ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

‘সীমান্তে যা কিছু ঘটছে, তার সঙ্গে বহু বিষয় জড়িত। এগুলো রাষ্ট্রীয় বিচারযোগ্য কোনো বিষয় নয়।’ গত ২২জানুয়ারি প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলোর ‘উদ্ধৃতি’ ছিলো এই বাক্য দুটি। আর যা বলেছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ওই দিন প্রকাশিত প্রথম আলোর এ বিষয়ের প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল- সীমান্তের ঘটনা নিয়ে চিন্তিত নয় সরকার। প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য তুলে ধরছি- ‘দুই দেশের পক্ষ থেকেই চোরাকারবারি, মাদক পাচার ও গরু চুরি হচ্ছে, প্রতিনিয়ত ঘটনাগুলো ঘটছে। এসব অতীতে ঘটেছে এখনও ঘটছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে। এগুলো নিয়ে সরকার খুব বেশি চিন্তিত নয়’ ।

সম্প্রতি চাপাইনবাবগঞ্জের একজন যুবক সীমান্তের ওপারে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নির্যাতিত হন। এ সম্পর্কিত ভিডিও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার-প্রকাশিত হলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। আর তাই ওই ঘটনার বিষয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি এসব মন্তব্য করেন। যিনি- এই সরকার চিন্তিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি কিন্তু এই সরকারের মুখপাত্রও বটে। ফলে তার এই কথাকে কেবল একজন মন্ত্রীর মন্তব্য নয় সরকারের কথা বলেই ধরে নিতে হবে। কিন্তু ওই ঘটনার পর আমরা টেলিভিশনগুলোতে এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রে দু;শ্চিন্ত ভঙ্গীমায় অনেককেই উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখেছি।ন যাদেরকে আমরা বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর বিশ্লেষক বলি। সেই বিশিষ্টজনেরা গুরুত্ব দিয়েই বলেছেন- সরকারকে উদ্বিগ্ন হতেই হবে- ভারতের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের স্বার্থে।

বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন অধিকার’র গত তিন বছরের মানবাধিকার প্রতিবেদনগুলো দেখলেও উদ্বেগের উদ্রেক হয়। কারণ অধিকার বলছে-গত ২০১১সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এই নয়মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে ২১ বাংলাদেশি। ওই সংগঠনের প্রতিবেদন অনুসারে ২০১০ সালে ভারতীয় বাহিনীর হাতে বাংলাদেশি নিহত হয়েছিল ৭৪ জন এবং ২০০৯সালে ৯৬জন। এতো গেলো কেবল নিহতের তথ্য। আহত বা নির্যাতিত ও বন্দি হওয়া মানুষের সংখ্যা তিন বছরে কয়েক হাজার। আরেকটি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মানবাধিকার প্রতিবেদনেও প্রায় একই ধরণের তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে। দুটি সংগঠনই বলছে- এই হিসাব কেবলমাত্র সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে করা। তার মানে বলা যায় সংবাদপত্রে সংবাদ হয়নি এমন অনেক ঘটনাও ঘটে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এসব তথ্য উপাত্ত হাজির করার একটাই যুক্তি মন্ত্রী মহোদয়ের হাস্যজ্জল মুখে বলা- সরকার চিন্তিত নয়’ এমন কথার বিপরীতে চিন্তিত হওয়ার কারণ বানানো।

সরকারের মুখপাত্র মাননীয় মন্ত্রী যখন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলছিলেন- সরকার চিন্তিত নয়, ঠিক তখনই খবর আসে যশোরের বেনাপোলের ধান্যখোলা সীমান্তে বিএসএফ’র গুলিতে রাশেদুজ্জামান নামের আরেক বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছেন। এই খবরটিও ২২শে জানুয়ারির প্রথম আলোতে প্রথম পৃষ্ঠায় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়েছে বেশ চিন্তিত ভাষায়ই। ওই সপ্তাহেই কুমিল্লার সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির এক সদস্যকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল বিএসএফ। নির্যাতিত হয়েই পরে তিনি ফিরে এসেছেন পতাকা বৈঠকের পর। এমন সংবাদও আমরা প্রথম আলোসহ অনেক পত্রিকায় পড়েছি।
ফলে আমাদের মন্ত্রী বা সরকার উদ্বিগ্ন বা চিন্তিত হওয়ার সুযোগ না থাকলেও আমরা সাধারণ মানুষ চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন হতে বাধ্য হই। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের চিন্তা বা উদ্বেগের প্রথম কারণ- আমাদের সরকার চিন্তিত নয়। আর দ্বিতীয় কারণ- প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ মানুষের, নির্যাতিতও হচ্ছে সাধারণ মানুষই। যে সাধারণ মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়ে নেতারা মন্ত্রী বা এমপি হন পরবর্তীতে সরকার গঠন করেন, সেই মানুষের মৃত্যু বা নির্যাতনের খবরে সরকার চিন্তিত হবে এটাই বোধ হয় শোভন। কারণ- সরকার চিন্তিত এমন কথা শুনলে আমরা আমজনতারা শান্তি পাবো এই ভেবে যে, যাক সরকার আমাদের কথা ভাবে। মানে আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করবো আমাদের সরকার তো এমনটাই হওয়ার কথা।

গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে লঞ্চ ডুবির ঘটনায়, অনেক প্রাণহানীর পর এক মন্ত্রী হয়তো মুখ ফসকেই বলে বসেছিলেন ‘আল্লাহর মাল, আল্লাহ নিয়ে গেছেন’ প্রথম আলোর সচেতন পাঠকদের মনে আছে মন্ত্রীর সেই বাণীর পর তিনি কতটা নিন্দিত হয়েছিলেন। অবশ্য সেই নিন্দার আগুনে ঘি ঢেলেছিল ‘চারপেয়ে ছাগল’। মনে আছে নিহতদের পরিবারকে একটি করে ছাগল ক্ষতিপূরণ দেবার ঘোষণাও দিয়েছিল সেসময়ের সরকার। আর এখন বলা হচ্ছে- এগুলো রাষ্ট্রীয় বিচারযোগ্য বিষয় নয়-সরকার চিন্তিতও নয়। বাহ্, হায়রে জনগণের ভাগ্য।

তাহলে সরকার আসলে কিসে চিন্তিত? সরকারের কর্মকাণ্ড আর ভাবগতি দেখে মনে হচ্ছে না তারা কোন বিষয়ে চিন্তিত। লাখলাখ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে যখন বাকরুদ্ধ হয়ে ঘরে ফেরেন। বাজার চাঙা করার দাবিতে রাজপথে মিছিল করেন তখনও তো সরকারকে কুব বেশি তো দূরে থাক সামান্য চিন্তিত বলেও মনে হয় না, পুঁজিবাজারের ক্রম নিম্নগতি নিয়ে। সরকার অর্থনীতি নিয়ে চিন্তিত হলে অর্থমন্ত্রী বলতে পারতেন না সুচক যখন বাড়ে তখন তখন তো কাউকে আনন্দ মিছিল করতে দেখি না, ইত্যাদি ইত্যাদি।(স্মৃতি থেকে লিখলাম… কথাগুলো বোধ হয় এমনই ছিল)।

সর্বশেষ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মী জুবায়ের আহমেদ হত্যা কিংবা তারও আগে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক হত্যার মতো অনেক ঘটনাই ঘটেছে এই সরকারের গত তিন বছরের মেয়াদে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও জেলায় জেলায় প্রতিদিনই খুন হচ্ছেন মানুষ, গুম হচ্ছে মানুষ। পত্রিকার পাতায় পাতায় দেখা যায় স্বজন হারাদের আহাজারির ছবি। স্বজনরা প্রশ্ন তোলেন- কার বুক খালি করেছো? এসব ঘটনায়ও তো সরকার চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন হয়েছে এমন কথা শুনি না কোন মন্ত্রীর মুখে।

দুর্ণীতির অভিযোগে যখন স্বপ্নের পদ্মাসেতুর অর্থ আটকে দেয় দাতারা তখনও তো কোন উদ্বেগ প্রকাশিত হয় না সরকারের তরফ থেকে। কোনো মন্ত্রীই বলেন না, আমরা বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত, সরকার ভাবছে সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে, কেউ বলেন না। সরকারের যেন কোন বিষয়েই চিন্তিত হতে নেই।

অতিসম্প্রতি অবশ্য একটি বিষয়ে চিন্তিত বলে মনে করেছে সাধারণ মানুষ। আর সেটি হলো- সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান ও সরকার উৎখাতের ব্যর্থ চেষ্টার ঘটনা। এটি অবশ্যই সরকারকেই কেবল কেন সাধারণ মানুষকেও চিন্তিত করে তুলেছে। এই ঘটনায় সাধারণ মানুষ চিন্তিত এই কারণে যে তারা অনির্বাচিত স্বৈরাচারী সামরিক শাসন তারা চায় না, জনগণ কেবল তাদের ভোটের অধিকার বজায় থাকুক এটাই চায়। কিন্তু ওই ঘটনায় সরকার চিন্তিত ভিন্ন কারণে। ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের ব্যর্থ চেষ্টার ঘটনায় পরতে পরতে রাজনীতির অপার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। বিরোধী দলকে কোণঠাসা করার দারুণ সুযোগ ওই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ব্যর্থ চেষ্টায় তৈরি হয়েছে। আর সেকারনেই সরকারের মন্ত্রী সাহেবরা সভা-সমিতিতে তাদের চিন্তিত হওয়ার কথা বারবার বলছেন। যা শ্রোতা বা সাংবাদিকরা শুনতে না চাইলেও বলছেন। ‘চিন্তিত’ এই কথাটির তাৎপর্য যেন সামরিক অভ্যুত্থানের ব্যর্থ চেষ্টায় নতুন করে প্রমাণিত হলো। যে ঘটনা ঘটেনি বা ঘটতে গেলেই আমাদের দেশপ্রেমিক সেনারা তা প্রতিহত করবেই এবং এমন চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হবে বরেই সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে সেই অঘটিত ঘটনায় সরকার চিন্তিত হয়ে রাতের ঘুম হারাম তুলেছে। কিন্তু মানুষের মৃত্যু-গুম-নির্যাতন এসব কোনো ঘটনাতেই সরকারের বোধে চিন্তার উদ্রেক হয় না।
সরকার যখন সাধারণ মানুষ নিয়ে চিন্তিত হয় না বা নির্লিপ্ত থাকে তখন কিন্তু সাধারণ মানুষই সরকার নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায়। কারণ সাধারণ মানুষই ভোট দিয়ে সরকার গঠন করেছে, করে এবং ভবিষ্যতেও করবে। এটাই গণতান্ত্রিক দেশে আইনসিদ্ধ বিষয়। সরকার যদি কেবল ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা নিয়ে চিন্তা করে, বিরোধী দলকে বিপাকে ফেলার ফন্দি আঁটে তাহলেই বিপদ। সরকার জনগণকে নিয়ে চিন্তিত হলেই জনগণ তার সুচিন্তিত রায় প্রদান করে। আগের জামানায় করেছে ব্যালটের মাধ্যমে আর এখন না হয় করবে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-ইভিএম’র বাক্সে। অন্য দিকে সরকারের চিন্তার কেন্দ্র থেকে যদি ‘জনগণ’ উবে যায় তাহলে ইভিএমও বোধ হয় অকার্যকর হয়ে পড়বে। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা এই সরকারই কেবল দাবি করতে পারে তারাই জনগণের সরকার। কারণ এর আগে এতো বেশি জনসমর্থন নিয়ে কোন রাজনৈতিক দলই ক্ষমতার স্বাদ নিতে পারেনি। ফলে জনগণের সরকার দাবিদার এই সরকারেরই তো জনগণের দু:খে চিন্তিত এবং আনন্দে উদ্বেলিত হওয়ার কথা। যদিও গত তিন বছরে এমন কোন নজির সরকার স্থাপণ করেনি। তাই বলে জনগনের সু-চিন্তিত রায় আদায়ের জন্য সরকার আগামী দুই বছরেও জনগণের জীবন-মরণ নিয়ে চিন্তিত হবে না তা বিশ্বাস করা দুমুর্খের কাজ।
গত চারদলীয় জোট সরকারও ক্ষমতা পেয়ে জনগণকে চিন্তা থেকে বাদ দিয়েছিল। তার ফল সবার জানা। এবার হয়তো তার উল্টোটাও হতে পারে। আবার নাও হতে পারে কারণ, জনগণের হৃদয় হলো দয়ার সাগর। আর যে সাগরে হাঙার-কুমিরের চাইতে ভোটের স্রোতই বেশি। যার যেটা খুশি চোখ বন্ধ করে বেছে নেবে। সময় আর বেশি নাই।

বি.দ্র রেফারেন্স হিসেবে প্রথম আলো’র তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র।