ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

মাধ্যমিক স্তরে সুশিক্ষার পরিবেশ ভাবনা (৬) :
এস.এস.সি পরীক্ষা দেওয়ার উপযোগী শিক্ষার্থীদের বাছাই করতে আমরা নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফলকে সক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করি। শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী জিপিএ উন্নয়ন পরীক্ষার্থী ছাড়া সকল পরীক্ষার্থীর নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক। তবে, পূর্বে এস.এস.সি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে অকৃতকার্য হওয়া পরীক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এটি শিথিলযোগ্য। নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করলে এস.এস.সি’র ফরম পূরণ করতে পারবে না এমন কোন লিখিত নির্দেশনা শিক্ষা বোর্ডের নেই। কিন্তু প্রচলিত রীতি অনুযায়ী স্টাফ কাউন্সিলের বৈঠকে ‘নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করা কোন শিক্ষার্থীকে ফরম পূরণ করতে অনুমতি কোন ক্রমেই দিব না এবং কোন শিক্ষক এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠান প্রধান কিংবা সভাপতিকে অনুরোধ করতে যাবো না’ মর্মে আমরা অধিকাংশ বিদ্যালয় রেজুলেশনে স্বাক্ষর করি। নির্বাচনী পরীক্ষার পরে শিক্ষকরা তাদের কথা রাখলেও অনেক বিদ্যালয়ের কর্ণধাররা অধিকাংশ সময় তাদের কথা থেকে সরে আসেন। যে শিক্ষার্থীদেরকে আমরা ৫ বছর পড়িয়ে এস.এস.সি পরীক্ষা দেওয়ার উপযোগী করতে পারলাম না, তাদেরকে পরীক্ষার সুযোগ দিলে আমাদের অখুশি হওয়ার কথা নয়। পরীক্ষার ফরম পূরণ করার জন্য কোন ছাত্রী যখন পকেটে ৫ হাজার টাকা নিয়ে কমিটির সদস্যদের পিছু পিছু ঘোরে এবং পরবর্তীতে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ফরম ফিলাপের টিকিট পায় তখনো আমরা বেজার হইনা। গণিতে শূন্য (০) পাওয়া কোন পরীক্ষার্থী যখন হোস্টেল চার্জ ও ফরম ফিলাপের ফিসহ মোট সাড়ে ১০ হাজার টাকা জমা দিয়ে ফরম ফিলাপের টিকিট পায় তখনো আমরা অত অখুশি হইনা। কিন্তু পর পর দু’বার নির্বাচনী পরীক্ষা দিয়ে ফেল করা কোন শিক্ষার্থী যখন অঝর নয়নে বলে ‘স্যার, আমি কি শুধু নির্বাচনী পরীক্ষাই দিতে থাকবো! এস.এস.সি পরীক্ষা দেওয়ার সৌভাগ্য কি আমার হবেনা!’ তখন হৃদয়ে বড় চোট লাগে। পকেটে টাকা পুরে কারো মাধ্যমে ছেলেটি লবিং করাতে পারেনি কিংবা বুদ্ধি খাটিয়ে হোস্টেলে থাকার সক্ষমতা দেখায়নি বলে যখন শুনি ছেলেটির ফরম ফিলাপ হয়নি, তখন ভেতরের ‘আমি’ কষ্ট পায়। এই ছেলেটি কি আগামী বছর রেজিষ্টেশন কার্ড নবায়ন করে এস.এস.সি পরীক্ষা দেওয়ার টিকিট পেতে আবার নির্বাচনী পরীক্ষা দিতে আসবে, ধারনা নেই। অন্যদিকে, মামার জোড়ে বিশেষ ক্ষমতায় যারা ফরম পূরণ করেছে, তাদেরকে ছোট বয়সেই আমরা শিখিয়ে দিলাম মামা থাকলে কাজ হয়! দোয়া করে দিলাম – তারা কামিয়াব হোক। কিন্তু বড় হয়ে সমাজে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে তারাও যে দূর্নীতি করবে না – সে ভরসা পাইনা।

বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী ফরম ফিলাপের জন্য বিজ্ঞানের নিয়মিত পরীক্ষার্থী ৯৯০ টাকা, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ ৯০০ টাকা, ১ থেকে ৪ বিষয়ের পরীক্ষার্থী ২২০-৪১৫ টাকা এবং সব বিষয়ের অনিয়মিত পরীক্ষার্থী ১০০০ টাকা নেওয়ার বিধান রয়েছে। সেন্টার ফি ২৫০ টাকা অতিরিক্ত প্রদান করতে হয় শিক্ষার্থীদের। কিন্তু আমরা অধিকাংশ বিদ্যালয় ২৫০০ টাকার নিচে ফরম ফিলাপের ফি নির্ধারণ করিনি। যে শিক্ষা প্রশাসন রেজিষ্টেশনের সময় ২০ টাকা কম নেওয়ার জন্য ফোন করেন, তাঁরা কি এসব বিষয় অবগত? তাঁরা কি কখনো প্রতিষ্ঠানের ফরম ফিলাপের খোঁজ খবর নিয়েছেন? নির্ধারিত ফি’র চেয়ে বেশি টাকা নিয়ে ফরম ফিলাপ করানোর কারণে তাঁরা কি কখনো কোন প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় এনেছিলেন? ম্যানেজিং কমিটির কোন সদস্য প্রভাব খাটিয়ে সর্বোচ্চ ২ জন নাকি ৭ জন শিক্ষার্থীর ফরম ফিলাপ করাতে পারেন তা কি কোথাও লেখা আছে? যে মেয়ে ফরম ফিলাপের জন্য ৫ হাজার টাকা দিলো কিন্তু স্কুল পেল ১ হাজার ৭ শত টাকা, তার অবশিষ্ট টাকার ভাগ কার কার পকেটে গেলো? প্রশ্নের সংখ্যা না বাড়িয়ে তারচে’ চলুন আমরা নিম্নোক্ত বিষয়গুলোতে শিক্ষা দরদীদের সুদৃষ্টি আকর্ষন করি।

১। ১০ম শ্রেণির ১ম সাময়িক পরীক্ষার পরে অভিভাবক সমাবেশ করে ফলাফল শিক্ষার্থীর অভিভাবকের হাতে দেওয়ার ব্যবস্থা করলে ভাল হয় (যদিও গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলো অভিভাবক সমাবেশ করে ফলাফল প্রদান এক যুগেও ১ বার করে কিনা সন্দেহ)। প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষার পরেও এটি অনুসরণ করা যায়। এতে অভিভাবকরা সম্মানিত বোধ করবেন এবং প্রতি টার্মে তাদের সন্তানদের ফলাফল দেখে অতিরিক্ত যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে উদ্যোগী হবেন। এটি তাদের পড়ালেখার মান বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
২। প্রতি টার্ম পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ শেষে স্টাফ কাউন্সিলের বৈঠকে বিষয় ভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনা সভা করে সন্তোষজনক নয় এমন বিষয়ের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে প্রতিষ্ঠান প্রধান ব্যাখ্যা তলব করে ফেলের কারণ জেনে নিতে পারেন। তবে, ব্যাখ্যা তলবের পর প্রাপ্ত অসংগতিগুলো দূর করার ব্যাপারে ম্যানেজিং কমিটি ও প্রধান শিক্ষক মিলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে উক্ত বিষয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে দোষারোপ করা যাবে না। ফলাফল ভাল করার ব্যাপারের উনাদের তর্জন-গর্জনকে আমরা তখন মেকি আন্তরিকতা হিসেবেই বিবেচনা করবো।
৩। নির্বাচনী পরীক্ষায় নির্বাচিত পরীক্ষার্থী ছাড়া অন্য কারো ফরম ফিলাপের প্রয়োজন হলে তা যেন একাডেমিক কমিটিকে সম্মান জানিয়ে করা হয়। অবাক হবেন, অনেক সময় অধিকাংশ শিক্ষক জানেনও না তাঁদের বিদ্যালয়ের ক’জন পরীক্ষার্থী, ক’জনকে অতিরিক্ত সুবিধা নিয়ে কিংবা পারিপার্শ্বিক চাপে ফরম ফিলাপ করানো হয়েছে।
৪। সাধারনেরা জানেন না ম্যানেজিং কমিটির কোন সদস্য সর্বোচ্চ ক’জন অনির্বাচিত শিক্ষার্থীর ফরম ফিলাপ করানোর নিয়ম রয়েছে কিংবা আদৌ কোন নিয়ম রয়েছে কি না। তাই ম্যানেজিং কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে তা নিয়ে শিক্ষকদের কিছু বলার থাকেনা।
৫। আমাদের মেয়েরা ম্যানেজিং কমিটির পিছু পিছু ঘোরে লবিং করুক, অতিরিক্ত টাকা নষ্ট করুক কিংবা তারা কষ্ট পাক্ এই ব্যাপারটি অযাচিত, সভ্য সমাজে বেমানান। তাই কোন অনির্বাচিত শিক্ষার্থীর জন্য কারো সুপারিশ এলে তা যেন শিক্ষকদের স্টাফ কাউন্সিলের বৈঠকে শুনিয়ে সম্মান দেওয়া হয়, অযথা হয়রানির শিকার যেন আমাদের সন্তানেরা না হয়।
৬। প্রতিটি স্কুল ফরম ফিলাপের টাকা নেওয়ার সময় বিশেষ ক্লাসের জন্য কমপক্ষে ৮০০ টাকা ফি অন্তর্ভূক্ত করেন। বিশেষ ক্লাসের নামে নেওয়া উক্ত ফি কোন কোন বিদ্যালয় ৭০% সমহারে সবাইকে বন্টন করেন, ৩০% বিশেষ ক্লাস নেওয়া শিক্ষকদের জন্য রেখে দেন। কোন কোন বিদ্যালয় ৪০%, ৬০% আবার কোন কোন বিদ্যালয় তা ৫০%, ৫০% হারে বন্টন করেন এবং এটি মোটামুটি সহনীয়। বিশেষ ক্লাস নেওয়া শিক্ষকদের সম্মানী প্রদানের ক্ষেত্রে আরও উদার হোন, আউটপুট ভাল পাবেন।

মানুষ শ্রদ্ধা ভরে আমাদের ডাকেন ‘মানুষ গড়ার কারিগর’। আমরা বিশ্বাস করি, সেই আমাদের ভেতরের মানবিক স্বত্তা একদিন জেগে ওঠবে, সমাজ তার সুফল ভোগ করে উপকৃত হবে এবং তা নিকট ভবিষ্যতেই। আমাদের সন্তানদের জন্য নিরন্তর শুভকামনা।
nurulislamsir@yahoo.com