ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

ধৃ ধাতু থেকে ধর্ম শব্দটির উৎপত্তি। ধৃ অর্থ যা ধারণ করা হয়। অর্থাৎ দৃশ্য-অদৃশ্যের বস্তু-অবস্তু সকলেই যা কিছু ধারণ করে তাই তাদের ধর্ম। বস্তুকে যতই বিভাজিত করা হোক, বিভাজিত প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুই সহজাত স্বভাব বা গুনাগুন ধারণ করে থাকে। এই সহজাত স্বভাব বা গুনাগুনই যার যার ধর্ম। যেমন- মানুষের ধর্ম মানবিক, পশুর ধর্ম পাশবিক, বায়ুর ধর্ম বায়বীয়তা, পানির তরলতা ইত্যাদি। মানুষের ধর্মে কোন সাম্প্রদায়িকতার সুযোগ নেই, কেননা সমস্ত মানুষ একই জাতি (সূরা বাকারা ২: ২১৩)। মানুষ মাত্রই একাকার আল্লাহর প্রতিনিধি; তারতম্য হয় জ্ঞান লাভের ওপর। সহজ কথায় বস্তুর-অবস্তু সকলের ধর্মেই সাম্প্রদায়িকতার কোনই বালাই নেই, একাকার প্রকৃতির নিয়মেই তা ধারণ করে থাকে।

অন্যদিকে, বিজ্ঞান হলো বি+জ্ঞান = বিশেষ জ্ঞান। যিনি বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন তিনি বিজ্ঞানী। বিশেষকে ইংরেজীতে বলে স্পেশাল, এর সীমাবদ্ধতা আছে, অসীম নয়। অসীম-অফুরন্ত-অদৃশ্য-অজানা জ্ঞান থেকে সূত্র বা বস্তুর ধর্ম সম্পর্কে আগাম নিশ্চিত হয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিন্তা, ধ্যান-ধারণা, গবেষণার মাধ্যমে যে বিশেষ জ্ঞান আমাদের কাছে দৃশ্যমান হয় বা জানতে পারি তাই বিজ্ঞান। গুঁরু ম জ বাসার আরো
সুন্দর ও সহজভাবে বিজ্ঞানকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তিনি বলেন- (অবাস্তব/অদৃশ্য) জ্ঞানের বাস্তব রূপকেই বিজ্ঞান বলে।

বিজ্ঞান যা কিছু আবিষ্কার করে প্রকৃতিতে তার অস্তিত্ব ছিল বলেই আবিষ্কার করতে পারে। আগে থেকেই সবকিছুর অস্তিত্ব আছে, আবিস্কারের মাধ্যমে শুধু রূপান্তরিত হয়। কেননা আল্লাহ বলেন [সূরা ফুরকান ২৫: আয়াত ৫৯] তিনি আকাশমন্ডলী, পৃথিবী ও উহাদের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছু ছয় দিবসে সৃষ্টি করেন —————।

যতক্ষণ আবিষ্কৃত হয়না ততক্ষণ আমাদের কাছে অবাস্তব/অদৃশ্য থাকে। [সূরা ফাত্হ্ ৪৮: আয়াত ২১] —— আরও রহিয়াছে যা এখনও তোমাদের অধিকারে আসেনি। তা তো আল্লাহর নিকট মওজুদ আছে ———-।

আর যখন আবিষ্কৃত হয় তখন তা বাস্তবে পরিনত হয়, আমরা দেখতে পারি। উদাহরণস্বরূপ: উড়োজাহাজ যখন আবিষ্কৃত হয় নি, তখন তা আমাদের কাছে অবাস্তব/অদৃশ্য ছিল। বিজ্ঞানী যখন উড়োজাহাজ আবিষ্কারের চিন্তা/গবেষণা করল তখন পর্যন্তও উড়োজাহাজের অস্তিত্বের ধারণা শুধুমাত্র বিজ্ঞানীর মধ্যেই ছিল। কিন্তুু যখন তিনি আবিষ্কার করে দেখালেন উড়োজাহাজ তখন সকলের কাছে দৃশ্যমান হলো এবং অবাস্তবটিই বাস্তবে রূপান্তরিত হলো।

ধর্ম ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক চিরন্তন। যেমন: আমি তুমি সে। আমি = সত্ত্বানুভূতি, তুমি = প্রেম, সে = জ্ঞান। আমার আমিত্ব দিয়া অফুরন্ত জ্ঞান রাজ্যের যে যতটুকু জানতে পেরে প্রেমডোরে তুমি করতে পারে সে ততটুকু আল্লাহবোধ অনুভূতি বা জ্ঞান অর্জন করতে পারে। [সূত্র: কোরান বনাম শরিয়ত]।

অর্থাৎ, বস্তুর ধর্ম/স্বভাব/গুনাগুন সম্পর্কে চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, গবেষণার মাধ্যমে অবাস্তব/অদৃশ্যের অফুরন্ত জ্ঞান রাজ্য থেকে জ্ঞান অর্জন করেই মানুষগণ বিজ্ঞানী, কবি-সাহিত্যিক, দার্শনিক তথা নবী-রাসুল হয়ে থাকেন। কোরান দেখুন:

[সুরা আশশুরা ৪২: ৫১ নং আয়াত]- অমা কানা লিবাসারিন আই ইউকাল্লিমাহুল্লাহু ইল্লা ওয়াহইয়ান আও মিওওয়ারা’য়ি হিজাবিন আও ইউরসিলা রাসুলান —। অর্থ: কোন মানুষ (বাসার) এর পক্ষে সম্ভব নয় যে আল্লাহ তার সংগে বাক্যালাপ (অফুরন্ত জ্ঞান রাজ্য থেকে জ্ঞান অর্জন) করবেন সরাসরি ওহী ব্যতীত কিংবা পর্দার অন্তরাল ব্যতীত কিংবা দূতের মাধ্যম ব্যাতীত। এ আয়াতে জ্ঞান অর্জনে তিনটি মাধ্যমের কথা বলা হয়েছে। ১. সরাসরি ওহী ২. পর্দার অন্তরাল ৩. দূত মাধ্যম। আল্লাহ বোধ বা জ্ঞান অর্জনের এ তিনটি মাধ্যমই অদৃশ্যকে দৃশ্যতর করে অবাস্তবকে বাস্তবে রূপান্তর করে সকলকেই নিরপেক্ষ সেবা প্রদান করে থাকে। যেমন: নবী-রাসুল, দার্শনিক, কবি-সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিকগণ কোন সম্প্রদায় বা দল-উপদলের নয়, তাদের জ্ঞানতত্ত্বে সকলেই নিরপেক্ষ সেবা পেয়ে থাকে।

ধর্ম ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতে হলে আয়াতে বর্ণিত ৩ নং ‘দূত মাধ্যম’ বিষয়ে আলোচনা জরুরী। প্রচলিত মতে দূত বলতে ফিরিস্তা বা জিব্রাইল অথবা বিশালাকৃতির কিছু একটাকে ধারণা করা হয়, যা বাস্তবে সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না। কিন্তুু সহজভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় প্রকৃতিই হচ্ছে জ্ঞান অর্জনের বাস্তবিক দূত। প্রকৃতির এটা কি, ওটা কি, কেন কীভাবে ইত্যাদি প্রশ্ন এবং সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে থাকে। আলোকিত মহাপুরুষগণও প্রকৃতিতে বিরাজমান বাস্তবিক প্রশ্ন এবং সমস্যা সমাধানের উদ্দেশে চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, গবেষণার মাধ্যমে আলোকিত হয়ে থাকেন। দার্শনিক, কবি-সাহিত্যিকগণও এই প্রকৃতিকেই জ্ঞানের দূত হিসেবে জানেন। তাইতো মহান আল্লাহ কোরানে বার বার ঘোষণা করেন প্রকৃতির দিকে লক্ষ্য করতে, কেননা প্রকৃতিতে রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন। দেখুন-

[সূরা নূর ২৪: আয়াত ৪৩-৪৪] ৪৩. তুমি কি দেখ না, আল্লাহ সঞ্চালিত করেন মেঘমালাকে, তৎপর তাহাদেরকে একত্র করেন এবং পরে পঞ্জীভূত করেন, অতঃপর তুমি দেখিতে পাও, উহার মধ্য হইতে নির্গত হয় বারিধারা; আকাশস্থিত শিলাস্তূপ হইতে তিনি বর্ষন করেন শিলা এবং ইহা দ্বারা তিনি যাহাকে ইচ্ছা আঘাত করেন এবং যাহাকে ইচ্ছা তাহার উপর হইতে ইহা অন্য দিকে ফিরাইয়া দেন। মেঘের বিদ্যুৎ ঝলক দৃষ্টি শক্তি প্রায় কাড়িয়া নেয়। ৪৪. আল্লাহ্ দিবস ও রাত্রির পরিবর্তন, ইহাতে শিক্ষা রহিয়াছে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য। ৪৫. আল্লাহ সমস্ত জীব সৃষ্টি করিয়াছেন পানি হইতে, উহাদের কতক পেটে ভর দিয়া চলে, কতক দুই পায়ে চলে এবং কতক চলে চার পায়ে, আল্লাহ যাহা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্ব শক্তিমান। ৪৬. আমি তো সুষ্পষ্ট নিদর্শন অবতীর্ণ করিয়াছি, আল্লাহ যাহাকে ইচ্ছা সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।

[সূরা বাকারা ২: আয়াত ১৬৪] নিশ্চয়ই আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত্রি ও দিবসের পরিবর্তনে, যাহা মানুষের হিত সাধন করে তাহাসহ সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানসমূহে, আল্লাহ আকাশ হতে যে বারিবর্ষণ দ্বারা ধরিত্রীকে তাহার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন তাহাতে এবং তাহার মধ্যে যাবতীয় জীবজন্তুর বিস্তারণে, বায়ুর দিক পরিবর্তনে, আকাশ ও পৃথিবীর নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে জ্ঞানবান জাতির জন্য নিদর্শন রহিয়াছে।

তাইতো কবি প্রকৃতিকে পাঠশালা উল্লেখ করে বলেন –
আকাশ আমায় শিক্ষা দিল
উদার হতে ভাই রে,
কর্মী হবার মন্ত্র আমি
বায়ুর কাছে পাই রে।
পাহাড় শিখায় তাহার সমান –
হই যেন ভাই মৌন-মহান,
খোলা মাঠের উপদেশে –
দিল-খোলা হই তাই রে।
সূর্য আমায় মন্ত্রণা দেয়
আপন তেজে জ্বলতে,
চাঁদ শিখালো হাসতে মোরে,
মধুর কথা বলতে।
———————-
———————-
বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর,
সবার আমি ছাত্র,
নানান ভাবে নতুন জিনিস
শিখছি দিবারাত্র।
এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়,
পাঠ্য যে সব পাতায় পাতায়
শিখছি সে সব কৌতুহলে,
নেই দ্বিধা লেশমাত্র।

অর্থ্যাৎ প্রকৃতিতে বিরাজমান আকাশ-বাতাস, মাটি, পানি, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, অনু-পরমানু, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তু-অবস্তু সকল কিছুই যে অফুরন্ত জ্ঞান রাজ্য থেকে জ্ঞান আহরণের বাস্তবিক দূত তা স্পষ্টই বলা যায়। এরপরে এ দূত কে ফিরিস্তা-জিব্রাইল যাই বলা হোক আপত্তি নেই।

ধর্ম থেকে বিজ্ঞান কিংবা বিজ্ঞান থেকে ধর্মকে কোনভাবেই আলাদা করা যায় না। কেননা, বিজ্ঞানীগণকে বস্তুর ধর্ম/স্বভাব/গুনাগুন সম্পর্কে আগাম জেনেই গবেষণার মাধ্যমে অফুরন্ত জ্ঞান রাজ্য থেকে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করতে হয়। অর্থাৎ বিজ্ঞানীগণ যখন কোন কিছু আবিস্কারের জন্য গবেষণা করেন তখন তাকে অবশ্যই গবেষণা বস্তুটির বা প্রকৃতির এ সমস্ত আকাশ-বাতাস, মাটি, পানি, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, অনু-পরমানু, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তু-অবস্তুর স্বভাব, গুনাগুন বা ধর্ম সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হয়। বস্তুটির ধর্ম সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারলেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গবেষণার মাধ্যমে অবাস্তবকে বাস্তবে রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়, যাকে বলা হয় বিজ্ঞান, আর যিনি এ জ্ঞান অর্জন করেন তাকে বলে বিজ্ঞানী। সুতরাং ধর্ম হলো বিজ্ঞানের গবেষণার সূত্র তাই ধর্ম ও বিজ্ঞান ওতপ্রোতভাবে জড়িত।