ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

একদিন জাপানি আইনুদের গ্রামে (পর্ব- ১)

আইনুদের দাস-দাসী করতে বাধ্য করার এই মানসিকতাকে অনেক প্রগতিশীল জাপানিরাই সমালোচনা করেন। কারণ এটা কখনো মানবিকতা কিংবা ন্যায়-নীতিকে অনুসরণ করে না। অনেক সমালোচনার পরও কেন জানি এই জাতির মানুষেরা সব দিক দিয়ে নিগৃহীত!

আইনু কন্যাদের সাথে আমরা সবাই

সকাল প্রায় নয়টার দিকে আমরা হোক্কাইডোর শিরাওগুনের আইনুদের গ্রামে পৌঁছে যাই। গাড়ি থেকে নামার পরই সকালের মে মাসের রৌদ্রের আর শীতল হাওয়ার অন্যরকম ভাল লাগার আবহাওয়া মনকে প্রফুল্ল করে তুলেছিল। হোক্কাইডোর সাপ্পোরো শহর থেকে শিরাওগুন আইনুদের গ্রামে যেতে এক দেড় ঘণ্টার সময় প্রয়োজন হয়। বাস, ট্রেন, শিনকানসেন বা স্পিডি ট্রেনে যেতে খুব বেশি সময় লাগে না। নিজেদের গাড়ি থাকলে খুব আরামেই স্নিগ্ধ সুন্দর পরিবেশ দেখতে দেখতে পৌঁছে যাওয়া যায়। আমরা খুব সকালে রওনা করলেও মাঝপথে জাপানি ট্রাডিশনাল পান কেক রেস্তোরাঁয় সকালের ব্রেকফাস্ট করে নিয়েছিলাম।

 

 

চোখ জুড়িয়ে গেল আইনুদের নিস্তব্ধ সুন্দর পরিকল্পিত ভাবে সাজানো গ্রাম দেখে। আমাদের জাপানি দাদী বরাবর আমাদের তার নিজের মতো গাইড করতে ভালোবাসে। তিনিই প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে টিকেট কাটলেন। টিকেটের সাথে তিনি কিছু ইংরেজিতে লিফলেট এবং পর্যটকদের জন্য তৈরি গাইড বুক নিয়ে এলেন। খুব বেশি পর্যটকদের সমাগম না থাকলেও মোটামুটি বেশ কিছু বিদেশি পর্যটক দেখা গেল। প্রবেশদ্বারের সামনেই বড় একটা আইনুদের গ্রামের গাইড ম্যাপ আছে। আমাদের দাদী মিসেসে চিয়ো সাইতো সবার হাতে গাইড বুক এবং লিফলেট দিলেন।

আমরা নিয়ম অনুযায়ি লাইন ধরে ঢুকলাম। ঢুকতেই ডান দিকে বিশাল এক স্টাচু। ধারণা করা হয়, কোনো এক আইনু লিডারের মুখায়বই স্টাচু করা হয়েছে। কিছুদূরেই এক ভাল্লুকের স্টাচু। সবাই ভাল্লুক দেবতার সাথে ছবি তোলা শুরু করলাম। এখনও ভাবলে মন ভালো হয়ে যায়। কিছু সুখের ভ্রমণ প্রতিটি মানুষকে দুঃসময়েও সুখের স্মৃতি হয়ে আগলে রাখে, মনকে একাগ্রতা আর শক্তি দেয়। সেই সব সুখের স্মৃতি ভেবেই অনিশ্চিত জীবন পার করে দেওয়া যায়।

এর নিচেই আরও একটি ম্যাপ। এরপর সারিতে সারিতে ঐতিহ্যবাহী আইনুদের ঘর। এখানে প্রতিটি ঘরের আলাদা আলাদা নাম আছে। সেই ঘরগুলোতে আইনুদের নানা রকম আচার-অনুষ্ঠান এবং ঐতিহ্য তুলে ধরার আয়োজন চলে। বিগ হাউজ, নেক্সট হাউজ, ফোর হাউজ, ফুঁড স্টোরেজ, স্মল হাউজসহ খুব সুন্দর সব নান্দনিক ডিজাইনের ঘর। এর সাথে আছে আইনু মিউজিয়াম, বাম পাশে বয়ে গেছে শিরাও পরতকান লেক। এই লেক ঘিরে আছে শিহরণ জাগানিয়া সব লোককথা বা মিথ। এর পাশেই ক্যাফে আর ফটো কর্ণার। আমরা একটু একটু করে গ্রাম দেখতে ভেতরে ঢুকলাম।

 


আইনু কন্যাদের নৃত্য 


বিগ হাউজ

আনন্দে মন ভরে গেল যখন আইনু কন্যারা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পড়ে এই ঘর থেকে অন্য ঘরে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল। আমাদের দেখে কয়েকজন আইনু কন্যা হাসিমুখে খুব আন্তরিকতা নিয়ে অভ্যর্থনা জানাল। জাপানি ভাষায় মিসেস চিয়ো সাইতো তাদের সাথে বেশ কিছুক্ষণ তাদের ভাল-মন্দ জানার চেষ্টা করল। তাদের বর্তমান নানা সমস্যা নিয়ে জানতে চাইল। কারো কারো চেহারায় বিষণ্ণতার ছায়া। ওদের সাথে কথা বলার পর দাদী আমাদের জানাল, “পর্যটক তেমন নেই। গ্রীষ্মকালে পর্যটক এলেও শীতের সময়টা তাদের খুব খারাপ কাটে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তাহলে ওদের অর্থনৈতিক সাপোর্টটা কে বা কারা করে।” মিসেস চিয়ো সাইতো জানাল, তাদের আয়ের উৎস পর্যটক। একসময়ে শিকার আর মাছ ধরা ছিল আয়ের অন্যতম উৎস। এখন কিছু আইনু তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

আমার বর জিজ্ঞেস করল, “জাপান সরকার তাদের কোন সহযোগিতা করে না?” সঙ্গে সঙ্গে দাদা রিউহে সাইতো মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিল, “নো নো! জাপানিরা তিনবার আইনুদের সাথে যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। তাদের সব জমি জাপানিদের দখলে আছে। আইনুদের জাপানিরা পছন্দ করেনা।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কিন্তু কেন?” খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে চিয়ো সাইতো বলল, “আইনুরা জাপানে লুকানো জাতি। তারা জাপানে বসবাস করলেও তাদের জীবন এবং সুযোগ-সুবিধা জাপানিদের মতো না। জাপান তাদের নাগরিক মনে করেনা।”

 


ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জায়গা

 

আমার মনটা বিষন্নতায় আক্রান্ত হল। জাপান দেশটাকে ভালো জানতাম। এখানেও সংখ্যালঘুদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণ হয়!  তবে আমার মনের সকল ভার কমিয়ে দেয় অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আইনু কন্যাদের গায়ের রঙিন সব পোশাক, মুখের উৎফুল্ল হাসি।

কথা বলতে বলতে আমরা বিগ হাউজের ভেতরে ঢুকলাম। সেখানে তাদের নানা রকম আচার-অনুষ্ঠান, নৃত্য এবং সংস্কৃতি অতিথিদের সামনে তুলে ধরা হয়। ঘরে ঢুকেই দেখলাম ছোট একটা স্টেজ। দর্শকদের জন্য বসার নির্ধারিত জায়গা আছে। মাথার উপরে অসংখ্য শ্যামন মাছে শুঁটকি দিয়ে সাজানো। ঘরের দেয়ালে দেয়ালে নানা রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ছবি, তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক আর জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো। শুধু তাই নয়, তাদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের বর্ণনাও দেওয়া আছে।

আমি পড়তে থাকলাম। এ যেন জাপানিদের এক বিস্ময়কর লুকানো ইতিহাস। অন্তরালে এই ইতিহাস পৃথিবীর সব মানুষের কানে পৌঁছায়নি। পুরো ঘরটার দেয়ালের সেঁটে রাখা লেখাগুলো আইনু ভাষার পাশাপাশি ইংরেজিতেও বর্ণনা থাকায় সুবিধা হয়েছে।

 


শ্যামন মাছের শুঁটকি

সেই সাথে আমার হাতের গাইড বুকে থাকা আইনু ইতিহাস সংস্কৃতি নিয়ে ছোট ছোট বর্ণনা পড়ে হতবিহ্বল হয়ে গেলাম। আর কিছুক্ষণ পরই স্টেজে আইনুদের নাচ শুরু হবে। দর্শকসারির সিটে গিয়ে বসলাম। অনেকটা ভারতীয় রাজাদের পোশাকের আদলে পোশাক পরা একজন আইনু পুরুষ এলো মাইক হাতে। সে জাপানি ভাষায় আইনুদের জীবন ইতিহাসের সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরল। এইদিকে মিসেস চিয়ো সাইতো পাশে বসে আমাকে ফিসফিস করে বলল, “উনার সব কথার বর্ণনা গাইড বুকে ইংরেজিতে আছে।” আমি খুশিতে আধখানা হয়ে বললাম, “অহ! রিয়েলি? ধন্যবাদ।”

কিছুক্ষণ পর একটা ভাল্লুক মেরে কাঁধে করে আগুনের সামনে নিয়ে এলো। সবাই মুখে কি যেন বলে। যদিও আসল ভাল্লুক না। শুধু দর্শকদের তাদের সংস্কৃতি দেখানোর জন্য কৃত্রিম বানানো ভাল্লুক মেরে দু-জন ব্যক্তি নিয়ে আসে। সেই ভাল্লুককে ঘিরে একদল আইনু কন্যা নিজেদের ভাষায় গান গেয়ে নেচে আনন্দ করল। বিভিন্ন ধরনের আচার অনুষ্ঠান করলো। বিষয়টা বেশ কৌতূহল উদ্দীপক এবং উপভোগ্য।

 


অনুষ্ঠান উপস্থাপনাকারী এক নারী


শ্যামন মাছের আঁশের জুতা

জাপানে আইনুরা আদি উপজাতি এবং সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে পরিচিত। তারা সর্বপ্রাণবাদী বা অ্যানিমিস্ট। এই উপজাতির মানুষেরা বিশ্বাস করে, সকল বস্তুর মধ্যে প্রাণ আছে। তারা প্রকৃতির সকল কিছুর মধ্যে দেবতার উপস্থিতি কিংবা দেবতা হিসেবে বিশ্বাস করে। তারা মনে করে মহাসমুদ্রের দেবতা হলো তিমি, প্যাঁচারা হলো গ্রামের রক্ষাকর্তা, আর ভাল্লুক হলো পাহাড়ের দেবতা। আইনুরা আরও বিশ্বাস করে, ভাল্লুকেরা তাদের মাছ শিকার, জমি চাষ আর কাপড় বুনতে শিখিয়েছে। তারা দেবতার সন্তুষ্টির জন্য ভাল্লুক হত্যা বা বলি দেয়, অনেক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। এই অনুষ্ঠানের মধ্যে ‘ইয়োমান্তে’ একটা বিশেষ পর্ব। এই সময় নাচ-গান আর ভোজ পর্বও হয়।

 

 


দর্শকদের বসার স্থান


স্টাচুর কাছে আমরা

 

তাদের মতে, বলি হওয়া প্রাণিদের আত্মাকে দেবতার কাছে পাঠানো হয়। শুধু ভাল্লুকই নয় শেয়াল আর প্যাঁচা সহ অন্য প্রাণীদেরও দেবতাদের দেশে পাঠানো হয়। ভাল্লুক বলি দিয়ে মাথাটা আলাদা করে বিশেষ রক্ত পান করে পুরুষেরা শক্তি অর্জনের জন্য। আর চামড়াটা দূরে রাখা হয়। সেই চামড়া পরে পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পুরুষেরা ভাল্লুক ধরে আর মেয়েরা তা পালে। কয়েক বছর হলে পরে তা বলি দেয়া হয়। সবকিছুর মধ্যে ইয়োমানতে কিংবা কাল্ট অফ দ্য বিয়ার হল প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ওদের আচার-অনুষ্ঠান দেখছিলাম আর মনে মনে হাসছিলাম। কতো বিচিত্র বিশ্বাসে চলে মানুষের জীবন!

চলবে …।