ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

প্রায় প্রতি ঈদের রাতেই বাসা পালিয়ে মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাই বাংলার প্রকৃতি ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতির কাছে মায়ার টানে। ঘুরে বেড়ানো আমার সব চেয়ে প্রিয় ভাললাগা। ছয় বছর আগেও হারিয়ে যাওয়া সুখ পাখি সুরঞ্জনাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম ঢাকা ও তার আশে পাশের প্রকৃতি ইতিহাস আর সংস্কৃতির খোজে। এখনো বদলায়নি আমার সেই ভাললাগাটা। যদিও বদলে গেছে জীবনের পথ রেখা। সুযোগ পেলেই মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যাই বাংলার প্রকৃতি ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতির কাছে মায়ার টানে। এবারের ঈদেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাসা থেকে বিকেলে বের হয়ে গেলাম মা’কে রথ মেলায় যাচ্ছি বলে। যদিও রথ মেলায় সত্যি যাচ্ছি। কিন্তু রথ মেলার পরে কোথায় যাবো তা তো আর মাকে বলে আসিনি। আর বলব বা কি করে আমি নিজেই তো জানিনা কোথায় যাবো আজ রাতে। তবে পালাবো যে সেটা আমি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম।

রথ মেলা ঘুরে রিক্সা নিয়ে আসলাম সুরমা নদীর ক্বিন ব্রিজ এর নিছে। অনেকক্ষণ বসে চা সিগারেট খেলাম। সন্ধ্যা প্রায় এলো এলো। তোপখানা ঘাট দিয়ে নৌকায় চরে নদী পার হয়ে রেল কলনি ধরে পায়ে হেটে চলে এলাম সিলেট রেল স্টেশন। স্টেশন একেবারেই ফাকা। ঢাকা চট্টগ্রাম গামি রেল দুটি অলস দাঁড়িয়ে আছে লাইনে। টিকেট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আজ কি চট্টগ্রাম গামি ট্রেন ছাড়বে। উনি জানালেন আজ ঢাকা চট্টগ্রাম গামি কোন ট্রেন ছাড়বেনা।

কি আর করার দুই চার মিনিট পায়ে হেটে চলে গেলাম বাস স্টেশন। বাস স্টেশন ঘুয়ে দেখি তেমন একটা গাড়ি নেই। একেবারে যে নেই তা কিন্তু না। অল্প কিছু সংখ্যক গাড়ি দাঁড়ানো আছে। ফুটপাতে চায়ের দোকানে বসে চা সিগারেট খেতে খেতে ভাবলাম কোথায় যাওয়া যায়। চোখ বুজে কল্পনা করতে লাগলাম। বারবার চোখে ফেইসবুকের তিলোত্তমা হাতিয়া গ্রুপটা ভেসে উঠছে। গ্রুপের ছবি গুলিও চোখে ভেসে উঠছে একে বারে স্পষ্ট। জোয়ার ভাটার, সারিসারি তালগাছ, ছোট বড় বিভিন্ন ধরনের বিভিন্ন ডিজাইনের নৌকা, ট্রলার, লঞ্চ, বিশাল মেঘনা নদী, মাছ ধরার দৃশ্য আরো কতো কি?

DSC_0597 (1)

হাতিয়া সিলেট থেকে অনেক দূর। কিন্তু আমার ছুটি ঈদের দিন সহ মাত্র তিন দিন। আজ তো এক দিন চলেই গেল। আর মাত্র দুই দিন ছুটি আছে। খুব টেনশনে পরে গেলাম। টেনশন দূর করে দিলো আমার পুরাতন একটা অভিজ্ঞতা। আজ থেকে চার বছর আগে কুরবানীর ঈদে ঠিক এই রকম তিন দিনের ছুটি নিয়ে এক দিনে ঘুরে এসেছিলাম সিলেট থেকে চট্টগ্রাম – কক্সবাজার – চট্টগ্রাম – ঢাকা – কিশোরগঞ্জ হয়ে সিলেট। যদিও সেবার রুটিন মাফিক শুধু নির্ধারিত জায়গা গুলি ঘুরে ছিলাম। তবে এবার কেন পারবোনা। নির্ভয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম তিলোত্তমা হাতিয়া দ্বীপ যাওয়ার। ইচ্ছেই তো শক্তি আর সাহস।

চায়ের দোকানে চা সিগারেট খেতে খেতে ইন্টারনেটে দেখে নিলাম কি ভাবে হাতিয়া যেতে হয়। হাতিয়া যেতে হলে আগে নোয়াখালি যেতে হবে। নোয়াখালি আমার খুব চেনা জেলা শহর। অনেকবার ঘুরতে গিয়েছি ঐ জেলাতে। তাই আর কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

সিলেট থেকে নোয়াখালী যায় একমাত্র বাস বিআরটিসি। তাই কদমতলী বিআরটিসি কাউন্টারে গেলাম। না রাতে নোয়াখলিতে কোন বাস যায়না বলে জানালেন বিআরটিসি কাউন্টারের ম্যানেজার। আমার জানা মতে আরেকটা বাস আছে ইউনাইটেড। যেটা সিলেট থেকে লক্ষিপুর যায় নোয়াখালির চৌরাস্তার উপর দিয়ে। ভাবলাম ইউনাইটেডে দিয়েই চৌরাস্তা পর্যন্ত যাওয়া যাবে। পুরো বাসষ্টেন জুরে খুজতে লাগলাম ইউনাইটেড বাস। কিন্তু না কোথাও খুজে পেলাম না ইউনাইটেড বাস বা বাসের কাউন্টার। শেষ সব শেষ। আর ঘুরা হচ্ছেনা তিলোত্তমা হাতিয়া। মনটা পুরাই ভেঙ্গে গেল।

খুব হতাসা গস্ত্য হয়ে চায়ের দোকানে বসে চা আর সিগারেট খাচ্ছি আর ভাবছি এখন কি করবো? হাতিয়া তো যাওয়া হচ্ছেনা তবে কোথায় যাবো? খুব সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে লাগলাম। চায়ে চুমুক দিচ্ছি আর সিগারাট টানছি। হটাৎ কানে ভেবে আসলো একজন বাস হেল্পারের “কুমিল্লা কুমিল্লা” বলে চিল্লানোর শব্দ। শুনা মাত্রই আমি চিৎকার দিয়ে বলে উঠলাম পেয়েছি পেয়েছি। চায়ের দোকানি সহ আশে পাশের সবাই কেপে উঠলেন আমার চিৎকারে। সবাই এক সাথে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন কি পেয়েছেন। আমি বিষন লজ্জা পেলুম। লজ্জা পেয়ে বললাম না তেমন কিছুনা। চায়ের দোকানের বিল পরিশোধ করে চলে এলাম কুমিল্লা টান্সপোর্ট নামক বাস কাউন্টারে। বাসের লোককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম গাড়িটা রাত আটটায় ছাড়বে কুমিল্লার উদ্যেশে। আমার এখন অনেক আনন্দ লাগতে লাগলো। কে আর ঠেকায় এখন আমার তিলোত্তমা হাতিয়া যাওয়া। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম কুমিল্লা হয়েই নোয়খালি যাবো। নোয়াখালীর মতো কুমিল্লাও আমার খুব চেনা শহর। কুমিল্লা শহরেও অনেক ঘুরেছি আমি। কুমিল্লাতেও কোন সমস্যা হবার কথা নয়।

সিদ্ধান্ত মোতাবেক কুমিল্লা টান্সপোর্ট এর টিকেট কাটলাম কুমিল্লার উদ্যেশে। রাত আটটার দুই এক মিনিট পরে বাস ছেড়ে দিল কুলিল্লার উদ্যেশে। টা টা বায় বায় বলে বিদায় নিলাম সিলেট থেকে। সিলেট থেকে নোয়াখালি তিলোত্তমা হাতিয়া দ্বীপ এর উদ্যেশে রাত দুইটার দিকে কুমিল্লা পৌছে গেলাম। তারপর কুমিল্লা বাস স্টেশন থেকে পায়ে হেটে কুমিল্লা রেল স্টেশন যাওয়ার পথে পুলিশ আটকালো আমায়। চেকিং করার জন্য ডাক দিলো। আমি পুলিশের দিকে এগিয়ে গেলাম।

আসলে পুলিশ চেকিং এ আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই আর আমার ভিতর পুলিশিং ভয়বীথি কাজ করেনা। সৃষ্টিকর্তা আমাকে যে চেহারা দিয়েছেন তা তো পুলিশের নজর কারবেই। পুলিশের দোষই বা কিসে তাতে? ভুলেও আমার চেহারা পুলিশের নজর এড়ায় না আমি জানী। এখন পর্যন্ত এমন কোন পুলিশ চেক পোস্ট নেই যেখানে পুলিশ আমাকে ডাকেনি বা চেকিং করেনি।

যাই হোক পুলিশ আমায় চেক করে আর আমার সাথে কথা বলে জানতে পারলেন আমি হাতিয়া যাচ্ছি ঘুরতে। উনি হাত মিলিয়ে সাবধানে যেতে উপদেশ দিলেন আমায়। আমিও সেই উপদেশ নিয়ে পৌছে গেলাম কুমিল্লা রেল স্টেশন। ষ্টেশনে বসে বসে কয়েকটা চা গিললাম। সাথে সিগারেট তো আছেই। ঘন্টা দুয়েক পরেই একটা ট্রেন আসলো চট্টগ্রাম গামি। বিনা টিকেটে উঠে পরলাম ট্রেনে। ট্রেনের ভিতর তিল ধারনের জায়গা নেই। আমি মনে হয় তিলের চেয়েও ছোট আকৃতির মানুষ তাই কোন রকম দাঁড়িয়ে থেকে বিশ পঁচিশ মিনিটে পৌছে গেলাম লাকসাম জংশনে। স্টেশন থেকে বেড় হওয়ার সময় একজন মুরব্বি দাড়িওয়ালা চাচা টিকেট চেক করছিলেন। আমার কাছে টিকেট চাইলেন। আমি তো টিকেট না কেটেই আসছি তাই চাচাকে বললাম চাচা আমি আসি নাই তো গাড়ি খুজছি নোয়াখালী যাবার জন্য। চাচা আর আটকালেননা আমায়। সোজা চলে আসলাম লাকসাম জংশন মেইন রোডে। ছয়টা বিশ মিনিটের দিকে কুমিল্লা থেকে নোয়াখালী গামি উপকূল নামক বাস ছেড়ে এসে লাকসাম জংশন মেইন রোডে থামলো। আমি উঠে পরলাম উপকূল বাসে নোয়াখালীর সোনাপুর বাস স্টেশন যাবার উদ্যেশে।

নোয়খালি সোনাপুর পৌচে মোবাইলে ঘড়িতে দেখলাম সাতটা চল্লিশ বাজছে। নাস্তা করার উদ্যেশে পিছন দিকে জিরো পয়েন্টের দিকে আসলাম। নাস্তা সেরে আবার চলে গেলাম সোনাপুর বাস স্টেশন। বাস স্টেশন এসে দেখি অনেক গুলি বাস লাইনে দাঁড়ানো হাতিয়া মুখি চেয়ারম্যান ঘাট যাওয়ার জন্য। আমার এখন যেতে হবে চেয়ারম্যান ঘাট। সব গুলি গাড়ির সামনের গ্লাসে লেখা আছে সোনাপুর টু চেয়ারম্যান ঘাট। সবার আগে দাঁড়িয়ে থাকা বাসে উটে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম এটা কি হাতিয়ার দিকে যাবে। উনি বললেন আপনি পিচনের কাউন্টারে যান। পিচনে এসে দেখি এই গাড়ির গ্লাসেও একী লেখা সোনাপুর টু চেয়ারম্যান ঘাট। একটু অবাক হলাম একি রোডের গাড়ি তবুও সার্ভিস আলাদা। যাই হোক কাউন্টার থেকে সত্তর টাকা দিয়ে চেয়ারম্যান ঘাট এর টিকেট কেটে গাড়ির সামন দিকে বসলাম। সামনের দিকে বসার উদ্যেশ হচ্ছে গাড়িতে বসে বসে প্রকৃত দেখা। গ্রামের শহজ সরল মানুষ গুলিকে দেখা। গ্রামের মানুষের জীবন যাপন দেখা। গ্রামের ভিতর দিয়ে চলে যাওয়া মেটো পথ গুলি দেখা। দূর আকাশে ঝাক বেধে উড়ে যাওয়া বকের পাল দেখা। দিঘির জলে শিশুদের দুরন্তপনা আর সাতার কাটা দেখা। গাড়ি রওয়ানা দিল সোনাপুর থেকে চেয়ারম্যান ঘাট এর পথের দিকে। গাড়ি ছুটছে আর আমি তাকিয়ে দেখছি বাংলার অপরূপ মায়া মাখা রুপ।

রাস্থার দু-ধারে সারিসারি গাছ গাছালি। কতো রকম গাছ তা নাম বলে বা গুনে বলা সম্ভব নয়। যদিও আমি তেমন গাছের নাম জানীনা। সকালে বেলা পাখির কিচির মিচির শব্দ কতো মধুর তা কেউ নিজের কানে না শুনলে বুঝতে পারবেননা। এই পাখির কিচির মিচির শব্দ গুলি সবচেয়ে বেশী ভাল লাগবে তাদের যাদের প্রতি সকালে কাকের কর্কশ ডাকে ঘুম ভাঙ্গে। অর্থাৎ ঢাকা বাসির। তাই বলে যে অন্যদের খারাপ লাগবে তা কিন্তু মোটেও ঠিক নয়। গাড়ি যতোই এগিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি ততোই সুন্দর হচ্ছে। চর জব্বর থানার পরেই প্রকৃতির আসল রুপ চোখে পরে। আমি নিশ্চিত কেউ চোখ সরাতে পারবেন না। প্রকৃতি প্রেমিদের খিদা মিঠানোর উপযুক্ত স্থান নোয়াখালীর চর জব্বর থানার সুবর্ণচর উপজেলা।

চলতি পথেই একটা বাজারের সাইন বোর্ডে লেখা দেখলাম হাতিয়া বাজার। আমি তো চমকে গেলাম। আরে হাতিয়া তো মেঘনা নদী মাঝখানে। গাড়ি তো কোন নদী বা ফেরী পার হয়নি। তবে হাতিয়া চলে এলাম কি করে। আমি গুগল ম্যাপে দেখেছি হাতিয়া মেঘনা নদীর ঠিক মাঝখানে। কিন্তু একী হলো মেঘনা পার না হয়েই হাতিয়া চলে এলাম কি করে? কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না এই অঘটনটা। খুব চিন্তায় পরে গেলাম। চিন্তারত অবস্থাতেই গাড়ির হেল্পার চেয়ারম্যান ঘাট নামেন বলে চিল্লাতে লাগলেন। আমি গাড়ি থেকে নেমে দেখি পিচ ঢালা রাস্থা এখানেই শেষ। এর পর থেকে ইট সলিং রাস্তা শুরু। ইট সলিং রাস্তা ধরে একটু এগিয়ে দেখি বিশাল বড় বড় মাছ ধরার নৌকা একটা খালের কাদার মধ্যে আটকে আছে। একটুও পানি নেই খালের মধ্যে। খুব অবাক হলাম এই দৃশ্য দেখে। এই ভরা বর্ষার মৌসুমে খালে এক ফুটা পানি নেই। এক বিন্দু মেনে নিতে পারছিলাম না এমন বাস্তবতা। আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দেখলাম বালুর মাঠ। মাঠের বাম দিকে সম্ভবত পুলিশ ক্যাম্প। পুলিশ ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে গেলাম। আগেই বলেছিলাম আমার চেহারা কোন পুলিশের চোখ এড়ায় না। এবারো তাই হলো। আমি পুলিশের সাহায্য চাওয়ার আগেই একজন পুলিশ দূর থেকে আমায় জিজ্ঞেস করে ফেললেন। এখানে কি খুজচ্ছেন? আমি যতারীতি উত্তর দিলাম হাতিয়া যাব স্টিমার ঘাটটা কোন দিকে? পুলিশ ভাই আঙ্গুলের ইশারায় দেখিয়ে দিলেন বাজারের ভিতর দিয়ে বাম দিকে।

আমিও উনার কথা মতো হাটতে লাগলাম বাজারের বাম দিকে। দূর থেকে তাকিয়ে দেখলাম খালি চর আর চর কোন নদী নেই। মনে মনে পুলিশ বেটারে গালি দিলাম ভুল ঠিকানা দেওয়ার জন্য। একটা সিড়িতে দেখলাম অনেকজন মানুষ দাঁড়িয়ে কি যেন দেখছেন। কৌতুহল বসত আমিও এগিয়ে গেলাম সিড়ির দিকে। ওমা একী এটা তো দেখি নদী। নদীর জল দেখে তো আমি অবাক। এই বর্ষাতেও নদীর জল নদীর তলানিতে। অর্থাৎ হাটু সমান। এতোই তলানিতে যে নৌকা চলা পর্যন্ত সম্ভব হচ্ছেনা। মানুষ জন পায়ে হেটে নদী পার হয়ে যাচ্ছেন ঐ পারে। সিড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ গুলি মুখে কেমন হতাসার চাপ। সবাই হতাসা মাখা মুখ নিয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের চাহনি দেখে আমিও দূরের দিকে তাকালাম। তাকাতেই আমি চমকে উঠলাম। ঐ তো সেই মেঘনা নদী দেখা যায়। যেটা আমি সিলেট থেকে খুজতে আসছি বাসা পালিয়ে মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে। আমার মনের মধ্যে এক অচেনা অজানা অপরিচিত আনন্দ বইতে লাগলো। কিন্তু স্থানীয় মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার মুখটা আবার মলিন হয়ে গেল। কৌতুহল বসত একজন লোককে জিজ্ঞেস করে ফেললাম কি হয়েছে আপনাদের? আপনাদের এমন দেখাচ্ছে কেন? উনার উত্তর আমাকে খুব চমকে দিল। উনি বললেন নদীতে জোয়ার নেই তাই নৌকা ট্রলার চলতে পারছেনা বলে উনারা বাড়ি যেতে পারছেন না। এখন আমি বুঝতে পেরেছি বিশাল বড় বড় মাছ ধরা নৌকা আর ট্রলার গুলি কেন খালের কাদার মধ্যে আটকে আছে। আমার আর বোঝতে বাকী রইলনা এখানকার মানুষ জোয়ার নিরবর। নদীতে আমি কোন দিন জোয়ার দেখিনি। তাই জোয়ার দেখার ইচ্ছা নিয়ে অনেকক্ষণ সিড়িতে দাঁড়িয়ে থাকলাম। কিন্তু না জোয়ারের কোন সম্ভবনা দেখতে পাচ্ছিনা। দাঁড়িয়ে না থাকতে পেরে অবশেষে সিড়িতে বসে পরলাম। স্থানীয় মানুষ জন আমার বসে পরাতে দেখলাম অনেকটা অবাক হলেন। হয়তো এটা উনাদের কল্পনাকে হার মানিয়েছে। কিন্তু আমার কাছে এমন কিছু মনে হয়নি। উনারা হয়তো ভেবেছেন শহরের মানুষ জন এভাবে বসতে পারেনা বা জানেনা বা বসেনা।

অনেকক্ষণ বসে থেকেও জোয়ারের কোন সম্ভবনা নেই। অনেক খিদা লেগেছে। তাই পিচনে ফিরে এসে একটা সাধারন রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম । আসলে এখানের সব গুলি রেস্টুরেন্ট খুব সাধারন। পর্যটকদের জন্য কোন সুবিধা নেই এই অঞ্চলে। থাকা খাওয়া ঘুরার জন্য সরকারী বেসরকারী কোন সুবিদা এখানে নেই। যদিও এখানে রয়েছে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা।

যাই হোক রেস্টুরেন্টে গিয়ে দুইটা সিঙ্গারা আর এক কাপ চা খেয়ে বের হয়ে সিগারেট ধরাতে ধরাতে আবার সিড়ির দিকে গেলাম। না এখনো জোয়ারের কোন সম্ভবনা নেই। জোয়ারের অপেক্ষায় থেকে খুব বিরক্ত লাগছিল। তাই ভাবলাম একটু ঘুরে আসি অন্য পাশে। বাজার থেকে দেখেছি একটা রাস্তা নদীর দিকে মেঘনা নদীর দিক গেছে। দেখি গিয়ে ঐ রাস্তা দিয়ে মেঘনার তীরে যাওয়া যায় কিনা। যেই ভাবা সেই কাজ। হাটতে লাগলাম ইট সলিং পথ ধরে। পথের শুরুতে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম এই রাস্থায় কি মেঘনা নদীর ধারে যাওয়া যায়। উনি উত্তর দিলেন জি যাওয়া যায়। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম কতক্ষন লাগবে যেতে? উনি বললেন মাত্র দশ মিনিট পায়ে হাটলেই পৌছে যেতে পারবেন। আমি উনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে হাটতে লাগলাম। আর দুপাশের গাছ গাছালি পুকুর খাল ঘাস ফুল দেখতে লাগলাম। পথের মাঝে গ্রাম্য বাচ্ছাদের দুরন্তপনা আমাকেও দুরন্ত হতে শেখাচ্ছে। কিন্তু তবুও পারছিনা। কারন শহরের আলসেমিটা তো আর এক দিনে চলে যায়না।

দশ মিনিট হেটে চলে এলাম নদীর ধারে। ওমা একি এটা নদী নাকী সাগর। মেঘনা তো আমি ভৈরবে দেখেছি। এর চেয়ে কত্ত ছোট। কিন্তু এখানে তো মেঘনাকে মেঘনা মনে হচ্ছেনা মনে হচ্ছে আরেকটা বঙ্গোপসাগর। এই অঞ্চলে নদী যেমন চর জাগিয়েছে আগে। এখন ঠিক সেই ভাবেই ভাংছে তার নিজের হাতে গড়া চর। অনেক গুলি বড় বড় গাছ নদীতে চলে গেছে। গাছের ঘুরা গুলি কোন রকমে ঠিকে আছে মাটিকে আখরে ধরে। হয়তো আর কয়টা দিন পরে আর আর মাটি ধরে ঠিকে থাকতে পারবেনা। নদী অনেক গুলি মাছ ধরার ভেসে বেড়াচ্ছে। কিছু কিছু আবার পাড়ে বসে নদীর ডেউয়ের দোল খাচ্ছে। অনেক দূরে তাকিয়ে দেখি বড় বড় মালবাহী ড্রেজার ভেসে ভেসে গন্তব্য ছুটছে। নদীর এই পাড় থেকে ড্রেজার গুলিকে পিপরার মতো ছোট দেখা যাচ্ছে। যদিও বোঝা যাচ্ছে অগুলি বিশাল আকার।

নদী পাড়ের বাম দিকে তাকাতেই চোখে পরলো একটা স্টিমার থেকে অনেক যাত্রী নামছেন। যদিও এটা কোন লঞ্চ বা স্টিমার ঘাট নয়। সম্ভবত ছোট নদীতে জোয়ারের পানি আসেনি বলে ঐ ঘাটে যেতে না পেরে এখানেই যাত্রী নামিয়ে দিচ্ছে। আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম স্টিমারের দিকে। এতক্ষনে সব যাত্রী নামা শেষ। স্টিমার নোঙর আটকে এখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো। ঘাসের উপর বসে থাকা একজন মানুষকে জিজ্ঞেস করলাম ভাই স্টিমার কি হাতিয়া যাবেনা? উনি উওর দিলেন ঘাটে তো পানি নেই তাই যাবেনা। যদিও জোয়ার আসে তবে যাবে মনে হয়। আমি উনাকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি হাতিয়া থাকেন? উনি জানালেন উনার বাড়ি হাতিয়া কিন্তু উনি হাতিয়া থাকেননা। নয় বছর পর উনি হাতিয়া যাচ্ছেন। তবুও যাওয়া হচ্ছেনা আজ নদীতে জোয়ার নেই বলে। উনার চেহারার মধ্যে খুব অসহায়ত্যের ছাপ আমি স্পষ্ট দেখতে পারলাম। নদীর এই পাড় থেকে হাতিয়া দ্বীপ ঝাপসা ঝপসা দেখা যায়। শুধু হাতিয়া নয় অনেক গুলি দ্বীপ দেখা যায়। প্রায় পাচটা দ্বীপ।

লোক মুখে জানতে পারলাম বাম দিকের প্রথম দ্বিপটা হাতিয়া। আমি হাতিয়া দ্বীপের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একটা লঞ্চ আসছে এই দিকে। একটু পরেই এখানে নোঙ্গর করা স্টিমারটি চলে গেল ঐ ছোট নদীর ঘাটের দিকে। আমি জানী এটা ঘাটে যেতে পারবেনা। কারন ওখানে নদীতে হাটু পানি। হাটু পানি দিয়ে এই স্টিমার চলতে পারবেনা। প্রায় দুই ঘন্টা নদীর পাড়ে ঘাসের উপর বসে থেকে মেঘনার ঢেউ দেখছি আর কোমল হাওয়া খাচ্ছি। সিগারেট যে টানছিনা তা কিন্তু নয়। বড় লঞ্চটা এই পাড়ে আসতেই আমি চিনে গেলাম লঞ্চটাকে। এই লঞ্চের ছবি আমি ফেইসবুকে অনেকবার দেখেছি তিলোত্তমা হাতিয়া নামের গ্রুপে। অনেক যাত্রী নিয়ে এসেছে লঞ্চটা। লঞ্চটা পাড়ে লাগাতে সময় লাগলো প্রায় আধা ঘন্টার উপরে। যাত্রী নামতে লাগলো আরো আধা ঘন্টার উপরে। সব যাত্রী নামার পরে আমি লঞ্চের একজন লোককে জিজ্ঞেস করলাম লঞ্চটা কখন যাবে হাতিয়ার দিকে। উনি জানালেন কাল সকালে। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম কেন? উনি বললেন এখন তো যাত্রী নেই। যা আছে তা খুব অল্প। এই অল্প যাত্রী নিয়ে তো আর যাওয়া যায়না। তার উপর আবার নদীতে জোয়ার নেই। জোয়ার হলে হয়তো যাত্রী হতো অনেক। আমার তো মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরলো। তবে কি আর আমার হাতিয়া যাওয়া হচ্ছেনা। মনটা পুরাই ভেঙ্গে গেল। রাগ অভিমান নিয়ে ইচ্ছে মতো সিগারেট টানতে লাগলাম। এখানে চায়ের দোকান নেই। নাহয় কয়েকটা চাও গিলতাম। কি আর করার ধীরে ধীরে চলে এলাম আবার চেয়ারম্যান ঘাট। সিড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম। না নদীতে এখনো জোয়ার এলোনা। সিড়িতে এখন আর আগের মতো অপেক্ষামান মানুষ জন নেই। সম্ভবত নদীতে জোয়ার নেই বলে সবাই আবার ফিরে গেছেন।

স্থানীয় একজনের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম আজ আর জোয়ারের সম্ভবনা নেই। তাই আজ আর কোন স্টিমার বা লঞ্চ হাতিয়া যাবেনা। ভাঙ্গা মনটা আবার ভেঙ্গে গেল। আমি বুঝে নিলাম আজ আর আমার হাতিয়া যাওয়া হচ্ছেনা। হাতিয়া যাওয়া স্বপ্নটা স্বপ্নই রয়ে গেল। তবুও চেষ্টা চালিয়ে গেলাম।

এদিকে দুপুর হয়ে এলো। আমার হাতের সময় প্রায় ফুরিয়ে আসছে। আজ রাতেই আবার আমাকে সিলেট রওয়ানা দিতে হবে। এই টেনশন নিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে নদীর দিকে তাকালাম। নদীর পাড়ে দেখলাম একটা স্প্রিড বোড দাঁড়ানো। কাছে গিয়ে চালকে জিজ্ঞেস করলাম হাতিয়া যাবেন কিনা। উনি বললেন যাবেন কিন্তু শুধু যাওয়ার জন্য উনাকে দুই শত টাকা করে দশ জন যাত্রী মিলে দুই হাজার টাকা দিতে হবে। আবার আসার সময় দশ জন মিলে দুই শত করে দুই হাজার টাকা। যদিও দুই শত টাকা আমার কাছে বেশী মনে হয়নি। কিন্তু দশ জন যাত্রী খোঁজা অনেক কঠিন। কারন আমার আসে পাসে একজন যাত্রীও নেই। সবাই ফিরে গেছেন নদীতে জোয়ার নেই দেখে। আমার একার পক্ষে তো আর দুই দুই চার হাজার টাকা বাড়া দেওয়া সম্ভবনা। আর আমি এতো পয়সা ওয়ালাও নই। পুরো তিলোত্তমা হাতিয়া মিশন এর বাজেট আমার মাত্র দুই হাজার টাকা। আর চেয়ারম্যান ঘাট থেকে হাতিয়ার স্প্রিড বোড বাড়া চার হাজার টাকা। কি আর করার মিশন ইম্প্রসিবল। আমার হাতে আর একদিনও থাকার মতো সময় নেই। নেই হোটেল ভাড়া করে থাকা খাওয়ার টাকা। সত্যি খুব নগন্য মনে হচ্ছে নিজেকে। বুজলাম গরিবের অভাব গরিবের স্বপ্ন ভঙ্গের প্রধান কারন।

পাড়ে এসে ডুবে গেল আশার তরী। গরিবের মিশন এরকমই হয়। আমি গরিব বলে আমার আর্থিক দুর্বলতা আর সময় স্বল্পতা আমার মিশনকে সফল হতে দিলোনা। তবে পণ করেছি ঠিকি আরেকবার আসবো এই তিলোত্তমা হাতিয়া মিশনে। সেবার আর বিফল হয়ে ফিরবোনা। তবে কবে আসবো তা আর আমার জানা নেই। তবে আসবো একদিন এটা সিউর। ফের ফিরে এলাম আপন গন্তব্যে বিফলতা বা পরাজয় মেনে নিয়ে।