ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 
12593967_10205534900507071_6135225608889624489_o

জীবন কতো রকমের অনুভূতি আর অভিজ্ঞতার সমষ্টি আমরা কেউ জানি না। জীবন নামক সমুদ্রে দু:খ আর সুখের স্রোতের খেলা দেখতে সেই জীবনটাও একদিন পরিসমাপ্তি টানে। জগতের অনেক নিয়ম দেখে দেখে ২০০৬ সালে এই আমি তখন ২১ বছরে পদার্পন করেছি। ছেড়ে এসেছি ষোড়শীর রঙ করা বিকেল।অষটাদর্শীর প্রেমময় আকাশ। উনিশের বিরহী নদী।আর কুড়িতে নতুন করে নতুন সকাল। প্রতিদিনের ডায়রির পাতা জুড়ে শুধু চোখের সামনে দিয়ে ছুটে চলা মানুষের জীবন যুদ্ধের দৃশ্য। হতাশা আসে। দু:খ আসে। তবুও জীবন থেকে সবপ্ন ছুটে যায় না।ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ে পদার্পন করেছি সবে মাত্র। কি নিজে বুঝিনি। যা আছে আমার ভিতর। কাছের বান্ধবীরা উৎসাহ দেয়।ততো দিনে এক পাতা দুই পাতা করে প্রায় চারশো পাতা। “ইন্দিরা রোড” নামে নিজেই নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজ অস্তিত্বের জানান দিলো। আমার লেখা প্রথম উপন্যাস। না।বই প্রকাশ এতো সহজ নয়। যে সবপ্ন উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে যায় তা সফল হবেই। আমার ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী সীমা শারমিন নিয়ে গেল আগামি প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গনির কাছে। হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়া হলো। বেশ অনেক দিন পর ফোন এলো। একজন প্রফেশনাল প্রুফ রিডার আমার পান্ডলিপি পড়ে লাইন আনুযায়ী লিখিত সমালোচনা দিয়েছেন। সেই সমালোচনা পড়ে প্রকাশক সেই একুশ বছর বয়সী তরুণী ফোনে জানালো পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশযোগ্য।

409709_3650872345617_1732607520_n
শুধু তা নয়। খুব শিঘ্রই এই পান্ডুলিপি প্রকাশের কাজ শুরু হবে। প্রুফ রিডার এবং প্রকাশ দুজনেই বেশ উচ্ছল মানসিক সৌন্দর্য প্রকাশ করলো। তার কিছুদিন পর জানা গেলো আমার সেই উপন্যাসের প্রচ্ছদকারক দেশবরেণ্য শিল্পী ধ্রুব এষ। প্রচারনা জন্য পোষ্টার এবং পত্রিকা গুলোতে নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ দিয়ে বিজ্ঞাপন দিলাম।
নতুন লেখক। তাও আবার নারী। টগবগে একুশ বাইশ বছর বয়সের তরুণী। আমিতো স্বপ্ন হাতে পেলাম। ধীরে সাদা কাগজে বল পয়েন্টে হাতে লেখা কথা গুলো। মানুষ গুলো। সেই মানুষগুলোর জীবনের দৃশ্যগুলো ছাপা কাগজে ভেসে বেড়াচ্ছে। সে এক অদ্ভুত অনূভুতির ছোয়াঁ। আমি কখনও একা। আবার কখনও বান্ধবীদের সাথে বই মেলা যাই। আগামী প্রকাশনীর স্টলে গিয়ে বসি। আমাকে আর আমার উপন্যাসের সাথে অনেকে মিলাতে পারেনা। ছাত্রী অবস্থায় লেখা উপন্যাসটা অনেকের কাছে একটু পরিপক্ক লেখকের তুলনায়। তাই অনেকে বুঝতে পারে না। বিশ্বাস করতে চায় না যে ঐ বইটি আমার জন্ম দেওয়া। আসলে পাঠক আর দর্শকের ভাবনা সময় কে নিয়ে ঘুরে। সময়ের সাথে সাথে তাদের চিন্তার ও পরিব্যপ্তি হয়। তাদের জ্ঞানের তৃষ্ণা অনেক। পত্রিকা এবং টিভির সাংবাদিকরা এসে নতুন নারী লেখকের সাক্ষাতকার নেয়। আমি জ্ঞানী মানুষের মতো তাদের প্রশ্নের উত্তর দেই।আমি তো প্রকাশনা জগতের নতুন অতিথি। বই প্রকাশের আনন্দেই আত্মহারা। দেখতে দেখতে বই মেলা শেষ। অনেক অভিজ্ঞতার মাঝে এই অভিজ্ঞতাও জীবনে নতুন মাত্রা যোগ দিলো।

তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্রী। পড়াশুনাও কম নয়। বই লেখা আর প্রকাশ যেন শুধুই আনন্দ।কিছুদিন পরে বুঝা গেলো প্রকাশক সাহেব খুশি। অনেক গুলো সৌজন্য কপি পেলাম। সেগুলো বিক্রি করে দিলাম শাহবাগ, নীল ক্ষেত, বনানী এবং মিরপুরের কিছু দোকানে। আমার তো মনে হয় বই বিক্রি মানে নিজের চিন্তা কে ছড়িয়ে দেওয়া। বই বিক্রি থেকে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে বান্ধবীদের নিয়ে স্টার কাবাবে খেয়ে ছিলাম। কিনে ছিলাম নিজের জন্য কিছু শৌখিন পণ্য।

তারপর অনেক গুলো দিন সময়কে মুঠো করে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একদিন শিখা প্রকাশনীর কর্ণধার আমাকে ফোন দিলেন। জানালেন যে তিনি আমার “ইন্দিরা রোড” বইটি পড়েছে। অনেক কষটে আমার বান্ধবি সীমা সারমিনের কাছ থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে ফোন দিয়েছে । আমি অনেকটাই অবাক হলাম। তিনি জানালেন আমার কাছে লেখা আর কোন পান্ডুলিপি আছে কি না? তিনি আমার বই প্রকাশ করতে চান। “ইন্দিরা রোড ” বইটি নাকি তাকে মুগ্ধ করেছে।
এই সুযোগ তো ছাড়া যায় না। তবে আমার কাছে কিছু কবিতা ছাড়া কিছু নেই। তিনি লেখা তৈরি করতে বললেন। এই দিকে আমার ব্যক্তি জীবন আর পরীক্ষা ঝামেলা। মন ঠিক মতো বসে না। চিন্তা ভাবনা গুলো বিক্ষিপ্ত। তবুও ক্লান্ত চিন্তার ফসল “ল্যাম্প পোস্টের আলোতে” প্রকাশ হলো ২০০৭ সালে।। আমার মা তখন ভীষন অসুস্থ। হাসপাতালে আর বিএফএম হলে বসে লেখা উপন্যাস। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালে প্রকাশ হলো “সেকেন্ড জুন”।

img_20160410_093315

সে এক অন্য রকম ভালোবাসা। নিজের লেখা চোখের সামনে রাখতেই ভালো লাগে। একদিন প্রকাশক জানালেন এই বইটি দেশের বাইরে গিয়েছে অনেকগুলো কপি। আমি তাকে কিছুই জিজ্ঞেস করিনা। ডেকে নিয়ে বই প্রকাশ করেছে। তাও আবার প্রতিষঠিত প্রকাশক। শুধু বই প্রকাশই যেন আমার বড় প্রাপ্তি। এরই সাথে অন্য একটা প্রকাশনা থেকে আমার একটি যৌথ কবিতার বই প্রকাশ হয়।

ঠিক সে বছর থেকে মা হাসপাতালে দীর্ঘদিন। আমার জীবনের একান্ত দু:খ গুলো শুধু বেড়েই চলেছে। বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকানোর ফুরসুরাত নেই। আমি নিজেই যেন উপন্যাসে ঢুুকে গেলাম। কতো রকমের দু:খ আসতে পারে জীবনে! সব যেন অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরলো। মনে হতে লাগলো সামনের পথ গুলোতে কেউ এতো গভীর অন্ধকারে ঢেকে দিয়েছে যে আমি জীবনের সবপ্ন গুলো ভুলতে বসেছি। তারপর কর্পোরেট দুনিয়ায় একটি চাকরি নিয়ে ঢুকলাম।দিন রাত বৈষয়িক হিসাব নিকাশ। গল্প কবিতায় মন ভেজানোর সময় কোথায়। জীবনের নিয়মে একদিন কেউ জীবনের সঙ্গী হলো।

এরপর তো প্রবাস জীবন। সেখানে জীবনটা স্পিডি ট্রেনের মতো। শুধুই ছুটে চলা। ছুটতে ছুটতে সবাই একদিন ক্লান্ত হয়। আমরাও হলাম। ফিরে এলাম। এরই মধ্যে গোটা পৃথিবীর গল্প পালটে গেছে। তথ্য প্রযুক্তি আর জীবন। চোখে দেখা সূর্যটা ও কেমন পাল্টে গেছে। এর মধ্যে দৈনিক প্রথম আলো তে দূরপরবাসে নিয়মিত লিখেছি। প্রকাশও হয়েছে। দৈনিক সংবাদ, কালি ও কলম, ইত্তেফাক, যুগান্তরে প্রকাশ হয়েছে ছোট গল্প।

আবার দীর্ঘদিন পর কেউ যদি বলে তোমার সেই আগের লেখা গুলো পড়তে চাই তখন মৃত স্বপ্নগুলো কেমন ঝাঁপিয়ে উঠে। নিজের মনের ভিতর থেকে অন্য কেউ চিৎকার করে বলতে থাকে জেগে উঠো। আমি সত্যিই আবার সবপ্ন কে সাথে নিয়ে জেগে উঠতে চাই। লিখে যেতে চাই জীবনে যা দেখেছি। জীবনে যা ভেবেছি।