ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

শিক্ষার্থীদের বই কেনা, আমাদের কমিশন খাওয়া এবং পরিবর্তনের আহবান:

ছোটবেলায় বার্ষিক পরীক্ষা শেষে পুরাতন বই কেনার জন্য আমাদের দৌঁড়ঝাপ শুরু হতো। তিনভাগের দুইভাগ মূল্য দিয়ে আমরা পুরাতন বই কিনতাম। নতুন ক্লাসে পুরাতন বই দিয়ে আমরা দিব্যি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারতাম। তবে, মাঝে মধ্যে ব্যাকরণ এবং গ্রামার বই নতুন করে কিনতে হতো। শিক্ষকতা জীবনে এসে বুঝতে পারছি বই না মিলবার পেছনে শিক্ষকদের কমিশন বানিজ্য কাজ করেছে। যুগের পরিক্রমায় চলমান এই কমিশন বানিজ্য আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে এবং এর দ্বারা আমাদের অভিভাবকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হন। শিক্ষার্থীরা নিম্নমানের বই কিনে প্রকৃত শিক্ষার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়, শিক্ষকদের ভেতরের সত্তা কুলুষিত হয়। আমরা এই পরিবেশের বদল চাই, বদল হওয়া উচিত।

আমি যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি সেখানে ৯ মাসের খন্ডকালীন চাকরী করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ওখানে সঠিক সময়ে সম্মানী না পেলেও আলোকিত সব শিক্ষাগুরুর সাহচর্যে থেকে কোটি টাকার সম্মান পেয়েছি এবং স্যারদের নিকট থেকে জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করে আমার ভেতরের আমিকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। ২০০৪ সালে একদিন স্টাফ কাউন্সিলের বৈঠকে ঐ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার প্রথম সম্মানী হিসেবে আমি ৫০০ টাকার একটি নোট পেয়েছিলাম। জানেন, ঐ টাকার নোটটি আমাকে দেওয়া হয়েছিল বই সিলেকশনের টাকা থেকে! আমার পৌরুষত্ব কালিমালিপ্ত হয়েছিল কিনা বুঝিনি। উক্ত বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার প্রথম টাকা দিয়ে বাবা-মা’র জন্য কিছু নাস্তা নিয়ে যেতে বলেছিলেন আমার এক স্যার। জানেন, স্যারের উপদেশ আমি রাখতে পারিনি! এখন আমরা শিক্ষকরা জানি, প্রতি বছরই অধিকাংশ বিদ্যালয় নিদ্দিষ্ট কোম্পানীর অথর্ব বই সিলেক্ট করে আমরা কমিশন খাই। সাবাশ! হে মানুষ গড়ার কারিগর।

জানেন প্রিয়, বর্তমানে আমরা সেশন শুরুর পূর্বেই (অনেক সময় অক্টোবর-নভেম্বর মাসেই) আমাদের কমিশন বানিজ্য সেরে ফেলি। বাজারে গরু তোলার মতো দরদাম করে মোটা অংকের টাকা নিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, আগামী বছর আমরা ঐ কোম্পানীর বই স্কুলে পড়াবো। আমাদেরকে টাকা দেওয়ার পর প্রকাশনীর এজেন্ট শাড়ি বদলিয়ে বইয়ের দাম বাড়িয়ে দেন। ১০০/১৫০ টাকার বই তখন আমাদের সন্তানদের কিনতে হয় ৩০০/৩৫০ টাকা দিয়ে। গত বছর আমরা অনেক স্কুলের শিক্ষকবৃন্দ কোরবানের পূর্বেই মোটা অংকের টাকা উপহার (?) নিয়ে আমাদের ভেতরের পশুকে খুশি করেছি। ভাগ-ভাটোয়ারা করে পাওয়া ৩/৪ হাজার টাকা আমরা আরামসে খরচ করেছি, হয়তো কোরবানের কাজে ঐ টাকা ব্যবহার করিনি সত্য কিন্তু অন্য কোন প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করে আমরা আমাদের সত্তাকে ভুলুন্ঠিত করেছি, নিজের আমিত্বকে অপমান করেছি, নিজের পৌরুষকে কুলুষিত করেছি। অবাক লাগে যখন দেখি এডভান্সড এর মতো প্রকাশনী স্কুল প্রতি ৪০/৫০ হাজার টাকা ডোনেশন দিয়ে বর্তমান বাজারে এগিয়ে থাকার চেষ্টা করে। চকরিয়ার সৌদিয়া বইঘর যখন কোরবানের আগে এসে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে যায়, তখন প্রকারান্তরে আমরা আমাদের বিবেককেই বিক্রি করে ফেলি। এটা বুঝার নিয়তি কেন আমাদের হয়না! মানবিক সমাজ বিনির্মাণে সুশিক্ষিত জাতি হিসেবে মর্যাদার সাথে শির উঁচু করে দাঁড়ানোর স্বার্থে আমাদের এই কমিশন বানিজ্য পরিহার করা দরকার। নয়তো, বড় হয়ে শিক্ষার্থীরা একদিন বুঝবে আমরা তাদের ঠকিয়েছিলাম, তাদের পিতার পকেটের টাকা তাদের বই কেনার পূর্বেই আমরা আমাদের উদরে ভরেছিলাম!

সুহৃদ, আমার বিশ্বাস এই সমস্যার সমাধানে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো কাজে লাগতে পারে-
(১) সরকার প্রণীত ৯ম-১০ম শ্রেণির একটি গ্রামার বই শিক্ষার্থীদের হাতে একসময় দেখা যেতো কিন্তু বেশি করে অনুশীলনের জন্য উক্ত বইয়ের পরিধি বাড়ানো দরকার। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগী হয়ে ব্যাকরণ ও গ্রামার বই রচনা করতে পারেন। উক্ত বই বিনামূল্যের বইয়ের সাথে শিক্ষার্থীদের দিতে পারলে ভাল, না দিলেও সমস্যা নেই। কারণ সরকার প্রণীত বইয়ের দাম সর্বদা কমই থাকে এবং তা শিক্ষার্থীরা সহজেই কিনতে পারবে।

(২) শিক্ষা প্রশাসন জেলার ভাল মানের শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি বই বাছাই কমিটি গঠন করতে পারেন। উক্ত কমিটি বিভিন্ন কোম্পানির গ্রামার ও ব্যাকরণ বই পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন কোন বই সিলেক্ট করলে শিক্ষার্থীদের উপকার হবে। সিলেক্টেড কোম্পানীকে ডেকে তাদের বইয়ের দাম কমানো সম্ভব হলে (দাম কমানো সম্ভব কারণ আমাদের কমিশন প্রদানের কারণেই তারা তাদের বইয়ের দাম বাড়িয়ে দেন) আমাদের অভিভাবকরা আর্থিক ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ পাবেন।

(৩) নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে জেলা শিক্ষা অফিস প্রতি বিদ্যালয়ে চিঠি প্রেরণ করতে পারেন যেখানে আদেশ থাকবে কমিশন নিয়ে বই নির্বাচন না করার। হুঁশিয়ারী থাকবে জানুয়ারী মাস থেকে সরেজমিন তদন্তে কমিশন নেওয়াসহ নিম্নমানের বই সিলেকশনের প্রমাণ পেলে শিক্ষার্থীদের সামনে কমিশন খাওয়ার কথা ফাঁস করে দেওয়া হবে।

(৪) অভিভাবকদের সজাগ থাকা জরুরী। নিম্নমানের বই সিলেক্ট করে উক্ত বই শিক্ষার্থীদের কিনতে বাধ্য করা হলে তাঁরা বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনবেন।

(৫) শিক্ষকদের হৃদয়ঙ্গম করা উচিত আকাম-কুকামের টাকা পকেটে ভরলে হৃদয়ের জ্যোতি ম্লান হয়, রুজির বরকত কমে। তাই মানবিক হৃদয়ের শিক্ষকরা মিলে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির নিকট বিষয়টি অবগত করতে পারেন।

প্রিয় সরকার বাহাদুর, ‘এ পেশার বর্তমান সম্মানীতে না পোষালে অন্যত্র যেতে পারেন,’ এমন কথা মানবিক হৃদয় চুরমার করে ফেলে। ভাঙ্গাচোরা হৃদয় দিয়ে কেমন করে আলোকিত মানুষ বানাবো বলেন! পেটে খেলে পিঠে সয় আমরা জানি। তাই আমাদের ন্যায্য দাবীগুলো মেনে নেন। অনন্য হৃদয়ের মানবিক মানুষ উপহার দেবো, আগামী কোরবানেই কমিশন খাওয়া আমাদের ভেতরের পশুকে আমরা কোরবানী দেবো – কথা দিলাম।