ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

ছবি পরিচিতি: সৈয়দ নজরুল ইসলাম (ভাইস-প্রেসিডেন্ট), তাজউদ্দীন আহমদ(প্রধানমন্ত্রী), কামরুজ্জামান(স্বরাস্ত্রমন্ত্রী), এম. মনসুর আলী (অর্থমন্ত্রী)

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইট সংঘটিত হবার সময় যখন অপারেশন বিগবার্ডের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানী বাহিনীর পক্ষ হতে গ্রেফতার করা হয় তার আগ মুহূর্তে ২৫ মার্চ দিবাগত রাত অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ইপিআর এর একটি ছোট ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ভয়াবহ গণহত্যার সময় আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নেতা তাজউদ্দীন আহমদ নিজ বাসভবন ছেড়ে পালিয়ে যান। এসময়েই তিনি বাংলাদেশ সরকার গঠনের পরিকল্পনা শুরু করেন। প্রথমে আত্মরক্ষা তারপর প্রস্তুতি এবং সর্বশেষে পাল্টা আক্রমণ এই নীতিকে সাংগঠনিক পথে পরিচালনার জন্য তিনি সরকার গঠনের চিন্তা করতে থাকেন। এরই মধ্যে ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি ফরিদপুর-কুষ্টিয়া পথে পশ্চিম বাংলার সীমান্তে পৌছান। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পদার্পণ করেন। সীমান্ত অতিক্রম করার বিষয়ে মেহেরপুরের মহকুমা শাসক তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী তাদের সার্বিক সহায়তা প্রদান করেন। সীমান্ত অতিক্রম করার পর ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মহাপরিদর্শক গোলক মজুমদার, তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন।

সীমান্তে পৌছে তাজউদ্দীন আহামদ দেখেন যে বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সেনাদের সমর্থনে ভারত সরকার থেকে নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ভারতীয় সামরিক বাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কিছুই করার নেই। মুক্তিফৌজ গঠনের ব্যপারে তাজউদ্দীন আহমদ বি,এস,এফ এর সাহায্য চাইলে তৎকালীন বি,এস,এফ প্রধান তাকে বলেন যে মুক্তি সেনা ট্রেনিং এবং অস্ত্র প্রদান সময় সাপেক্ষ কাজ ।তিনি আরো বলেন যে ট্রেনিং বিষয়ে তখন পর্যন্ত ভারত সরকারের কোন নির্দেশ না থাকায় তিনি মুক্তিবাহিনীকে ট্রেনিং ও অস্ত্র দিতে পারবেন না।কেএফ রুস্তামজী দিল্লির ঊর্ধ্বতন সাথে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয় তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে নিয়ে দিল্লি চলে আসার জন্য। দিল্লিতে যাবার পর ভারত সরকার বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হন যে, তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠতম সহকর্মী। ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠক শেষে তিনি বাংলাদেশকে সর্বপ্রকার সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলে তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের এমএনএ(M.N.A) এবং এমপিএ(M.P.A)দের কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তে অধিবেশন আহ্বান করেন। উক্ত অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে মুক্তিযুদ্ধ ও সরকার পরিচালনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়। এই মন্ত্রিপরিষদ এবং এমএনএ ও এমপিএ-গণ ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঘোষনা করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী,ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী,খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য নিয়োগ করা হয়। ১১ এপ্রিল এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়।

মন্ত্রণালয়সমূহের নাম
১ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
২. পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
৩ অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
৪ মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়।
৫ সাধারণ প্রশাসন বিভাগ।
৬ স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
৭ তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়।
৮ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
৯ ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়।
১০ সংসদ বিষয়ক বিভাগ।
১১ কৃষি বিভাগ।
১২ প্রকৌশল বিভাগ।

মন্ত্রণালয় ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীগণ :
তাজ উদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী
প্রতিরক্ষা
তথ্য ও বেতার এবং টেলিযোগাযোগ
অর্থনৈতিক বিষয়, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন
শিক্ষা,স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন সরকার, স্বাস্থ্য, শ্রম ও সমাজকল্যাণ
সংস্থাপন ও প্রশাসন
যেসব বিষয়ের দায়িত্ব মন্ত্রিপরিষদের অন্য কোন সদস্যকে প্রদান করা হয়নি

খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক-
পররাষ্ট্র বিষয় আইন ও সংসদ বিষয়

এম মনসুর আলী
অর্থ ও জাতীয় রাজস্ব
বাণিজ্য ও শিল্প
পরিবহণ

এ এইচ এম কামরুজ্জামান
স্বরাষ্ট্র বিষয়ক
সরবরাহ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন
কৃষি

১৯৭১ সালের অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয় এপ্রিল ১০ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী বাহিনীকে প্রতিরোধ ২৬ মার্চ ১৯৭১ তারিখেই শুরু হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সংগঠন ও সমন্বয়ে, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে এবং, সর্বোপরি এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী দেশ ভারতের সরকার ও সেনাবাহিনী সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক রক্ষায় এই সরকারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এই সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বিরূদ্ধতা যুদ্ধের রূপ নেয় এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা হয়ে ওঠে।

সুত্র: সিমিন হোসেন রিমি (এপ্রিল ২০০৫). আমার ছেলেবেলা,১৯৭১ এবং বাবা তাজউদ্দীন আহমদ।
নির্মলেন্দু গুণ (ফেব্রুয়ারি ২০০৮). আত্মকথা ১৯৭১ (১ম সম্পাদিত). প্রকাশক: বাংলা প্রকাশ।
উইকিপিডিয়া।