ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

japan-women-workforce

জাপান অর্থনীতিতে নারী হল অর্থনীতির সূর্য । প্রধানমন্ত্রী শিনজে আবে তাঁর  Womenomics  Theory দিয়ে প্রমান করেছেন  একটা দেশের  আধুনিক অর্থনীতি গতিশীল রাখতে নারীর অংশ গ্রহন কতোটা অত্যাবশ্যক । ঘুমহীন অর্থনীতির এই দেশে চব্বিশ  ঘণ্টা মানুষ মেশিনের মতো কাজ করে । মানুষের প্রতি মানুষের সম্মানবোধ, কর্ম পরিবেশ, দেশের আইন এবং কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এই সব দিক থেকে জাপান হল শান্তির জনপদ। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মী থেকে মন্ত্রিসভা সব জায়গায় নারীর স্বতঃস্ফূর্ত নিরাপদ অংশগ্রহন যেকোন মানুষের চোখ কে মুগ্ধ করবে । অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহনে গড়ে উঠেছে এক অভিন্ন ইতিহাস বিশ্ব অর্থনীতির
মানচিত্রে ।নারীকে যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে এই দেশের সার্বিক আর্থ সামাজিক অবকাঠামোতে নারী এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় । জাপান এর প্রতিটি জায়গায় নারীকে রাখা হয়েছে অর্থনীতির  প্রান হিসাবে । জাপান এর অর্থনীতির দিকে তাকালে যেকোন মানুষের চিন্তা একটু হলেও থামবে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামুলক বাজারে জাপান কতোখানি  সচেতন  অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহন   নিয়ে। জাপানিজ চিন্তা ভাবনা ,নীতি নির্ধারণ এবং ব্যবস্থাপনা লক্ষ্য করলেই তার স্পষ্ট ধারনা পাওয়া যায় । শুরুর দিকে আমি একটু কৌতূহল এবং অভিভূত হয়েছিলাম জাপান এর আর্থ সামাজিক অবস্থা দেখে । একটি দেশ  তার আইন শৃঙ্খলা কতোটা নিরাপদ যে একজন নারী ইচ্ছে করলে যেকোন সময়ে যে কোন বয়সে নিজেকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখতে পারে ।

শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, চাকুরি, গবেষণা আর সৃষ্টিশীল জগত কোথায় জাপানিজ নারী নেই। অর্থনীতির প্রতিটি জায়গা নারীর পদচারনায় মুখর । চৌদ্দ বছরের কিশোর-কিশোরী আর আশি বছরের দাদা- দাদি এক সাথে কাজ করে। এখানে লসন, ডিনার বেল, সুপার আরক্স, সেভেন এলিভেন, সেকোমারট  নামের অনেক অনেক চব্বিশ ঘণ্টা খোলা  দোকান আছে যেখানে যেকোন বয়সের যে কোন সময়ে নারীরা তাদের  দক্ষতা অনুযায়ী কাজ করতে পারে। শুধু তা নয় একজন মানুষ যদি তার স্থায়ী চাকুরী থেকে অবসর নেয় সে ইচ্ছে করলে খণ্ডকালীন চাকুরী করতে পারবে । এখানে খণ্ডকালীন চাকুরগুলো ব্যাপক জনপ্রিয় । কারণ বিশেষ করে ছাত্র ছাত্রী, নারী ,অবসর প্রাপ্তরা তাদের শারীরিক পরিশ্রম দিয়ে ঘণ্টা হিসেবে কাজ করতে পারে। সবার জন্য সমান সুযোগ সুবিধা রয়েছে। প্রাকৃতিক নিয়মে একজন নারীকে মা হতে হয় ।আর সে কারণে অনেক দেশের নারীকে কখনও কখনও প্রথম বাচ্চা হওয়ার পর  চাকুরী ছাড়তে হয় । অনেক সময় সন্তান এবং সংসার এর জন্য নারী কে তার অর্থনৈতিক উৎস হারাতে হয়। এমন হাজারো কারণ আছে।  কিন্তু জাপান এ একজন নারী তার সংসারের কাজ সেরে অবসরে যেকোন প্রতিষ্ঠানে নিজেকে নিজের ইচ্ছেমত সময় বেঁছে নিয়ে অর্থনীতিতে এবং উন্নয়নে সম্পৃক্ত রাখতে পারে । আধুনিক অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে যেন সমগ্র জনগোষ্ঠী  সম্পৃক্ত । আর এটা কেবল জাপান এ সম্ভব । কারন জাপানিজ আইন শৃঙ্খলা এবং কাজের প্রতি সম্মান । কে কি কাজ করে সেটা কোন ব্যপারনা । বরং কে কতোটুকু কাজ করে বা করতে পারে সেটা ব্যপার।

এই দৃশ্য একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া কোণ উপায় নেই ।কারন এই আধুনিক সময়ে ও নারীর প্রতি বাংলাদেশের সামাজিক ধারনা খুব নিম্ন মানের এবং বৈষম্যমুলক  । শিক্ষার বাণিজ্য সম্পসারনের ফলে এখন জিপিএ ৫ ,গ্র্যাজুয়েট এর সংখ্যা কম নয় ।কখনও কখনও অনুন্নত দেশের মেধার সার্টিফিকেট থাকায় নেহায়েত ভাগ্য গুনে কেউ কেউ উন্নত দেশের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পেয়ে যায় ।কিন্তু এই শিক্ষার সহজকরনে অনেক নামে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ও কম নয়। যখন আমরা বাস্তব প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করি তখন দেখি প্রকৃতই মেধায় মননে ,চিন্তায় ,মানবিক জীবন চর্চা এবং জীবনবোধ সম্পন্ন মানুষের অভাব।তাই যোগ্য নেতৃত্ব দেওয়ার মতো মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন মানুষের ও অভাব ।যে কারনে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায়  নারীর প্রতি সঠিক ধারণা তৈরি হতে আরও অনেক বেশি সময়ের ব্যাপার ।আমাদের দেশে অধিকাংশ জনগণ মধ্যবিত্ত । এই শ্রেণিকে প্রতিনিয়ত পেটে ক্ষুধা রেখে সময়ের আধুনিকতার কাছে মিথ্যে হাসি দিতে হয় । এখানে পড়াশুনার একমাত্র উদ্দেশ্য হল একটি চাকুরি । আর  বাংলাদেশে একটি ছেলে কিংবা মেয়ে সাতাশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সটা পার করে দেয় মাত্র আঠারো থেকে বিশ হাজার টাকার একটি  সামান্য চাকুরী পেতে । কখনও কখনও তার চেয়েও কম । মাত্র বিশ হাজার টাকার নিচে থাকে একটি মানুষ ,একটি জীবন ,একটি পরিবার এর সব স্বপ্ন । ঠিক এই বয়সের একটি জাপানিজ ছেলে মেয়ে নিজ খরচে কয়েকটা দেশ ভ্রমণ করার অর্থনৈতিক  যোগ্যতা  রাখে । কারণ এই দেশে ছেলে মেয়েরা অনেক অল্প বয়সে নিজের দায়িত্ব নিতে শিখে । অনেক অল্প বয়স থেকে তারা অর্থনৈতিক  আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করে ।

দ্য গার্ডিয়ান এ  শিনজে আবে এর [Japan must embrace ” womenomics” to modernise economy] শীর্ষক জার্নাল থেকে জানা গেল World Assembly For Women in Tokyu { WAW TOKYU}  চারদিনের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শিণজে আবে এবং তাঁর স্ত্রী আঁকিয়ে আবে WOMENOMICS THEORY এর মাধ্যমে  নারী কে তুলে ধরেছেন আধুনিক অর্থনীতির প্রান হিসাবে  । ২০২০ সালের মধ্যে আধুনিক জাপানিজ অর্থনীতিতে  নারী নেতৃত্ব কে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । শুধু তা নয় G7 দেশগুলোতে নারীর অর্থনৈতিক ভূমিকা এবং নারীর তুলনামূলক অংশ গ্রহণ তুলে ধরা হয়েছে ।  দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ উত্তর জাপান  শুধু আধুনিক প্রযুক্তির  উদ্ভাবন এবং কঠোর পরিশ্রম দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে । বছরের অধিকাংশ সময় শীত এবং অনেক অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হয় জাপানকে । মানুষ এর অস্তিত্ব যেখানে থাকে সেখানে সমস্যা ও থাকে । এখানে ও অনেক রকমের সমস্যা আছে । সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা হার মেনে যায় জাপান এর চলন্ত অর্থনীতিতে নারীর   স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ।শুধু তা নয়  আইন শৃঙ্খলা , অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা , মানবিক জীবন চর্চা ,প্রাকৃতিক শিক্ষা ,মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান বোধের চর্চা  অত্যন্ত নিখুঁত নিয়মে চলছে। অথচ আমাদের দেশে নারী এবং নারী উন্নয়ন সম্পর্কে আর্থ সামাজিক ধারণা এখনও গভীর অন্ধকারে ।মানুষের প্রতি মানুষের সঠিক আচরন ,চিন্তা চেতনার বিকাশ ,মানবিক মূল্যবোধ , পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ  এর চর্চা আমাদের দেশের জীবন এবং সংস্কৃতিতে  নেই। খুব কঠিন এবং অসুন্দর হলেও আমাদের দেশের অনেক উচ্চ শিক্ষিত জনগনের ও  এই সব সম্পর্কে  ধারনা নেই। অন্যকে অশ্রদ্ধা, চিন্তা কে কটূক্তি করা ,আত্মকেন্দ্রিকতা কিংবা স্বার্থপরতার চর্চা ,বহিঃশক্তির বা বহিঃ শত্রুর  দালালী করা  সবই যেন নিয়মে পরিনত হয়েছে।

যে কোন  রাজনৈতিক অস্থিরতায় কিংবা ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে দেশের সম্পদ নষ্ট সহ নাশকতামুলক কাজ করা   এবং নারীর প্রতি অসৌজন্যমুলক আচরন করা কোন সভ্য সমাজের মানুষ করতে পারে না । দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী  দায়িত্বহীন  এবং জনগন ও দেশের নিয়ম কানুনের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল । আর এই সবের মধ্যে অর্থনীতিতে নারী ইস্যু ভীষণ অসহায় । একটি দেশ উন্নত হতে হলে সেই দেশের নারীদেরও অর্থনীতিতে সমান এবং যোগ্য সম্মানজনক সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে । নারীর প্রতি অন্যায় এবং বৈষম্যমূলক আচরন প্রতিরোধে  কঠিন আইন এর প্রয়োগ করতে হবে । নারী তার যোগ্য অধিকার বুঝে পাবে । নারীর প্রতি সম্মানের জায়গাটা অনেক বেশি উজ্জ্বল থাকবে । তবে সময় হয়তো পালটাবে । মানুষ ও চিন্তা করতে শিখবে । স্বপ্নকে অনেকদূর বিস্তৃত করতে জানবে। নিজের দেশ এবং অর্থনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে । একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামোতে নারীকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে । আমি ও একজন বাংলাদেশি হিসেবে স্বপ্ন দেখি আমাদের দেশের নারীরা অনেক সম্মানের সাথে দেশীয় অর্থনীতি ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের তুলে ধরবে ।