ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

পরীক্ষা সংশিষ্টদের কাজে অপরিণামদর্শিতা, শিক্ষার্থীদের চাতুর্য ও পরিবর্তনের আহবান: মেধা যাচাইয়ের জন্য আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে বছরে তিনবার শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিয়ে থাকি। মানসম্মত প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সুষ্ঠু ও নকল মুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা গ্রহণ শিক্ষার্থীদের গুনগত মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজে অনেক সময় সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার অভাব ও অপরিণামদর্শিতার কারণে টার্ম পরীক্ষাগুলোতেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে এবং শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল কৌশল অবলম্বন করে আবারও নকল প্রবণতায় জড়িয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট এবং সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে হুমকি স্বরূপ। এ থেকে যত তাড়াতাড়ি পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব জাতির জন্য ততই মঙ্গল।

প্রতিটি বিদ্যালয় তাদের আভ্যন্তরীণ পরীক্ষা সম্পাদনের জন্য নিজেদেরই প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করার সরকারী নিয়ম রয়েছে। কিন্তু প্রশ্নপত্র প্রণয়নের কাজটি কিছুটা দুরূহ হওয়ার কারণে কিংবা কমিশনসহ সস্তায় বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে প্রশ্নপত্র পাওয়া যায় বলে অনেক সরকারী-বেসরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় নিজেরা প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন না। এক্ষেত্রে প্রশাসনের সুষ্ঠু নজরদারির অভাবও কম দায়ী নয়। তাই বিভিন্ন বিদ্যালয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মানহীন প্রশ্নপত্রেই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। বেশ কয়েক বছর আমরা লক্ষ্য করেছি, প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রশ্ন পরবর্তী বছরের প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় হুবহু মিল, বছরের পরবর্তী পরীক্ষা সমূহেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি কয়েক বছর। সরকারী স্কুলের নির্বাচনী পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আমাদের অনেক বিদ্যালয়ের নির্বাচনী পরীক্ষার প্রশ্নের সাথে হুবহু মিলে যাওয়ার ঘটনাও অতীতে আমরা দেখেছি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় নিচু শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তাদের উপরের শ্রেণির প্রশ্নপত্র জমিয়ে রাখত এবং পরবর্তী ক্লাসে হুবহু কমন পেত। তারপরও আমরা অনেক বিদ্যালয় চট্টগ্রামের ‘মূল্যায়ন’ থেকে প্রশ্নপত্র কিনে নেওয়া থেকে বিরত থাকিনি। কারণ আমরা আমাদের প্রশ্নের কমিশন সেই ব্যবসয়িক প্রতিষ্ঠান থেকে ঠিকই আমরা পেয়ে থাকি। বিষয়টি মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জার, জাতির জন্য হতাশার।

আমরা জানি, সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়নের কাজটি জটিলই বলা যায়। যেহেতু প্রশ্নপত্রটি পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের বাড়ি যায় এবং মানসম্মত প্রশ্ন তৈরীর কাজে নিজেদের সৃজনশীলতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাই এক্ষেত্রে নিজেদের প্রেস্টিজ ধরে রাখার জন্য শিক্ষকদের বাধ্য হয়ে পড়াশোনা করতে হয়। একটি সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরীতে আমাদের প্রায় এক সপ্তাহ সময়ে দরকার পড়ে। তাই আমরা অনেক বিদ্যালয় প্রশ্নপত্র তৈরীর কাজে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে পড়ি। বিষয়টির বদল হওয়া দরকার।

আপনি অবাক হবেন, বর্তমানের শিক্ষার্থীরা নকল করার কাজে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করতেও পিছপা হয়না। প্রায় প্রত্যেক টার্মে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কারণে আমরা কয়েক টার্ম ধরে নিজেদের কিছু প্রশ্ন (গণিত, ইংরেজী ও সাধারণ বিজ্ঞান) নিজেরা করি। ফলে, প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অপবাদ থেকে আমরা কিছুটা রক্ষা পাই। কিন্তু চলমান নির্বাচনী পরীক্ষার ইংরেজী ২য় পত্রের দিন আমরা জেনে যাই শিক্ষার্থীদের নকল করার ডিজিটাল কৌশল। ধরা পড়ার পরে আমাদের শিক্ষার্থীরা স্বীকার করে, আমাদের স্কুল ১টায় ছুটি হওয়ার পরে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে কৌশলে স্কুল আঙ্গিনায় তারা ঘুরাঘুরি করতে বলে। যখন দেড়টায় পরীক্ষা শুরু হয় তখন কোন একজন পরীক্ষার্থী একটি প্রশ্ন বেশি নিয়ে অপেক্ষায় থাকা নিচু ক্লাসের শিক্ষার্থীকে সুযোগ বুঝে প্রশ্নটি ধরিয়ে দেয়। উক্ত শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট একটি কলোনিতে গিয়ে কলেজ পড়ুয়া এক বড় ভাইকে প্রশ্নটি দিয়ে আসে। তখন ছেলেটি বই খোলে ১ থেকে ৮ নং পর্যন্ত গ্রামারের উত্তর মোবাইলে লিখে এস.এম.এস করে দেয়। পরীক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে তাদের নিজেদের মোবাইল নং উক্ত কলোনিতে পরীক্ষা শুরুর পূর্বেই জমা দিয়ে আসে। পরীক্ষা চলার ফাঁকে মোবাইল অন করে শিক্ষার্থীরা উত্তর লিখে দেয় অথবা ওয়াশ রুমে যাবার নাম করে মোবাইলে পাঠানো উত্তর দেখে আসে। আমরা শংকিত হই। এই বছর খুটাখালী তমিজিয়া মাদ্রাসার বাংলা প্রথম পত্র বিষয়ের প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছে। আমাদের ঈদগাঁওতে ছেলেরা ফটোস্ট্যাট করতে এলে একটি কম্পিউটারের দোকানে তারা আমার হাতে ধরা পড়ে। প্রশ্নগুলি উক্ত মাদ্রাসার এক শিক্ষকের হাতে দিয়ে কৌশলী হবার পরামর্শ দিয়েছিলাম।

সুহৃদ্‌, কালের পরিক্রমায় আমাদের শিক্ষার্থীরা বহতা নদীর মতো এগিয়ে যাচ্ছে। সেকেলে ধ্যান-ধারনা আঁকড়ে ধরলে মানবিক ও মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরীর কাজে আমরা পিছিয়ে পড়বো, জাতি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাই চলুন, একটু ভেবে নিই-

(১) প্রতিটি বিদ্যালয় পরীক্ষা শুরুর অন্তত একমাস পূর্বে সংশ্লিষ্ট বিষয় শিক্ষককে দিয়ে প্রশ্নপত্র তৈরী ও মডারেশন করে নিতে পারেন। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও পড়াশোনা হবে, নিজের সাবজেক্টের প্রশ্নপত্র সম্পর্কে সুন্দর একটা ধারণা হবে। সুন্দর পরিবেশে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে এটি সহায়ক হবে।

(২) নিজেদের তৈরী প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে কিনা প্রশাসন সরেজমিনে তদন্ত করতে পারেন। ব্যত্যয় চোখে পড়লে শাস্তির বিধান যেন তাড়াতাড়ি হয়।

(৩) বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কৌশলজ্ঞান সম্পর্কে সজাগ থাকা ভালো। পাবলিক পরীক্ষা সমূহের মতো সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করা যায়। গেইটেই তাদের চেক করে নিতে হবে যাতে মোবাইল এবং অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্র সংগে নিতে না পারে।

(৪) ইদানীং অন্যান্য ক্লাসের শিক্ষার্থীদের বেশি পড়ানোর নামে নির্বাচনী পরীক্ষা সমূহ বিকালে নেওয়ার রেওয়াজ দেখা যায়। কিন্তু উক্ত সময়ে কোন শ্রেণিতে ১২২ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ৪০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও তাদের উপস্থিতির হার বাড়ানোর জন্য আমরা কোন পদক্ষেপ নিইনা। ফলে, উক্ত সময়ে তাদেরকে বেশি পড়ানোর বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অন্যদিকে, শিক্ষকবৃন্দ ক্লাস নেওয়ার পরে অনেকটা ক্লান্ত শ্রান্ত হয়েই পরীক্ষার হলে ডিউটি দেন। এই সুযোগটি কাজে লাগায় আমাদের শিক্ষার্থীরা। তাই সম্ভব হলে নির্বাচনী পরীক্ষা সকালে নেওয়া যায়। সকালে পরীক্ষা নেওয়ার সুফল আছে বলেই হয়তোবা প্রায় পাবলিক পরীক্ষা সকালে অনুষ্ঠিত হয় এবং তা আমাদের অনুসরণ করা ভাল।

(৫) টার্ম পরীক্ষার উত্তরপত্র রেজাল্টের পরে কয়েকদিনের জন্য শিক্ষার্থীদের দিয়ে দেওয়া ভাল। শিক্ষার্থীরা উত্তরপত্র বাড়িতে নিয়ে গেলে অভিভাবকবৃন্দ তাদের সন্তানদের মান সম্পর্কে প্রত্যক্ষ কিছু দেখতে পাবেন। ফলে, অভিভাবকবৃন্দ আরও একটু সজাগ থেকে তাদের সন্তাদের মান বৃদ্ধির কাজে শামিল হবেন। তাছাড়া, নিজেদের উত্তরপত্র দেখে শিক্ষার্থীরা ভুলভ্রান্তি শোধরাতে পারবে, সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তরের মান বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করবে। অন্যদিকে শিক্ষকবৃন্দও উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে আন্তরিক হবেন।

(৬) রেজাল্টের পর মার্কশিট নেবার জন্য শিক্ষার্থীদের কাকুতি-মিনতি করতে হবে কেন। তাদের পরীক্ষার মার্কশিট তাদেরকে প্রদান করা আমাদের কর্তব্যের পর্যায়ে পড়ে তা কেন আমরা ভুলে যাই। অবশ্য কিছু কিছু বিদ্যালয় বাৎসরিক পরীক্ষার মার্কশিট প্রদান করলেও সংখ্যার দিক দিয়ে তা নেহাৎ কম। তাই, প্রতি পরীক্ষার রেজাল্টের দিন অভিভাবক সমাবেশ করে শিক্ষার্থীদের মার্কশিট অভিভাবকবৃন্দের হাতে দিতে পারেন। এতে অভিভাবকবৃন্দ সম্মানিত বোধ করবেন, তাদের সন্তানদের উন্নতির সংগ্রামে আরও তৎপর হবেন।

(৭) টার্ম পরীক্ষার রেজাল্টের পর স্টাফ কাউন্সিলের বৈঠকে প্রতি বিষয়ে কৃতকার্য-অকৃতকার্যের তুলনামূলক আলোচনা করতে পারেন। পাসের হার বাড়ানোর জন্য কোন্ সাবজেক্টে কি অসুবিধা তা নির্ণয় করে সমাধানের পথ বের করতে পারেন। ফলে, জবাবদিহিতার কারণে পরবর্তী পরীক্ষা সমূহে নিজের সাবজেক্টে ভাল ফল করার জন্য শিক্ষকবৃন্দ আরো সজাগ থাকবেন।

প্রিয় সহকর্মী, এ পেশার সম্মানী ও দায়িত্বের কথা জেনেই আমরা এ পেশায় এসেছি। তাই সম্মানী অপ্রতুলতার দোহাই দিয়ে আমরা আমাদের গুরু দায়িত্বে অবহেলা করতে পারিনা। তাই, আসুন আমরা বদলে যাই। চলুন, আমরা নিজেদের প্রশ্নপত্র নিজেরা করি, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করি এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে সত্যিকারের সহযোগী হই। শুভেচ্ছা নিরন্তর।