ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

সুশিক্ষা অর্জনের পথ পরিক্রমায় আমাদের সন্তানরা মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ নিতে শিক্ষালয়ে ভর্তি হয়। জীবনের ৫টি রঙিন বছর মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাটিয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহনের অভিলাষে এক সময় তাদের ডাক আসে সুদুরের। সমুখের পানে ওরা চলিঞ্চু; উন্নত জীবন গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে – অনন্য মানুষ হবার অভিপ্রায়ে। শিক্ষা জীবন শেষে নাড়ীর টানে তাদের অনেকেই নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে হৃদ্য সম্পর্ক রাখেন। বিদ্যালয়ের চতুর্পাশ চষে বেড়ানো, এসেম্বলী ক্লাসের শৃংখলিত শাসন, শিক্ষা সফরে গিয়ে উচ্ছলতায় অবগাহন কিংবা কৈশরের দুষ্টুমীপূর্ণ স্মৃতি এত সহজে কি ভুলা যায়। তাই সুসংবদ্ধ বিভিন্ন ব্যাচ মিলে অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রাক্তন ছাত্র সংসদ গঠিত হয়। কখনো পূনর্মিলন বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন কিংবা প্রয়াত শিক্ষকের স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সৃজনশীল ও উঁচু মানের কার্যাবলীতে তারা সম্পৃক্ত হন। জানান দেন, নিজের বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন প্রত্যাশী তারা। সামাজিকভাবে উঁচু আসনে কিংবা প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হতে পারলে প্রাক্তন ছাত্ররা নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অবদান রাখার চেষ্টা করেন। এটি স্বাভাবিক এবং এটিই হওয়া সুখের।

কিন্তু যুগোপযুগী ও সামাজিক দক্ষতায় প্রাজ্ঞ না হওয়ার কারনে কদাচিৎ প্রাক্তন ছাত্র সংসদের কাজগুলি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাদের অনেক দিনের পরিশ্রম বিফলে যায়। সামাজিক দায়বদ্ধতায় সাড়া দিলে মানবিক গুণগুলি বিকশিত হয় জানি। কিন্তু এসব কাজে সংশ্লিষ্টদের অগোচরে অনভিপ্রেত বিষয় যুক্ত হয়ে পড়লে সত্যের মানদন্ডে তা বৈধতা পায়না। এতে করে প্রাক্তন ছাত্রদের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অকাম্য টানাপোড়েন সৃষ্টি হয় এবং সুযোগ সন্ধানীরা তা কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করার অপপ্রয়াস চালান।

এ প্রসংগে সাম্প্রতিক একটি দূর্ঘটনার উল্লেখ করা ভালো। ককসবাজারের অনন্য বিদ্যাপীঠ ঈদগাহ্ আদর্শ শিক্ষা নিকেতনের কেজি শাখার প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক হাবিবুর রহমান স্যার বিগত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। স্যারের স্মরণে বিদ্যালয়ের প্রাক্তণ ছাত্র ফোরাম একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ ও স্মরণ সভা আয়োজনের প্রস্তুতি নেন গত ২৪ জানুয়ারী। কিন্তু প্রয়াত শিক্ষকের স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের আড়ালে সম্পাদক সাহেব অনেকের লেখা সম্পাদনা করে সুকৌশলে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সংক্রান্ত একটি দাবী প্রায় প্রতিটি লেখায় জুড়ে দেন। ফলে ন্যায্য ও সময়োপযোগি প্রতিক্রিয়ায় এই সুন্দর ও মহৎ আয়োজন স্থগিত হয়ে যায়। কোন প্রয়াত শিক্ষকের স্মারক গ্রন্থে উক্ত শিক্ষকের মহতী কার্যক্রম, স্মৃতি চারণ ও অবদানের কথা উঠে আসে সুধীজনের কথামালায়। যেহেতু হাবিব স্যার বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক তাই স্যারের অবদানের ফিরিস্তি ও স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রসংগ আসাই স্বাভাবিক। প্রতিটি লেখায় তা এসেছেও। এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে সম্পাদক সাহেব প্রায় প্রতিটি লেখায় যেখানেই প্রতিষ্ঠাতার প্রসংগ এসেছে সেখানে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বৃহত্তর ঈদগাঁওর নামকরা হোমিওপ্যাথ ও শিক্ষানুরাগী ডাঃ মুহাম্মদ আলমের নাম জুড়ে দেন। প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ডে থাকা প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব কামরুল হক চৌধুরীকে স্মারক গ্রন্থে লিখা হয় দাতা ও পরিচালক হিসেবে। ২০০৪ সালের এপ্রিলে আমি ঈদগাহ্ আদর্শ শিক্ষা নিকেতনে যোগদানের পর থেকে প্রতিষ্ঠাতা দাবী তোলা ডাঃ মুহাম্মদ আলমকে অত্র বিদ্যালয়ের কোন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। এর পূর্বে তিনি শেষ কবে অত্র বিদ্যালয়ে পদধুলি রেখেছিলেন তা আমার জানা নেই। তবে স্মারক গ্রন্থে প্রকাশিত লেখাগুলো পড়ে জানতে পারি অত্র বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে আলহাজ্ব কামরুল হক চৌধুরীর পাশাপাশি ডাঃ মুহাম্মদ আলম, প্রয়াত এ.জেড.এম শাহজাহান চৌধুরী লুতু মিয়ার অবদানও অনস্বীকার্য। আর একটি নতুন বিদ্যালয় দাঁড় করানোর পেছনে যে শিক্ষকবৃন্দ গলদঘর্ম ও অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন তাঁর মধ্যে প্রয়াত হাবিবুর রহমান স্যার অগ্রগণ্য। সেই হাবিব স্যারের অকাল প্রয়ানে অন্য সবার সাথে অত্র শিক্ষালয় এবং প্রাক্তন ছাত্ররা এক অনন্য শিক্ষাগুরুকে হারালেন। তাঁকে স্মরণ করে দোয়া মাহফিল, স্মৃতিচারণ সভা এবং স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ সুধীমহলে প্রশংসা পেলেও স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের মতো জটিল কাজটিতে সম্পাদক সাহেবের একছত্র আধিপত্যে অত্র বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের অর্জিতমান কিছুটা মলিন হয়।

এ প্রসংগে বলা যায়, স্মারক গ্রন্থ কমিটির পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া বজায় রাখলে, ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার অযাচিত মানসিকতা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হলে এবং সম্পাদনার সময় অপরের মেধাস্বত্বের স্বীকৃতি দিতে উদার হলে স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ সাবলীল হয়। হাবিবুর রহমান স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের সংশ্লিষ্ট পোস্টারিং, দাওয়াতনামা এবং স্মারক গ্রন্থ সবকিছুতে সম্পাদক সাহেবের অন্যরকম সৃজনশীলতা ও মেধার স্বাক্ষর ফুটে ওঠেছে। এটি আমাদের আনন্দিত করলেও স্মারক গ্রন্থের লেখা সমূহে যে দাবী সম্পাদক সাহেব তুলেছেন তা অত্র বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে আমাকে খুশি করতে পারেনি। কারণ যে ব্যক্তিকে আমি স্কুলে আসার পর থেকে বিদ্যালয়ের সামগ্রীক উন্নয়নে পরিশ্রম করতে দেখেছি অষ্টপ্রহর, রেকর্ডপত্রে যিনি প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যুগ ধরে সমাদৃত সে ব্যক্তি আলহাজ্ব কামরুল হক চৌধুরীর অবদানকে স্মারক গ্রন্থে অনেকটা ছোট করে দেখা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। ফলে, সামগ্রিক বিবেচনায় প্রয়াত শিক্ষকের স্মরণসভা ও স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের মতো সৃজনশীল ও মানবিক দায়িবদ্ধতার কাজটিতে অনভিপ্রেত বিষয় এসে পড়ায় তা পন্ড হয়ে যায়।

প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাথে ও শিক্ষালয়ের হৃদ্যতা বাড়ানোর স্বার্থে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো ভূমিকা রাখতে পারেঃ
১। পূর্বে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্কুল সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে বিদ্যালয়ের সুনাম বাড়তো। এর ধারাবাহিকতায় আমরা নিজেরাও ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহ্ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে অনেকবার পূনর্মিলন অনুষ্ঠান করেছি অবলীলায়। কিন্তু যুগ বদলেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গন্ডি পেরিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে গেছেন। তাদের মনের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তাই অনেক সময় অযাচিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুন্ন করে। এটি যাতে না ঘটে সেজন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষক মিলে প্রাক্তন ছাত্র সংসদের জন্য অনুকরনীয় ও অবশ্য পালনীয় একটি নীতিমালা প্রনয়ণ করা যেতে পারে। কোন অনুষ্ঠান করতে গেলে প্রাক্তন ছাত্র সংসদ উক্ত নীতিমালা পরিপন্থী কোন কাজ করবেনা মর্মে লিখিত নেয়া যেতে পারে।
২। প্রাক্তন ছাত্র সংসদকে কোন অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দিয়ে তা যেন স্থগিত করতে না হয় সেজন্য প্রাক্তন ছাত্র সংসদের যে কোন আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পূর্ণ তদারকি করার স্বার্থে ছাত্র সংসদ কমিটিতে প্রতিষ্ঠানের কোন চৌকষ শিক্ষককে অন্তর্ভূক্ত করার বিধান রাখা যেতে পারে।
৩। প্রাক্তন ছাত্র সংসদের সাথে বিদ্যালয়ের আত্মিক সম্পর্কের মানোন্নয়নে অনুষ্ঠান পরবর্তী জবাবদিহীতামূলক বৈঠকের আয়োজন করা যেতে পারে।
৪। কোন সময় প্রাক্তন ছাত্র সংসদের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন বিষয় নিয়ে অনভিপ্রেত পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তা নিরসনের জন্য বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও প্রতিষ্ঠান প্রধান তা নিরসনের জন্য সমঝোতা বৈঠকের আয়োজন করতে পারেন।
৫। প্রাক্তন ছাত্র সংসদের কাউকে কাজে লাগিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কারো সংকীর্ণতায় যাতে প্রাক্তন ছাত্র সংসদের কাজগুলি কলুষিত না হয়, যাতে কেহ স্বীয় স্বার্থ হাসিল করতে ব্যস্ত না হয়ে পড়ে সে বিষয়ে প্রাক্তন ছাত্রদেরও সজাগ থাকা জরুরী।
৬। স্মারক গ্রন্থ কিংবা ম্যাগাজিন প্রকাশের মতো দূরূহ কাজটিতে সম্পাদক ও সম্পাদনা পরিষদের নিবিড় অবলোকন করা প্রয়োজন। অনন্য মেধাবীরা একাকী তা সম্পাদনা করার দুঃসাহস দেখাতেই পারেন। কিন্তু তাতে স্মারকগ্রন্থ কিংবা ম্যাগাজিনের সার্বিক সৌন্দয্য ও মানবিক আবেদন ম্রিয়মান হয়। সম্পাদক সাহেব লেখার সম্পাদনা করতেই পারেন। ছান্দসিক দ্যোতনা সৃষ্টি, বাক্যের যোগ্যতা রক্ষা কিংবা আবহ সৃষ্টির জন্য তা প্রয়োজনও। কিন্তু অন্যের লিখা বেশি কাট-ছাঁট করার প্রয়োজন হলে তা লেখককে জানিয়ে করা ভাল।
৭। প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এদের পদভারে ও সৃজনশীল কর্মকান্ডে বিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি পাবে এটি সাধারণের প্রত্যাশা। প্রত্যেকবার বড় আয়োজন করা বাধ্যতামূলক তো নয়। তাই কোন প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত ছাত্র সংসদ থাকলে বছরান্তে তাদের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকরা বসে চা চক্রের আয়োজন করতে পারেন। এতে তাদের সাথে প্রতিষ্ঠানের হৃদ্যতা বাড়বে। প্রাক্তন ছাত্র সংসদ সম্মানিত বোধ করবে। এ নিবিড় সম্পর্ককে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে তা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রীবৃদ্ধিতে অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনিন্দ্য অলংকার। তাদের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুসম্পর্ক রাখা গেলে তাতে প্রতিষ্ঠানের মানবিক দ্যূতি বিকশিত হয়। আমরা চাই প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিষ্ঠানের হৃদ্যতা বজায় থাকুক। আর আমরা নতুন প্রজন্ম কাউকে অযাচিতভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার মানসিকতা রাখিনা। ঈদগাহ আদর্শ শিক্ষা নিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব কামরুল হক চৌধুরী কর্তৃক বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে অকৃত্রিম উদারতা, সুক্ষ্ম নজরদারী ও আন্তরিকতা প্রজন্মান্তরে মানুষ মনে রাখবে। পাশাপাশি অত্র বিদ্যালয়ের অন্যতম সহযোগি উদ্যোক্তা বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ডাঃ মুহাম্মদ আলম, এতদাঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় জননেতা প্রয়াত এ.জেড.এম শাহাজাহান চৌধুরী লুতু মিয়া ও হাবিব স্যারসহ চিত্তবান সবার প্রতি আমাদের বিনীত শ্রদ্ধা।