ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

 

ঘটনাটা শুনেই বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠলো । হোক্কাইডো আসার কয়েক মাস পরের কথা । একটু একটু করে এই জায়গার মানুষ এবং পরিবেশের সাথে পরিচিত হচ্ছি ।হঠাৎ যেন নতুন পৃথিবী । সব কিছু নতুন । আমার স্বামী সারাক্ষণ তার গবেষণা নিয়ে তাঁর কর্মস্থলে প্রচণ্ড ব্যস্ত । আমি নিজের মতো করে নিজের জীবনটা উপভোগ করার চেষ্টা করছি । প্রশান্ত মহাসাগর আর জাপান সাগরের অদ্ভুত রহস্যময় মায়ায় গড়ে উঠা হোক্কাইডো দ্বীপটা নিজেই যেন এক রহস্য । স্থানীয় জাপানিজদের কাছে জানা যায় হোক্কাইডোর ইতিহাস বেশি দিনের নয় । আমার আবার ইতিহাস এবং সংস্কৃতি দুটোই খুব আনন্দ দেয় । এই শহরটার নাম সাপ্পরো ।

খুব সুন্দর এবং পরিকল্পিত নগর । হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয় কে কেন্দ্র করেই অনেক বিদেশির প্রবেশ এই সাপ্পরো শহরে । তাই বিদেশিদের জন্য সিটি সাপ্পরো ও অনেক আয়োজন রাখে । গ্রীষ্মকালের কিছু আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে গিয়ে অনেক গুলো স্বেচ্ছা সেবক দলের সাথে পরিচয় হল । এখানে বৃদ্ধ মানুষ অনেক । স্বেচ্ছা সেবক দল গুলো বেশির ভাগ বৃদ্ধ দিয়ে পরিচালিত হয় । এই রকম স্বেচ্ছা সেবক দলেরই একজন বৃদ্ধা । উচিদা শেই । তিনি এক সময় কলেজ শিক্ষক ছিলেন । উচিদা নামটা তার নিজের পরিবার থেকে পাওয়া । শেই নামটা তার স্বামীর পদবি ।এটা এখানকার জাপানিজ সংস্কৃতি । বিয়ের পর সবাই স্বামীর পদবি গ্রহন করে । অল্প কিছু দিনের মধ্যে তার সাথে কেমন করে যেন আমার খুব ভাল সম্পর্ক হয়ে গেল । সে আমাকে তার নাতনির মতো দেখে । সে শেখাতে আর আমি শিখতে ভালবাসি । স্বেচ্ছা সেবক দলের সবাই খুব খুশি হয় আমি যখন তাদের সাথে কাজে অংশ গ্রহন করি । কারন এখানে তরুন তরুণীরা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত । বয়স্কদের সাথে আমার মতো একজন তরুণী আন্তরিকতার সাথে মিশে গেছি । এই ব্যপারটা ওদের খুব আনন্দ দিত । সেই অবসর সময় গুলোতে সেচ্ছা সেবক দলের সাথে অনেক নতুন নতুন জায়গা ঘুরার সুযোগ হল । সেই সাথে বিচিত্র সব জাপানিজ ইতিহাস আর সংস্কৃতি । এই জায়গাটার নাম তমাকমাশি । সাপ্পরো শহর থেকে বেশ দূরে । সেখানে নিদম হোটেলে প্রতি বছর প্যাসিফিক মিউজিক ফেস্টিভ্যাল হয় । অনেক দেশের মানুষ এই বিখ্যাত সঙ্গীত উৎসব উপভোগ করতে আসে ।আর নিদম হোটেল বিখ্যাত ছেলে মেয়েদের বিয়ের জন্য । সে এক বিশাল আয়োজন । কোন এক শীতের সকাল । আমাকে উচিদা শেই নিতে এলো । আমার বাসা থেকে তাঁর গাড়িতেই সাপ্পরো ষ্টেশন । সেখানে সে গাড়ি নির্ধারিত জায়গায় রাখল। তারপর আমাকে নিয়ে সাব ওয়ে দিয়ে অন্য আরেক ষ্টেশন এ নামল । নামার পর দেখলাম অনেক গুলো বড় বাস সবার জন্য অপেক্ষা করছে । সেই বাসে এক মাত্র আমিই ছিলাম তরুন কেউ বাকি সবাই পঞ্চাশের উপর বয়স । আমাকে পেয়ে সবার খুব কৌতূহল আর জিজ্ঞাসা। ঘণ্টার কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে নিয়ে এলো নিদম হোটেল । আস্পারাগাসের আইস্ক্রিম , স্পাগেটি , আর ট্র্যাডিশনাল জাপানিজ খাবারে মধ্যাহ্ন ভোজ । পিয়ানোর অদ্ভুত সুরের মূর্ছনায় সময়টা সংগীতময় হয়ে উঠে ছিল । ফিরে আসার সময় । আমরা গাড়িতে উঠবো যে জায়গা থেকে তার কাছেই অনেক পুলিশ । আমি দেখলাম সেখানে ছোট বাচ্চাদের স্কুল । স্কুলের সামনের জায়গাটায় মনে হচ্ছে কোন দুর্ঘটনা । রাস্তায় রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছিলো । সবাই বিচলিত হয়ে গেল । আমি যেন ভয় না পাই আমাকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছিল কয়েক জন বৃদ্ধা । কেউ বুঝতে পারছে না কি ঘটেছে । এমন সময় একজন বৃদ্ধ আসল খবর নিয়ে এলো ।

একজন বাবা তার দুই শিশু বাচ্চাকে নিয়ে এই পাহাড়ি পথ দিয়ে যাচ্ছিলো । ধারনা করা হচ্ছে বাচ্চা দুটো ওই স্কুলের । হঠাৎ কোন এক অদ্ভুত মানুষ একটি প্রাইভেট কার দিয়ে প্রথমে বাবা কে ধাক্কা দেয় এবং পরে বাচ্চাদের । বাচ্চারা ভয় পায় । বাচ্চাদের বাবা সে অদ্ভুত মানুষ এর উপর রেগে যায় ।তাদের মধ্যে মারামারি শুরু হয় । তখন এক পর্যায়ে স্কুলের এক শিক্ষিকা স্কুল থেকে বের হয়ে আসে । বাচ্চা দুটো কে বাঁচায় । কিন্তু এদিকে বাচ্চার বাবাকে অদ্ভুত লোক ছুরি মেরে কার নিয়ে পালিয়ে যায় । স্কুল শিক্ষিকা পুলিশকে খবর দেয় । পুলিশ বাচ্চাদের উদ্ধার করে । এক পর্যায়ে অপরাধীকে ধরে ও ফেলে । আমরা সেদিন খুব দ্রুত সে জায়গা থেকে চলে আসি । আমি একটু মানসিক ভাবে চিন্তিত হই । ভয় যে পেয়েছি তা আমি আমার নিজের ভিতরের অনুভুতিতে টের পাই । দুই মাস পরের কথা । আমার উচিদা শেই এর সাথে দেখা । অনেক কথা বলার পর আমি তাকে সেই অপরাধীর কি শাস্তি হয়েছিল জানতে চাইলাম । সে জানাল আরেক অদ্ভুত ঘটনা । যা কি না যে কোন মানুষকে আতংকিত এবং চিন্তিত করে তুলবে । অপরাধী স্বীকার করেছে যে ওই শিশুদের বাবা এবং বাচ্চাদের সে চিনেনা । আমি অবাক হয়ে গেলাম । তাহলে সে তাদের মেরেছে কেন?

উচিদা শেই খুব গম্ভীর ভাবে বলল, অপরাধী জানিয়েছে যে বাচ্চারা তার বাবার সাথে অনেক হাসি খুশি ভাবে যাচ্ছিল । সে দৃশ্য সে তার মস্তিস্কে ধারন করতে পারেনি । তাই আঘাত করেছে কিন্তু তাদের সে চিনে না।
আমি বললাম , এটা কি হিংসা না মানসিক রোগ?

উচিদা শেই বলল , অপরাধী বলেছে অনেক বছর আগে সে ওই নিদম হোটেলে তার প্রিয় বান্ধবীকে বিয়ে করেছিল এবং তাদের দুইটা বাচ্চা ছিল । কিন্তু সে অনেক বেশি মদ পান করত তাই তার বউ তাকে ছেড়ে চলে যায় এবং তাদের ছোট ছোট বাচ্চারাও তাকে ছেড়ে যায় । বাবার সাথে বাচ্চাদের সুখ দৃশ্য তাকে পাগল করে তুলেছিল । সে তার নিয়ন্ত্রন হারিয়ে খুনের নেশায় উম্মাদ হয়ে গিয়েছিলো।

আমি কথা গুলো শুনছিলাম কিন্তু আমার ভিতরে মারাত্মক ভয় কাজ করছিল । মানুষের বিচিত্রতা আমাকে ভাবিয়ে তুলল । কোন রকম কারন ছাড়াই একটা মানুষের প্রান গেছে । কি অদ্ভুত নিয়তি । এই জীবনের রহস্য!
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম , এখন ওই অদ্ভুত লোকটার কি মৃত্যুদণ্ড হয়েছে?

উচিদা শেই চুপ করে রইল । সে কোন উত্তর দেয় না । অনেকটা সময় যাওয়ার পর সে নিজ থেকেই বলল , পুলিশ তাকে ধরে জেলে রেখে ছিল । কিন্তু তার বিচার করার আগেই জেল থেকে সে উধাও হয়ে যায় । শুধু তা নয় তার সাথে রাখা আরও একজন কয়েদির লাশ পাওয়া যায় । জেলের তালা সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় সে পালায় । কেউ কেউ ধারনা করছে সেটা কোন অভিশপ্ত অশরীরী ছিল । পুলিশ এবং মিডিয়া এই খবর বাইরে প্রকাশ করেনি । কারন জনগনের ভিতর বিভ্রান্ত এবং ভয় তৈরি হবে । সেই সাথে প্রশাসন কে অশ্রদ্ধা করবে। সেখান থেকে স্কুল সরিয়ে নেওয়া হয় । লোক মুখে শোনা যায় প্রায়ই নাকি প্রাইভেট কারের অদ্ভুত মানুষ দেখা যায় আর এমন সব সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ ও মারা যায় কিন্তু কোন অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায় না । পুলিশ প্রশাসন এবং মানুষ খুব সচেতন । কিন্তু রহস্যের কাছে জীবন খুব অসহায় । পরিচিত পৃথিবী আর যাপিত জীবনে রহস্য স্বীকৃতি পায়না । তারপরও গভীর এক ভয়ংকর অস্তিত্ব নিয়ে রহস্য নিজেই মানুষের মনে আর জীবনে জায়গা করে নিয়েছে । যা অস্বীকার করার ও কোন পথ নেই মানুষের।