ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষে জীবিকার তাগিদে আমরা অধিকাংশই বিভিন্ন পেশার সাথে নিজেদেরকে জড়িয়ে নিই। ২০০২ সালে বি.এস-সি পাসের পর অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই আমি শিক্ষকতা পেশায় জড়িয়ে যাই। কক্সবাজার সদরের দীপশিখা গার্লস একাডেমিতে তখন শিক্ষক সংকট চলছে। পরিচালক ও প্রধান শিক্ষক লন্ডনে তাঁর ছেলের বার-এট-ল’র সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হলে তিনি আমাকে স্কুলে নিয়ে গেলেন। শিক্ষকতায় নবীন আমি চার মাস ওখানে অনেকটা বিনা পয়সায় কাটিয়ে দিলাম। এরপর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত হলে ওখানে ভর্তি হই। চমৎকার ও অনন্য আন্তরিক দু’জন প্রশিক্ষক স্যারের তত্ত্বাবধানে প্রত্যাশা এবং সিলেবাসের বাইরে অনেক কিছু শিখে আপ্লুত হয়েছি। মুহাম্মদ ইলিয়াছ মিয়া চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ে আমার এক ফুফাত ভাই শিক্ষকতা করতেন। আমার প্রশিক্ষণ শেষ হলে ফুফাত ভাইয়ের ২০ দিনের ছুটিতে তাঁর শুণ্যতা পূরণ করতে গিয়ে শিক্ষকতার প্রতি নেশা আরও বাড়লো। ইতোমধ্যে ঈদগাহ শাহ জব্বারিয়া আদর্শ দাখিল মাদ্রাসায় বি.এস-সি শিক্ষক না থাকায় ওখানে পড়ানোর জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে পড়ানো শুরু করলাম। মাদরাসার প্রত্যেক শিক্ষক বিনা বেতনে পড়াতেন। কিন্তু আমাকে নামমাত্র সম্মানী দিতে ১০ম শ্রেণি থেকে টাকা উঠানো হল। একমাস পূর্ণ হওয়ার দিনই আমার কৈশরের স্মৃতি বিজড়িত ঈদগাহ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে ডাক পেলাম। মাদরাসা থেকে ১০০০ টাকা সম্মানী নিয়ে আমি আমার নিজের স্কুলে চলে গেলাম। যে সব আলোকিত হৃদয়ের স্যারেরা আমাকে পড়িয়েছেন তাঁদের সাথে চেয়ারে বসতে গিয়ে আমার অন্যরকম অনুভূতি ও মুগ্ধ হওয়ার পালা। পড়াতে গিয়ে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছি। জানলাম, সরকারী টাকা পেতে গেলে এম.পি.ও ভুক্ত হতে হয়। শুণ্যপদ না থাকায় আমি স্থায়ী হতে পারছিনা। ইতোমধ্যে চাকরির নয়মাস পূর্ণ হতে চললো। স্কুলের উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটির দলাদলি ঐ স্কুলে তখন শুরু হয়ে গেছে। এদের যাঁতাকলে আমিও পিষ্ট হলাম। ২০০৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসের চাকরী জীবনে আমাকে সর্বমোট ২ হাজার টাকা সম্মানী দিতে উনাদের খারাপ লাগেনি। আমি কষ্ট পেলাম। এম.পি.ও ভুক্ত হওয়ার আশায় বিভিন্ন স্কুলে পরীক্ষা দিতে লাগলাম কিন্তু শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অসুন্দর কাজের দৌরাত্ম্যে আমি বার বার অনুত্তীর্ণ হচ্ছি। লিখিত পরীক্ষায় টিকলাম তো ভাইভাতে শেষ। খবর পাই, যিনি টিকলেন তিনি অমুকের আত্মীয়, কেহ বা অনেক বছর ধরে স্কুলে পড়িয়ে যাচ্ছেন নিয়োগের আশায় কিংবা উনি তো অভিজ্ঞতার ১০ নম্বরে এগিয়ে গেছেন! কোন কোন পরীক্ষায় দেখা যেতো সংশ্লিষ্টদের বশে এনে আগেই প্রশ্ন কেনা হতো! খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। শিক্ষকতার নেশা থেকে নিবৃত্তিও পাচ্ছিলাম না। শের আলী স্যার বলতেন, শিক্ষকতায় চল্লিশা (৪০ দিন পূর্ণতা) পার হলে এ নেশা কাটানো কঠিন। নতুন প্রতিষ্ঠিত ঈদগাহ ইন্টারন্যাশনাল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এন্ড কলেজে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হলাম। কিন্তু আমার অন্যতম শুভাকাংখী শিক্ষাগুরু সিরাজ স্যারের পরামর্শে ঐ বিদ্যালয় উদ্বোধনের দিন আমার যাওয়া হয়নি। শিক্ষকতা এগিয়ে চলেছে, সম্মানীর হদিস নেই। অন্যরকম প্রতিশোধ ও শিক্ষকতার প্রতি আমার নেশা এবং শিক্ষার্থীদের অকৃত্রিম ভালবাসায় আমি ঐ স্কুলের ৯ মাসের চাকরী জীবনে মাত্র ১ দিন ছুটি নিয়েছিলাম। ইতোমধ্যে আমার বর্তমান চাকরিস্থল ঈদগাহ আদর্শ শিক্ষা নিকেতনে কম্পিউটার শিক্ষকের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলো। হাই স্কুলের সহকর্মী জসিম স্যার আমাকে বললেন তাঁর জন্য তাঁর সাথে পরীক্ষা দিতে যেতে হবে। উনি আমার জন্যও ব্যাংক ড্রাফট করলেন। আমার কাগজপত্র রেডি করে জমা দিলেন। নিয়োগ পরীক্ষার সময় সকাল ১১টা। অফিস সহকারী না থাকায় আমি সকাল থেকে হাইস্কুলে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ফি নিয়ে রশিদ দিচ্ছি। ১১টা বাজলেও কাজ শেষ হচ্ছেনা। জসিম স্যার ফোন করেই চলেছেন। রশিদ স্যার বললেন, ‘কাজ বন্ধ রাখ, টাকাগুলো আমাকে দাও; আমি গুনে বুঝিয়ে দেবো।’ হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। শিক্ষা নিকেতনে পৌঁছে দেখি আমি যথাসময়ে না আসায় কোরাম সংকট, পরীক্ষা স্থগিত। প্রসঙ্গত বলে রাখি, তখন ঐ স্কুলে অনারারী চাকরি করা এক স্যারের জন্য অনেক লবিং হয়েছে। জসিম স্যারের পক্ষেও দেখি জোর লবিং। আমি কিছুই বুঝিনি। উনারা দুইপক্ষ নিয়োগ কমিটিকে বুঝিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য রাজি করালেন। পরীক্ষা হলো। আমি ঠিকই লিখিত পরীক্ষায় প্রথম হলাম। ভাইভা দিলাম। অপর দু’প্রতিযোগীর জোর লবিং স্বত্তেও নিয়োগ কমিটির স্বচ্ছতায় আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি নির্বাচিত হয়ে গেলাম।

এপ্রিল ২৪, ২০০৪ এ যোগদান করলাম। সেপ্টেম্বরে আমার এম.পি.ও আসলো। শুরু হলো স্বাচ্ছন্দ্যে পথা চলা। কোন শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকলে গ্যাপ ক্লাসের অধিকাংশ আমাকে নিতে হতো। ইংরেজী, বাংলা, রসায়ন, গণিত, কৃষি শিক্ষা কোনটিই বাদ যেতো না। নিজের ক্লাসের বাইরে গ্যাপ ক্লাস টানতে গিয়ে কষ্ট হতো। ভেতরের আমি প্রবোধ দিতো এ বলে যে, আমি একদিন অনুপস্থিত থাকলে আমার ক্লাস নিতে গিয়ে অনেকের অনভুতি বোধহয় এমনই হবে। তাই অন্যরমকম প্রতিদান দিতে গিয়ে আমি প্রতিদিনই স্কুলে যাই। প্রথম বছর শেষে দেখা গেলো, মাত্র ১ দিন ছুটি নিয়েছি। সহকর্মীরা আমার খুব প্রশংসা করলেন। অনুপ্রাণিত হয়ে পরের বছর একদিনও ছুটি নেইনি। বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমাকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে সম্মানিত করলেন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতার স্ত্রী সেলিনা আকতার। বিষয়টি আমাকে এত আমোদিত করলো যে পরের বছর থেকেও আমি শিক্ষার্থীদেরকে বেশি সময় দিয়ে রেকর্ড গড়ার চেষ্টা করি। ৫ বছর শেষে দেখা গেলো, আমার ছুটি মাত্র ৩ দিন। দেশবরেণ্য উপস্থাপক হানিফ সংকেত বিষয়টি জানলেন। তাঁর দেশসেরা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে আমাকে শিক্ষকতায় নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হিসেবে প্রতিবেদন করেন। ‘ইত্যাদি’ টিম বিদ্যালয়ে এসে শুটিং করলেন। ১০ মে কুমিল্লার শালবন বৌদ্ধ বিহারের উম্মুক্ত মঞ্চে অজস্র দর্শকের সামনে আমাকে সম্মানিত করে দু’টি কম্পিউটার প্রদান করেন। বিটিভি ও বিটিভি ওয়ার্ল্ডে ২৯ মে ২০০৯ এ তা প্রচার হলো। আমার আনন্দ আর ধরেনা। দেশ বিদেশ থেকে মুহুর্মহু ফোন, ধন্যবাদ আর শুভকামনায় আমি অভিসিক্ত হতে লাগলাম। ধারাবাহিকতায় ঐ বছরই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমি লাভ করি ‘বি.এস.বি ফাউন্ডেশন এওয়ার্ড ২০০৯’। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের ঐ অনুষ্ঠানটি এ.টি.এন বাংলা সরাসরি সম্প্রচার করলো। শুভেচ্ছা আর প্রতিদানে হৃদয় ভরে যাচ্ছে। ‘ঈদের ইত্যাদি’তে আবারও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের আলোকিত মানুষদের সাথে ইনডোর স্টেয়িামের মঞ্চে বসলাম। সাবিনা ইয়াছমিন ও এন্ড্রো কিশোর আমাদের কার্যক্রমকে সম্মান জানিয়ে একটি চমৎকার গান পরিবেশন করেন। পলান সরকার, আকবর আলী আশা’দের মতো অনুকরনীয় মানুষদের সাথে ভাব বিনিময়ে আমি বিমুগ্ধ হলাম। জয়েন্ট কক্স, ককসবাজার আমাকে সংবর্ধিত করলেন। ২০১১ সালের ২২ মে আমার ৭ বছরের অনন্য শিক্ষকতার প্রতিবেদন করলেন দেশের ভিন্ন মাত্রার দৈনিক ‘প্রথম আলো’র অন্যরকম সৃজনশীল সাংবাদিক আবদুল কুদ্দুস রানা ভাই। ২০১২ সালের জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভিন্নমাত্রায় উপস্থাপনসহ আমাকে ক্রেস্ট দিয়ে সম্মানিত করেছেন প্রথম আলো’র সহযোগী সম্পাদক বিশ্বজিত চৌধুরী।

ইতোমধ্যে আমার শিক্ষকতার ৮ বছর ৯ মাস পূর্ণ হলো। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আমার দুরে থাকা কেবল ঐ ৩ দিনই। আমার শিক্ষার্থী ও পেশাকে ভালবেসে আমি আজ প্রতিদানে সমৃদ্ধ। প্রাপ্তি ও ভালবাসায় আমি বিমুদ্ধ। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বমানের শিক্ষায় সমৃদ্ধ হয়ে দেশের কল্যাণে ভূমিকা রাখবে। শিক্ষাথীদের জন্য প্রতিদিন যেন এক একটি ভালবাসা দিবস। দেশের সব শিক্ষার্থীর জন্য শুভেচ্ছা ও ভালবাসা নিরন্তর।