল আর উদ্দীপিত হতে, দেশের খবর জানতে ট্রানজিস্টার মানে রেডিও। এই যে স্বাধীনতার সিনেমা মাত্রই একটা কমন জিনিস দেখানো হয়, মানুষের অতি কষ্টে রেডিওতে চড়থাপ্পড় মেরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠাণ শুনার দূর্বার প্রচেষ্টা, এটা আসলে সেই অনিশ্চিত সময়ের সামান্যই প্রতিফলন। ১৯৮৩ সালের ৩০শে জুন জাতীয় সম্প্রচার কেন্দ্র শেরে বাংলা নগর স্থানান্তরিত হওয়ার পর শাহবাগের ভবনটি বেতারের প্রধান কার্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।

২০০৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারী এফ এম রেডিও “ রেডিও টুডের (এফ এম ৮৯.৬)” যাত্রা শুরু হয়। এফ এম রেডিও এখন বেশ জনপ্রিয়। নতুন নতুন ছেলে মেয়ে, নতুন শিল্পী, কলাকুশলী মূলত ইয়াং জেনারেশন দিয়ে সম্প্রচারিত এফ এম তাই ইয়াং আর টিনএজদের মঝে জনপ্রিয়তা লাভ করে সহজেই। কিন্তু ততদিনে প্রযুক্তি হয়ে গেছে সহজলভ্য। মোবাইলে, গাড়িতে বাজছে এফ এম এর গান আর বেতারের অনুষ্ঠান। যে যন্ত্রটা এক সময়ে মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, উৎকণ্ঠার সঙ্গী ছিল সেটা চলে গেল আড়ালে। বেতার সম্প্রচার শুনতে এখন আর আলাদাভাবে রেডিও কিনতে হয়না। তাই সময়ের তাগিদেই তাকে চলে যেতে হল লোকচক্ষুর অন্তরালে, দৃষ্টির বাইরে, কখনো ডাস্টবিনে। নষ্ট বলে আমার বাসা থেকেও তাকে স্থানান্তরিত করা হয়েছে ডাস্টবিনে আমার এক সময়ের প্রিয় যন্ত্র- ট্রানজিস্টারকে।