ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

প্রকৃতির রূপসী কন্যা আমাদের এ দেশ- বাংলাদেশ। এ দেশের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে কতই না সৌন্দর্য! পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন ‘সুন্দরবন’ তার সুন্দরের ডালি নিয়ে যেমন এ দেশে অবস্থান করছে ঠিক তেমনি পৃথিবীর দীর্ঘতম সমূদ্র সৈকত ‘কক্সবাজার‘ও এ আমাদের বাংলাদেশেই। বাংলাদেশে প্রকৃতির প্রতিটি খাঁজে খাঁজে সৌন্দর্য যেন লুটোপুটি খাচ্ছে। অতি সম্প্রতি সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার ‘রাতারগুল’ নামক স্থানে ‘রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট’ বা জলাভূমির বন অন্যতম একটি দর্শণীয় স্থান হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে। মিডিয়া কর্মীদের কল্যাণে এ বছরই প্রথমবারের মতো এটা আলোচনায় আসে। ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াগুলোতে ‘রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট’ নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার ও প্রকাশের পর থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রকৃতি প্রেমিরা এসে ভীড় করেন সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেরার প্রত্যন্ত এ অঞ্চলে। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া ছাড়াও ফটোগ্রাফারদের কল্যাণে এ বনের হাজারো দৃষ্টি নন্দন ছবি ছড়িয়ে পড়ে ‘ফেসবুক’সহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। তাই রাতারগুল বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ববাসীর কাছে পর্যটন ও গবেষণার অন্যতম স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে সহজেই।

সামজিক যোগাযোগের সাইট ‘ফেসবুক’ এ ‘রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট’ এর দৃষ্টি নন্দন ছবি দেখে রাতারগুল ভ্রমণের ইচ্ছা ব্যক্ত করি সহকর্মী বড় ভাই সাইফুল আলম রাজ্জাকের কাছে। সাইফুল আলম রাজ্জাক ভাই ভ্রমণ বিলাসী মানুষ। সময় পেলেই তিনি ঘুরে বেড়ান দেশের নানা প্রান্তে। রাতারগুল নিয়ে তার আগ্রহের কমতি নেই। কিন্তু তার কর্মস্থলের ব্যস্ততা তাকে সে সুযোগ করতে দেয়নি। ফটোগ্রাফার বন্ধু খালেদ আহমদ ফটোগ্রাফির মহড়া দিতে রাতারগুল যাচ্ছি- যাব এ রকম করতে করতে আর যাওয়া হচ্ছিল না। প্রথম আলোর ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিনিধি ও প্রকৃতি প্রেমিক শ্রদ্ধেয় জুয়েল খান আমাদের ভ্রমণের প্রাণ ভ্রমরা হয়ে থাকেন সবসময়ই। সাইফুল আলম রাজ্জাক ভাই এবারের কোরবানীর ঈদের দুদিন আগে সময় করে নিলেন। জানালেন সবকিছু ঠিকটাক থাকলে ঈদের তিন দিন আগে অর্থাৎ ২৪/১০/২০১২ রোজ বুধবার আমরা রাতারগুল যাচ্ছি। বিষয়টা ফটোগ্রাফার খালেদ আহমদ ও প্রকৃতি প্রেমিক জুয়েল খানকেও জানালেন। খালেদ আহমদ তার এক হাত লম্বা ল্যান্সের ক্যামেরা নিয়ে রেডি কিন্ত দূর্ভাগ্যই বলতে হয় আমাদের। আমাদের ভ্রমণের প্রান ভ্রমরা জুয়েল খান স্থানীয় একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম থাকায় তিনি সঙ্গী হতে পারছেন না জানিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত তারিখে আমরা তিন জনই রওনা দিলাম রাতারগুলের উদ্দেশ্যে ।

প্রথমে আমরা তিন জন মিলিত হলাম সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কুদরত উল্লাহ জামে মসজিদের প্রধান ফটকে। সেখান থেকে রিকশায় করে আম্বরখানা পয়েন্টে। আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজি চালিত একটি ত্রিহুইলার ফোরস্ট্রোকে করে গোয়াইনঘাটের সাহেবের বাজার। সাহেবের বাজার একটি গ্রামীন বাজার- বিকালে যেখানে হাট বসে। এ গ্রাম্য বাজারে আমরা হালকা নাস্তা করে কিছু শুকনো বিস্কিট ও পানীয় নিলাম। একই ফোরস্টোকে করে আমরা রওনা দিলাম রাতারগুল সংলগ্ন মটরঘাটের উদ্দেশ্যে। পাকা রাস্তা ছেড়ে গাড়িটি নামল মেঠো পথে। দুধারের জমিতে সবুজ ধান, মাঝ দিয়ে মেঠোপথ, উপরে নীল আকাশ- এ যেন মন কেড়ে নেয়া এক ভাল লাগায় ভরে গেল মনটা।

গাড়িটি গিয়ে থামল মটরঘাট। মটরঘাটের একপাশে দু‘একটি দোকান। অন্য পাশে একটি মন্দির। মন্দিরের সীমানা ঘেঁষেই শাহ কামাল(র.) নামে একজন ওলীর মাজার। সেদিন ছিল বিজয়া দশমীর দিন। মন্দিরে তখন প্রতীমা বিসর্জনের প্রস্তুতি চলছে। মাজার ও মন্দিরের পাশাপাশি অবস্থান- সাম্পদায়িক সম্প্রীতির এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী হতে পারে! মটরঘাটের অনতি দূরেই চেঙ্গের খাল নদী। এ নদীর কুল ঘেঁষেই রাতাগুল বন। নদীর পাড়ে বেশ কিছু ডিঙ্গি নৌকা। এসব নৌকা ভাড়ায় চালিত। একটি নৌকা ভাড়া করে চেঙ্গের খাল নদী দিয়ে কিছু দুর গিয়েই বনে প্রবেশের খাল ধরে আমরা প্রবেশ করলাম বনে।

আমাদের নৌকাটি বনে প্রবেশের খালে ঢুকলেই বেশ কিছু পাখি ডানা ঝাপটে কলতানে মুখরিত করল পরিবেশ। রাজ্জাক ভাই বলে উঠলেন- ”রাতারগুলের পাখিরা আমাদের স্বাগত জানাল”। এগিয়ে চলল নৌকাটি। ফটোগ্রাফার খালেদের লম্বা ল্যান্সওয়ালা ক্যামেরা দেখে বানরগুলো সম্ভবত ভয়ই পেল। তাড়াহুড়ো করে মা বানরটি তার বাচ্চাটিকে ঝাপটে ধরে গাছের ডালে ডালে চলে গেল আমাদের দৃষ্টি সীমার বাইরে। খালেদ হয়তো বানরের বাচ্চা নিয়ে দৌঁড়ার দু‘একটি ছবি তুলে থাকতেও পারে। খালের দুধারে হাজার বছরের প্রাচীন গাছগাছালি। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ-গাছালি পরম মমতায় জড়াজড়ি করি দাঁড়িয়ে আছে হাজার বছর ধরে। গাছগাছালির মধ্যে হিজল ও করচ গাছের আধিক্যই বেশি। সুর্য তখন মাথার ওপরে। বাতাসে গাছের পাতার দুলুনির সাথে সাথে সূর্যের আলোও যেন দুল খায়।

পাখপাখালীর কলতান শুনে শুনে আমরা প্রবেশ করলাম গভীর বনে। বনের ভেতরে কত যে খাল- খালের শাখা-প্রশাখা! এরকম করে সারাটা বন ঘিরে জালের মতো জড়িয়ে আছে হাজারো খাল। প্রতিটি খালের দুধারে ঘন গাছপালা। কোন দিক থেকে কোন দিকে যাব? নৌকার মাঝিকেই তার ইচ্ছে মতো আমাদেরকে নিয়ে যেতে বললাম। শরতের শেষে পানি শুকিয়ে অনেকটা নৌকা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বড় বড় খাল ছাড়া খালের শাখা প্রশাখায় নৌকা আটকে যায়। এসব খালে রয়েছে হরেক রকমের মাছ। পানি কমে আসায় খালের পানিতে মাছগুলো স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল। বেশ কয়েকটি মাছ আমাদের নৌকায়ও লাফ দিয়ে উঠল। হঠাৎ নৌকার মাঝি তার গলা ছেড়ে গান গেয়ে উঠল-”মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে/ আমি আর বাইতে পারলাম না …….”। তার গান শুনে শুনে আমরা হারিয়ে গেলাম গভীর বনে।

পড়ন্ত বিকেলে আমরা যখন ফিরছিলাম- নৌকার মাঝি জানাল, ‘বনের মুল সৌন্দর্য বর্ষা মৌসুমে-্ পানি যখন থৈ-থৈ করে। তখন বনটিকে ছবির মত দেখায়। বনের গাছগুলো ডুবে যায় পানিতে এবং শূধুমাত্র গাছের ডগাগুলো ভেসে থাকে পানির উপরে। তখন নৌকায় দাঁড়িয়ে বনের অনেকটাই একসাথে দেখা যায়’।

রাতারগুল বনকে ঘিরে এলাকার মানুষের মনেও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রাতারগুলকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠবে পর্যটন নগরী। অবহেলিত এ প্রত্যন্ত অঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হবে এমনটি তাদের আশা। রাতারগুলকে বিশ্ববাসী জানতে পারছে এতে করে তারা রোমাঞ্চিত। তাই এখানে পর্যটকরা যাতে কোনরকম হয়রানির শিকার না হন সে ব্যাপারে তারা বেশ তৎপর। মটরঘাটে তারা একটি স্বেচ্ছাসেবী কমিটি গঠন করেছেন। কেউ কোন হয়রানির শিকার হলে তা দেখভাল করেন তারা।

পৃথিবীর অল্প কয়েকটি সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলাভূমির বনের মধ্যে রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট একটি। সরকারের প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটা হয়ে উঠতে পারে পর্যটকদের জন্য অন্যতম একটি আকর্ষণীয় স্থান।

লেখক –
নাছির মাহমুদ
শিক্ষক
e-mail: numahmud@live.com