ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

খালেদার ইন্ডিয়া সফর যখন শুরু হয়েছিল তখন থেকেই আলোচনা সমালোচনা কেউ বলছে আগামীতে খালেদার ক্ষমতায় যাওয়া নিশ্চিত করতে এই সফর, আবার কেউ বলছে সারা জীবন ভারত বিরোধী মনোভাব পোষণ করে এখন খালেদার এই সফরের প্রসঙ্গে নয়াদিল্লি কতটুকু আশ্বস্ত হবে, আবার কেউ বলছে হায় হায় ,খালেদা এইটা কী করল ?

আমি খালেদার এই সফর নিয়ে মোটেই হতাশ হইনি। কিছুটা তাজ্জব হয়েছি মাত্র পাকিস্তান প্রেমী খালেদা জিয়া হটাত্‍ করে ভারত প্রেমী হয়েছে দেখে। কেন না, ২০০১ সালের নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে খালেদার ভারত সফরে খালেদা ইন্ডিয়া কে আশ্বস্ত করতে পেরেছিল, যে বিএনপি যদি ক্ষমতায় ফিরে আসে তাহলে ইন্ডিয়াকে গ্যাস দিবে বাংলাদেশ। যদিও বিএনপি ফিরে এসে দশ ট্রাক অস্ত্র দিতে চেয়েছিল ইন্ডিয়াকে।

বলতে দ্বিধা নেই, আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইন্ডিয়ার মতামত বহি:বিশ্বে বেশ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। আমার জানা নেই খালেদা ইন্ডিয়া সফর শেষে হাতে করে কী নিয়ে এসেছেন, তবে গতকালকে খালেদার উপদেষ্ঠা পরিষদের এক সাবেক মন্ত্রীর জনসংযোগ দেখে তাই মনে হয়েছে যে আগামীতে বিএনপির ক্ষমতা নিশ্চিত করতে খালেদা ইন্ডিয়া সফর করতে গিয়েছেন এবং ইন্ডিয়া গ্রিন সিংগ্যাল দিয়ে দিয়েছে। অর্থ্যাত আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় ফিরছে। তাই কোনও চিন্তা নেই। কে কোন ফ্যাক্টরী দেখা শোনা করবে, তা ঠিক করে আমাকে জানাও, খেয়াল রেখো হাসিনা সরকারের পতন হয়ে যাচ্ছে, তাই পরের কাজ গুলো এখনি শেষ কর। এই বক্তব্য গুলো বিএনপির ৯১ শাসনামলের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আধ্যাপক মান্নান সাহেবের। যার বিরুদ্ধে ৯১ শাসনামলে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ হিসেবে রয়েছে, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ত্বে থাকার সময়ে হজের হাজীদের কাছ থেকে টাকা আত্তসাধের, কোনাবাড়ীতে এক বিধবা মহিলার কাছ থেকে জোরপূর্বক ভুয়া দলিলের মাধ্যমে তিন বিঘা জমি আত্ত্বসাধের, যেখানে ক্ষমতার পরবর্তীতে গড়ে তোলা হয়েছে কোনাবাড়ী প্লাজা নামের এক বহুতল সুপার মার্কেট। এমন আরও অনেক দুর্নীতির অভিযোগ। যাইহোক, পাঠক মান্নান নিয়ে আর বলতে চাই না, আমার বিএনপি ভাইয়েরা বলবেন এইগুলো সব ষড়যন্ত্র। বলছি বেগম খালেদা জিয়া নিয়ে

বিএনপি-জামাত নেতাকর্মীরা যেন সেই বদনাম থেকে বের হয়ে আসতে পারে তাই কিছু খালেদার বহুবচন মনে রাখা জরুরী –

* “বর্তমান সরকার দেশের যা কিছু আছে সবই তলে তলে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে। সরকার দেশের ও দেশের মানুষের পক্ষে কথা বলছে না। সরকার অন্য দেশের হয়ে কাজ করছে। কাজেই বর্তমান সরকার যতদিন ক্ষমতায় থাকবে ততই দেশের ক্ষতি হবে। দেশের সর্বনাশ হবে।” [জনকণ্ঠ, ১২.১২.১১]

* “এ সরকার ভারতীয়দের সরকার। তাদের কথামতো দেশ পরিচালনা করছে। সীমান্তে প্রতিনিয়ত মানুষ হত্যা করে। বিএসএফ এ দেশের জায়গা-জমি দখল করে কিন্তু এ সরকার প্রতিবাদ করে না।” [জনকণ্ঠ ২৭.১১.১১]

* এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি সুস্পষ্টভাবে দুটি বিষয় তুলে ধরেছেন-

১. “স্বাধীনতার পর তারা ভারতের সঙ্গে ২৫ বছরের গোলামি চুক্তি করেছিল। তখন পুরোপুরি এ চুক্তি বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তাই এখন ক্ষমতায় এসে এ চুক্তি বাস্তবায়ন করছে।”

২. “তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা না দিলে ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট, করিডরসহ সব ধরনের ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ করে দেয়ার আহ্বান জানান।” [জনকণ্ঠ ২৮.২.১২]

* পল্টনের এক সমাবেশে এর আগে বলেছিলেন বাংলাদেশের বুকের ভেতর দিয়ে ট্রানজিটের কোন গাড়ি চলতে দেয়া হবে না, হবে না। বাংলাদেশকে পুরোপুরি ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করেছে এই সরকার। প্রধানমন্ত্রী ভারতে গিয়ে দেশ বন্ধক দিয়ে এসেছেন।” [ইত্তেফাক ৮.১১.১০]

* ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে সাভারে দেযা বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন এখন থেকে মসজিদে মসজিদে উলুধ্বনি হবে। অর্থাৎ ভারত জোর করে সব মুসলমানকে হিন্দু বানাবে।

* ১৯৯৬ সালের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি হলে বলেছিলেন, ফেনী থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত সব ভারতের অধীনে চলে যাবে।

শুধু তাই নয়, দেখুন একটু ফ্যাশব্যাক দিয়ে কী সুন্দর দেখা গিয়েছিল সেই সময়কার কিছু গঠনা

আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ তে ক্ষমতায় এসে যখন আলোচিত পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদিত করলো, তারপরে খালেদা জিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসঙ্গহতি সমিতির সাথে বিশাল একটা লংমার্চ করেন এবং সেই লংমার্চে চট্টগ্রাম রোড-কাঁচপুরে বাধা দিয়ে আলোচনায় চলে আসেন সাংসদ শামীম ওসমান। সেই লংমার্চের মুল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলোঃ পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য অঞ্চলসহ ফেনী ভারতের অধীনের চলে যাবে। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন তখন ফেনী-১ আসনের এম পি। না ফেনী এখোনো বাংলাদেশের সাথেই আছে কিংবা বাংলাদেশের কোনো মসজিদ এখনো মন্দির হয়ে যায়নি; বিপরীতদিকে উলুধ্বনির পরিমান বাস্তবেই অনেক কমে গেছে। তারপরে বি এন পি ২০০১ এ ক্ষমতায় এসে উলফা-দশ ট্রাক অস্ত্র-এসব কি ছিলো? জানার আগ্রহ পোষণ করছি। কেন না, বিএনপি নেত্রী বরাবর অভিযোগ করে আসছেন, আওয়ামীলীগ ভারতের দালাল, শেখ হাসিনা বাংলাদেশ নয় ভারতের নেত্রী।

এমন কী, বিএনপির গত ১২ জুনের তথাকথিত মহাহমাবেশে বিএনপি-জামাত সহ আঠারো দলীয় নেতারা প্রকাশ্যেই বলেছিল, তিলক ওয়ালী ভারতের মুখ্যমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কে আমরা আর ক্ষমতায় দেখতে চাই না, এই নির্মম সত্যি কথাটা বলেছিলেন শফিউল আলম প্রধান, যদিও পরে হুজুগের কারণে আবার খালেদার নাম বদলিয়ে হাসিনার নাম বলতে হয়েছিল শফিউল আলম প্রধানের। অর্থ্যাত এই তথাকথিত আঠারো দলের মূল স্লোগান ছিল ভারত বিরোধী।

এখন কথা হচ্ছে, যে খালেদা জিয়া তার ইন্ডিয়া সফর শুরু করেছিলেন ইন্ডিয়ার সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল বিজেপি এবং হিন্দুত্ববাদী নেত্রী সুষমা স্বরাজের সাথে বৈঠক দিয়ে। সেখানে এই সফর বাস্তবিক অর্থে কতটুকু বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় সাধিত হয়েছে তা ভেবে দেখতে হবে। কেন নয়, ইন্ডিয়া সফর যদি হয় ভগবান পরিবর্তনের হিসেব সরূপ তাহলে বলতে হচ্ছে, খালেদার দেশ প্রেম নিয়ে আমি শংকিত। নিছক ক্ষমতায় যেতে হবে যেকোনো মূল্যে এই যদি হয় খালেদার মনোবাসনা তাহলে আর ভোটে অংশ নিয়ে লাভ কী ? তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দরকার কী ? কখনও লন্ডনে, কখনও বেইজিংগে, কখনো দিল্লিতে আবার জাপানেও যেতে চেয়েছিলেন- সবুজ সংকেত সময় মতো না আসায় যাওয়া হয়নি। চীনা নেতাদের কাছে খালেদা দুঃখ প্রকাশ করেছেন খালেদা। বলেছেন, তার শাসনকালে ঢাকায় তাইওয়ানের ট্রেড মিশন চালু করতে দেয়ার সিদ্ধান্ত ছিল ভুল। ভারতের কাছে তো এক প্রকার পিঠ পেতে দিয়েছেন খালেদা, বলেছেন ভারতের বিরুদ্ধে কোনও জঙ্গি তত্পরতা মেনে নিবে না তার আগামী সরকার।

বুঝলাম অনেক আয়োজন, অনেক প্রচেষ্টা আগামীতে ক্ষমতায় যেতে হবে যেকোনো মূল্যে। বলতে দ্বিধা নেই আমার মতে তাতে সমস্যার কী আছে ? জনগণ যদি ভোট দেয় তাহলে ক্ষমতায় যাবে, যদি ভোট না দেয় তাহলে ক্ষমতায় যাবে কী করে ? ভগবান বদল করে ?

পরিশেষে বলতে চাই, মানুষের চরিত্রের বহি:প্রকাশ ঘটে তার কর্মে, দেশ প্রেম এর বহি:প্রকাশ ঘটে তার দেশের মঙ্গলে মঙ্গল ময় কাজের মাধ্যমে, এপারের নালিশ ওই পাড়ে দিয়ে, একজনের বদনাম আরেকজনের কাছে দিয়ে যদি চারিত্রিক সার্টিফিকেট পাওয়া যেত তাহলে এই দেশে অনেক বরেণ্য ব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতো। তাই বলছি, আগের দেশের স্বার্থ রক্ষা করুন, তারপরে ভগবান বদল করুন।

@সুলতান মির্জা।