ক্যাটেগরিঃ আর্ত মানবতা

হযরত আলী। খুব সাধারণ একজন মানুষ। নিম্ন মধ্যবিত্ত। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেলস সুপারভাইজার পদে কাজ করতেন। সাদামাটা জীবনের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু সেই হযরতই এমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, যা এখন আর আমাদের সমাজে খুব একটা দেখা যায় না। পরোপকার করতে গিয়ে নিজের জীবনটাই বিলিয়ে দিয়েছেন ছিনতাইকারীদের হাতে।

হ্যাঁ, পাঠকরা হয়তো অনেকেই জানেন। গত শুক্রবার সকালে মিরপুরের রাইনখোলায় প্রাত:ভ্রমণে বেড়ানো তিন নারীকে ছিনতাইকারীদের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়েছিলেন হযরত। ছিনতাইকারীরা তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান হযরত আলী।

আমাদের সমাজটা এখন এমন হয়ে গিয়েছে, কেউ কারো বিপদে এগিয়ে যাই না। ঘরে কিংবা বাইরে কেথাও না। অযথা ঝামেলা না জড়ানোর প্রবনতা আমাদের মধ্যে জেকে বসেছে। তাই রাস্তায় কেউ যদি আহত হয়ে কাতর চিৎকার করতে থাকে, কিংবা ছিনতাইকারী বা চোর-ডাকাতের কবলে পড়ে কেউ সহযোগিতার জন্য চিৎকার করে, আমরা কেউ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করি না। আমরা সবার আগে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবি। নিজেকে নিরাপদ স্থানে রাখতে চাই।

এই যখন সমাজের অবস্থা, তখন একজন হযরত আলী, যিনি বিরল সাহসিকতার পরিচয় দিলেন, তা আসলেই অবিস্মরণীয়। অপরিচিত তিন নারীকে বাঁচাতে গিয়ে তিনি নিজের প্রাণটাই সঁপে দিলেন। কিন্তু এমন একজন বীরের মর্যাদা আমরা কী দিলাম। শুক্রবারের পর আজ যখন লিখটি ততক্ষণে তিন দিন প্রায় পেরিয়ে যাচ্ছে। কেউ হযরতের পাশে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায়নি। না তার পরিবারের কাছেও। হযরত যেই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন সেই প্রতিষ্ঠান (কল্লোল গ্র“প) থেকে কিছু খরচ দেওয়া হয়েছে। তা দিয়ে ঢাকা থেকে লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়েছে। সঙ্গে কয়েকজন সহকর্মীও গিয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্র তার দায় এড়িয়ে গেছে। রাষ্ট্র যন্ত্রের কেউ তার পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর কথা চিন্তাও করেনি।

পেশায় সাংবাদিক হওয়ায় গত শনিবার হযরতের ওপর একটি ফলোআপ রিপোর্ট করতে আমি তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। মিরপুরের রাইনখোলার বাসায় কেউ নেই। পরিবারের সদস্যরা সবাই সাতক্ষীরার সদর থানার বল্লী গ্রামে গিয়েছেন। মোবাইল ফোনে হযরতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তার স্ত্রী সালমা সুলতানা কাতর কণ্ঠে বলছিলেন, ‘ওতো অন্যের উপকার করতে গিয়ে নিজের জীবন দিল এখন আমাদের কী হবে? আমার দুই সন্তানের কী হবে?’ এটি এমন একটি প্রশ্ন শুধু আমার নয়, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ভাষা হয়তো কারো জানা নেই। বিলাপ করছিলেন তিনি। বলছিলেন ‘ভাই আপনারা কিছু করেন। আমি এখন দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব? কীভাবে সন্তানদের মানুষ করব।’

আমি নিজে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি। কী করব আমি? কি করতে পারি। সাংবাদিকতা পেশায় থেকে এমন কত ঘটনার মুখোমুখি হই। সব পাশ কাটিয়ে রেখে আমাদের কাজ করতে হয়। কিন্তু হযরতের স্ত্রীর এই কাতর কণ্ঠ, তার দুই সন্তানের ভবিষ্যত, একটি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়া স্বপ্ন আমাকে ভীষণ আলোড়িত করে। আমি ভাবি আসলেই কী হযরতের জন্য আমরা কিছুই করতে পারি না? আমাদের কী কিছুই করার নেই? আমরা কী তার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারি না/

খোঁজ নিয়ে যতটুকু জানতে পেরেছি, দুই সন্তানের জনক ছিলেন সাহসী এই বীর। বড় ছেলে প্রিন্স মণিপুর স্কুলে পড়ে। আর ছোট্ট মেয়ে প্রীতি পড়ছে মিরপুরের একটি কিন্ডার গার্টেনে নার্সারীতে। হযরত নিজে সাতক্ষীরা থেকে গ্রাজুয়েশন করার পর ঢাকায় চলে আসে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছে সে। সর্বশেষ গত ১২ বছর ধরে কাজ করছে কল্লোল গ্র“প অব ইন্ডাস্ট্রিজে।

কল্লোল গ্র“পের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। তারা সাধ্য মতো চেষ্টা করছে হযরতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর। চাকরীতে ঢোকার পর করা জীবন বীমা, প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত সুবিধাগুলি তারা দ্রুত দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। রাষ্ট্র হয়তো পাশে দাঁড়াচ্ছে না। কিন্তু আমরা কি হযরতের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারি না? সবাই যদি একটু ভেবে দেখেন।

একটা বিষয় ভেবে দেখুন তো। আজকে আমি কিংবা আপনি, আমার কিংবা আপনার ভাই-বোন-আত্মীয়-স্বজন কেউ এমন ঘটনার মুখোমুখি হতে পারে। কেউ কোনো বিপদে পড়তে পারে। যদি আমরা হযরতদের সম্মান ও তার পরিবারের পাশে না দাঁড়াই, হয়তো কেউ কোনো দিন আর কারো বিপদে পাশে দাঁড়াবে না এবং যখন আমরাই এমন বিপদের মুখোমুখি হবো।

একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাই। ক’দিন আগে শেওড়া পাড়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে রাস্তায় পড়েছিলেন। আধা ঘন্টা পড়ে ছিলেন রাস্তায়। কেউ তাকে ধরেনি। সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছে, আর উটকো ঝামেলা এড়াতে দূরে সরে গেছে। অবশেষে এক তরুণ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এমন ঘটনার মুখোমুখি আমরাও যে কখনো পড়বো না তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি?

অতএব আর বসে থাকা নয়, উঠে আসুন, ভাবুন একজন হযরতের পরিবারের পাশে কীভাবে দাঁড়ানো যায়। আসুন আমরা আলোচনা করেই সেটা ঠিক করি।

লেখাটি সামহোয়ারইন ব্লগেও প্রকাশিত হয়েছে