ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বে পশ্চিমা দেশ গুলো কে যারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলাফেরা করছে ইরান তাদের মধ্যে অন্যতম। আমি মনে করি ইরানের সেই সামর্থ্য হয়ে গেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর নানা বাধা ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সৃষ্টিশীলতার মন্ত্রে উজ্জীবিত ইরানী জাতি এবং বিশেষ করে এর যুবপ্রজন্ম বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসহ অন্য অনেক ক্ষেত্রে অসাধারণ অনেক সাফল্য অর্জন করেছে। ইরান বিষয়ে আমার আগ্রহ অনেক দিনের। ইরান নিয়ে গত বেশ কয়েক দিন অনেক আমি যা জেনেছি তা শেয়ার করলাম । ইরানের মুসলিম জাতির সেসব সাফল্যের কিছু কথা জানানোর জন্যই আমার এই পোস্ট ।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে পরমাণু প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যাধুনিক ও জটিল প্রযুক্তি। ইরানী বিজ্ঞানীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অত্যন্ত জরুরি এ ক্ষেত্রে দর্শনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন। বিভিন্ন ধরনের দূরারোগ্য ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় উপাদান সমৃদ্ধ কিছু ওষুধ উৎপাদন শুরু হয়েছে ইরানে। ইসলামী বিপ্লবের ৩২তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ইরানী কর্মকর্তারা এইসব ওষুধ উৎপাদনের কথা জানিয়েছেন। যেমন, যকৃত বা কলিজার ক্যান্সার প্রতিরোধের ওষুধ ক্রোমিয়াম ফসফেট পি-৩২, ব্রেন টিউমার চিকিৎসার ওষুধ থেরাপি আয়োডিন-১২৫, প্রোস্টেট, ফুসফুস ও স্তনের টিউমার চিকিৎসার ওষুধ ব্রোম্বজিন গ্যালিয়ুম -৬৮ এবং জেনারেটর স্ট্রানসিউম ৯০/ইট্রিয়াম -৯০ ইত্যাদি। ইরান বিজ্ঞান গবেষণার জন্য খুবই জরুরি হিসেবে বিবেচিত পারমাণবিক গলনযন্ত্র বা “আইআর- আইইসিএফ”ও নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে এ ধরনের যন্ত্র নির্মাণে সক্ষম বিশ্বের ৬টি দেশের ক্লাবে শরীক হল ইরান। অর্থাৎ এক্ষেত্রে বিশ্বে ইরানের অবস্থান ষষ্ঠ। অন্য যে ৫টি দেশের এ প্রযুক্তি রয়েছে সে দেশগুলোর নাম যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্স। গত ২০০৫ সাল থেকে ইউরোপে ঔষধ তৈরির জন্যে এ পর্যন্ত পাঁচ লাখ লিটার ইরানী প্লাজমা ইউরোপে প্রেরণ করা হয়েছে। তবে দেশের প্রয়োজনীয় ইন্ট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবোলিনের চাহিদা ইরানী প্লাজমা থেকেই উৎপাদিত হচ্ছে।দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সুরক্ষাসহ আরো অনেক দুরারোগ্য সমস্যার ক্ষেত্রে এই আই ভি আই জি ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে সারা বিশ্বে দুই কোটি সত্তুর লক্ষ লিটার প্লাজমা উৎপাদিত হয়। এর মধ্য থেকে আশি থেকে নব্বুই লক্ষ লিটার ব্যবহৃত হয় ঔষধের কাজে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্লাজমা থেকে উৎপন্ন ঔষধের বাজারের শতকরা প্রায় চল্লিশ ভাগই উত্তর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে, শতকরা বত্রিশ ভাগ ইউরোপের নিয়ন্ত্রণে আর শতকরা দুই ভাগ মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

মহাশূন্য প্রকল্পগুলো ছাড়াও বিপুল সংখ্যক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ইরানের সাম্প্রতিক সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খবর। ইরানী বিশেষজ্ঞরা এখন ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার রাডার নির্মাণ করছেন এবং আরো দূরপাল্লার রাডার নির্মাণের গবেষণা সম্পন্ন করেছে। আগামী বছরের মধ্যে ইরান এক হাজার ১০০ কিলোমিটার ও তার চেয়েও বেশী পাল্লার রাডার নির্মাণ করবে। ইরানী বিশেষজ্ঞরা ছোট নৌযানে ব্যবহার উপযোগী বিশেষ সামুদ্রিক রাডার নির্মাণের গবেষণা শেষ করেছে। এই রাডারের পাল্লা হবে ৬০ কিলোমিটার। ৩০০ কিলোমিটার পাল্লার উপকূলীয় রাডার নির্মাণের গবেষণাও শেষ করেছেন ইরানী বিজ্ঞানীরা।

সম্প্রতি ইরান কয়েকটি পেট্রোকেমিক্যাল ও শোধনালয় উন্নয়ন প্রকল্পও সম্পন্ন করেছে। ইরানে সম্প্রতি উৎপাদিত হয়েছে ১৫০ কোটি লিটার উন্নত মানের অক্টেন। ইরান নিকট অতীতেও তার চাহিদা মেটানোর জন্য পরিশোধিত পেট্রোল বা বেঞ্জিনের এক তৃতীয়াংশই আমদানী করতো বিদেশ থেকে। বর্তমানে দেশটি এইসব জ্বালানী নিজেই উৎপাদন করছে এবং বিদেশেও একশ কোটি লিটার বেঞ্জিন রপ্তানির জন্য বাজার খুঁজছে। অর্থাৎ এই জ্বালানী খাতে ইরানের ওপর পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা দেশটির জন্য আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে এবং ইরান এখন এ খাতে স্বনির্ভর হয়েছে। ইরানের বিভিন্ন সেক্টরের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পরিণতি সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ইরান আন্তর্জাতিক মানের দুই কোটি লিটার বেঞ্জিন বিদেশে রপ্তানির জন্য উৎপাদন করবে।

৩২ বছর আগে ইরান তার তেল ও জ্বালানী শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট খুচরা যন্ত্রাংশও মেরামত করতে পারত না। এ শিল্পে মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেয়ারও অনুমতিও দিত না পশ্চিমা শোষক দেশগুলো বা তাদের তল্পীবাহক স্থানীয় সরকার। বর্তমানে ইরানী বিশেষজ্ঞরা তেল ও গ্যাস শিল্পের মেরামত বা সংস্কার প্রকল্পগুলো নিজেরাই চালাচ্ছেন। ইসলামী ইরান ডিম, দুধ, গোশত, মোরগ ও গম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। দেশটি এখন বিদেশে ৪৯ টি কৃষি পণ্য রপ্তানী করছে। অথচ ইসলামী বিপ্লবের আগে দেশটি বেশির ভাগ খাদ্যসামগ্রী বিদেশ থেকে আমদানী করত।

ইরান পরমাণু তৎপরতা প্রথমবারের মত শুরু করেছিল ১৯৫৬ সালে ইসলামী বিপ্লবের অনেক বছর আগে। সে বছর তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এ গবেষণাকেন্দ্রের কাজ এগিয়ে নেয়ার জন্যে ইরান ও আমেরিকা সে বছরই একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। তবে ১১ বছর পর ১৯৬৭ সালে এ পরমাণু কেন্দ্রে ৫ মেগাওয়াট শক্তি সম্পন্ন একটি পরমাণু চু্ল্লী চালু করার মাধ্যমে ইরানের বাস্তব পরমাণু তৎপরতা শুরু হয়। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই পরমাণু চুল্লী বসাতে সহায়তা করেছিল মার্কিন সরকার। যদিও শিক্ষা ও গবেষণাই ছিল এ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে, কিন্তু তা সত্ত্বেও এ চুল্লিটি নির্মাণের সময় ইরানের প্রকৌশলীদের উপস্থিতি বা তাদের সহযোগিতার ব্যাপারে কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। বিভিন্ন তথ্য প্রমাণে দেখা যায়, ইরানের বিজ্ঞানীরা যাতে এ প্রযুক্তির ব্যাপারে ধারণা অর্জন করতে না পারে সেজন্যে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে এই চুল্লির যন্ত্রপাতি সংযোজন ও চুল্লির কাজ শুরু করার সময় কোনো ইরানী বিজ্ঞানীকে উপস্থিত থাকতে দেয়া হয় নি।

ইরানের নাতাঞ্জে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প চালু হয় ২০০৬ সালের বসন্তকালে। একই সময়ে ইরান ইয়েলো কেক উৎপাদনেও সক্ষম হয়। এ ছাড়াও গত চার বছরে ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীরা নাতাঞ্জ, ইস্ফাহান ও আরাকের পরমাণু স্থাপনাগুলোয় নতুন প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ যুব প্রজন্মের। পরমাণু ক্ষেত্রে ইরানী বিজ্ঞানীদের একের পর এক নতুন সাফল্যে দিশাহারা পাশ্চাত্য দেশটির বিরুদ্ধে নানা ভিত্তিহীন প্রচারণা জোরদার করে এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রভাব খাটিয়ে তেহরানের বিরুদ্ধে চার চারটি প্রস্তাব পাশ করে। এসব প্রস্তাবে ইরানের ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু এতসব চাপ সত্ত্বেও ইরান পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আই এ ই এ’র সদস্য হিসেবে এবং এন পি টি বা পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রেখেছে। ইরানের বিশ সালা পরিকল্পনায় ২০ টির বেশি নতুন পরমাণু চুল্লি নির্মাণ এবং অন্ততঃ ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট নেয়া হয়েছে। আসলে পরমাণু ক্ষেত্রে ইরানের প্রতি পাশ্চাত্যের অসহযোগিতার ফলে ইরান এক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়।

পরমাণু রশ্মি বা শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত জাতের বীজ উদ্ভাবন বা বীজের সংস্কার এবং এভাবে কৃষি-উৎপাদন বৃদ্ধি ; খাদ্য সামগ্রীর স্টেরিয়ালাইজেশান বা জীবানুমুক্ত করা ও খাদ্য সামগ্রীকে স্বাস্থ্যসম্মত করা; পশুর জন্য টিকা তৈরি,তেলের পাইপ লাইনের সংস্কার, সংকোচনযোগ্য পলিমারের পাইপ নির্মাণ; বিভিন্ন ধরনের লেজার রশ্মি ব্যবহার এবং হাত-পায়ের ছাপ নির্ণয়ের মত বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর কিছু অংশ। এ ছাড়াও আলোক-রশ্মি বা তেজস্ক্রিয় রশ্মির মত বিভিন্ন রশ্মির মাধ্যমে চিকিৎসার কেন্দ্র বা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারী, দেশকে বাইরের সীমান্ত থেকে আসা পারমাণবিক রশ্মির নিঃস্বরণ বা হামলা থেকে রক্ষা, দূষিত খাদ্য ও স্বাস্থ্য-সামগ্রীর অনুপ্রবেশ বা চোরাচালান রোধ করা প্রভৃতি ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচীর আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ক্ষেত্রে ইরান এরিমধ্যে অনেক দর্শনীয় অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

পাশ্চাত্যের অসহযোগিতা সত্ত্বেও ইসলামী ইরান নিজস্ব মেধা ও সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে তার পরমাণু কর্মসূচী এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে ইসলামী ইরান ইউরেনিয়ামের খনি আবিষ্কার ও তা উত্তোলন করে ইউরেনিয়ামকে ইয়েলো কেইকে পরিণত করার প্রযুক্তি আয়ত্ত করে। এমনকি ইরান ইস্পাহানে ইয়েলো কেইককে হেক্সাফ্লোরাইড গ্যাসে রুপান্তর করার স্থাপনা বা ইউরেনিয়াম কনভারশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে এবং নাতাঞ্জ এলাকায় সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্রের সমন্বয়ের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতেও সক্ষম হয়। রাশিয়ার সহযোগীতায় পরিপূর্ণ হওয়া বুশেহরে পরমাণু স্থাপনা এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এ স্থাপনার কম্পিউটারগুলোকে স্টুক্সনেট ভাইরাসের মাধ্যমে অচল করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে পাশ্চাত্য ও ইহুদিবাদী ইসরাইল। বুশেহরে পরমাণু স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ইরান বুশেহরে, নাতাঞ্জ ও আরাকের পরমাণু স্থাপনা ছাড়াও আরো কয়েকটি নতুন পরমাণু স্থাপনা এবং বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার জন্য কয়েকটি নতুন স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এরিমধ্যে অনেক স্থাপনার স্থান বাছাই করা শেষ হয়েছে। আগামী বছরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার নতুন স্থাপনাগুলোর মধ্যে তৃতীয়টির নির্মাণ কাজ শুরু করবে ইরান। ইরানের বিশ সালা পরিকল্পনায় ২০ টিরও বেশি নতুন পরমাণু চুল্লি নির্মাণ এবং অন্ততঃ ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট নেয়া হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান পারমাণবিক গলন যন্ত্র নির্মাণেও সফল হয়। এর আগে বিশ্বের মাত্র ৪ টি দেশের কাছে এ প্রযুক্তি ছিল। এ চারটি দেশ হল যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্স। পরমাণু বিভাজনের উল্টো পদ্ধতিতে জ্বালানী উৎপাদন করা হয় এ যন্ত্রে। হাল্কা পরমাণুগুলোকে একসাথে উত্তপ্ত করে ভারী পরমাণুতে পরিণত করে জ্বালানী উৎপাদন করা হয় এ পদ্ধতিতে। ইরানের প্লাজমা ফিজিক্স গবেষণা কেন্দ্র ওই পরীক্ষামূলক যন্ত্র নির্মাণে সক্ষম হয়েছে। আগামী দশ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে পারমাণবিক জগতে পরমাণু বিভাজনের পদ্ধতি বাতিল হয়ে এ নতুন পদ্ধতি চালু হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইরানের প্লাজমা ফিজিক্স গবেষণা কেন্দ্র ন্যানো প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও একটি সফল প্রতিষ্ঠান । চিকিৎসা ক্ষেত্রে লেজার রশ্মি প্রয়োগের প্রশিক্ষণেও এ প্রতিষ্ঠানের সুনাম রয়েছে। এ ব্যাপারে রাশিয়ার সাথে ইরানের সহযোগীতা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা ও নানা বাধা সত্ত্বেও ইসলামী ইরান বিমান ও মহাশুন্য খাতেও একের পর এক অভাবনীয় এবং অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। ইরানী বিজ্ঞানীরা এখন মহাকাশে রকেটে বা মহাকাশযানের সাথে জীবন্ত প্রাণী বা বায়োলজিক্যাল ক্যাপসুল পাঠাচ্ছেন। ইরানের অনুসন্ধানী বা কাভেশগার রকেটগুলো পৃথিবীর ওপর বিভিন্ন ক্ষতিকর রশ্মি ও গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। “সিনা-এক” নামের একটি উপগ্রহ প্রথমবারের মত নির্মাণ করে রাশিয়ার সহযোগিতায়। পৃথিবীর কক্ষপথে ঐ কৃত্রিম উপগ্রহ নিক্ষিপ্ত এবং স্থাপিত হয় ২০০৫ সালে । দূর থেকে পরিমাপ এবং তথ্য আদান-প্রদান ও সংরক্ষণ সিনা’র দুটি বড় মিশন। এ ছাড়াও পৃথিবীর ভূগর্ভস্থ সম্পদ নিয়ে জরীপ, চাষযোগ্য অঞ্চলসহ উদ্ভিদ বা গাছ-পালা-বহুল অঞ্চল সনাক্ত করা ও প্রাকৃতিক বা নানা আকস্মিক দূর্যোগের প্রভাব পর্যবেক্ষণ এবং ইলেকট্রনিক ডাক-সেবা প্রদান কৃত্রিম উপগ্রহ সিনার আরো কিছু কাজ । এরপর ইরান ২০০৬ সালে “কাভেশ” নামের রকেট পাঠায় মহাশুন্যে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণামূলক কাজে ব্যবহারের জন্য ইরান জোহরেহ বা শুকতারা ও মেসবাহ এবং মেসবাহ-দুই নামের আরো কয়েকটি কৃত্রিম উপগ্রহ নির্মাণেরও উদ্যোগ নেয়। তবে মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে ইরানের অগ্রগতির পরবর্তী বড় সাফল্যটি ছিল “উমিদ” নামের কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ। উমিদ বা আশা নামের এ উপগ্রহ পুরোপুরি ইরানের নির্মিত প্রথম উপগ্রহ এবং এটি উৎক্ষিপ্ত হয়েছে ইরানের নির্মিত স্টেশন থেকে। ইরানের জাতীয় উপগ্রহ হিসেবে খ্যাত ওই কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণসহ এর যন্ত্রাংশ পরিকল্পিত ও নির্মিত হয়েছে ইরানী বিশেষজ্ঞদের হাতে। এটি ইরানের দ্বিতীয় উপগ্রহ যা পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপিত হয়। সাফির দুই বা দূত-দুই নামের একটি ইরানী উপগ্রহের মাধ্যমে উমিদকে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করা হয়। মূল উপগ্রহ “উমিদ” বা “আশা” ও এই উপগ্রহ বহনকারী রকেট ছাড়াও ভূ-পৃষ্ঠে স্থাপিত উপগ্রহ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং এই স্টেশন বা কেন্দ্রের সমস্ত যন্ত্রপাতিও ইরানে নির্মিত হয়েছে। “উমিদ” ইরানে অবস্থিত তথ্য-গ্রাহক কেন্দ্রগুলোতে তথ্য পাঠায়। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে “কাভেশগার-সে” ছাড়াও ইরান আরো ৩ টি উপগ্রহ এবং উপগ্রহবাহী রকেট “সি-মোরগ” উৎক্ষেপণ করে। উপগ্রহবাহী মোটর “সি-মোরগ” “সাফির” বা “দূত-দুই”র উন্নততর মডেল। এটি ১০০ কেজি ওজনের কৃত্রিম উপগ্রহকে পৃথিবী থেকে ৫০০ কিলোমিটার উঁচু কক্ষপথে স্থাপন করতে সক্ষম।

ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানের প্রতিরক্ষা বা সমর শিল্প ছিল পুরোপুরি পাশ্চাত্য-নির্ভর। ইসলামী বিপ্লবের প্রায় দেড় বছর পর পাশ্চাত্যের ইশারায় ইরাকের সাদ্দাম সরকার ইরানের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল যুদ্ধ। দীর্ঘ ৮ বছরের ওই যুদ্ধের সময বিকশিত হয় ইরানের প্রতিরক্ষা বা সমর শিল্প। দেশটি এখন প্রচলিত সামরিক সাজ-সরঞ্জাম ও অস্ত্র-শস্ত্রে পুরোপুরি স্বনির্ভর, এমনকি অপ্রচলিত বা অত্যাধুনিক অনেকে সমর-সম্ভারেও প্রায় স্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জল, স্থল ও আকাশে ইলেকট্রনিক সাজ-সরঞ্জামে সুসজ্জিত ইরানের সশস্ত্র বাহিনীগুলোর বেশ কিছু সামরিক মহড়াই এর অন্যতম প্রমাণ। এইসব মহড়ায় প্রদর্শিত হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপক নৌযান ও রাডারসহ আরো অনেক অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র। ইলেকট্রনিক সাজ-সরঞ্জাম প্রতিরক্ষার সফট প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। ইরানে ই সি সি এম ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেশটির প্রতিরক্ষার সফট প্রযুক্তি খাতে সাফল্যের অন্যতম নিদর্শন। ইরান বিমান প্রতিরক্ষা তথা বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও রাডার সিস্টেম খাতেও ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ ধরনের নানা সিস্টেম ইরান নিজেই এখন উৎপাদন করছে। ইরান এক্ষেত্রে রাশিয়ার এস-থ্রি হান্ড্রেড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমমানের বা তার চেয়েও উন্নত সিস্টেম উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে।

ইরান পাইলটবিহীন ও বোমা পরিবাহী জেট বিমান কাররারে’র সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। ড্রোন বা পাইলট বিহীন জেট বিমান কাররার প্রযুক্তিগত দিক থেকে খুবই শক্তিশালী। এটি বানাতে খুবই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ইরান ছাড়া বিশ্বের মাত্র দুটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স এ পর্যন্ত পাইলটবিহীন জেট বিমান তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। ইরানের তৈরি কাররার পাইলটবিহীন জেট বিমান অনেক উপর দিয়ে ঘণ্টায় এক হাজার কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম। কাররার লম্বায় চার মিটার। এটি বিভিন্ন ধরনের বোমা এবং ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। এই জেটের চারটি ক্ষেপণাস্ত্র এক হাজার কিলোমিটার দূরত্বের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। বোমাগুলোও শত্রুর অবস্থানে কঠিন আঘাত হানতে সক্ষম। ‘জুলফিকার” ও “সেরাজ” ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকারী দু’টি অত্যাধুনিক গানবোটের নাম। সেরাজ খুবই দ্রুতগতি সম্পন্ন গানবোট। শত্রুপক্ষের আক্রমণের দ্রুত জবাব দিতে সক্ষম এই গানবোটটি গতি এবং রকেট নিক্ষেপের ক্ষেত্রে অনন্য। সেরাজ উত্তাল সমুদ্রেও কাজ করতে পারে। টহলবোট জুলফিকার শত্রুদের বোটে অসম্ভব দ্রুততার সাথে হামলা চালাতে সক্ষম। বিপুল সংখ্যক গানবোট তৈরির ফলে ইরানের নৌবাহিনীর আক্রমণ ক্ষমতা ভীষণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্রুতগতি সম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকারী গানবোটের ক্ষেত্রে বিশ্বে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ ইরানের মত শক্তি অর্জন করতে পারে নি। ইরানের মধ্যম গতি সম্পন্ন গানবোটগুলো মার্কিন রণতরিগুলোর চেয়েও দ্বিগুণ গতিসম্পন্ন। ইরান গানবোটের পাশাপাশি সাবমেরিন তৈরির ক্ষেত্রেও অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন চারটি গ্বাদির সাবমেরিন ইরানের নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে। এই সাবমেরিনগুলো শত্রুর রাডার ফাঁকি দিয়ে দ্রুত গতিতে শত্রুদের ধাওয়া করতে সক্ষম। অগভীর জলেও ইরানের গ্বাদির সাবমেরিন ভালোভাবে কাজ করে।

মোটর গাড়ি শিল্প আধুনিক বিশ্বে অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম বড় মাধ্যম। এই শিল্প বিশ্বের দেশগুলোর শিল্পখাতের অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক বিশেষজ্ঞ এ শিল্পকে শিল্প-উন্নয়নের রেল ইঞ্জিন বলে অভিহিত করে থাকেন। তাই এ শিল্পে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়। মোটরগাড়ি শিল্প সচল হয়ে উঠলে অন্য অনেক শিল্পও রমরমা হয়ে উঠে। কারণ, অটোমোবাইল বা মোটরগাড়ি শিল্পের ওপর অন্ততঃ ৮০টি শিল্প নির্ভরশীল বা সম্পর্কিত। যেমন, ইস্পাত, ইলেকট্রনিক, পেট্রোক্যামিক্যাল, গাড়ির চাকা, তেল শোধনাগারে উৎপাদিত নানা উপজাত, কাঁচ, কাপড়, আয়না, চামড়া, ও অন্য আরো অনেক শিল্প। ১৯৯২ সালে ইরান জাতীয় মোটরগাড়ি নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় এবং সংযোজন শিল্পের গন্ডী থেকে বের হয়ে গাড়ির মূল ইঞ্জিন ও সব ধরণের যন্ত্রাংশ নির্মাণ শুরু করে। এখন ইরানে নির্মিত গাড়ী ইউরোপ ও এশিয়ার নানা দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হচ্ছে।

বিশ্বে বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে ইরানের অবস্থান তৃতীয় এবং বাঁধের পরিকল্পনা বা ডিজাইন তৈরি করার ক্ষেত্রে দেশটি রয়েছে প্রথম বা শীর্ষ অবস্থানে। ইরান “কারুন-চার” নামের বাঁধ নির্মাণ করে এ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের গৌরবও দেশটির নামের সাথে যুক্ত করেছে। ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নানা নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেশটি এ খাতে এমন অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হল।

ইরানে জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল, আর গ্যাস রয়েছে ৩ হাজার তিন শত কোটি ঘন মিটার। জ্বালানি তেল রিজার্ভের দিক থেকে বিশ্বে ইরানের স্থান চতুর্থ ও গ্যাস রিজার্ভের দিক থেকে দ্বিতীয়। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি গ্যাস সম্পদের মজুদ রয়েছে রাশিয়ায়। ইরান বিশ্বের গ্যাস সম্পদের মোট মজুদের শতকরা ১৮ ভাগের অধিকারী।

ইসলামি বিপ্লবের আগে কৃষি ও খাদ্য শিল্পে ইরান ছিল প্রায় পুরোপুরি পাশ্চাত্যের ওপর নির্ভরশীল। শুস্ক মরুময় দেশ ইরানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু তা সত্ত্বেও কৃষিকাজের জন্য পানি সরবরাহের লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছে অনেক বাঁধ। ফলে মরুময় ও আধা-মরুময় অনেক প্রান্তর পরিণত হয়েছে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা অঞ্চলে। এসব অঞ্চলে বছরে কয়েকবার ফসল তোলা হয়।

তথ্যসুত্র: রেডিও তেহেরান বাংলা বিভাগ ও ফার্স নিউজ ।