ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

সম্ভবত দিনটা ছিল ২০০৭ সালের কোন এক শুক্রবার। তখনকার সময় নিজ এলাকার বন্ধু বান্ধবদের সাথে আড্ডাবাজি ও মেয়েদের সাথে ’টিজ’ করে দিন কাটতো আমার। এখনকার ইভটিজিং -কে তখনকার সময় ’টিছ’ বলা হতো। এলাকার পাড়া প্রতিবেশী ভদ্রলোকদের কাছে তখন খারাপ ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিলাম। স্কিনটাইট জিন্স প্যান্ট আর হাতে রুপার ব্রেসলেট, গলায় চেইন ঝুলে থাকতো সবসময়। তখন লোকে বেশ কদর দিত। এখন বুঝতে পারি সেই কদর প্রকৃত কদর ছিলনা। সেই কদর ছিল লোকের ভয়ভীতি থেকে। সেই কদর মানুষ সামনে থেকে দিত ঠিকই কিন্তু পেছনে  গালি। সেই গালির খবর জানতে পারলে ডেকে নিয়ে আসতাম আড্ডা খানায়। তারপর কিছু উত্তম মাধ্যম।

তো এভাবেই একদিন রাতের দিকে আড্ডা দিচ্ছিলাম। তখন রাত দশটার উপরে ছিল। আমার সবচেয়ে খারাপ একজন বন্ধু একজন ৯০ বৎসর বয়সি মহিলা সাথে নিয়ে ডেকে বললো এই চাচী লালটিলার দিকে হাঁটছিলেন একা একা। আমি চাচীকে জিজ্ঞেস করলাম, চাচী আপনার বাসা কোথায় ? চাচী উত্তরে বললেন আমার বাসা ভাইবোন মাজারের ওখানে। আমি বুঝলাম চাচী পাঠানটুলার কথা বলছেন। আমি আবার চাচীকে জিগ্যেস করলাম, তা চাচী আপনি এখানে কী করে আসছেন? চাচী জবাবে বললেন, আমি বিয়েতে আসছি সেন্টারে। আমি চমকে গেলাম। কারণ আমাদের এলাকায় তখন কোন কমিউনিটি সেন্টার ছিলনা। তাই আমি চাচীর কাছে জানতে চাইলাম কোন সেন্টারে এসেছেন চাচী? চাচী বললেন ভাইবোন মাজারের পাশের বাসা থেকে গাড়ি দিয়ে সেন্টারে এসেছি। আমি চাচীকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, চাচী সেন্টারের নামটা কি বলতে পারবেন? উনি জবাবে বললেন, আমি সেন্টারের নাম জানিনা। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, চাচী সেন্টারের ঠিকানাটা কি বলতে পারবেন? চাচী মাথা নাড়িয়ে না সূচক জবাব দিলেন।

আমি কোন উপায় না পেয়ে এক হাত মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আরেক হাত দিয়ে এতক্ষন যাবত চাচীকে ধরেই আছি। চাচীকে আমার যে খারাপ বন্ধুটা নিয়ে এসেছিল সে তখন আমার কানে কানে বললো চাচীর হাতে সোনার চুড়ি ও গলায় সোনার চেইন আছে। চল এগুলি মেরে দেই। আমি চাচীর হাত ও গলার দিকে তাকিয়ে দেখলাম চাচীর হাতে বেশ ভারি ভারি একজোড়া সোনার চুড়ি ও গলায় মোটাসোটা একটা চেইন ঝুলছে। অলংকারগুলি সোনার রঙের ছিল ঠিকই কিন্তু সোনা ছিল কিনা আমি জানিনা। কারণ এ বিষয়ে আমার কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না। তবে আমার খারাপ বন্ধুটার বেশ অভিজ্ঞতা ছিল। কারণ  বাটপার হিসেবে এলাকায় বেশ পরিচিত ছিল তার। তো আমি আমার খারাপ বন্ধুটাকে ধমক দিলাম এমন কথা বলার জন্য।

 

আমি  এলাকায় খারাপ ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিলাম তবে ছিনতাই-বাটপারি-লোক ঠকানো ইত্যাদি কোনো অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে কারো ছিলনা। কারণ আমি এমন ছিলাম না । তবে আমার বন্ধু মহলের মধ্যে অনেকেই এমন বদগুণের অধিকারী ছিল। আমি সমাজের ভদ্র মহলে খারাপ ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিলাম ঠিকই কিন্তু সাধারণ লোকদের কাছে ছিলাম বেশ জনপ্রিয়।
তো যাই হোক, আমি টের পেলাম আমি যে হাত দিয়ে চাচীকে ধরে আছি সেই হাতটি আমার খুব কাঁপছে। আমি বুঝতে পারলাম আমার হাত নয় চাচী কাঁপছেন । আমি তখন ভাবলাম চাচীর বয়স খুব বেশী বলে হয়তো চাচী খুব কাঁপছেন। আমার ভাবনা ভুল প্রমাণ করে দিতে চাচী আমাকে বললেন, আমার খুব ক্ষিদা লেগেছে আমাকে কি অল্প কিছু ভাত খাওয়াতে পারবে? চাচীর কথাগুলি শোনা মাত্রই সেই অমানুষ আমিটার ভিতর এক মানুষ জেগে উঠলো।

আমরা চাচীর সাথে আমাদের পাড়ার একটা রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়েই কথা বলছিলাম। সাথে রেস্টুরেন্টে ঢুকে চাচীকে চেয়ারে বসিয়ে বয়কে ডেকে বললাম, তাড়াতাড়ি এখানে ভাত দে। আর তরকারি কী কী আছে বল? আমার আরেকটা বন্ধুকে বললাম, যা গ্লাসে পানি নিয়ে আয়। এই রেস্টুরেন্টা কিন্তু এই বন্ধুর মামার। আমি তার মামাকে চাচা বলে ডাকি আর উনি আমাকে আব্বা বলে ডাকেন।

বয় ছেলেটা ভাত দিল টেবিলে। আর আমি আমার বন্ধুর হাত থেকে পানি ভর্তি গ্লাস নিয়ে একটা প্লেটে নিজ হাতে হাত ধোয়াতে ধোয়াতে বললাম, কী খাবেন চাচী? চাচী বললেন যে কোন কিছু। আমি বললাম, এই যা মোরগ নিয়ে আয়। চাচী বললেন, উনি মাংস খেতে পারেন না। উনার দাঁত নেই। বললাম, তবে মাছ দে। চাচী বললেন, মাছ খেতে পারবেন না। উনি চোখে ঠিক মতো দেখতে পাননা । আমি বললাম, সমস্যা নেই আমি খাইয়ে দেব। চাচী একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন, না, নিজের হাতে খেতে পারবো। এমন ভাবে আদর আমার মাও কোন দিন আমায় করেনি। দু’চোখের কোনে দু ফোঁটা পানি চলে আসলো। আমি আড়ালে পানি মুছে নিয়ে বয় ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম, চাচীর খাওয়ার মতো কী আছেরে? ছেলেটি বললো, মিষ্টি কুমড়ার সবজি আছে। চাচীর কাছে আমি জানতে চাওয়ার আগেই চাচী বয় ছেলেটির কাছে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে মিষ্টি কুমড়ার সবজি দিতে বললেন। ছেলেটি এনে দিল। চাচী ধীরে ধীরে খেতে লাগলেন। ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় ১২টার কাছাকাছি।

চাচীর খাওয়া দাওয়ার ফাঁকে আমার খারাপ বন্ধু ও আরেকটা বন্ধু আমায় ইশারায় বাহিরে আসার কথা বললো। আমি চাচীর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বাহিরে আসলাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বল কী বলবি? ও বললো কিরে চুরি আর চেইন মারতে নাকী তুই বারণ করেছিস ওকে (খারাপ বন্ধুটা দিকে হাত দেখিয়ে)? আমি উত্তরে বললাম, হ্যা, তোর কোনো সমস্যা? সে বললো, গাধার মতো কথা বলিস না তো। পরে পস্তাবি কিন্তু। আমি উত্তরে বললাম তুই তো দেখছি ঐ (খারাপ বন্ধুটিকে দেখিয়ে) বাটপারটার সাথে যোগ দিয়েছিস। খারাপ বন্ধুটা তখন আমায় কি বলতে যাচ্ছিল আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম তোরা চলে যা। চাচীর কী ব্যবস্থা করা লাগে আমি করবো বলেই আমি হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে চাচীর কাছে চলে আসলাম। এসে দেখি চাচী এখনো আস্তে ধীরে খাচ্ছেন।

তো চাচী ধীরে ধীরে খাচ্ছেন। আর আমার ঐ বন্ধু দুইটা ভিতরে এসে একটা আরেকটার সাথে কানাকানি করছে লক্ষ্য করলাম। আমি তাদের দিকে পাত্তা না দিয়ে আমাদের এলাকার বড় ভাই, ওয়ার্ড কমিশনার প্রার্থীকে কল দিলাম। ভাইকে চাচীর সব ঘটনা খুলে বললাম। ভাই বললেন, উনি অনেকটা দূরে আছেন। আসতে দেড়টা বেজে যাবে। আমি যেন কোন ব্যবস্থা নেই। আমি ওকে বলে লাইন কেটে দিলাম। লাইন কাটা মাত্রই আমার বন্ধু দুইটা আমায় বললো,  এসব বলতে গেলি কেন? আমি ধমক দিয়ে বললাম, তোদের বলেছিনা তোদের কোন সমস্যা থাকলে চলে যেতে। আমার ধমক খেয়ে তারা আবার বাহিরে গিয়ে কি যেন গুণ গুণ করতে লাগলো। আমি চাচীর দিকে তাকিয়ে চাচীকে জিজ্ঞেস করলাম, চাচী আর কিছু লাগবে কিনা? চাচী বললেন, আর খেতে পারবো না। আমি চাচীর প্লেটে তাকিয়ে দেখি ভাত প্রায় পুরাটাই প্লেটে রয়ে গেছে। আমি বললাম, আরো অল্প কিছু খেয়ে নিন। উনি আর পারবেন না বলে পানি খেতে লাগলেন। আমিও আর জোড়াজুড়ি করলাম না।

খাওয়া দাওয়া শেষে আমি চাচীকে বললাম, চাচী আজ রাতটা আপনি আমাদের বাসায় থেকে যান। চাচী আমার গালে হাতাতে হাতাতে বললেন আরেক দিন থাকবো। আজ বাসায় চলে যেতে হবে। ছেলেমেয়েরা চিন্তা করছে। চাচী এমনভাবে কথাগুলি বলছিলেন যেন চাচী হারিয়ে যাননি। বরং আমার কাছে বেড়াতে এসেছেন।

আমরা রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে একটু হাঁটতে লাগলাম ভাইবোন মাজারে যাওয়ার জন্য রিক্সা নেওয়ার উদ্দেশ্যে। হাঁটতে হাঁটতে চাচীকে  জিজ্ঞেস করলাম, চাচী আপনি কি ভাইবোন মাজারের কাছে গেলে আপনার বাসা চিনতে পারবেন? চাচী আমায় এমন উত্তর দিলেন আমি চমকে গেলাম। বললেন ভাইবোন মাজারে না দরগা গেইট উনার বাসা। আমি কী বলবো কী করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। চাচী একবার বলছেন উনার বাসা ভাইবোন মাজারে আরেকবার বলছেন শাহজালাল মাজারে। এই খটকা আমাকে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগাতে লাগলো। চাচীকে বন্ধু দুইটার হাতে দিয়ে আমি আবার আড়ালে এসে সিগারেট টানতে টানতে সিদ্ধান্ত নিলাম আমার পরিচিত কোতয়ালী থানার বন্দর বাজার ফাঁড়ির এসআই জালাল ভাইকে ফোন করবো। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া মাত্রই দৌড়ে আবার চাচীর কাছে যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে জালাল ভাইকে কল দিলাম।

কল চলছে আর আমি চাচীর বাম হাত ধরে। হাত ধরতেই দেখলাম চাচীর হাতটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। আমি সন্ধিহান চোখে আমার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে চাচীর পুরা হাতটা চেক করে দেখলাম চাচীর হাতে চুড়ি নাই। সাথে সাথে ডান হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমার বাটপাট বন্ধুটা চাচীর ডান হাতের চুরি খোলার চেষ্টা করছে। আমি ধমক দিয়ে বললাম ছাড় ওটা। আর যেটা খুলে ফেলেছিস সেটা আবার পরিয়ে দে। এতোক্ষনে মোবাইলের লাইনটা কেটে গেছে। ওপাশ থেকে রিসিভড হয়নি বলে। আমি আমার মোবাইলটা বন্ধুর হাতে দিয়ে বললাম চুড়িটা দে। সে আমতা আমতা করে কি বললে বলতে চুড়িটা দিল। আমি তার কথায় গুরুত্ব না দিয়ে বললাম দেখ ডায়ালে এস আই জালাল লেখা নাম্বার আছে ওটাতে কল দে। সে কল দিচ্ছে আমি চাচীকে চুড়ি পরিয়ে দিচ্ছি। চুড়ি পরানো শেষে আমি ওর হাত থেকে মোবাইলটা কানে লাগাতেই ওপাস থেকে জালাল ভাই হ্যালো বলে উঠলেন। আমিও হ্যালো বলে জিগ্যেস করলাম কোথায় আপনি? উনি বললেন বাসায় ঘুমাচ্ছি, কিন্তু কেন? আমি বললাম একটা দরকার ছিল। আচ্ছা ঠিক আছে ঘুমান বলে লাইন কেটে দিলাম। কারণ উনি আজ নাইটে ডিউটিতে নেই।

তারপর ফোনবুক থেকে এসআই মাসুদ রানার নাম্বার বের করে কল দিলাম। হ্যালো বলে জিজ্ঞেস করলাম কোথায় আছেন? জানালেন শিবগঞ্জ। বুঝলাম উনি এখন ডিউটিতে আছেন। তাই চাচীর ঘটনা খুলে বললাম। উনি জানালেন এ রকম একটা ম্যসেজ এসেছে উনাদের কাছে থানা থেকে। কিন্তু উনি কোন বিস্তারিত জানেন না। আমি বললাম আপনি থানাতে খোঁজ নিন। উনি বললেন, উনি থানার ডিউটি অফিসারকে আমার নম্বর দিচ্ছেন। অফিসার আমার সাথে কথা বলে বিষয়টা ক্লিয়ার করে নেবেন। আমি উনাকে ওকে ধন্যবাদ বলে লাইন কেটে দিলাম।

বন্ধুদের বললাম আয় চাচীকে নিয়ে রেস্টুরেন্টের ভিতরে বসি। ঘড়িতে প্রায় একটা বাজে। রেস্টুরেন্টের স্টাফদেরকে বললাম, এক সাইট খোলা রেখে শাটার লাগিয়ে ফেলতে। আর তোরা ঘুমিয়ে পর যাবার সময় আমি তোদের ডেকে দিয়ে শাটার লাগাতে বলে যাবো। একটা ছেলে শাটার লাগাতে গেল। বাকিরা বসেই রইলো কেউ ঘুমাতে গেলনা। আমি আবার বললাম, যা ঘুমা গিয়ে। ওরা জানালো এখন ঘুমাবে না চাচীর একটা দিক হোক তারপর ঘুমাবে। আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না এরা কেন ঘুমাতে চাচ্ছেনা। হয়তো ওদের মানবিক দিক থেকে নয়তো নাটকের শেষ অংশ দেখার আগ্রহে। তাই আর আমি ওদেরকে ঘুমানোর চাপ দিলামনা।

আমার মোবাইলে কল বেজে উঠলো অচেনা নাম্বারের। বুঝে নিলাম থানা থেকে। রিসিভড করে হ্যালো বললাম। ওপাশ থেকে সালাম দিয়ে বললেন আপনি কি রফিক। জবাবে বললাম জি আপনি নিশ্চয়ই থানা থেকে কল করেছেন এস আই মাসুদ রানা সাহেবের থেকে কাছ থেকে ঘটনা জেনে। উনি বললেন জি, একজন বৃদ্ধ মহিলা নিখোঁজের খবর আমাদের কাছে মহিলার সন্তাররা নিয়ে এসেছিলেন। মহিলার পড়নে বাসন্তী রঙের শাড়ি, বয়স ৯০, গায়ে খয়েরি রঙের পাতলা শাল। আমি বললাম জি এই চাচীর সাথে সব ঠিক ঠিক মিল আছে। উনি বললেন বৃদ্ধ মহিলাকে জিগ্যেস করুন তো উনার বড় ছেলের নাম কি? আমি চাচীকে জিগ্যেস করলাম চাচী আপনার বড় ছেলের নাম কি? উনি কাপাকাপা কন্ঠে বললেন আক্তার। আমি সিউর হওয়া এবং থানা অফিসারকে শুনানোর জন্য একটু জোরে বললাম কি বললেন আক্তার? চাচী মাথা নেরে হ্যা সূচক জবাব দিলেন। থানা অফিসার অপাশ থেকে বলতে লাগলেন জিগ্যেস করেন তো উনার ছেলে কি করেন? আমি ওকে বলে চাচীকে জিগ্যেস করলাম চাচী আক্তার ভাই কি করেন? চাচী আবার কাপাকাপা কন্ঠে জবাব দিলেন স্কুল মাস্টার। আমি আবারো সিউর হওয়া এবং থানা অফিসারকে শুনানোর জন্য একটু জোরে বললাম কি বললেন স্কুল মাস্টার। অপাশ থেকে অফিসার বলেন সম্ভবত মিলে গেছে। আমাদের কাছে জিনি এসেছিলেন উনার নাম আখতারুজ্জাম। উনি সরকারী গালস স্কুলের একজন শিক্ষক। আমি বললাম তবে তো মিলে গেছে। এখন উনাদেরকে খবর দিন উনি বললেন ওকে, শাহী ঈদগাহে আমাদের একটা টিম আছে ডিউটিতে। আমি টিমকে আপনার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি এবং বৃদ্ধ মহিলার ছেলে মেয়েদেরকে আপনার নাম্বার আর ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি উনারা আপনার সাথে কথা বলে নেবেন। আমি ওকে সালাম দিয়ে লাইন কেটে দিলাম।

লাইন কাটতেই দেখলাম আমার বন্ধুরা ও রেস্টুরেন্টের স্টাফরা আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। যেমনটা সিনেমার পর্দায় দর্শক তাকিয়ে থাকে সিনেমার শেষ অংশের আগ মুহূর্তে। আমি চাচীর দিকে তাকিয়ে দেখলাম চাচীর আমাদের দিকে কোন মনোযোক নেই। আমি চাচীর কানের কাছে গিয়ে বললাম চাচী শীত লাগছে নাকি? চাচী আমার মুখে হাত বুলিয়ে বললেন না। আমি এতোক্ষন লক্ষ্য করলাম চাচী খুব সংক্ষিপ্ত কথা বলেন। অল্প কথায় উত্তর দেন। চাচীকে জিগ্যেস করলাম চাচী চা খাবেন। চাচী মাথা নাড়িয়ে না করলেন।
আমি আর চাচীকে কোন প্রশ্ন করে বিরক্ত করলাম না।

আমি খুব বেশী চা সিগারেট খাই। সিগারেট কয়েকটা খেলেও এতোক্ষন যাবত কোন চা খাওয়া হয়নি। তাই মানিব্যাগ হাতে নিয়ে আমার বন্ধুকে বললাম এখানে তো চা নেই, চুলা বন্ধ। যাতো শাহী ঈদগাহ থেকে চা নিয়ে আয়। হোটেলের চায়ের কারিগর বললো ভাই চা আনতে হবেনা আমি এখানেই বানিয়ে দিচ্ছি। আমি বললাম থাক তোর আর কষ্ট করা লাগবে না। ছেলেটা বললো না ভাই কি বলেন? কষ্ট হবে কেন? আমি বললাম আচ্ছা ঠিক আছে যা। আমি পকেট থেকে বন্ধুকে টাকা দিয়ে বললাম যা তো চায়ের সাথে খাওয়ার জন্য কিছু নিয়ে আয়। কারিগর ছেলেটি চা বানাতে পেছন দিকে গেল সাথে গেল আরো দুইজন স্টাফ। আর সামন দিকে গেল আমার বন্ধু একজন স্টাফকে সংগে নিয়ে।

আমি আরেক বন্ধুকে চাচীর খেয়াল রাখিস বলে বাহিরে চলে গেলাম একটা সিগারেট টনতে। সিগারেট প্রায় শেষ বিতরে থেকে ডাক এলো চা হয়ে গেছে। আমি চা খেতে চলে আসলাম। একটা ছেলে চা দিল আমার হাতে। আমি চা হাতে নিলাম সাথে সাথে ফোন বেঁচে উঠলো। সালাম দিয়ে হ্যালো বললাম। ওপাশ থেকে সালাম নিয়ে বললেন আমি আখরুজ্জামান আপনি রফিক ভাই তাইনা। আমি বললাম জি ঠিক আছে আমি রফিক। উনি বললেন আপনার এখন কোথায় আছেন বলুন। আমি আমাদের অবস্থান জানালাম। উনি বললেন ঠিক আছে আমরা অতিদ্রুত আসছি বলে সালাম দিয়ে লাইন কেটে দিলেন। লাইন কাটার সাথে সাথে রাস্তায় শুনলাম সিএনজি গাড়ি থামার শব্দ। বুঝলাম ডিউটিরত পুলিশ টিম এসে পরেছে। আমি একটা ছেলেকে পাঠিয়ে দিলাম পুলিশ টিমকে ভিতরে নিয়ে আসতে। উনারা ভিতরে আসলেন। আমি এসআই’র সাথে হাত মিলিয়ে উনাদেরকে বসতে বললাম। এবং জানালাম চাচীর ছেলে কল দিয়েছিলেন। শিঘ্রই আসছেন জানিয়েছেন। উনি ঠিক আছে বলে বসে পরলেন। আমি চায়ের কারিগরের দিকে থাকিয়ে বললাম কিরে চা আছে আর? ও বললো অনেক টুকু আছে ভাই। আমি বললাম উনাদেরকে চা দে। উনাদেরকে দিয়ে যদি থাকে তবে আমাকেও বাহিরে এক কাপ দিয়ে যাস। বলে আমি বাহিরে চলে গেলাম সিগারেট টানতে। ছেলেটা একটু পরে এসে চা দিয়ে গেল। আমি চা খেতে খেতে সিগারেট টানতে লাগলাম।

ভিতরে আসতেই এসআই সাহেব আমাকে ইশারায় ডাকলেন। আমি গেলাম। উনি কানেকানে বললেন উনার গায়ে তো সোনার জিনিস দেখছি। সব ঠিক আছে তো। আমি আমার বাটপার বন্ধু ও তার সাথেরটাকে জিগ্যেস করলাম কিরে চাচীর গয়নাগাটি সব ঠিক আছে তো। ওরা আমতা আমতা করে জবাব দিল হে সব ঠিক আছে। এসআই সাহেব বললেন বলেন আপনাকে আমি কানেকানে বললাম কেউ যেন না শুনে তাই, আর আপনি বলে থেমে গেলেন। আমি হাসতে হাসতে বললাম আমার ঐ দুই বন্ধুকে গয়নার দ্বায়ীত্ব দিয়েছি তো তাই ওদেরকে কাছ থেকে জেনে নিলাম। সবাই হেসে উঠলো শুধু চাচী ও আমার দুবন্ধু ছাড়া। সবাই কি বুঝে হাসলো আমি জানিনা। তবে আমার বন্ধু দুটি কেন হাসেনি সেটা ঠিকি আমি জানি। আর চাচী এমনিতেই শান্তসৃষ্ট স্বল্পভাষী মানুষ বলে হাসেননি।

যাই হোক হাসির মাঝখানে আমার মোবাইলটা বেজে উঠলো। মোবাইলের স্কিনে দেখলাম আমাদের কমিশনার পার্থী বড় ভাইর নাম ভেসে উঠেছে। আমি সবাইকে হাসি থামাতে বলেই কল রিসিভড করে সালাম দিলাম। বড় ভাই বললেন খুব লেইট হয়ে গেছরে। তা বল তোদের কি খবর? আমি ঘড়ির দিকে থাকিয়ে দেখলাম দেড়টার উপরে বাজে। কিন্তু ভাই বলেছেন দেড়টায় আসবেন। তো যাই হোক আমি বড় ভাইকে চাচীকে নিয়ে আমাদের বর্তমান অবস্থা সব জানালাম। ভাই বললেন উনি গাড়িতে আধা ঘন্টার মধ্যে আসছেন। আমি ঠিক আছে বলে সালাম দিয়ে লাইন কেটে দিলাম।

বাহিরে একটি মাইক্রোবাস গাড়ি থামার শব্দ শুনলাম। তাই বাহিরের দিকে গেলাম। দেখলাম গাড়ি থেকে কয়েকজন নামছেন। একজন গাড়ি থেকে নামতে নামতে হাত এগিয়ে দিয়ে আমায় বললেন আরে রফিক আপনি। তা কেমন আছেন? আমি হাত মিলিয়ে বললাম ভাল তা আপনি কেমন আছেন? উনি ভাল জবাব দিয়ে বলতে লাগলে এখানে একজন মহিলা……… আমি উনাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বললাম আখতার ভাইকে? উনি হাত দিয়ে দেখাতে যাবেন এমন সময় একজন মাঝ বয়সি লোক এসে বললেন জি আমি আখরুজ্জামান। আমি হাত মিলিয়ে বললাম আসুন ভিতরে আসুন বলে রেস্টুরেন্টের ভিতরে নিয়ে আসলাম। উনারা ভিতরে আসতেই চাচীকে দেখে
আম্মা বলে দৌড়ে গিয়ে জরিয়ে ধরে চিৎকার দিয়ে উনারা সবাই কাদতে লাগলেন। আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, না শুধু উনারা কাদছেন না। কাদছে আমার বাটপার বন্ধুসহ সব সব বন্ধুরা। কাদছে হোটেল স্টাফরা। এবং কি পুলিশ বাহিনীও। কিন্তু আমার কখন থেকে দু চোখ দিয়ে জল ঝরছে আমি বুঝতেই পারলাম না। বুঝতে পারলাম তখন যখন চাচী আমার কাছে এসে উনার দু হাত আমার না জানা চোখের জল মুছে দিলেন। আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম। কারণ আমার কাদার কথা নয়। কারণ আমি একদল পাতি মাস্তানের টিম লিডার। এদের কোন মন থাকেনা। এদের মন থাকতে নেই। ওরা অমানুষ। মনহীন অমানুষ কাদতে পারেনা।

চাচী আমার চোখের জল মুছে দিয়ে ভালবাসা দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আমিও এই ভালবাসার মধ্যে নিজেকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলার প্রথম শিক্ষা পেলাম। এবাবে একে একে চাচীর ছেলে ও আত্মীয়রা আমায় পরম ভালবাসা দিয়ে বুকে জরিয়ে ধরেলেন। এবার টের পেলাম আমার চোখ দিয়ে আবার জল ঝড়ছে। আমি সবার আড়ালে জল মুছে নিলাম। জানিনা সে দিন সবার থেকে সত্যি চোখের জল আড়াল করতে পেরেছিলাম কিনা।

আবেগ প্রবণ মুহূর্তের শেষে পুলিশের এসআই উনার ডিউটি পালনে ব্যাস্ত হতে লাগলেন। চাচীর বড় ছেলেকে বললেন দেখুন আপনার মায়ের সব ঠিকঠাক আছে কিনা। আখতার সাহেব কোন কিছু না দেখেই বললেন জি ঠিক আছে। আমি বললাম একটু ভাল করে খেয়াল করে দেখুন না। উনি আমাকে বললেন আপনি যদি বলেন সব ঠিক আছে, তবে সব ঠিকঠিক। আপনি যদি বলেন ঠিক নেই, তবে ঠিক নেই। আমি আমার ঐ বন্ধু দুটিকে জিগ্যেস করলাম সব ঠিক আছে তো? ওরা উত্তর দিল সব ঠিক আছে। আমি বললাম ওরা যখন ঠিক আছে বলেছে তখন নিশ্চয়ই ঠিক আছে। এসআই সাহেব আখতার সাহেবের উদ্দশ্যে বললেন তবে এখন আপনার উনাকে নিয়ে যেতে পারেন। এবং কাল থানায় গিয়ে একবার দেখা করে আসবেন। উনি এসআই সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে ঠিক আছে বললেন।

আখতার সাহেব আমাকে উনার ভিজিটিং কার্ড দিয়ে উনাদের সাথের একজনকে (জিনি আমাকে চিনেন) জিগ্যেস করলেন তুমি উনাকে চিনো কি করে? উনি উত্তরে বললেন আমি যখন টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বিএড ট্রেনিং এ ছিলাম। তখন থেকে উনার সাথে আমার পরিচয়। উনার আমাদের কলেজের অধ্যপকদের সাথে বেস সখ্যতা ছিল। উনি আমাদের কলেজের প্রোগ্রামে গান গেয়েছেন অনেক বার। আমি মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আখতার ভাই বললেন অহ তাই। আমি জি বলে বললাম চাচী আমাকে প্রথম উনার ঠিকানা বলেছেন ভাইবোন মাজার। তো আমরা চাচীকে নিয়ে ভাইবোন মাজারে যাওয়ার জন্য যখন রিক্সা ডাকলাম তখন চাচী বলে উঠছেন উনার বাসা শাহজালাল মাজার একালাকায়। তখন খটকা লাগায় আমরা আর ভাইবোন মাজার কিংবা শাহজালাল মাজার এলাকাতে যাইনি। উনি বললেন আসলে আম্মা ভুল বলেননি। তবে আম্মা বয়সের কারণে আপনাকে বুঝিয়ে বলতে পারেননি। ভাইবোন মাজার এলাকায় আমার বোনের বাসা আর শাহজালাল মাজার এলাকায় আমাদের বাসা। এমনতাবস্তায় একটি পাজারো জিপ গাড়ি এসে থামলো। গাড়িটি আমাদের কমিশনার প্রার্থী বড় ভাইর। উনি গাড়ি থেকে নেমে এলেন। উনি আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেলেন কিরে সব দেখি একাই ঠিকঠাক করে নিয়েছিস। কাদে হাত রেখে বললেন গুড গুড। আমি চাচীর আত্মীয় ও পুলিশ টিমের সাথে উনার পরিচয় করিয়ে দিলাম। পরিচয় শেষে পিছন থেকে একজন ঘড়ি দেখে বললেন রাত দুইটার উপরে বাজে। এখন আমাদের যাওয়া উচিত।

চাচীকে নিয়ে চাচীর বড় ছেলে এবং আমি ধরেধরে নিয়ে গাড়িতে তুললাম। একে সবাই গাড়িতে উঠে গেলেন।
ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিলেন চাচী গাড়ির জানালা দিয়ে আমাকে ডেকে উনার নাকে নাক ঘষে আদর করতে লাগলেন। গাড়ি একটু একটু করে চলতে লাগলো। গাড়ি একটু এগিয়ে যাওয়ায় আমি গাড়ির সাইটে পিছনে পরে গেলাম। সবাই তখন গাড়ির ভিতর থেকে হাত নাড়িয়ে আমায় টাটা দিতে লাগলেন। এবং কি চাচী নিজেও। চলতে চলতে গাড়ি আমাদের চোখের আড়াল হয়ে গেল। আমি তবুও এক ধ্যানে থাকিয়ে ছিলাম গাড়ি যে দিকে চলে গেল সে দিকে। ধ্যান ভাংলো এসআই সাহেবের কথায়। আমি ধ্যানমগ্ন থাকায় এসআই সাহেব কি বলেছেন ঠিক বুঝতে পারলাম না। তাই আবার জিগ্যেস করলাম কি? উনি বললেন আমরাও যাই তবে। আমি হাত মিলিয়ে বললম ওকে যান। উনি আমাকে সম্মান সূচক (কদর) সালাম দিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু উনি আমার বয়সের প্রায় দুগুন বড়। আমি বুঝতে পারলাম এ সম্মান প্রকৃত সম্মান। এ সম্মান একজন মানুষকে সম্মান। এ সম্মান আমার মানুষ হয়ে উঠার প্রথম সম্মান। আর এতো দিন যে সম্মান পেতাম (কদর) সেটা প্রকৃত সম্মান নয়। সে সম্মান ছিল একজন অমানুষকে সম্মান। যে সম্মান (কদর) মানুষ ভয়ভীতি দিত, ভালবেসে নয়।

একটু পরে আমাদের কমিশনার প্রার্থী বড় ভাই ও বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। রেস্টুরেন্ট স্টাফদের বললাম অনেক কষ্ট দিলাম রে তোদের। এবার সাটার লাগিয়ে ঘুমিয়ে পর। অদের মধ্যের একজন বলে উঠলো ভাই আপনাকে আমার সারা জীবন মনে থাকবে। আমি তাকে গালে হাত বুলিয়ে আদর করে বন্ধুদের নিয়ে বাহিরে চলে এলাম। ঐ বন্ধু দুইটাকে বললাম কিরে কোনটা ভাল হলো? গয়নাগুলি মেরে দেওয়া নাকী এটা?
বাটপারটা কোন জবাব দিলনা। কিন্তু বাটপারের সাথে যোগ দেওয়া বন্ধু আমাকে ঝড়িয়ে ধরে বললো তুই আজ অনেক ভাল একটা কাজ করেছিস। আমি ঐ বাটপাড়টার কথায় ভুল করেছিরে আমায় ক্ষমা করে দিস। এই বন্ধুটি এবাবে অনেকবার আমায় বুকে জরিয়ে ধরেছি। কিন্তু কোন দিন তার বুকে জরিয়ে ধরার মধ্যে এতো গভীর ভালবাসার অনুভব পাইনি। সেও কোন দিন এতো গভীর ভালবাসা দিয়ে আমায় জড়িয়ে ধরেনি। এ আমার মানুষ হয়ে উঠার প্রথম ভালবাসা।

আমি পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে দিয়ে অদেরকে বললাম নে ধরা। আমাকেও একটা ধরিয়ে দিস। সাথে সাথে আমার ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে চেয়ে দেখি মা। আমি মাকে খুব ভয় পাই। তাই ভয়ে ভয়ে ফোন ধরে বললাম হ্যালো। মা এই রাত তিনটা বাজে তোর দেখি কোন আসার খর নাই। আমি এই তো আসছি, তুমি ঘুমাও বলে লাইনটা কেটে দিলাম।

বন্ধুর হাত থেকে একটা ধরানো সিগারেট টান দিয়ে নিয়ে টানতে টানতে বললাম আজ থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে একটি ভাল কাজ করার যাত্রা শুরু। বলেই সুরঞ্জনাকে কল দিয়ে বন্ধুদের সাথে হাত মিলিয়ে বিদায় জানিয়ে হাঁটতে লাগলাম বাসায় ফেরার পথে। সুরঞ্জনাকে বললাম আজ একটা ভাল কাজ করেছি। সুরঞ্জনা বললো ওরে আমার ফেরেস্তারে। আজ থেকে আপনি আমার ফেরেস্তা…।