ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে মানুষের আচরনের ইতিবাচক পরিবর্তন হলে আমরা তাকে সুশিক্ষা বলি। আলোকিত মানুষ গড়ার কাজে সুশিক্ষা বিতরণের কৌশলগত মানোন্নয়নে পৃথিবীর কল্যাণকামী মানুষগুলোর চেষ্টার কমতি নেই। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন স্ট্রাটেজি’র খবর পাওয়া যায়। শিক্ষক হিসেবে মেধার দৌঁড়ে এগিয়ে থাকতে হলে আই.সি.টি নির্ভর আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতির সাথে আমাদের আপ-টু-ডেট থাকা জরুরী। শ্রেণি কক্ষে টেকসই পাঠদানের জন্য ‘ডিজিটাল কন্টেন্ট’ তেমন একটি নিয়ামক যার সফল ব্যবহার পাঠদানকে সহজবোধ্য, উপভোগ্য ও ফলপ্রসু করে তোলে।

শিক্ষায় ডিজিটাল কন্টেন্ট হচ্ছে পাঠ্য বইয়ের বিষয়কে শিক্ষা সহায়ক ও পাঠ সংশ্লিষ্ট ভিডিও, ছবি, অ্যানিমেশন ইত্যাদি ব্যবহারে গতিময়তায় উপস্থাপনের জন্য শিক্ষকদের তৈরী একধরনের অডিও ভিজ্যুয়াল উপকরণ। এর সফল ব্যবহারে শিখন-শেখানো কার্যক্রম হৃদয়গ্রাহী হয়, বিমূত ও দূর্বোধ্য বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের নিকট সহজেই স্পষ্ট হয়।

ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরীর জন্য শিক্ষকদেরকে কম্পিউটার ব্যবহারের সাধারণ জ্ঞান, অভ্র ব্যবহার করে টাইপিং, ওয়েব থেকে সার্চের মাধ্যমে পাঠ সংশ্লিষ্ট ছবি, ভিডিও টিউটোরিয়াল, এনিমেশন ইত্যাদি খোঁজা ও ডাউনলোড করতে পারার সক্ষমতা এবং পাওয়ার পয়েন্টে তা প্যাডাগজি অনুসরণ করে সঠিক স্লাইডে অন্তর্ভূক্ত করার কৌশল আয়ত্ত করতে হয়। এক কথায় এটাকে ডিজিটাল পাঠটীকা বলা যেতে পারে। শ্রেণি কক্ষে এটির সফল উপস্থাপনের মাধ্যমে শিখন-শেখানো কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক কর্মপদ্ধতি নিশ্চিত হয়।

বইয়ের বিষয়বস্তুকে আই.সি.টি’র সহায়তায় প্রাণবন্ত করে তোলে ফলপ্রসু পাঠদানের জন্য ডিজিটাল কন্টেন্টের ব্যবহার উন্নত শিক্ষা পদ্ধতিতে অনুসৃত হয় অনেক আগে থেকেই। আশার কথা, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের শিক্ষকরাও ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরী ও ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। এ কাজে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির জন্য আমাদের দেশে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান সফলভাবে এগিয়ে চলছে। আধুনিক বাংলাদেশের প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষাদানে যোগ্য শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত রাখার জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটি আমাদের শিখে নেওয়া জরুরী।

প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের ডিজিটাল কন্টেন্টের মান যাচাই ও উৎসাহ প্রদানের লক্ষে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (এটুআই প্রোগ্রাম) ‘ডিজিটাল কন্টেন্ট প্রতিযোগিতা ২০১২’ শুরু করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সহায়ক এমন একটি পরিশীলিত ও সৃজনশীল কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ। শিক্ষক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের জন্য নিদ্দিষ্ট নিং ব্লগে (www.ictinedubd.ning.com) কন্টেন্ট আপলোডের মাধ্যমে শুরু হওয়া এ প্রতিযোগিতায় আমিও বেশ আগ্রহ নিয়ে ১ম রাউন্ডে অংশগ্রহণ করি। কন্টেন্টের মান যাচাই বাছাই শেষে জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় (২য় রাউন্ড, চট্টগ্রাম টিচার্চ ট্রেনিং কলেজে অনুষ্ঠিত) অংশগ্রহণ করে সফল হই এবং বিভাগীয় পর্যায়ে (৩য় রাউন্ড, কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে অনুষ্ঠিত) অংশগ্রহণ করি। বিষয় নির্বাচনে সিদ্ধান্তহীনতা এবং কৌশলগত সীমাবদ্ধতায় এবার জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ সম্ভব হয়নি। তবে, জাতীয় পর্যায়ের ১ম ডিজিটাল প্রতিযোগিতার বিভাগীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য হওয়া কম্পিউটার শিক্ষক হিসেবে আমার জন্য বেশ গর্বের। অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আগামী প্রতিযোগিতায় আরও ভাল করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।

ডিজিটাল কন্টেন্ট প্রতিযোগিতায় বেশি সংখ্যক শিক্ষকের অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছতার স্বপক্ষে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলোতে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
১। প্রতিমাসে কমপক্ষে ১টি কন্টেন্ট নিং এ আপলোড করা বাধ্যতামূলক করা গেলে এ কাজে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা বাড়বে।
২। প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটি উদ্যোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষিত শিক্ষককে কাজে লাগিয়ে অপরাপর শিক্ষকরা ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরী শিখে মেধার দৌঁড়ে নিজেকে এগিয়ে রাখার উদ্যোগ নিতে পারেন।
৩। জেলা পর্যায়ে আইসিটি নির্ভর কার্যক্রমে ‘ডিজিটাল কন্টেন্ট প্রতিযোগিতা’র আয়োজন করলে শিক্ষকদের সৃজনশীলতা বাড়বে। বিচারক হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞ শিক্ষককে ব্যবহার করা গেলে ভাল হয়।
৪। বিচারক নিয়োগে আরও নিরপেক্ষ ও কৌশলী হতে হবে। কারণ ডিজিটাল কন্টেন্ট বা ইফেকটিভ পাঠটীকা যা-ই বলেন বিষয়ভেদে উপস্থাপনায় কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত বিভাগীয় প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত সময়ের ২ ঘন্টা পরেও কন্টেন্ট জমা দিতে দেখেছি আমার উপস্থাপনের সময়ে, সেশন পরিচালনায় ব্যবহৃত ল্যাপটপে। এ অনৈতিক কাজটিতে জুরি বোর্ড বাধা দেন নি আমাদের অভিযোগের পরেও। ফাইনাল রাউন্ডের জন্য নির্বাচিত নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের জেবা ম্যাডামের সৃজনশীলতা ও সক্ষমতার প্রতি সম্মান জানিয়ে বলছি, প্রতিযোগিতা চলাকালীন ল্যাব টেকনিশিয়ান কর্তৃক তাকে সহযোগিতা করার ব্যাপারটি আমরা চট্টগ্রামের প্রতিযোগীরা ভাল চোখে দেখিনি। কক্সবাজারের প্রথম ‘ডিজিটাল ফেয়ার ২০১২’ এ আমি জিতলেও ‘সমাজ সেবা’র মানুষ দিয়ে ডিজিটাল কন্টেন্টের বিচারকার্য প্রশংসিত হয়নি।
৫। সামগ্রিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক প্রতিযোগিতা হলে প্রতি বছর বিষয়ভিত্তিক বেশ কিছু ভাল কন্টেন্ট পাওয়া যেতো।
৬। বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় জুরি বোর্ডে বিষয়ভিত্তিক বিচারক রাখা এবং উপস্থাপনায় সমান সময় দেওয়া প্রয়োজন। কারণ ডিজিটাল কন্টেন্ট উপস্থাপনের সময় কন্টেন্টে না দেওয়া ইংগিত শিক্ষকের নিজস্ব স্বকীয়তায় ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে।
৭। বিভাগীয় পর্যায়ের মতো প্রতিযোগিতায় ২ জন পরিদর্শক দিয়ে ৩০ জন প্রতিযোগীকে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়না বলে মনে হয়েছে। কারণ পরিদর্শকের চোখ ফাঁকি দিয়ে মডেমে থাকা মেমোরী কার্ড থেকে জমিয়ে রাখা সংশ্লিষ্ট ভিডিও, ছবি ব্যবহার করেছে অনেকে।
৮। জাতীয় প্রতিযোগীতার ১ম রাউন্ডেই সব টিটিসি ও নিং এ একই রকম স্লাইড পরিকল্পনা জানিয়ে দেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন।
বিভাগীয় পর্যায়ের ৩০টি কন্টেন্ট আমরা নিয়ে এসেছি। ওখানে বৈচিত্রগত, কৌশলগত ও মানের দিক দিয়ে বেশ ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেছে।
৯। প্রতিযোগীদের সম্মানজনক সম্মানী দিতে সরকারের দৈন্যতা আমাদের মোটেও ভাল লাগেনি। প্রেরিত চিঠিতে প্রতিষ্ঠান কর্তৃক খরচ বহনের সুষ্পষ্ট উল্লেখ থাকলে প্রতিযোগিদের সমস্যায় পড়তে হত না।
১০। একজন শিক্ষক যখন বলেন ‘ডিজিটাল কন্টেন্ট কী’ তখন আমাদের বুঝার বাকি থাকেনা প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা কতটা পিছিয়ে আছি। আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা প্রশাসন, সমাজের আলোকিত মানুষ ও মিডিয়া এগিয়ে এলে বিভিন্ন পর্যায়ে ‘ডিজিটাল কন্টেন্ট প্রতিযোগিতা’ আয়োজনের মাধ্যেমে আমাদের শিক্ষক সমাজ প্রশিক্ষিত হবে এবং আমরা একটি সুন্দর ডিজিটাল ক্লাসরুম পরিচালনা করে সুশিক্ষা বিতরনে এগিয়ে থাকবো।

৩ ও ৪ ডিসেম্বর জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা। চট্টগ্রামের ৩ প্রতিযোগী কলিগ ঈন্দ্রজিৎ, দীপক ও মান্নান স্যারসহ ফাইনাল রাউন্ডের সব শিক্ষকের জন্য নিরন্তর শুভেচ্ছা।
nurulislamsir@yahoo.com