ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে পত্র লিখন বা চিঠি লিখন। এক সময় গ্রামে-গঞ্জে যেনতেন ভাবে একটি চিঠি লিখতে পারতো বা পড়তে পারতো তার তুলা ছিল আশি টাকা। প্রবাসে স্বজনের কাছে চিঠি লিখতে মানুষ দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতো। গ্রামের একজন বা দুজন চিঠি লিখা জানতো। তাদের কদর ছিল সীমাহীন। তাদের সিডিউল নিয়ে এসে পরে চিঠি লিখাতে হতো বলে দাদা দাদীর কাছ থেকে জানা। ক্রমান্বয়ে মানুষ লেখাপড়ায় মনোযোগী হলো, চিঠি লিখা শিখল। তারপরও যে সুন্দর করে চিঠি লিখতে পারতো তার কদর ছিল অন্যরকম। চিঠিতে বাহারী ছন্দের ভাষার প্রয়োগ ছিল লক্ষ্যনীয়। বিষেশ করে প্রেমিক প্রেমিকাদের চিঠি পড়লে মনে একধরণের শিহরণের সৃষ্টি হতো। বিভিন্ন ম্যাগাজিনেও প্রেমপত্রের একটি বিভাগ ছিল লক্ষ্যণীয়। কে কার চেয়ে সুন্দর চিঠি লিখতে পারতো তার এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা লেগে থাকতো সবসময়।

প্রবাসে থাকা ছেলের চিঠি পড়ে মমতাময়ী মায়ের চোখের পানি ঝরতো অবিরত। যখনই ছেলের কথা মনে হতো তখনই তার লিখা চিঠিটি বের করে পড়ে নিতেন অথবা পড়িয়ে শান্ত্বনা খুজতেন। পাড়া পড়শিদের ডেকে নিয়ে ছেলের পাঠানো চিঠির কথা বলতেন আর দোয়া করতে বলতেন। তাছাড়া মা পথের পানে চেয়ে থাকতেন এই বুজি ডাকপিয়ন এসে ছেলের চিঠি এসেছে বলে ডাক দিল। সেদিন আর নেই। যুগের পরিবর্তনে আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষ আর চিঠি লিখেনা। প্রযুক্তি মানুষকে দিয়েছে গতি কিন্তু কেড়ে নিয়েছে সব আবেগ উচ্ছাস। এখন মা ছেলের মধ্যে সরাসরি কথা হয়। কিন্তু এটা আর চোখের জলের নাগাল পায়না। এটা এখন আর পাড়া প্রতিবেশির বলার মতো কোন ব্যাপার না। ডাকঘরে লম্বালাইনে দাড়িয়ে চিঠি আসার খবর জানার দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। মা তার ছেলেকে চিঠি লিখেন না বা ছেলে তার মাকে চিঠি লিখে না। কোন প্রেমিক অথবা প্রেমিকা চিঠি লিখার মতো ব্যাকডেটেড কাজে উৎসাহ পায় না। চিঠি বা পত্র মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে অযথা সময় নষ্ট করার একটি উপকরণ মাত্র। পরীক্ষা পাশের জন্য ছাত্রছাত্রীদের যতটুকু পত্র লিখা শিখতে হয় ঠিক ততোটুকু ছাড়া পত্র যে একটি শিল্প বা ভাল লাগার একটি বিষয় অথবা পত্র যে একটি ঐতিহাসিক দলিল, পত্র যে সময়ের কথা বলে তা এখনকার ছেলেমেয়েদের মাঝে তা উপলব্দি করার সময় নেই। তাই ক্রমশ: হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সাহিত্যের একটি বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ পত্র সাহিত্য। ইতিহাস ঐতিহ্য ও সময়কে ধরে রাখার স্বার্থে এবং ভাষার সুনিপুণ ব্যবহার জানার স্বার্থে আমাদের পত্র সাহিত্যকে বাচিয়ে রাখা একান্ত জরুরি। এ ব্যাপারে সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি, ভাষাবিদ ও ঐতিহাসিকদের এগিয়ে আসতে হবে। আসুন আমরা সবাই মিলে আমাদের সাহিত্যের একটি অন্যতম নান্দনিক অংশ পত্র সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাই।

ব্লগার : শিক্ষক
Email : numahmud@live.com