ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

ঢাকা শহর এর যানজট নাগরিক জীবনে নতুন কোনও ব্যাধি নয়। যত দিন যাচ্ছে ততটা তীব্রতর হচ্ছে যানজটের ধারাবাহিকতা। নগর বাসী ও নীরবে সয়ে যাচ্ছে যানজট সংক্রামন এর অত্যাচার। এ যেন দেখার কেউ নেই। বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ, রাস্তাঘাট ভাঙ্গাসহ নানা কর্মকাণ্ড প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করায় যানজট বেড়ে গেছে এবং ক্রমশ এটি বাড়তেই থাকবে। আর এ অবস্থার পরিত্রাণের লক্ষ্যে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। যদিও এই ক্ষেত্রে আমি বিশ্বাস করি ফ্লাইওভার নির্মাণ যানজট নিরসনে খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে না। যানজট নিরসনে দরকার ছিল মূল রাস্তার পরিসর বাড়ানো, কিন্তু সেই সুযোগ মনে হয় আমাদের আর হবে না। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে ঢাকা শহরে প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে যেকোনো শ্রেণীর নতুন নতুন গাড়ি, অথচ এর বিপরিতে এক ইঞ্চি রাস্তা ও বৃদ্ধি পাচ্ছে না।

আমি মনে করি আধুনিক ঢাকার এই দুরাবস্থার নাম যানজট না, এটাকে প্রাইভেট গাড়ীর জট বলাই অধিকতর শ্রেয়। ভেবে দেখুন আমাদের পরিস্থিতিটা কী, ৪০ ফুট লম্বা একটি পাবলিক বাসে আমরা চলাফেরা করি কম বেশি মিলিয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ। তারপর ও খুব চাপাচাপি করে। আবার ১৩ থেকে ১৫ ফুট লম্বা একটি প্রাইভেট গাড়িতে চলাচল করে সর্বোচ্চ ৪ জন মানুষ। এই ৪০ ফুট পর্যন্ত লম্বা একটি বাসের পরিধি হতে সর্বোচ্চ ৩ টি প্রাইভেট গাড়ি যথেষ্ঠ। তাহলে ফলাফল কী দাড়ায় ? ৩ টি প্রাইভেট গাড়ির মোট যাত্রী হলো ১২ জন, আর এর সমপরিমাণ একটি লম্বা পাবলিক বাসের যাত্রী সংখ্যা হলো ৫০ থেকে ৬০ জন। আর তাই খুব সহজেই পরিসংখ্যন হয়ে যায় এই যানজটের মূল হলো প্রাইভেট এর সংখ্যা বৃদ্ধি।

একটি পরিসংখ্যান দেখুন
২০০৩ সালে যেখানে ঢাকা শহরে সর্বমোট রেজিস্টার যানবাহন ছিল ৩০৩২১৫ টি
২০১১ সালের জুন পর্যন্ত সেখানে ঢাকা শহরে সর্বমোট যানবাহনের সংখ্যা এসে দাড়ায় ৬৪৩০০৩ টি।

এর মধ্যে দেখুন পাবলিক বাসের চিত্র কতটুকু দুর্বল হয়ে পড়েছে
২০১১ সালের জুন পর্যন্ত (বর্তমানে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে হিসেব নেই) শুধু ঢাকা শহরে প্রাইভেটকার-১৭৪১২২টি,জিপ,মাইক্রোবাস-৬৮৩০২টি ও ট্যাক্সির সংখ্যা-১০৬৮২টি চলাচল করছে।
আর একই সময়ে যাত্রীবাহী পাবলিক বাস-৯১১১টি ও মিনিবাস-৮৫১৫টি চলাচল করছে।

সুত্র: বিআরটি

মোটকথা পাবলিক বাসের এই চিত্র বলে দেয় ঢাকা শহরের যানজটের জন্য কোনও ভাবেই সাধারণ জনগণের বাহন পাবলিক বাস দ্বায়ী নয়। অথচ এই পাবলিক বাস দিয়ে নগরে যাতায়াত করে প্রায় ৯০% মানুষ। কিন্তু অবাক হই যাদের চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করতে গিয়ে ঢাকা শহরের ৯০% যাতায়াতের ক্ষেত্রে মানুষকে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে তারা আর কেউ নয় তারা হলো প্রাইভেট আরোহী। যেহেতু নগরের সকল জনগণ প্রাইভেট সুবিধার অন্তর্ভুক্ত নয় তাই প্রস্তাবনা থাকলো এ অবস্থা দ্রুত সমাধানে প্রাইভেট গাড়ী নিয়ন্ত্রণের কোন বিকল্প নেই।

প্রাইভেট গাড়ী নিয়ন্ত্রণ এর প্রস্তাবনা নিম্নরূপ:

* ঢাকার সকল রাস্তায় কঠোরভাবে গাড়ী পার্কিং নিষিদ্ধ সংক্রান্ত বিধান বাস্তবায়ন জরুরী
* ব্যস্ত রাস্তায় প্রাইভেট গাড়ী প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা জরুরী
* মার্কেটগুলোর সামনে প্রাইভেট গাড়ী পার্কিং বা গাড়ী থামানো নিষিদ্ধ করা জরুরী
* যত্রতত্র ইউটার্ন নিষিদ্ধ করা জরুরী
* এক পরিবারের একটির বেশি প্রাইভেট গাড়ি নিষিদ্ধ করা জরুরী
* প্রাইভেট গাড়ির মালিক দের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে আশা যাওয়ার জন্য প্রাইভেট গাড়ি নিষিদ্ধ করা জরুরী।

পাবলিক বাস এর জন্য প্রস্তাবনা:
* স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পাবলিক বাসের ব্যবহার নিশ্চিত করা
* বাস মলিকগণ রুট পারমিট অনুসারে বাস রাস্তায় নামাচ্ছে কি না তা মনিটরিং করা
* বাস মালিকরা রাস্তায় গাড়ী কম নামিয়ে যাতে সংকট সৃষ্টি না করতে পারে এ বিষয়ে সতর্কমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা
* আন্ত:জেলা বাস টার্মিনাল ঢাকা বাহিরে স্থানান্তর করা
* ঢাকা শহরে শুধু মাত্র নিদৃষ্ট সংখ্যক পাবলিক পরিবহন ব্যপক হারে চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

পথচারীদের যাতায়াত প্রস্তাবনা
* নির্দিষ্ট স্থান দিয়ে পথচারীদের যাতায়াতে উত্সাহিত করতে সকল রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং অংকন নিশ্চিত করা।
* পথচারীদের ফুটওভার ব্রিজের ব্যবহার সম্মন্ধে উত্সাহিত করা, যদি আইন লঙ্গন করে তাহলে প্রয়োজনে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানার বিধান করা।

সিএনজির জন্য প্রস্তাবনা
* সিএনজির মিটারে সকল স্থানে চলাচল নিশ্চিত করতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা

রিকশার জন্য প্রস্তাবনা
* জনবহুল রাস্তায় রিক্সা চলাচলের জন্য বিধি নিষেধ আরোপ করা
* রিক্সা গুলোর জন্য দাঁড়ানোর স্থান নিশ্চিত করা
* সারিবদ্ধভাবে রিক্সা চলাচলের বিষয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করা
* যে রাস্তায় রিক্সা চলাচল করবে সেই সব রাস্তায় অন্য যানবাহন নিষিদ্ধ করা

উক্ত প্রস্তাবনা গুলো বিবেচনার মাধ্যমে এক কোটির জনসংখ্যার এই নগরীর যানজট যে পুরোপুরি শেষ হবে আমি তা বলছি না তবে আমি মনে করি যানজট কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আসবে। বলার অপেক্ষা রাখে না ঢাকা শহরের যানজট ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব। সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার এই সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষের যাতায়াতের দূর্ভোগ বৃদ্ধির পাশপাশি বাড়ছে যাতায়াত খরচ এবং অন্যান্য সমস্যা। তাই এখনই পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে এর দ্বায়ভার এড়ানোর সুযোগ সরকারের হাতে থাকবে না।

অতএব, উক্ত বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিনীত আবেদন জানাচ্ছি।

@ সুলতান মির্জা