ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

দ্বিতীয় পর্ব..

 

 

আমি বিস্ময়কর দৃষ্টি নিয়ে আইনু নারীদের নাচ দেখছিলাম। সেই সাথে হাতের গাইড বুক পড়ে তাদের আচার-অনুষ্ঠানগুলো বুঝার চেষ্টা করছিলাম। একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম, নৃত্যরত নারীরা একটু বয়স্ক। সবাই চল্লিশ বছর বয়সের উপরে। সাজ-সজ্জার কারণে তাদের বয়স বুঝা কঠিন। এখানে তরুণ বয়সের কাউকে দেখা যাচ্ছে না। নারীদের পোশাকগুলো জাপানি কিমোনো স্টাইলে হলেও একদম আলাদা। আইনু নারীরা নিজেদের সৌন্দর্য এবং ঋতুমতি হওয়ার চিহ্ন বুঝাতে ঠোঁটের চারপাশে গভীর সীমানা চিহ্নিত উল্কি একে রাখে। এছাড়া বাহুতেও উল্কি আঁকা আইনু মেয়েদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। মেয়েবেলা থেকেই তারা ঠোঁটে আর বাহুতে উল্কি আঁকে। খুব ছোট বয়সে তাদের বিয়ে হয়ে যেতো। ছেলেদেরও মাত্র ১৬ বছরেই প্রাপ্তবয়স্ক মনে করা হতো। ছেলে-মেয়ে দুজনেই কানের দুল পরতো। শুধু তা নয়, আইনু ছেলে-মেয়েরা নিজেদের মতো সাজাতে ভালোবাসে। আইনু মেয়েরা সাধারণত যা করে তার মধ্যে রান্না করা, সেলাই করা বা কাপড় বোনা, মাঠে কাজ করা, বাচ্চা লালন পালন করা এবং তাদের পড়াশুনা শেখানোর কাজ করে।

জাপানি ভাষায় অনেক শব্দ আছে যা আইনু ভাষা থেকে এসেছে। আইনুদের নিজস্ব ভাষা এবং বর্ণমালাও আছে। তবে আইনু মেয়েরা সেই সময়ে যুদ্ধে অংশ নিতে পারতো এবং আইনুদের গ্রাম্য সালিশে মেয়েদের মতামত নেওয়া বা দেওয়ার প্রথা ছিল। মেয়েরা বাচ্চাদের কোলে নেয় না। পিঠের ঝুলিতে বেঁধে রাখে। এমনকি বাচ্চা কখনও ব্যথা পেলে কিংবা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে পড়ে গেলে বাচ্চাদের নিজেদের উঠে দাঁড়ানো শেখায়। কখনও তারা বাচ্চাকে তুলে কোলে নেয় না। আর এই প্রথা এখনও জাপানিদের মধ্যে আছে।

 

খুব ছোট বয়সেই বাচ্চাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সামাজিক জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার কলা-কৌশল শেখানো হয়। আধুনিক জাপানি মায়েরাও বাচ্চা নীচে পড়ে গিয়ে কান্না করলেও তাদের বাংলাদেশি মায়েদের মতো কোলে নেয় না। এমনকি তাকায়ও না। তবে কখনও বাচ্চাদের নিজেদের উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করে। আইনু মায়েরা বাচ্চাদের কঠোর শাসনে রাখে।

আমি আরও একটু সচেতনতার সাথে স্টেজে আইনুদের পর্যায়ক্রমে আচার-অনুষ্ঠানগুলো দেখছিলাম। একটা বিষয় দেখলাম, বাঙালি গ্রামের মায়েদের মতো কাপড় দিয়ে দোলনা বানিয়ে তারা সেখানে বাচ্চাদের শুয়ে রেখে ঘুমপাড়ানি গান শোনায়। দুই-তিনটা মহিলা সেই বিষয়টা গান, নাচ আর অভিনয়ের মাধ্যমে দেখাল। মেয়েরা কিভাবে মাঠে কাজ করে, কাপড় বোনে কিংবা শিকারও করে।

 

 

মেইজি সরকার আসার পর সেই সময়ে ব্যাপক সংস্কার এবং পরিবর্তন হয়। দীর্ঘ সময় ধরে আইনুদের নিয়ম-কানুন নানা রকম প্রথা বন্ধ বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আইনুদের শুধু উৎপাদন হয় না এমন সব জমি দেওয়া হয়। জোর করে তাদের কৃষি কাজের দিকে ঢেলে দেয়। আইনুরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মূল ধারার জাপানিদের সাথে মিশে যায়। স্কুলে স্কুলে আইনু ভাষা বাদ দেওয়া হয়। জাপানি ভাষা চালু করা হয়। ইতিহাসের পটপরিবর্তনে আইনুদের জীবনেও নানা পরিবর্তন এসেছে। আইনু নেতারা চেষ্টা করে যাচ্ছে তাদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে।

আইনু শাসনামলের সময় আইনু গ্রামগুলোতে প্রধানতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিল শামান বা আইনু ওঝা। আইনু শামানদের প্রধান কাজ ছিল গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে তার অসুখ সারানো। তাদের নিজস্ব ঐশ্বরিক শক্তি কিংবা আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অসুস্থদের সুস্থ করে তুলতেন। শুধু তা নয়, পশুর আত্মারাও নাকি আইনুদের সাহায্য করে যেকোন রোগ সারাতে। আইনু শামান কে সবাই মেনে চলতো।কেউ অসুস্থ হলে গ্রামের মানুষ শামান কে জানাতো। আইনু শামান কে জানালে সে সূর্যাস্তের জন্য অপেক্ষা করতো। তারপর রোগীর কাছে গিয়ে ঢোল-ড্রাম পেটায়, জাদুর কাঠি নাড়ায় এবং পশুদের আত্মাদের ডাকা হয় নাচ গানের মাধ্যমে।

 

এক সময়ে ধারনা করা হতো যে আইনুরা ইউরোপ থেকে উদ্ভুত এক জাতি। অবশ্য এর পেছনে অনেক কারণও ছিল। আইনু পুরুষদের ইউরোপিয়ানদের মতো ঢেউ খেলানো চুল, পেশীবহুল শরীর, আর মুখ ভরা দাঁড়ি ছিল। তবে গবেষণায় দেখা যায়, আইনুরা প্রাচীন ‘জুমন’ জাতির সরাসরি বংশধর। জুমনরা উত্তর এশিয়ায় বসবাসরত প্রাচীন আদিবাসী জাতি। তবে এটাও ঠিক যে আইনুদের মুখে মুখে প্রচলিত কথা বা ইতিহাস থেকে জানা যায়, আলাস্কার উপকূলে বসবাসরত টলিনজিৎ জাতির সাথে তাদের একটা সম্পর্ক আছে। তবে অন্য ভাষার সাথে আইনু ভাষার  কোন সম্পর্ক নেই। তবে কিছু সচেতন আইনু নেতা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে।

 

 

বিগ হাউজে আইনুদের পরিবেশিত গান, নাচ আর অভিনীত নানা রকম আচার-অনুষ্ঠান দেখার পর কিছুটা সময় পুরো ঘরটা ঘুরে দেখলাম। মিসেস সাইতো কয়েকজন আইনু মহিলার সাথে জাপানিতে কথা বলল। ঘরের উপরের দিকে অনেক অনেক শ্যামন মাছ ঝুলানো। মাছগুলোর দিকে তাকালেই বুঝা যায়, আইনুরা অনেক অনেক শ্যামন মাছ শিকার করে। মাছই তাদের প্রধান খাদ্যদ্রব্য। সেই সাথে হেরিং মাছও ধরে। শুধু তা নয়, তারা স্বল্প মাত্রার কৃষিকাজও করে। বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা বুনো নানা রকম উদ্ভিদ চাষবাস করতো। উৎপন্ন কৃষির মধ্যে গম, শিম, বজরা কিংবা মিলেট। আইনু মেয়েরা আটুশ আঁশের কাপড়ও বুনতো। এলম এক ধরনের গাছ আছে। সেই গাছের তন্তু থেকেই আটুশ আঁশ তৈরি হতো। আইনু মেয়েরা ভীষণ ভাল নিয়ম মাফিক কাপড় বোনে।

এরপর আমরা বাইরে বের হয়ে এলাম। আমার চোখে দেখা আইনু গ্রামটা একদম ভিন্ন দুনিয়া মনে হল। অন্য এক পৃথিবীর মানুষ মনে হতে লাগল।

 

কিছুটা সময় আশে পাশের পরিবেশ উপভোগ করলাম। নিস্তব্ধ আইনু পরিবেশটা অনুভব করার চেষ্টা করছিলাম। আইনুদের অন্যান্য ঘরগুলো অবলোকন করলাম। সাধারণত আইনুদের ঘর হয় আয়তকার। দেয়ালগুলো হয় নলঘাগড়া কিংবা দূর্বা ঘাস দিয়ে। এই ঘরগুলো বাইরের দিক থেকে শিল্পিত মনে হলেও বসবাসের জন্য খুব একটা সুখকর জায়গা নয়।

জাপানের হোক্কাইডো আইল্যান্ডের আইনু গ্রামের অঞ্চলটা বছরের বেশির ভাগ সময়ে শীত থাকে আর তুষারপাত হয় নিয়মিত। অন্যদিকে বর্ষার সময়ে অনেক বৃষ্টিপাত হয়। বলা যায়, প্রতিনিয়ত আইনুদের কঠিন প্রকৃতির প্রতিকুল পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলতে হয়। আইনুদের জীবন এক কঠিন সংগ্রামের নাম।

 

 

ঘরের মেঝেতে গর্ত করে আগুন জ্বালিয়ে রাখে। তার উপরে গ্রিল বা জালি দিয়ে রাখা হয়। সেখানে মাছ-মাংস পুড়িয়ে খায়। ঘরের দরজার সামনেই এক বালতিতে পানি রাখা হয় প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য। জানালা দুটি থাকলে একটি পবিত্র হিসেবে ধরা হয়। তাই সেটি আর খোলা হয় না। ঘরে খাবার পুড়িয়ে গ্রিল করা হয় বলে অনেক ধোঁয়া থাকে সব সময়। একটা মিশ্র গন্ধও থাকে। আর ঘরের ছাউনিতে ফুটো কম থাকায় ধোঁয়া কিংবা গন্ধ সহজে বের হতে পারে না।

আর বছর জুড়ে শীত এবং তুষারপাত হওয়ায় নিজেদের সারাদিনের পরিহিত কাপড় পড়েই তারা ঘুমায়। ঘরের মধ্যে অনেক ধোঁয়া থাকায় সেখানে সময় কাটানো সাধারণ মানুষদের জন্য খুব একটা আরামপ্রদ না। তবে আইনুদের ঘরগুলো ভেতরে যাইহোক বাইরে থেকে বেশ সুন্দর।

মিসেস চিয়ো সাইতো ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকটা ছবি তুললেন। ঘর সম্পর্কে খুঁটিনাটি আমাদের বুঝিয়ে দিলেন। যদিও গাইড বুকে খুব সুন্দর করে সব কিছুর বর্ণনা আছে। মিসেস সাইতোর বর্ণনায় তা আরও স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। এরপর আমরা হাঁটতে হাঁটতে আইনু মিউজিয়ামে ঢুকলাম। এখানে এসে আবার চোখ কপালে উঠে গেল!

চলবে …

 

পূর্ব প্রকাশিত….