ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

শিশুদের মতোই নির্ভরশীল এবং সহজ-সরল মনোভাবের বাবার বয়সীরা যান্ত্রিক সমাজে যুগে যুগে উপেক্ষিত। তাঁদের সারাজীবন কাটে গলদঘর্ম পরিশ্রমে, আমাদের আলোকিত মানুষ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে। অথচ তাঁদের বৃদ্ধ বয়সে যত্ন নেয়ার পরিজনেরা দুরে থাকতেই যেন মরিয়া হয়ে ওঠি। এটি সমাজের চিরায়ত রীতি। বয়োবৃদ্ধ তাজর মুল্লুকও এমন আচরনে নিষ্পেষিত। কক্সবাজার সদরের ইসলামাবাদ ইউনিয়নের বাশঁঘাটায় বাড়ি, বয়স ৮০ পেরিয়ে। ১ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা হলেও তিনি পত্রিকা পড়তে পারেন, পুঁথি পড়তে পারেন অবলীলায়। মা-বাবা মারা গেলে সংসারের হাল ধরতে মানুষটি রিক্সা চালান একনাগাড়ে পঁচিশ বছর। ইত্যবসরে, তাঁর ছেলে মেয়ে হলো, মাথার ঘাম পায়ে ঝরিয়ে তাদের দুবেলা দুমুঠো খাইয়ে বড় করলেন। মেয়েদের দুঃখ-কষ্টে বিয়ে দিয়েছেন। চার তাগড়া জোয়ান থাকলেও বাবার কর্তৃত্বভার নেওয়ার সৗভাগ্য বুঝি নেই। জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে রিক্সা চালাতে চালাতে হওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি এখন পুরোদস্তুর রিক্সা মেকানিক। বৃহত্তর ঈদগাঁও বাজারে যাওয়ার প্রধান সড়কে ইসলামাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের রাস্তার ধারে নিজস্ব এক টুকরো জায়গাতে একটি দোকান রয়েছে তাঁর। দোকানটির চাল খড়কুটো দিয়ে তৈরী ছিল, চারপাশে একসময় কোন বেড়া ছিলনা। এম.পি লুৎফুর রহমান কাজলের বদান্যতায় দোকানটি মোটামুটি বসার উপযোগী করা হয়েছে কিছুদিন হলো। এখানে বসে তিনি মেকানিকের কাজ করেন। বুড়ো বলে বেশী গ্রাহকও জুটেনা হয়তো। তবুও চমৎকার এক সম্মানিত জীবন চলছে তাঁর।

বৃদ্ধ মানুষদের নিয়ে মানুষটি তাঁর দোকানে পুঁথির আসর জমান প্রতিদিনই, রোমাঞ্চিত হন অন্য রকম আনন্দে । তিনি সুর করে পুঁথি পড়েন, শ্রোতাদের মধ্যে অভিজ্ঞ একজন মানে বলে দেন। আবার কোন দিন তিনি শ্রোতাদের দলে ভিড়েন, অন্য একজন পুঁথি পড়েন। আমরা দেখতে পাই, প্রতিদিনই তিনি জোহরের নামাজের পর থেকে আসরের নামাজের পূর্ব পর্যন্ত পুঁথির আসর জমান। পাশেই ঈদগাঁও বাজার। প্রতিদিনই দেখি, বাজারে যাবার পথে বৃদ্ধ মানুষগুলো ওখানে বসে জিরিয়ে নেন, অনেকে আবার কেবল পুঁথির আসরে বসার ইচ্ছে থেকেই বাড়ি থেকে বের হন, পুঁথি শুনে মনটাকে প্রশান্ত করেন। স্কূল থেকে বাড়ি যাবার পথে দেখতে পাই, দোকানটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসা ২৫-৩০ জন বয়সের ভারে ন্যূজ মানুষ; পুঁথি পড়ছেন, শুনছেন আর যেন ভাসছেন অপার আনন্দে। হাটবারে তাদের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে যায়। দোকানে আসন সংকুলান হয়না বলে কেহ কেহ রাস্তার ধারে বসে পুঁথির আসরে অংশ নেন প্রায়ই। রিক্সা চালনার সময়ে অবশ্য রাতের বেলাতেই তিনি পুঁথির আসর জমাতেন। জনশ্রুতি আছে, বয়োবৃদ্ধ তাজর মুল্লুকের পুঁথি পড়ার বয়স প্রায় ৪৫ বছর। মজার বিষয় হলো, তিনি এ কাজে কোনদিন কারো কাছ থেকে একটি টাকাও নেন নি। উল্টো যাঁরা পুঁথি শুনতে আসেন তাঁরাই তাঁর বিড়িগুলো সাবাড় করে দেন। চেয়ারম্যান থাকাকালে জাফর আলম তাঁদের সবাইকে মাঝে মধ্যে নাস্তা খাওয়াতেন। কিছু কলেজ ছাত্র, বয়স্ক শিক্ষক, জাতি সত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, প্রয়াত গবেষক মালিক সোবহানের মতো মানুষেরা পুঁথি পড়ায় অংশগ্রহণ করে তাঁদের আসরের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন কখনো কখনো।

যে বৃদ্ধ মানুষগুলো আজ বয়সের ভারে ন্যূজ, অন্য রকম অভিমান আর দুঃখে যাঁদের হৃদয়ের দেয়াল নড়েবড়ে, আরেক দুঃখী মানুষ তাঁদের বিনা পয়সায় ৪৫ বছর ধরে পুঁথি শুনাচ্ছেন, পরস্পরের আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করছেন – এ মহত্ত্বের তুলনা নেই। পুঁথির আসর আর বাবার বয়সী মানুষগুলো যেন আজ একটি মানবিক পরিবার। পুঁথি সাহিত্য চর্চার মতো বিলুপ্তপ্রায় কাজটিতে বাবার বয়সী মানুষদের নিয়ে পুঁথির আসর জমানো তাজর মুল্লুক একজন সাদা দিলের মানুষ, তাঁর জন্য আমাদের বিনীত শ্রদ্ধা।

nurulislamsir@yahoo.com