ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

ক্রমশ ভারী হচ্ছে বড় আর ছোটর শ্রেণীবিন্যাস। জানি না, এর শেষ কোথায় ? ঈদ আনন্দ ইসলাম ধর্মের একটি ধর্মীয় উত্সব। ধনী-গরিবের অনাবিল আনন্দের একটি উত্সব। অথচ এই ঈদের আনন্দের মধ্যে ধনী-গরিবের স্পষ্ট ব্যবধান লক্ষণীয় একটি বিষয় আমাদের চলমান সমাজে। কেউ একটি জামার জন্য ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে না, আবার কেউ সোনাক্ষী জামা গায়ে দিয়ে ঈদের আনন্দ লুটে নেয়। কেউ নিজের বাড়ির ঈদের মাঠে একটি লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পড়ে ঈদের নামায পড়তে পারে না, আবার কেউ দামী পাঞ্জাবি-স্যুট পড়ে ঈদের নামায পড়তে চলে যায় লণ্ডন বা ব্যাংককে। কেউ ঈদের আগে বেতন বোনাস পায় না আবার কেউ বেতন বোনাসের টাকা পরিশোধ না করে লাখ টাকায় গরু ক্রয় করে কুরবানী দিয়ে নিজের আভিজাত্য ফুটিয়ে তোলে নিজের পরিবার ও পরিজনের কাছে। এই হলো ঈদের আনন্দ। ঈদের পরের অংশ বেড়ানোর কথা না হয় বাদ দিলাম।

 

তবে বছরের বিশেষ এই দিনটির তাৎপর্য একজন বড়লোকের চেয়ে গরিবের কাছে অনেক বেশি বলে আমি বিশ্বাস করি। একজন গরিবের ঘরে ঈদের গুরুত্ব অপরিসীম এক কেজি সেমাই, এক কেজি চিনি, ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের কে সাধ্যের মধ্যে কিছু জামা কাপড় কিনে দেওয়া, পকেট খরচের জন্য কিছু বাড়তি টাকা হাতে রাখা এ যেন এক কল্পনাবিলাসী সুখের মত। অথচ এই সুখ টুকু উপভোগ করতে গরিবের অবস্থা হয়ে উঠে নাভিশ্বাস । কিন্তু কিছু করার থাকে না ঈদ বলে কথা। অন্য আর দশ জনের মত খানিকটা হলেও তো কিছু না কিছু করতে হবে। কোনও রকমে ঈদের আনন্দ শেষ হলে পড়ে বাড়ে নিজের দুর্ভোগ। এই হল গরিবের ঈদের আনন্দ।

আর বড় লোকের ঈদ তো হয় প্রতিদিন। এ আর নতুন কী ? লেটেস্ট মডেলের জামা কাপড়, যেমন হলো আব্বু, এইবার কিন্তু আমাকে ৫৫ হাজার টাকার লেহেঙ্গাটা কিনে দিতে হবে। আবার কুরবানির গরুটা যেন হয় সব চেয়ে বড়, না হলে মান সম্মানের প্রসন পড়শীর কাছে মুখ দেখাব কেমন করে ? বাবা-মা ছেলে-মেয়ের এইসব আব্দার চুম্বকের গতিতে পূরণ করে দেয়। আর খাওয়া দাওয়ার বিষয় সে তো আপনারাই বলতে পারবেন কতটুকু হয়।

যে কথা বলার জন্য এই লেখা, ঈদের আগের দিন সাধারণ একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের হাহাকার যদি এমন হয়, যে ঈদের আগে বোনাস তো দূরে থাক মূল বেতনই পায়নি। তখন সেই গার্মেন্টস কর্মীর ঈদের আনন্দ কেমন হতে পারে ? অথচ সেই গার্মেন্টস এর মালিক এইবার ঈদ করতে গেছেন কানাডাতে। তখন এটা কেমন লাগবে ? বুঝুন আমাদের শ্রেণী বৈষম্য কোথায় গিয়ে দাড়িয়েছে।

প্রাসঙ্গিক বলছি গাজিপুয়ের একটি সোয়েটার কারখানার কথা, দিগন্ত সোয়েটার ফ্যাক্টরী নাম শুনে থাকবেন হয়তো বা যেখানে কাজ করে প্রায় ত্রিশ হাজারের মত শ্রমিক, এই ঈদে তাদের বোনাস তো দূরের কথা মূল পায় পর্যন্ত হয়নি। ঈদের দুই দিন আগে তারা পায় বোনাসের জন্য বিক্ষোভ করেছে, কিন্তু তাদের কোনও কথা মালিক পক্ষের কান পর্যন্ত যায়নি। অবশেষে বৃহস্পতিবার দিন বিকেল বেলা তারা আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, পায় বোনাসের জন্য প্রথমে রাস্তা অবরোধ করে,প্রায় ৫০ টির মত গাড়ি ভাংচুর করে। প্রশাসন বা মালিক পক্ষের কোনও লোকজন তাদের কথায় কর্ণপাত করেনি। তারপর এই ত্রিশ হাজার শ্রমিক মিছিল করে কারখানায় দিকে এগিয়ে যায়, কারখানার কিছু ভাংচুর করে কিন্তু কে শুনে কার কথা, মালিক পক্ষ পুলিশের সহযোগিতা নেয়, পুলিশ আসে কিন্তু মালিক পক্ষের এক কথা খুব লসে আছি কোনও ভাবেই বোনাস দিতে পারছি না। গাজীপুরে গার্মেন্টে অগ্নিসংযোগ, আহত শতাধিক, ভাঙচুর

এই ত্রিশ হাজার শ্রমিকের দীর্ঘশ্বাস আনন্দ কী হবে তা বুঝে নিতে পারেন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই সোয়েটার কারখানার মালিকের দীর্ঘশ্বাস এর আনন্দ কী থেমে থাকবে ? উনাদের গরু ক্রয় করা কী থেমে থাকবে ? থেমে থাকবে না, কিন্তু যাদের ঈদের আনন্দ থেমে থাকবে তারা হলো এই নিরীহ ত্রিশ হাজার শ্রমিক, যারা চিন্তা করেছিল বেতন বোনাস নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মা-বাবা ভাই, বোনদের সাথে মিলিমিসে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করবে।

যদিও বলতে দ্বিধা নেই এই চিত্র শুধু দিগন্ত সোয়েটার কারখানার চিত্র, এই চিত্র সারাদেশের অবহেলিত শ্রমিকের চিত্র, এই চিত্র নিরীহ গরীব শ্রেণীর মানুষের চিত্র। যা দেখার ও শোনার কেউ নেই, কারণ এরা যে ছোটোলোকের জাত, এদের আবার কিসের ঈদ ? এদের ঈদ বলতে কিছু আছে নাকি ?

আমি খুব লজ্জিত হই যখন শুনি, যে অমুক গার্মেন্টস এর কর্মচারীরা বেতন-বোনাস এর দাবিতে রাস্তা অবরোধ করে রেখেছে হাতে রয়েছে মাত্র দুই দিন কী একদিন তারপর হবে ঈদ তখন কেমন লাগে বলুন ?তখন কী খোঁজ নিয়ে জানতে ইচ্ছা করে না যে গার্মেন্টস মালিক কী ঈদের বাজার সদাই করেছিল কিনা ? না করে থাকলে কিছু টাকা দিয়ে আসতাম।

পরিশেষে বলতে চাই, আসুন আমরা ঈদের আগে আমাদের দারিদ্র্য পড়শীর খোঁজ নেই। সে কী ঈদের বাজার সদাই করেছে কিনা ? সবাই মিলে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করি এক সাথে। মূল্যায়ন করি তাদের দীর্ঘশ্বাস কে, যেন ভুলে না যাই যাদের ও মানুষ তাদের ও রয়েছে আনন্দের অধিকার।

সবাইকে ধন্যবাদ।
আর
বিডি ব্লগের সম্মানিত ব্লগার ও পাঠকদের সকলকে জানাচ্ছি ঈদের অগ্রিম শুভেচ্ছা সকলকে ঈদ মোবারক।
@সুলতান মির্জা।

ছবি সুত্র: গাবতলির গরুর বাজার।