ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

তথাকথিত ধর্মীয় উগ্রপন্থী সংগঠনটি দিন দিন আমাদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশের সর্বক্ষেত্রে অলিখিত নিষিদ্ধ এই সংগঠনটি এখন মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দাড়িয়েছে। আমি মনে করি সরকারের এই সব বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। নিতে হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। তা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, যদিও এখনি লেজেগোবরে অবস্থা বিদ্যমান। এই সব কালো কেউটের দল, সামাজিক, রাজনৈতিক, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন জায়গাতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড। সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল কে টাকার বিনিময়ে ব্যবহার করে এই দেশের মানুষের মাঝে বিভিন্ন ধরনের প্রপাগান্ডা চালিয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে মগ্ন হয়েছে যা ইতিমধ্যে আপনারা খেয়াল করে দেখেছেন।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করার পর যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন জামায়াতে ইসলামী এবং যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক সংগঠন ছাত্রশিবির রাজনৈতিক তত্পরতার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক তত্পরতা শুরু করে। যার নেতৃত্বে শুধু মাত্র জামাত-শিবিরের নেতৃবৃন্দ নয়, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের লোকদেরই বসানোর চেষ্টা করা হয়। আর এই পথ ধরেই দেশের অন্যতম কবি ফররুখ আহমেদ, অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, অধ্যাপক ড. কাজী দীন মুহাম্মদ, কবি আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসান, আল মুজাহিদী, হাসান আলিম, অভিনেতা ওবায়দুল হক সরকার, আরিফুল হক, এক সময়ের আলোচিত চিত্রনায়ক আবুল কাসেম মিঠুনসহ শতাধিক কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিককে তাদের করে নিয়েছে।

যাকে যেভাবে সম্ভব, তাকে সেভাবেই দলে ভিড়িয়েছে জামাত-শিবির। কাউকে ধর্মের কথানুযায়ী বেহেশতের লালসায় ফেলে, কাউকে পৃথিবীর প্রাচুর্য দিয়ে আবার কাউকে নাম-খ্যাতি দেওয়ার মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কবি আল মাহমুদকে যে মাধ্যমটিতে তারা তাদের করে নিয়েছেন, সে মাধ্যমটির কথা। আর তা হলো টাকা। কেননা, একটা সময় কবি আল মাহমুদ শিল্পকলা একাডেমীর পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। ঠিক তখনই কবির পরিবারে নেমে আসে দারিদ্র্র্যের কষাঘাত। আর সে সময় কবিকে আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে নিজেদের করে নেয় জামাতিরা। তখন থেকেই কবি আল মাহমুদ ছাত্রশিবিরের মুখপত্র নতুন কিশোর কণ্ঠ, জামাতের সাহিত্যভিত্তিক মুখপত্র নতুন কলম, রাজনৈতিক মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম, সাপ্তাহিক সোনার বাংলাসহ অর্ধশতাধিক যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সমর্থক ছাত্রশিবিরের পত্রিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত হোন।

কবি আল মাহমুদ কে বিনিময়ে গুলশানে ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে দেয় ঐতিহাসিক রাজাকার-ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা ও জামাতের অন্যতম প্রধান মিডিয়া দিগন্ত টিভির প্রধান রাজাকার মীর কাশেম আলী। পাশাপাশি কবি আল মাহমুদ জামাত-শিবিরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, জামাত-শিবিরের পত্রিকায় লেখা দেওয়াসহ তাদের পক্ষে কাজ করার জন্য একটা মাসিক ভাতা পেতে থাকেন। এত এত সুযোগ কবি আল মাহমুদ যখন জামাত-শিবির থেকে পেলেন। তখন কবি আল মাহমুদ বেমালুম ভুলে গেলেন যে, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, ভুলে গেলেন তার হাত ধরে গণকণ্ঠ পত্রিকায় উঠে এসেছিল স্বাধীনতার কথা, তিনি ভুলে গেলেন যে তিনি ‘কাবিলের বোন’ নামক চমত্কার একটি স্বাধীনতার সপক্ষের গ্রন্থ লিখেছিলেন। আরও ভুলে গেলেন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ এই দেশে জামাত-শিবির শুধুই যুদ্ধাপরাধী চক্র।

রাজনৈতিক অঙ্গনে কষ্টের জাল বোনার পাশাপাশি বাংলা ও বাঙালির হাজার বছরের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও অন্ধকারের জাল বুনছে যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন জামায়াতে ইসলামী ও যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকগোষ্ঠী ছাত্রশিবির। সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক কালো হাতের আঁচড়ে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে আমাদের সাহিত্য, আমাদের সাংস্কৃতিক দেহ। সরাসরি বললে বলতে হয়, জামায়াতে ইসলামী আর শিবিরের দৌরাত্ত এখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, আজিজুল হক কলেজ আর বরিশাল বি এম কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে চলে এসেছে পুরানা পল্টনের দিগন্ত টিভি পর্যন্ত। এখানেই তাদের পরবর্তী টার্গেট সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এই আগ্রাসনে মদদ দিতে এগিয়ে আসছেন অনেক স্বাধীনতা-স্বাধিকারের পক্ষের লোকও। কেউ জেনে, কেউ না জেনে।

দেশের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত যে কাগজটিতে লেখেননি, সেটি হলো দৈনিক নয়া দিগন্ত। অথচ এই কাগজে অহরহই লিখছেন স্বাধীনতা-স্বাধিকারের পক্ষের লোক হিসেবে পরিচিত অনেকেই। এমনকি জাতীয় কবিতা পরিষদের মূল উদ্দেশ্য যেখানে দেশবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাস্তবায়নের জন্য লেখালেখি করা, সেখানে এই সংগঠনের বর্তমান সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক দু-একশ টাকার কাছে বিক্রি হয়ে লিখে চলেছেন অবিরাম। সুযোগে সদ্ব্যবহার করছে আলী আজম থেকে রাতারাতি আবিদ আজম, জাকির হোসেন থেকে রাতারাতি জাকির আবু জাফর বনে যাওয়া জামাত-শিবিরের গৃহপালিত এই তথাকথিত কবি-ছড়াকারেরা। যাদের লেখা আজ অবধি পায়নি কোনো সাহিত্যমান।

এইবার আসুন দেখে নেওয়া যাক, জামাত-শিবিরের সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন গুলো কী কী
সারা দেশে চার শতাধিক সংগঠন রয়েছে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত ও তাদের সমর্থক ছাত্রশিবিরের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্কে। এর মধ্যে হাতেগোনা দু-চারটির অনুমোদন থাকলেও অধিকাংশই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ সংস্কৃতিকেন্দ্রর অঙ্গসংগঠন হিসেবে। আর বাংলাদেশ সংস্কৃতি কেন্দ্র হলো জামায়াতে-ইসলামীর সহযোগী সংগঠন। এই সব সংগঠনের নামে ভিবিন্ন সময় ভিবিন্ন ভাবে কথা বলে মানুষ কে ধোকা দিয়ে যাচ্ছে জামাতিরা। সংগঠন গুলো হলো, সিএনসি, বাংলা সাহিত্য পরিষদ, স্বদেশ সাংস্কৃতিক পরিষদ, উত্সঙ্গ, সৃজন চিন্তন, মৃত্তিকা একাডেমী, প্রতিভা ফাউন্ডেশন, শহীদ মালেক ফাউন্ডেশন, কিশোর কণ্ঠ ফাউন্ডেশন, সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী, বিপরিত উচ্চারণ, পল্টন সাহিত্য পরিষদ, ফররুখ পরিষদ, চত্বর সাহিত্য পরিষদ, কিশোর কলম সাহিত্য পরিষদ, ফুলকুঁড়ি সাহিত্য পরিষদ, নতুন কলম সাহিত্য পরিষদ, আল হেরা সাহিত্য পরিষদ, মাস্তুল সাহিত্য সংসদ, সম্মিলিত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংসদ, স্পন্দন সাহিত্য পরিষদ, রেলগাছ সাহিত্য পরিষদ, কবি সংসদ বাংলাদেশ, কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ সাহিত্য সংসদ, কানামাছি সাহিত্য পরিষদ, অনুশীলন সাহিত্য পরিষদ, শীলন সাহিত্য একাডেমী, পারফর্মিং আর্ট সেন্টার, সংগ্রাম সাহিত্য পরিষদ, উচ্ছ্বাস সাহিত্য সংসদ, ইসলামী সাহিত্য পরিষদ, দাবানল একাডেমী, মওদুদী রিসার্চ সংসদসহ পাঁচ শতাধিক সংগঠন রয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে ।

এইসব তথাকথিত সংগঠনের মূল লক্ষ্য হলো সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে বেছে বেছে বরেণ্য সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের নিজেদের দলে ভেড়ানোর পাশাপাশি তরুণ সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক কর্মীদেরও দলে ভেড়ানো। যাতে করে সারা দেশে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ব্যানার ঝুলিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন জামায়াত-শিবিরের কাজ করতে পারে। সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জামাত-শিবিরের এই যে আগ্রাসন। তাতে আমাদের দেশ ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের দিকে।

শুধু সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনেরই নয়। জামায়াত-শিবির এগিয়ে আসছে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক অসংখ্য পত্রিকার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশনা শিল্পেও। বাংলাবাজার, মগবাজার, শাহবাগসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এসব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গুলো। এই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকাশ করে জামাত-শিবিরের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বইয়ের পাশাপাশি দেশের খ্যাতিমানদের বই, যাতে করে দলে ভেড়ানো যায় এসব খ্যাতিমান সাহিত্যিককে। যেখান থেকে প্রতিবছর আমাদের সময়ের আলোচিত লেখকদের বই প্রকাশিত হয়। সিদ্দিকীয়া পাবলিকেশন্স, আধুনিক প্রকাশনী, প্রীতি প্রকাশন, কিশোর কণ্ঠ প্রকাশনী, ফুলকুঁড়ি প্রকাশনী, মিজান পাবলিকেশন্স, ইষ্টিকুটুম, আল্পনা প্রকাশনী, গণিত ফাউন্ডেশন, মদিনা পাবলিকেশন্স, প্রফেসর’স, কারেন্ট নিউজ, সাজ প্রকাশন, সৌরভ, সাহিত্যকাল, নবাঙ্কুর, সাহিত্যশিল্প, শিল্প কোণ, আযান, অনুশীলন, ফুলকলি, দিগন্ত, পাঞ্জেরী, আল কোরআন প্রকাশনী গুলোতে এই সব অপকর্ম গুলো হয়ে থাকে।

সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ইসলামি সাইনবোর্ড লাগানোর জন্য ইসলামী ব্যাংক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিজ্ঞাপন, স্পনসর দেওয়ার পাশাপাশি জামাত-শিবিরের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন তাদের জাকাত ফান্ড থেকে এককালীন টাকা দিয়ে থাকে প্রতিবছর। যে কারণে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের মতো মিলনায়তনে অনুষ্ঠান করার সামর্থ্য তাদের রয়েছে।

আর এইজন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সরকারের উদাসীনতা দেখে আমি হতাশ। যেমন বিশ্বকাপ ক্রিকেট এর একটি আয়োজনের সময় যখন রাজধানীর বুকে দেখা যায় ইসলামী ব্যাংকের বড় বড় বিল বোর্ড তখন কী করে বলি সরকার এই বিষয় গুলো জানে না ? আমি তো মনে করি সরকারের কেউ না কেউ আর্থিক সুবিধা ভোগ করে জামাতীদের এইসব সুযোগ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে।

তাই সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি, অবস্থা বেগতিক হয়ে দাড়িয়েছে, আমাদের দেশকে যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামী ও যুদ্ধাপরাধী সমর্থকগোষ্ঠী ছাত্রশিবিরের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে না পারলে অচিরেই সারা দেশে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে, যা আমাদের কারোই কাম্য নয়। অতএব স্বাধীনতার সপক্ষের সরকার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারকে এখনই সচেতন হতে হবে ও কোনও বিলম্ভ না করে এখনই তাদের কর্মকাণ্ড রুখে দিতে হবে।

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন ধরনের পত্র পত্রিকা ও তাদের ওয়েবসাইট।

@সুলতান মির্জা