ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

সুখ ও শান্তির পসরা সাজিয়ে আলোকিত জীবন গড়ার আহবানে প্রতি বছর আমাদের সামনে আসে পরম খুশির ঈদ। আলহামদুলিল্লাহ! অন্য রকম আনন্দের সায়রে অবগাহনেই কেটেছে আমার সব ঈদ। তবে, ২০১০ সালের ঈদ একটু অন্যরকম মানবিকতায় সমৃদ্ধ। স্ব-অবস্থান থেকে অসহায় মানুষের কল্যাণে সাহায্যের হাত বাড়ানোর কাজে বিষয়টি আমাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।
পাশের বাড়ির আমার বয়সী ছেলে রহিম, দারিদ্রের কষাঘাতে পারিবারিক হাল ধরতে হয়েছে বলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরুতে পারেনি। বিয়ে করেছে বছর চারেক হলো। একটি ফুটফুটে মেয়ে আছে। সহজ সরল ছেলেটি মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারকেল গাছ ছেঁটে দিয়ে জীবিকা উপার্জন করত। কায়িক পরিশ্রমে মোটামুটি ভালই চলছিল তাদের দিনযাপন। একদিন আচমকা শুনতে পাই, কাজ করতে গিয়ে এক বাড়ির নারকেল গাছ থেকে ছেলেটি পড়ে গেছে। এক পা ও কোমর ভেঙ্গে গেছে। এলাকার সহৃদয় মেম্বার রশিদ আহমদের আর্থিক সহযোগিতায় ছেলেটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, টানাপোড়নে কোন রকম চিকিৎসা চলছে। আমরা কয়েকজনকে ডেকে মেম্বার আহবান জানালেন ছেলেটির সুচিকিৎসার্থে মানবিক কিছু করার। সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা ভেবে আমরা সাড়া দিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম এবারের ঈদে বেড়াবার বিষয়টি আমরা ভিন্নভাবে উপভোগ করবো। আমরা জানি, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্যের হাত প্রসারিত করার সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে আমাদের গ্রামবাসীর। তাই মনস্থির করলাম, এবারের ঈদে ছেলেটির চিকিৎসার্থে সবাইকে জড়িয়ে মানুষকে অন্যরকম আনন্দ দেব। আমরা সেবার ঈদের নামাজ পড়ে সানি, মনছুর, জিয়া, মোঃ হোসন, এখলাছ, মোস্তফাসহ প্রায় ১৫ জন বন্ধু মিলে আমাদের গ্রামের প্রতি বাড়িতে যাওয়া শুরু করলাম, ছেলেটির চিকিৎসার্থে সাহায্যের আবেদন জানালাম। ঈদের দিন আমাদের মানবিক কাজ দেখে গ্রামবাসী খুশি হন। প্রতি বাড়ি থেকেই সাহায্য আর উৎসাহ পাওয়ায় আমরা অনুপ্রাণিত হলাম। কোন বাড়িতে ৫-১০ টাকা, কোন বাড়িতে ৫০-৫০০ টাকা আবার কোন বাড়িতে ৫০০০ টাকা পেয়ে আমাদের বিমুগ্ধ হবার পালা। যে বাড়িতে টাকা হাতে নেই সে বাড়ির লোকেরা আমাদের চাউল দিয়েছে। আমরা খুশি হলাম। অনেক বাড়িতে ঈদের সেমাইসহ বিভিন্ন ধরনের নাস্তাও খেয়েছি বেশ। ঈদের পরের দিনও এমন হয়েছে। আমাদের গ্রামের প্রায় ৪০০ বাড়িতে গিয়ে আমরা দু’দিন ঈদের বেড়ানো ব্যতিক্রমভাবে উদযাপন করলাম, ছেলেটির চিকিৎসার্থে টাকা উত্তোলন করলাম। দেখা গেলো, প্রায় পঁচিশ হাজার টাকা পেয়েছি আমরা। ছেলেটির চিকিৎসার্থে নিবেদিতপ্রাণ মেম্বারকে ডেকে আমরা টাকাগুলি দিয়ে দিলাম। তাঁর চোখে-মুখে কৃতজ্ঞতার ছবি দেখে আমরা আপ্লুত হয়েছি। খুশির খবর, ছেলেটির চিকিৎসার্থে আমাদের উত্তোলিত টাকাগুলো দারুণ কাজ দিয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসা শেষে কয়েকমাস বিছানায় শুয়ে সময় কাটে তার। উপার্জনক্ষম অন্য কেহ না থাকায় বেশ কষ্টে দিন চলছিল। সুস্থ্য হলেও হাঁটা-চলায় কিছুটা সমস্যা হওয়ায় কায়িক শ্রম করতে পারছিল না। মেয়েদের একটি সমিতি থেকে ছেলেটিকে ৬০০০ টাকা বিনা লাভে ধার নিয়ে দিলাম। ছেলেটি এখন বাড়ির পাশে একটি ছোট্ট দোকান দিয়েছে। কর্জ পরিশোধ করে এখন স্বাবলম্বী হবার পথে সংগ্রাম করছে। স্কুলে যাবার পথে প্রতিদিন তার সাথে দেখা হয়। তার চোখে কৃতজ্ঞতার ছায়া দেখে আমার সুশিক্ষা বিতরনের কাজটি শুরু হয়। আমি অন্যরকম আনন্দে উদ্বেলিত হই, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বদলে যাওয়ার মিছিলে এগিয়ে থাকতে অনুপ্রাণিত হই। আসুন, আমরা স্ব-অবস্থান থেকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সমাজ বিনির্মাণে সহযোগী হই।
nurulislamsir@yahoo.com