ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

নূরুল ইসলাম
কম্পিউটার শিক্ষক
ঈদগাহ আদর্শ শিক্ষা নিকেতন
ঈদগাহ, সদর, কক্সবাজার

‌‌”ইত্যাদি” ব্যক্তিত্ব

ICT (Information and Communication Technology) শব্দটির সাথে আমরা প্রায় সবাই পরিচিত। ব্যবহারভেদে এটির সংজ্ঞা ভিন্ন হতে পারে। সহজ কথায় এর সংজ্ঞা আমরা এভাবে দিতে পারি, যে কোন প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে, স্বল্প খরচে এবং দ্রুততম সময়ে কোথাও প্রেরণ কিংবা নিজে পাওয়ার জন্য আমরা যে প্রযুক্তি ব্যবহার করি তা-ই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তি দক্ষতার সাথে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে দুনিয়ার অধিকাংশ দেশ সামনের দিকে এগুচ্ছে। কিন্তু অনিচ্ছা কিংবা ভয়ের কারণে বিষয়টির সুফল গ্রহণ করার মজা থেকে আমরা অনেকেই বঞ্চিত। আশার কথা, বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা এবং আইটি’র মানুষগুলোর সততার কারণে বাংলাদেশও স্বপ্নের ‘‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’’ হবার পথে পুরোদমে যাত্রা শুরু করেছে। পৃথিবীর বর্তমান চেহারা বলে দেয়, যে মানুষটি তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার জানবেন না বা শেখার কাজে নিজেকে জড়াবেন না, ব্যবহারিক জীবনের অলিগলিতে তিনি ঠকবেনই। তাই, আধুনিক দুনিয়ার সাথে নিজেকে আপ-টু-ডেট রাখার জন্য, নিজেদের প্রয়োজনীয় কার্যক্রমগুলো মনের মতো করে সম্পাদনের জন্য আমাদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার জানা ও শিখা অতীব জরুরী।

ভাল কথা, আমরা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কে শিখতে চাই। এর বিশাল পরিধি থেকে কি শিখবো আমরা। সহজ উত্তর, নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যা দরকার তাই শিখবো এবং সেটিই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। কিভাবে, কোন্ বিষয় থেকে শুরু করবো – বলেন? তার আগে আসুন জেনে নিই, আমরা সাধারণ মানুষেরা কিভাবে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করি।

আমরা জানি, মোবাইলের মেমোরী কার্ডের মধ্যে অনেকেই গান, ছবি আপলোড করেন। কোন্ দোকানে কাস্টমার বেশি যায় জানেন? যে দোকানের অপারেটর ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন নতুন গান ডাউনলোড করে রাখেন অবশ্যই তার দোকানে – তাই না? এই যে দোকানি নতুন নতুন গান ডাউনলোড করার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন এটিই তার কাছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার। এবং এটি যেহেতু তার আয় বাড়িয়ে দেয় সেহেতু প্রতিনিয়ত Google কিংবা তার প্রিয় সাইটে ঘুরাঘুরি করতে গিয়ে ভাল অনেক কিছু তিনি শিখে যান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সাথে নিজের খাতির জমান। জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন, এই ব্যাপারটি শিখার জন্য তাকে বেশি বেগ পেতে হয়নি। তার প্রয়োজন ও সদিচ্ছা তাকে প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হতে বাধ্য করেছে এবং সে আগ্রহভরে শিখে নিয়েছে।

আমি দেখেছি, আমাদের ঈদগাঁও এর কোন সাংবাদিক ছবিসহ কোন বিজ্ঞাপন পেলে তাকে কক্সবাজার পত্রিকা অফিসে ছবি নিয়ে সরাসরি যেতে হতো। এতে তার অন্তত একশত টাকা এবং মূল্যবান কিছু সময় নষ্ট হতো। অথচ এখন সেই সাংবাদিকদের অনেককেই দেখি, নিজেই নিজের কম্পিউটার থেকে ছবিসহ বিজ্ঞপ্তি কিংবা সংবাদ ই-মেইল করে দিচ্ছেন। অন্য সাংবাদিকরা তার দ্বারস্থ হচ্ছেন তার মাধ্যমে ইমেইল করার জন্য। অন্যের কম্পিউটার দোকানে গিয়ে অপারেটরের মাধ্যমে সংবাদ লিখার চেয়ে নিজের কম্পিউটারে নিজেই সংবাদ লেখার মাঝে কত আনন্দ মেলে এবং মনের মতো সংস্কার করে সংবাদটিকে গ্রহনযোগ্য করে তোলা যায় তা কেবল ব্যবহারকারীই বুঝেন। তাছাড়া, অনলাইন বিভিন্ন পত্রিকা পড়ে তিনি তাজা খবরের সাথে সব সময় নিজেকে আপডেট রাখেন। এই যে সাংবাদিকতার কাজে তিনি ইমেইল ব্যবহার করছেন, বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা পড়ে নুতন নতুন খবর পাচ্ছেন, বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী লেখা পড়ে নিজেও তেমন কোন লিখা তৈরীর বিভিন্ন ইঙ্গিত পাচ্ছেন এসব তার নিকট তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সফল ব্যবহার। আমি এমন এক সাংবাদিককে জানি, যিনি ল্যাপটপ কিনে ঐ রাতেই বাংলা কি বোর্ড সম্পূর্ন মুখস্থ ও আয়ত্ত করে ফেলেছেন এবং সঠিক নিয়মে এখন প্রাত্যহিক কাজে ব্যবহার করছেন। আপনিও শুরু করুন। নিজের কাজের আনন্দে নিজেই বিমোহিত হবেন।

আমরা শিক্ষকরা জানি, বর্তমানে কেবল নির্দিষ্ট পাঠ্য বই পড়িয়ে শিক্ষার্থীদের মন জয় করা দুরূহ। ছাত্ররা বুঝতে পারে, কোন্ স্যার কেমন পড়াশুনা করেন। বর্তমানে ই-তথ্য কোষ এ বিষয়ভিত্তিক পাঠের উপর ডিজিটাল কন্টেন্ট ডাউনলোডের সুবিধা সংযুক্ত হয়েছে। তাছাড়া, Google এ সার্চ দিয়ে যে কোন বিষয়ের প্রয়োজনীয় তথ্য সহজেই পাওয়া যায়। এসব বিষয় যদি আপনার পাঠে সংযুক্ত করেন তাহলে শিক্ষার্থীরা জানবে আপনি তাদের ভাল শিখানোর জন্য পড়াশোনা করেন। অতিরিক্ত কিছু জানার কারনে আপনার প্রতি তাদের সমীহ অন্যদের থেকে আলাদা হবেই। আর এসব কিছুর সংগে নিজেকে মানিয়ে না নিলে তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে আপনি পিছিয়ে পড়ছেন- সেটা আপনার শিক্ষাথীরাও জেনে যাবে। তাই শুরু করুন আপনার স্কুল থেকেই। আপনার স্কুলের কম্পিউটারগুলো কাজে লাগান। শিক্ষার কাজে Google এ সার্চ দেওয়া, ব্রাউজিং শিখে নিন। কম্পিউটার শিক্ষকের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলুন। সাফল্যে, আনন্দে এবং সৃষ্টিশীলতায় নিজেই অভিভূত হবেন।

অনেক স্কুলের কম্পিউটার রুম প্রতিদিন খোলাও হয়না অথবা শিক্ষার্থীদেরকে সহজে কম্পিউটার কক্ষে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়না – এটা আমরা জানি। অথচ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, কম্পিউটারগুলো শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করবে, শিখবে। অথচ নষ্ট হবার ভয়ে অনেক স্কুলের প্রধান শিক্ষক কম্পিউটার রুমে শিক্ষার্থীদের অবাধ যাতায়াত পছন্দ করেন না। কিন্তু আমরা জানি, আইটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদেরকে বারবার অনুরোধ করেন, কম্পিউটার রুমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য। আর কম্পিউটার শিক্ষক ট্রাবলশ্যুটিং এ একটু দক্ষ হলেই সাধারণত কম্পিউটার অচল হবার ভয় নেই। শিক্ষার্থীদের কম্পিউটারে বসান, লেখালেখির কাজ শিখান, Google এ প্রয়োজনীয় তথ্য কিভাবে খোঁজতে হয় শেখান। বড় হলে ওরা আপনার আন্তরিকতাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। আর প্রধান শিক্ষকবৃন্দেরও উচিত আইটি খাতকে প্রাধান্য দেয়া, অভাব অভিযোগ শুনে শিক্ষার্থীদৈর তথ্য প্রযুক্তি শেখার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরী করা।

মোট কথা, একটু খেয়াল করলেই আপনি মুগ্ধ হবেন – শিক্ষা, চিকিৎসা, ইউনিয়ন পরিষদ, ব্যাংকিং জগত, কৃষিখাত, ই-গভর্নেন্স থেকে শুরু করে সবখানেই আজ তথ্য প্রযুক্তির জয়জয়কার। মানুষ সহজেই এ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের কাজগুলি সাবলীলভাবেই সম্পাদন করে নিচ্ছেন। তাই, আসুন আমরা আজ থেকেই শেখা শুরু করি। এবং তা হাতের মোবাইলটি দিয়েই।

মোবাইলে ২০টাকা দিয়ে গান লোড করার চেয়ে চলুন ২০ MB কিংবা ১৫ MB নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু করি। প্রথমে প্যাকেজটা কিনে নিজে কিংবা কারো সহায়তায় m.operaminn.com লিখে Install করে নিই। বাংলা পড়ার জন্য about:config লিখার পরে সেটিংস এর use bitmap fonts for complex scripts এর No পরিবর্তন করে Yes এবং Save দিই। Bookmarks তৈরী করে নিই http://www.coxsbazarnews.com, http://www.bdnews24.com/bangla, http://www.banglanews24.com.. ফলে, পুরো এক সপ্তাহ আপনি প্রাত্যহিক খবরের সাথে আপডেট থাকবেন। আপনার ভাল লাগবে। wap.opentechbd.com লিখে Infocell, E2Bdictionary download করে নিই। প্রয়োজনের সময় বাংলা ডিকশনারীটি আপনাকে অনেক সাহায্য করবে। ইত্তেফাক, যুগান্তর এর সংবাদ শিরোনাম এবং ক্রিটের খবর আপনি অতি স্বল্প kb ব্যয়ে পেয়ে অনেক মজা পাবেন। অনেকে এখন মোবাইলে Facebook, Nimbuzz, Fring ব্যবহার করে কথা বলেন। এসবে কিছু সময় ব্যয় করা অনেকের প্রাত্যহিক কাজের একটি। ফেসবুক বুন্ধু কিংবা নেট ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাপ্ত ভিন্ন স্বাদ আপানাকে তথ্য প্রযুক্তির সাথে নিজেকে জড়াতে সাহায্য করবে।

এবার আসুন, জেনে নিই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি শেখার কিছু সহজ উপায়ঃ

২০০২ সালে আমি যখন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, ককসবাজার কার্যালয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি তখন এক স্যার বলেছিলেন, কম্পিউটার ভাল শিখতে হলে ‘ত্যাঁদড়’ হতে হবে। অর্থাৎ যার কম্পিউটার আছে তার কাছে তিনি পছন্দ না করলেও ঘন ঘন যেতে হবে। মাঝে মাঝে ওই কম্পিউটারটি ব্যবহার করতে হবে তিনি পছন্দ না করলেও। তখন দেখা যাবে, ধীরে ধীরে আপনি কিছু শিখে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি কিছু মনে করেন বলে তার সঙ্গ যদি ছেড়ে দেন তাহলে আপনি শিখার ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবেন না। আজ এ অবস্থানে এসে স্যারের কথাটির সত্যতা প্রতিদিন উপলব্ধি করছি। আসলেই আমাদের উচিত যিনি জানেন তার নিকট থেকে যে কোন কৌশলে শিখে নেয়ার মন মানসিকতা তৈরী করে নেয়া। যিনি জানেন, তার কথায় মাইন্ড না করা বরং তার সাথে থেকে শিখে নেয়ার মানুষকেই স্যার ‘ত্যাদড়’ বুঝিয়েছিলেন। তাই চলুন –

১। প্রথমেই শিখার জন্য ‘ত্যাঁদড়’ হবার মনমানসিকতা তৈরী করে নিই।
২। যিনি কম্পিউটার ব্যবহার জানেন কিংবা মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তার সাথে সখ্যতা গড়ে তুলুন এবং তার সহযোগিতায় আপনার মোবাইলে প্রয়োজনীয় সফটওয়ার ডাউনলোড করে নিন এবং সফটওয়্যার গুলো বিশেষ করে Google এর ব্যবহার শিখে নিন। এটি আপনাকে অনেকদুর এগিয়ে নেবে।
৩। টেলিভিশন, ডিভিডি কেনার চেয়ে সম্ভব হলে বাড়ির জন্য একটি কম্পিউটার কিনে নিন এবং প্রাথমিক ব্যবহারগুলো শিখে নিন।
৪। আজকাল ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রে কম্পিউটার শেখার সুন্দর ব্যবস্থা হয়েছে। সুযোগ পেলে ছোট ছোট কোর্সগুলো শিখে নিন।
৫। সম্ভব হলে একটি মডেম কিনে ইন্টানেট ব্যবহার শুরু করুন। Google, Youtube ব্যবহারের কৌশল শিখে নিন। তথ্য-প্রযুক্তির পথে অবলীলায় আপনি এগিয়ে যাবেন।

আমরা জানি, বাংলাদেশী বংশোদ্ভোত সালমান খান ইউটিউবে বিনা মূল্যের শিক্ষা বিষয়ক ভিডিও বানিয়ে পৃথিবীর সেরা ১০০ প্রভাবশালীর তালিকায় স্থান করে নিয়ে বাংলাদেশকে সম্মানিত করেছেন। আপনি নিজেকে সম্মানিত করার জন্য আজ থেকেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার শিখা শুরু করুন। নিজের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদনের জন্য তথ্য-প্রযুক্তিকে কাজে লাগান। ভিন্ন কিছু জানার কারনে সমাজে আপনার কদর বাড়বে, ধীরে ধীরে আপনার ভেতরের শক্তিমত্তা কাজে লাগিয়ে আপনি পরিনত হবেন অনন্য মানুষে। আর আপনার ভালবাসা, কর্মে সাফল্য আমাদের বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে সাফল্যের সরোবরে। এবং শির উচিয়ে আমরা বলবো, ‘শোকর আলহামদুল্লিাহ! আমরা বেশ ভাল আছি’।