ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

একজন অনুপ্রাণিত শিক্ষকই কেবল শ্রেণি কার্যক্রমকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেন।

‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’। শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতি করতে পারেনা। আর প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে তার ভিত্তি। ভিত্তি যত মজবুত হবে স্থাপনাটি তত মজবুত হবে। তাই প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্বের সাথে দেখা হয় সারা বিশ্বে। বাংলাদেশেও প্রাথমিক শিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকল্পে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। শ্রেণীকক্ষ নির্মাণসহ বিদ্যালয়ের ভৌত ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণসহ নানাবিদ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে রাষ্ট্র। মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকল্পে ভৌত ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিবেদিত ও অনুপ্রাণিত হতে হবে একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা । একজন নিবেদিত ও অনুপ্রাণিত শিক্ষকই পারেন মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে। আর একজন শিক্ষককে অনুপ্রাণিত করতে কিছু প্রণোদনা প্যাকেজের অবশ্যই প্রয়োজন।

এটা অনস্বীকার্য যে, আমাদের দেশে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তার চাকুরীর বিপরীতে যে বেতন ভাতা পান তা দিয়ে তাঁর সংসার চলেনা। ‘নুন আনতে পানতা ফুরোয়’ এরকম যখন অবস্থা তখন মানসিকভাবে বিচলিত একজন শিক্ষক কীভাবে শ্রেণীকার্যক্রমের পাশাপাশি অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবেন? কীভাবে দুর্বল ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনা তার মাথায় আসবে? পাশের ঘরের শিশুটি যখন আয়েশি জীবন যাপন করছে ঠিক তখনি তাঁর শিশুটির বিবর্ণ চেহারা তাঁর চোখে ভেসে বেড়ায় সর্বক্ষণ। অভাব যখন একজন মানুষের নিত্য সঙ্গী তখন কী করে সে অনুপ্রাণিত হবে? তাছাড়া একই পদে দিনের পর দিন একই কাজ করতে কার ভাল লাগে? প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিভাগীয় পদোন্নতি নেই বললেই চলে। এতে করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিতরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে আসলেও তাদের মধ্যে অন্য চাকুরী খোজার প্রবণতাটাই বেশি থাকে ফলে শিখন শেখানো কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়। যদিও সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতির সুযোগ আছে তাও আবার জেলা সদর বা বিভাগীয় সদরগুলোতে পদশূন্য হবার সাথে সাথেই অন্য যায়গা থেকে ঐ শূন্যপদ পূরণ হয়ে যাওয়ায় জেলা বা বিভাগীয় সদরে কর্মরত সহকারী শিক্ষকগণ পদোন্নতির কোন সুযোগ পাননা বিধায় একই পদে দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে তাদের মধ্যে একধরনের একঘেয়েমী ও হতাশা চলে আসে- ফলে তারা কাজে অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলেন।

এমতাবস্থায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনুপ্রাণিত করতে নিম্নলিখিত প্রস্তাবনা উপস্থাপন করছি-

১। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ভাতা বর্ধিত করতে হবে, যাতে করে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে স্বাচ্ছন্দে সমাজে চলাফেরা করতে পারে।
২। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যোগ্যতা ভিত্তিক বেতন কাঠামো গঠন করতে হবে।
৩। বিভাগীয় পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে- যাতে করে তারা প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ আসনটিতে যাবার সুযোগ পান। এতে করে মেধাবী ও উচ্চ শিক্ষা অর্জনকারীরা অন্য চাকুরীর পেছনে না ঘুরে এখানেই তারা তাদের মেধা ও শ্রম ব্যয় করবেন।
৪। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একঘেয়েমী দুর করতে তাদের নিয়ে বাৎসরিক খেলাধুলা ও সাংষ্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে।
৫। শিক্ষকদের কার্যক্রম সুপারভিশনের দায়িত্বে নিয়োজিত অফিসারগণকে পুলিশি মনোভাব ছেড়ে সহযোগী বন্ধু হিসেবে কাজ করতে হবে।
৬। শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট, ইবিক্রস ও টাইমস্কেল প্রদানে দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটিয়ে যথাসময়ে তা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
৭। প্রতিটি বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী ও এমএলএসএসের পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ করতে হবে যাতে করে শিক্ষকগণ অফিসিয়াল কাজে সময় ব্যয় না করে শ্রেণি র্কাযক্রমে সময় ব্যয় করতে পারেন।

প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির মূল ভিত্তি। প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ একটি দেশের সবচেয়ে লাভ জনক বিনিয়োগ। তাই প্রাথমিক শিক্ষায় অধিকতর বাজেট বরাদ্দ করে বিদ্যালয়ের ভৌত ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষকদের অনুপ্রাণিত করতে পারলেই তবে আমরা মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারব।

লেখক: শিক্ষক
ইমেইল: numahmud@live.com