ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

অমর একুশে বইমেলায় ৪৫০ নং স্টলে ‘ঘাস ফুল নদী’- তে ম. জামিলুল বাসারের ‘কোরান বনাম শরিয়ত’ গ্রন্থটি পাওয়া যাচ্ছে। নিম্নে উল্লেখিত প্রতিবেদনটি বইটি থেকে হুবহু তুলে ধরা হলো:

৫৪ মৃত্যুর পূর্বে সম্পত্তি বণ্টন বাধ্যতামূলক
[উত্তরাধিকারী আইন]
হাঁ! বিষয়টি নতুন শুনলেও কোরানের অমোঘ বিধান। মৃত্যুর আগে স্ব জ্ঞানে, স্ব ইচ্ছামতো সম্পত্তি ত্যাগ বা বণ্টন করে যাওয়া প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক; অন্যথায় তাঁর ক্ষমা নেই! জান্নাতের আশাও নেই! সুতরাং অবিলম্বে বিধানটি বলবৎ করা উচিত:
১. তোমাদের মধ্যে যখন কারো মৃত্যু উপস্থিত হয় আর তার যদি ধনসম্পত্তি থাকে, তবে পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনের জন্য অছিয়ত করার বিধান দেওয়া হল। মুত্তাকীদের জন্য এটা অবশ্য পালনীয়। তা জানার পরও যদি কেউ তা অস্বীকার/ পরিবর্তন করে তবে সে পাপী হবে; নিশ্চয়ই আল্লাহ সব শোনেন, সব জানেন। তবে যদি কোনো অছিয়তকারীর পক্ষপাতিত্ব বা অন্যায়ের আশংকা করে তবে নিরপেক্ষ মীমাংসায় দোষ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু [২: বাকারা-১৮০-১৮২]
আল্লাহর নবি মৃত্যুশয্যায়
‘‘-এক সময় তাঁর মনে পড়ল, বিবি আয়শার (রা) হাতে অনুর্ধ্ব ৯টি দিরহাম রয়েছে। তাঁর আদেশে মুদ্রাগুলো তাঁর হাতে দেয়া হলে তিনি বললেন, ‘এগুলো আমার মালিকানায় থেকে গেলে আমি কেমন করে আল্লাহর সামনে দাঁড়াব? এগুলো দান করে ফেল।’ (দ্র: সং. ই. বিশ্বকোষ, ২য় খ. ২য় সংস্করণ, পৃ: ২৫৮)
আল্লাহর নবি, বিশাল রাজ্যের অধিপতি
‘‘-ইনতিকালের সময় হযরত (সা.)-এর সম্বলের মধ্যে ছিল একটি শ্বেত খচ্চর, কিছু যুদ্ধাস্ত্র এবং একখন্ড জমি। এই জমিটুকুও ইনতিকালের পূর্বে দান করে দেয়া হয়েছিল। হযরত (স.)-এর বর্মটি কয়েক সা’ যবের পরিবর্তে বন্ধক ছিল এক য়াহুদির কাছে। প্রদীপ জ্বালাবার জন্য আইশা এক প্রতিবেশিনীর কাছ থেকে তেল ধার করেছিলেন।’’ (দ্র: সং. ই. বিশ্বকোষ, ২য় খ. ২য় সংস্করণ, পৃ: ২৫৯; ই. ফা)
পুরুষ/বাবার উত্তরাধিকারী আইন
২. আল্লাহ তোমাদের ছেলে-মেয়েদের সম্বন্ধে নির্দেশ দিচ্ছেন:এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান; কিন্তু কেবল কন্যা দুইয়ের অধিক থাকলে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুইতৃতীয়াংশ, আর মাত্র এক কন্যা থাকলে তার জন্য অর্ধাংশ। তার সন্তান থাকলে তার পিতা-মাতা প্রত্যেকের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-ষষ্ঠাংশ; সে নিঃসন্তান হলে এবং পিতা-মাতাই উত্তরাধিকারী হলে তার মাতার জন্য এক-তৃতীয়াংশ; তার ভাই বোন থাকলে মাতার জন্য এক-ষষ্ঠাংশ; এসবই সে যা ওসীয়ত করে তা দেয়ার এবং ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও সন্তানদের মধ্যে উপকারে কে তোমাদের নিকটতর তা তোমরা অবগত নও। এটা আল্লাহর বিধান; আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। [ ৪: নিছা-১১]
নারী/মাতার উত্তরাধিকারী আইন
৩. তোমাদের স্ত্রীদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধাংশ তোমাদের জন্য, যদি তাদের কোনো সন্তান না থাকে; এবং তাদের সন্তান থাকলে তোমাদের জন্য তাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ; ওসীয়ত পালন এবং ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের সন্তান না থাকলে তাদের জন্য তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির একচতুর্থাংশ, আর তোমাদের সন্তান থাকলে তাদের জন্য তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-অষ্টমাংশ; তোমরা যা ওসীয়ত করবে তা দেয়ার পর এবং ঋণ পরিশোধের পর। যদি পিতা-মাতা ও সন্তানহীন কোনো পুরুষ অথবা নারীর উত্তরাধিকারী থাকে তার এক বৈপিত্রেয় ভাই অথবা ভগ্নী তবে প্রত্যেকের জন্য একষষ্ঠাংশ। তারা এটার অধিক হইলে সকলে সম-অংশীদার হবে এক তৃতীয়াংশে; এটা যা ওসীয়ত করা হয় তা দেয়ার এবং ঋণ পরিশোধের পর, যদি কারো জন্য ক্ষতিকর না হয়। এটা আল্লাহর নির্দেশ, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল। [৪: নিছা-১২]
উভয়ের উত্তরাধিকারী আইন
৪. তারা তোমার কাছে জানতে চায়! বল! যে ব্যক্তি পিতামাতা ও সন্তানহীন, তার সম্বন্ধে আল্লাহ বিধান দিচ্ছেন: সে যদি মারা যায়, কিন্তু এক বোন থাকে, বোনটি তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধেক পাবে, আর সে হবে তার উত্তরাধিকারী যদি তার ছেলে (ভাই) না থাকে, কিন্তু যদি ২ বোন থাকে তবে তারা পাবে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ আর যদি ভাইবোন থাকেতবে পুরুষরা পাবে স্ত্রীলোকের দুই অংশের সমান। আল্লাহ পরিষ্কার নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তোমরা পথভ্রষ্ট না হও। [৪: নিছা-১৭৬]
৫. সম্পত্তি বণ্টনকালে য়াতীম আত্মীয় এবং অভাবগ্রস্ত লোক থাকলে তাদেরকে তা থেকে কিছু অংশ দিবে এবং তাদের সঙ্গে সদালাপ করবে। [৪: নিছা-৮]
সম্প্রতি বর্তমান সরকার আয়াতে বর্ণিত নারীর ‘দ্বিগুণ পুরুষের অংশ’ এই অসম বিধানটি সংস্কার করে নারী-পুরুষ সমান অংশীদার করার একটি মহৎ যুগান্তকারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কিন্তু শরিয়ত এটাকে কোরানবিরুদ্ধ কাজ, কোরানের ওপর হস্তক্ষেপ, ইসলাম গেল, ধর্ম গেল ইত্যাদি অপপ্রচার করে জনসাধারণকে ক্ষেপিয়ে সরকারের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে এবং বিভিন্নভাবে সরকারকে অনবরত হুমকিধমকিও অব্যাহত রেখেছেন। নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি ও যুক্তি-প্রমাণাদিসহ বিধানগুলোর নিম্ন বর্ণিত বিচারবিশ্লেষণ জনসাধারণের কানে পৌঁছে দিতে পারলে সরকারের ঐ পদক্ষেপকে ৯৯% শতাংশ লোক স্বাগতম জানাবে বলেই বিশ্বাস।
বিচার-বিশ্লেষণ
ক. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বদা স্মরণীয় যে, উপরোল্লিখিত ২ থেকে ৪ নং আয়াতগুলোতে স্পষ্ট যে, ঐ বিধানগুলো উত্তরাধিকারীদের আইন; স্বত্বাধিকারীর আইন নয়; অর্থাৎ মরা মানুষের পরিত্যক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারার বিধান। জীবিত মানুষের সম্পত্তি বণ্টনের বিধান নয়।
খ. সম্পত্তিধারী জীবিত মানুষের ফরজের ফরজ, ওয়াজিব বা বাধ্যতামুলক বিধান হল উপরোল্লিখিত ১ নং ধারা; অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বে স্ব জ্ঞানে, স্ব-ইচ্ছায় যাকে ইচ্ছা তাকেই অছিয়ত বা উইল করে যাওয়া; এটা সম্পত্তিধারীর যেমন কঠিন বাধ্যতামূলক পালনীয় ঠিক তেমনই বাধ্যতামূলক অনুসরণীয় উত্তরাধিকারীদের ক্ষেত্রে। পরবর্তী আয়াতেও সর্বোচ্য গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যে, ভাগ-বাটোয়ারার পূর্বে অছিয়ত নামা বা উইল যা করে/বলে গেছে তা শিরোধার্য মানতে হবে; অতঃপর তার দেনা শোধ করতে হবে। তারপরও সতর্ক করা হয়েছে যে, এটা যারা অস্বীকার এমনকি পরিবর্তন করবে তারা পাপী হবে। এক্ষণে স্পষ্ট যে, প্রত্যেক মুসলিম মৃত্যুর পূর্বে তার সম্পত্তি উইল করতেই হবে। সুতরাং আকস্মিক মৃত্যু ইত্যাদি বিশেষ কারণ ব্যতীত প্রধানত ধর্মভীরুদের মৃত্যুর পর কোনোই সম্পত্তি থাকতে পারে না। তবুও বিশেষ কারণে যদি কিছু থেকেই থাকে তবে তার দেনা শোধ করার পরেই (যদি থাকে) পুরুষ ২ ও নারী ১ হিসেবে বণ্টিত হবে। অতএব প্রচলিত
বিধানটি একেবারেই গৌণের গৌণ তো বটেই উপরন্তু তা সম্পত্তিধারী জীবিতদের জন্য প্রযোজ্যই নয়। কিন্তু শরিয়ত এই ওয়াজিব (১নং ধারা) বিধানটি কালাকাল যাবৎ অবহেলা বা অস্বীকার করে আসছে; এমনকি ১৪শ বছর যাবৎ জনসাধারণকে জানতেও দেয়নি। মুসলিমগণ যদি স্ব স্ব ছেলে-মেয়েদের বর্তমান, ভূত-ভবিষ্যৎ আর্থিক সচ্ছল-অসচ্ছলতা বিচার-বিশ্লেষণে, ছেলেদের মধ্যে বেশি-কম বা মেয়েদের ছেলের সমান বা দ্বিগুণ সম্পদ উইল করে যায় বা মৃত্যুর আগখানে ঘোষণা করে যায়! তাতে অবশ্যই কোরান লঙ্ঘিত হয় না! বরং কোরানের পাকা-পোক্ত অনুসারী বলেই সাব্যস্থ হয়। এক্ষণে নারী ১ পুত্র ২ সম্পর্কীয় প্রচলিত আইনটি অতিরিক্ত (নফল) এবং একেবারেই গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে; কারণ তারা পিতা-মাতার মৃত্যুর পূর্বেই উইল করা প্রয়োজনীয় সম্পত্তি প্রাপ্ত হয়েছে; অতঃপর অছিয়তের পরে সম্পত্তি না
থাকাই স্বাভাবিক। এক্ষণে সরকারের উচিত ‘উইল করা বাধ্যতামূলক’ আইন অবিলম্বে পাশ করা। ফলে:
১. শরিয়তের কিশোরসুলভ চেঁচামেচি চিরতরে বন্ধ হবে।
২. সঠিক এবং উপযুক্ত পাত্রে সম্পত্তি হস্তান্তরিত হবে।
৩. পিতা-মাতা ছেলে-মেয়েদের কাছে পরম পূজনীয় হয়ে থাকবে।
৪. পরিবার তথা সমাজে অধিকতর শান্তি বিরাজ করবে।
এক্ষণে নিশ্চিত যে, ১ নং ধারায় বর্ণিত ওয়াজীব আইনটি অস্বীকার বা গোপন করে পুরুষের স্বার্থরক্ষার ঘৃণ্য কৌশল হিসেবে অতিরিক্ত বা নফল আইনটি (৪: ১১ ) ওয়াজিব হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। একই মাবাবার একই রক্তের সন্তানদের মধ্যে বাস্তবিক চাহিদা ও প্রয়োজনের তোয়াক্বা না করে ঐ অসম বণ্টন অমানবিক ও কোরানবিরুদ্ধ। [আরও দেখুন ‘কোরান সংকলন বিতর্কের উর্ধ্বে’]
গ. শরিয়ত অপপ্রচার করছে যে, ‘স্বামী স্ত্রীর অংশের শরিক হয় না, মেয়ে স্বামীর অংশের শরিক হয় বিধায় ছেলেদের অর্ধেক পেয়েও মোট হিসেবে নারীগণ জিতে যায়।’ এটা তাদের অদূরদর্শী ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফতোয়া। সাক্ষি স্বরূপউপরোল্লিখিত ২ ও ৩ নং ধারার আয়াতদ্বয় নতুন করে মনোযোগ সহকারে পড়লেই তার সত্যতা প্রমাণ হবে যে, ‘স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্পদে উভয়ের হক নির্ধারিত আছে।’ তা’ছাড়াও নিম্ন বর্ণিত আয়াতে পরিষ্কার ঘোষণা আছে: পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে; তা অল্পই হোক বা বেশিই হোক, এক নির্ধারিত অংশ। (৪: নিছা-৭)
ঘ. প্রচলিত অসম নীতিটি ফরজ বা গুরুত্বপূর্ণ যে নয় তা বারবার আলোচিত হয়েছে। ধর্মভীরুদের উইল করার পরে অবশিষ্ট সম্পত্তি থাকতেই পারে না। কিন্তু হতাশার বিষয় যে, শরিয়ত এখানেও কোরানের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ করে অছিয়তের পরিমাণ বেঁধে দিয়েছে।
ঙ. উপরে বর্ণিত ৫ নং ধারার আয়াতটি কোনো আয়াতের অংশ নয় বরং একটি পূর্ণ ও স্বতন্ত্র নির্দেশ: কিন্তু ১ নং ধারার মতোই শরিয়ত ১৪শ বছর যাবৎ গোপন রেখেছে! জানা মতে জীবিত-মৃত এমন কোনো আলেম-আল্লামা, পীর-বোজর্গ নেই যিনি সম্পত্তি বণ্টনকালে এতিম আত্মীয় বা অভাবগ্রস্তদের কিছু সম্পত্তি লিখে দিয়েছেন বা লিখে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
চ. স্মরণীয় যে, উল্লিখিত আয়াতে দেখা যায় বিভিন্ন ভাগ অংকে কম-বেশি ভাগশেষ বা অবশিষ্ট থাকে যেমন: ৪ নং ধারাটির প্রথম অংশ; ঐ অবশিষ্টাংশ ৫ নং ধারা অনুযায়ী নিকট এতিম-মিছকিন বা অভাবীদের, বা অন্য কাউকে দিতে হবে! তা আজও অমীমাংসিত রাখা হয়েছে; কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, মুসলিম বিশ্বে এমন কোনো পরিবার নেই যে পরিবারে অনুরূপ অংশটি আজও মালিকানাহীন হয়ে পড়ে আছে। সুতরাং এখানেও প্রচলিত উত্তরাধিকারী বিধানটি প্রশ্নবিদ্ধ।
অতিরিক্ত যুক্তি
৬ষ্ঠ শতাব্দীতে নারীগণ ছিল অধিকার-বঞ্চিত অসহায়, একমাত্র পুরুষের পণ্য; প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে জীবিত কবর দিত, হাটে-বাজারে ছাগলমুরগির মতো ক্রয়-বিক্রয় করত, ইচ্ছামতো ভোগ-বিলাস করত। তাদের আয় রোজগারের কোনোই সুযোগ বা পথ ছিল না; বাধ্য হয়ে পুরুষের অর্জিত অর্থে আমৃত্যু জীবন ধারণ করতে হ’ত। এহেন পরিবেশে পুরুষের অর্ধেক ভাগই ছিল তাদের জন্য অপ্রত্যাশিত আকাশ-ফোঁড়া রহমত। কিন্তু নারীদের সে অবস্থা, পরিবেশ আজ আর নেই। যেমন নেই ‘অবাধ ক্রীত দাস-দাসী ক্রয়-বিক্রয় ও ভোগ; তীর, ধনুক, তলোয়ার যোগে উটের পিঠে যুদ্ধ, ইত্যাদি সবই সংস্কার হয়েছে এবং অনবরত হচ্ছে। সংস্কার হয়েছে মদন মিরাস আইন, সংস্কার হয়েছে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ-বর্জনের আইন; বাতিল হয়েছে অশ্লীল ‘হিল্লা’ বিয়ের।
আজ নারীগণও সংস্কারিত, পুরুষের তুলনায় শিক্ষিতা ও স্বনির্ভরশীলা বলে অধিকাংশ পুরুষ বিয়ের জন্য শিক্ষিতা চাকুরীজীবী নারী হন্যে হয়ে খোঁজেন। এমতাবস্থায় আদি উত্তরাধিকার আইন সংস্কার করা ফরজ বলে শতভাগ মানুষ স্বীকার করতে বাধ্য। প্রয়োজনের সমতাবাদই ইসলাম বা শান্তিবাদের শ্রেষ্ঠতম ভিত্। নারী-পুরুষের অসম বণ্টন সমতায় আনলে কোরান তিল পরিমাণও অস্বীকার করা হয় না। যেমন অস্বীকার করা হয়নি: খেজুরপাতার মসজিদ মার্বেল পাথরে সংস্কার করায়; হাজীদের কাবায় প্রবেশের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও (দ্র: ৩: ৯৭) আজ তা নিষিদ্ধ; হজরে আছওয়াদ সরাসরি চুমু দেয়ার চিরাচরিত শরিয়তি বিধান থাকলেও আজ মাত্র ঢাকটিতে চুমু দেয়ার সুযোগ পায়! চামড়ায় লেখা কোরান কাগজ বা সিডি, ক্যাসেট করাতে; আল্লাহর মুখের আরবি ভাষার কোরান বিভিনড়ব ভাষায় সংস্কার করাতে; নোক্তাবিহীন কোরানে নোক্তা যুক্ত করে সংস্কার করায়। কোরান অস্বীকার করা হয়নি বছর বছর জাকাতের পরিমাণ সংস্কার করাতে, ১শ টাকার কোরবানীর গরু ১০ হাজার টাকায় কেনাতে, ৩/৫ ওয়াক্তের পরিবর্তে ৬/১০ ওয়াক্ত নামাজ পড়ায়, ১ পয়সার পরিবর্তে ২/৫ পয়সা দান করায় বা ১ মাসের পরিবর্তে দেড়-২ মাস রোজা রাখায়ও কোরান লঙ্ঘিত হয় না এবং হয়নি; বরং শরিয়ত মতেই অতিরিক্ত ছোয়াবের নিশ্চয়তা আছে। যে মায়ের পেটে জন্ম নিয়ে তাঁর নাপাক (?) পথে বের হয়ে পাকপবিত্র মাওলানা (আমাদের আল্লাহ), মোজাদ্দেদ, পীর-গাউস-কুতুব, কামেল-দরবেশ, রাছুলের সেক্রেটারি সেজে বেহেস্তের দাবিদার হচ্ছি! সে নারীর পবিত্র মুখের গ্রাস, পেটের ক্ষুধার সমতা আনলে বা আরো কিছু বেশি দিলে আল্লাহর গোস্যা হওয়ার যুক্তি-প্রমাণ ইহ-পরকালে নেই। তবুও সরকার দল-উপদলের ভয় করলে অন্তত মৃত্যুর পূর্বে ‘উইল করা বাধ্যতামূলক’ আইনটি অবিলম্বে পাশ করা উচিত। এর বিপক্ষে মুসলিম বিশ্বের ১ জন লোকও প্রতিবাদ করতে সক্ষম হবেন না। পক্ষান্তরে প্রচলিত উত্তরাধিকার আইনটি অতিরিক্ত হেতু নিস্ক্রিয় হয়ে যাবে।

মদন মিরাস
অর্থাৎ দাদার জীবিতাবস্থায় বাবার মৃত্যু হলে দাদার সম্পত্তি থেকে নাতিদের চিরতরে বঞ্চিত করা হয়। যদিও নাতি দাদার রক্তের এবং বংশনামের উত্তরাধিকার এবং তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারীর অধিকার নিয়েই এ যাবৎ বাবার সঙ্গে ভোগ করে আসছিল। কিন্তু দাদার বর্তমানে বাবার অকাল মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এতিম শিশু রাতারাতি কপর্দকহীন পথের ভিখারি বনে গেল; অর্থাৎ পুত্রের মরার কারণে এতিম নাতি নাতনিদের ওপরে খাড়ার ঘা! কিন্তু ভুইয়া, জমিদার, তালুকদার ইত্যাদি বংশনামের উত্তরাধিকারসহ আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েই গেল। এমন অদ্ভুত পৈশাচিক আইনটির পক্ষেকোরানের কোনোই সমর্থন বা আকার-ইঙ্গিত নেই। তবুও এই গুরুতর অমানবিক আইনটি কখন! কিভাবে! এবং কেন! মুসলিম সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করল, তা ভেবে শিউরিয়ে উঠতে হয়! কোরানে যেখানে সম্পত্তি বণ্টনকালে আত্মীয়, এতিম ও অভাবগ্রসত্ম লোকদের কিছু সম্পত্তি ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ আছে (৪: ৮)! সেখানে নাতি-নাতনিদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার কোনো প্রশড়বই আসে না। তাছাড়াও ৪:১১ নং আয়াতে ‘আল্লাহ তোমাদের সন্তান সম্বন্ধে নির্দেশ দিতেছেন-, উত্তরাধিকারী, সন্তান-সন্ততি’ ইত্যাদি ব্যবহৃত শব্দ-বাক্যের মধ্যে নাতিনাতনিদের অধিকার সুস্পষ্ট। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মদন মিরাস-এর বিরুদ্ধে জ্ঞানী-অজ্ঞানী সকলেই সমভাবেই অসন্তুষ্ট এবং তা না পারে স্বতঃর্ফূতভাবে গ্রহণ করতে, না পারে দোযখের ভয়ে প্রতিবাদ করতে। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমত যে, বঙ্গপীর ও বঙ্গ বীর, শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হক এই হীন, অমানবিক ‘মদন মিরাস’ আইনটি রহিত করে বাঙালি এতিমদের অধিকার পুনঃরুদ্ধার করে কোরানের সঠিক বিধান প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু অন্যান্য মুসলিম দেশে অনুরূপ অরনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা জানা নেই।
বিনীত।