ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

পাঠক, শুরুতেই আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিন । বলুন তো- একজন বাজে চরিত্রের অধিকারী মানুষের কাছ থেকে প্রাপ্ত চারিত্রিক সনদপত্র কতটা গ্রহণযোগ্য ? আপনি যাই বলুন না কেন আমাদের সমাজে কিন্তু সকল চারিত্রিক সনদপত্রই গ্রহণযোগ্য তা সে চরিত্রবান কিংবা চরিত্রহীন ব্যক্তি যার কাছ থেকেই প্রাপ্ত হোক না কেন । কিন্তু খানিকটা অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের কাছেই ব্যাপারটা অত্যন্ত অযৌক্তিক এবং ভারসাম্যহীন বলে মনে হবে । তার মনে হবে বেপারটা আসলে ধর্মভিত্তিক জঙ্গিদের মুখে ধর্মের কথা শুনার মত । আসলেও তাই । জঙ্গিরা যেমন ধর্মের নামে নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্যকে আড়ালে রেখে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায় ঠিক তেমনিভাবে বর্তমানে অসংখ্য দুশ্চরিত্রবান রাজনীতিবিদ তাদের কুমতলবকে, নিজেদের পকেট ভরার কুমতলবকে আড়ালে রেখে গণতন্ত্রের নামে স্বৈরতন্ত্রের চর্চা করতে চান এবং করছেনও তাই । আর এমনটি চলতে থাকলে পুরো পৃথিবীতে অন্যায়-অবিচার আর দুঃশাসনের রাজত্ব পাকাপুক্ত হতে মোটেই বেশি দিন লাগবে না । পুরো পৃথিবীই আজ এ অনাকাংখিত হুমকির মুখোমুখি । তবে এই পরিস্থিতির জন্য কিন্তু আমরা নিজেরাই দায়ী । আমরা আমাদের সরকার ব্যাবস্থা তথা শাসন ব্যাবস্থাকে এই হুমকিকে চ্যালেঞ্জ করার মত করে গড়ে তুলি নি । আমরা বছরের পর বছর , যুগের পর যুগ এমন অসংখ্য শাসক নির্বাচন করে চলেছি যাদের অত্যন্ত বিশাল একটি অংশ অসৎ চরিত্রবান স্বার্থপর রাজনীতিবিদ । আর তারা হুমকিটি মুকাবেলায় নয় বরং এর বাস্তবায়নের ব্রত গ্রহন করে কাজ করে যাচ্ছেন নিরলস ভাবে ।

বুঝাই যাচ্ছে যে আমাদের নির্বাচন পদ্দতিতেই ভুল, আমরা সঠিক জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারি না । প্রকৃতপক্ষে আমরা অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসক নির্বাচন করে তার কাছ থেকে গণতান্ত্রিক শাসন আশা করছি, যা অত্যন্ত হাস্যকর । অন্যান্য দেশের কথা খুব ভালো করে জানি না তবে আমাদের প্রিয় স্বদেশে যা হচ্ছে টা অনেকটা এই রকম-

ধরুন, কোন একটি নির্বাচনে প্রার্থী ৩ জন, আর প্রার্থীদের নিয়ে মোট ভোটার সংখা ১০ । নির্বাচন হলে দেখা গেল একজন প্রার্থী পেয়েছেন ৪ ভোট এবং অন্য দুইজন পেয়েছেন ৩ ভোট করে ৬ ভোট (বলে রাখা ভালো যে প্রার্থীরা নিজেদের ভোটের অপচয় করেনি অর্থাৎ নিজেরাই নিজেদেরকে ভোট দিয়েছেন) । এখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১০ ভোটের মধ্যে ৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন প্রথম প্রার্থী । কিন্তু মোট ভোটারের ৬০ শতাংশই তার বিপক্ষে । তাহলে এখানে গণতন্ত্র কোথায়? গণতান্ত্রিক উপায়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও গণতন্ত্র অস্তিত্বহীন । (আমার কোন একটি ব্লগে মন্তব্য করতে গিয়ে একজন পাঠক এই কথাগুলো বলেছিলেন) ?

এখন প্রত্যেক প্রার্থীকে যদি আমরা একেকটি আলাদা আলাদা রাজনৈতিক দল বিবেচনা করি তাহলে এই পরিস্থিতিতে একটাই সমাধান হতে পারে আর সেটা হল একাধিক দল মিলে জোট গঠন করা । যদি যেকোনো দুইটি দল (উপরে বর্ণিত দুইজন প্রার্থী) মিলে জোট গঠন করে তবে তাদের ভোট সংখ্যা দারাবে ৬ টি অথবা ৭ টি (১০ টির মধ্যে) যা গণতন্ত্রের সহগামী । কিন্তু বাস্তবে যা ঘটে তা হল এই জোটের যেকোনো একটি দল হয়তো পকেট ভরার অধিকারটা নিজেদের বেশী বলে দাবি করে বসে, যা অন্য দলটি মেনে নিতে চায় না অথবা অন্য দলটিরও ঠিক একই দাবি থাকে । ফলে যা ঘটে তা হল হয় দুটি দল এক হয়ে অথবা যে যার মতো করে পাল্লা দিয়ে নিজেদের পকেট ভরতে শুরু করে । জনগণের কথা ভাবার সময় তারা তখন বাস্তবিকই পান না । অর্থাৎ আসি আসি করেও গণতন্ত্রের আর আসা হয়ে উঠে না ।

আর চরিত্রহীন , লোভী , স্বার্থপর এই সকল ঘৃণ্য রাজনীতিবিদদের নিজেদের বাজে উদ্দেশ্য হাসিলের এই ঘৃণ্য সুযোগটি আসলে করে দেয় তাদের দীর্ঘ পাঁচ বছরের শাসনকাল (লুটেপুটে খাওয়ার জন্য যথেষ্ট সময়) আর সর্বোপরি গণতন্ত্রমনা ভালো মানুষদের নিষ্ক্রিয়তা । কোন একজন বিখ্যাত মনীষী বলেছিলেন- “ খারাপ মানুষদের খারাপ কাজে নয় বরং ভালো মানুষদের নিষ্ক্রিয়তাই সমাজকে ধ্বংস করে ।’’ সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটিকেই প্রকৃতপক্ষে গণতান্ত্রিক করে তোলা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, বলা যায় সময়ের দাবিতে পরিণত হয়ে পড়েছে ।

এখন প্রস্ন হল- কীভাবে সম্ভব ? কি রকম হতে পারে পুরো প্রক্রিয়াটি ? আমি কেবল আমার ধারণাটুকু ব্যাখ্যা করছি, একান্তই আমার মতামত পেশ করছি । পাঠকের সুচিন্তিত মন্তব্য , পরামর্শ এবং মতামত একান্তভাবে কাম্য-

আমার মনে হয় আমাদের দেশের নিরবাচন পদ্ধতিতে নীতিগত কিছু পরিবর্তন এনে প্রকৃত গণতন্ত্রের পথ অনেকখানি সুগম করা সম্ভব ।

প্রথমেই বলা যাক সংসদ নির্বাচনের কথা । আমার মতে কোন প্রার্থীকে তার আসনে বিজয়ী হতে হলে তাকে মোট প্রদত্ত ভোটের অন্তত ৩০ শতাংশ পেতে হবে । যতজন প্রার্থীই ৩০ শতাংশ বা তার বেশি ভোট পাবেন তাদের প্রত্যেকেই বিজয়ী হিসেবে গণ্য হবেন । আর কোন প্রার্থীই যদি ৩০ শতাংশ ভোট না পায় তবে সেই আসনে পুনঃনির্বাচন হবে । এই প্রক্রিয়াটি ইউনিয়ন পরিষদ , উপজেলা পরিষদ , জেলা পরিষদ , পৌরসভা এবং সিটি করপরাশন নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে হবে । আর এটা সম্ভব হলে গণতন্ত্রের পথ বেশ খানিকটা সুগম হবে বলেই আমার বিশ্বাস ।

এবার আসা যাক সরকার গঠনের দিকে । কোন দল মোট আসনের যত শতাংশ আসনে বিজয়ী হবে মোট মন্ত্রী , উপমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর ঠিক তত শতাংশই ঐ দল থেকে নির্বাচন করতে হবে । আর বর্তমান প্রচলিত নিয়মানুযায়ী সব চেয়ে বেশি আসনে জয় পাওয়া দলের প্রধান প্রধানমন্ত্রী হলেও নির্বাচিত সাংসদদের ভোটেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া উচিৎ । ‘উপপ্রধানমন্ত্রী ‘ পদ সৃষ্টি করতে হবে এবং তিনিও সাংসদদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন । তবে উপপ্রধানমন্ত্রী হবেন বিরোধী দল থেকে ।

জাতীয় সংসদের স্পীকারও নির্বাচিত হবেন সাংসদদের ভোটে এবং অবশই তিনি হবেন প্রাপ্ত আসন সংখ্যায় পিছিয়ে থাকা কোন দল থেকে । এতে করে বিরোধী দলগুলো সংসদে কথা বলার সুযোগ পাবে । ডেপুটি স্পিকার সাংসদদের ভোটে যেকোনো দল থেকেই হতে পারেন ।

এবার আসা যাক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়টিতে । কোন সাংসদ রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না । তবে সাংসদরা কোনরকম রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই এরকম যেকোনো ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি পদের জন্য প্রস্তাব করতে পারবেন । প্রস্তাবিত নামগুলোর মধ্য থেকে সাংসদদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন । সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী , স্পীকার নির্বাচন সহ পুরো প্রক্রিয়াটির দায়িত্ব থাকবে স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের উপর । অতএব নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নিরপেক্ষ হতে হবে । কমিশন সব ধরণের কাজের জন্য স্বাধীন বিচার বিভাগের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে ।

সবচেয়ে জরুরী যে কথাটি সেটি হচ্ছে সরকারের মেয়াদ হবে চার বছর । অর্থাৎ প্রতি চার বছর পর পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে । এতে করে নির্বাচিত সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাব এততুকু হলেও কমবে ।

আর আমাদের দেশের নির্বাচন পদ্ধতিটিকে যদি এমনিভাবে পরিবর্তিত করে নেয়া যায় তবেই গণতন্ত্রের জয় হবে বলে আশা করা যায়। তখন আমাদের সোনার বাংলা আর শ্মশান হবে না, মরতে হবে না ফেলানিদের, বিনা অপরাধে পঙ্গু হতে হবে না লিমনদের, অন্ধ হতে হবে না রুমানাদের । সর্বোপরি আর কোন মানুষকেই মরতে হবে না চিকিৎসার অভাবে, আর কোন নিরপরাধ মানুষকেই বিচারের নামে প্রহসনের মুখোমুখি হতে হবে না , পুনঃজন্ম হবে না এরশাদদের ।

এখন হয়তো কোন কোন পাঠক আমার দিকে প্রশ্নের তীর ছুড়বেন , বলবেন “বর্তমান ঘূনে ধরা মেরুদণ্ড ভাঙা শাসন ব্যবস্থা কি আমাদেরকে সেই সুবর্ণ সুযোগ করে দিবে যাতে করে আমরা এই পদ্ধতিটির প্রয়োগ ঘটাতে পারি ?” আমি বলব- “না, এই ঘৃণ্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা কখনই নিজে থেকে আমাদেরকে সেই সুযোগটি দিবে না । সুযোগ আমাদেরকেই করে নিতে হবে; আমাদের স্বার্থে আমাদেরকেই তৈরি করে নিতে হবে পথ, হাঁটতে হবে সেই পথ ধরে । আর যারা বলবেন পুরো প্রক্রিয়াটি আকাশ-কুসুম কিংবা মাটিতে দাঁড়িয়ে চাঁদ ছোঁয়ার সংকল্প করার মত তাদেরকে বলছি- “মানুষ যখন প্রথম চাঁদের ধুলো গায়ে মাখার স্বপ্ন দেখে তখন কিন্তু প্রায় পুরো পৃথিবীই ভেবেছিল সেটা নিতান্তই বাড়াবাড়ি, এককথায় দুঃস্বপ্ন । কিন্তু সেই সপ্নীল মহাকাশচারীদের স্বপ্নের তীব্রতা আর প্রবল সাধনা তাদের ধোঁকা দেয় নই । তারা কেবল চাঁদের ধুলো গায়ে মেখেই থেমে যান নি বরং পা বাড়িয়েছেন মঙ্গলের দিকে, লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরের গ্রহ-নক্ষত্রের দিকে ।’’

অতএব, আসুন স্বপ্ন দেখি একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক সমাজের, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের, সর্বোপরি একটি গণতান্ত্রিক পৃথিবীর; জেগে উঠি ৫২, ৬২, ৬৬, ৬৯, ৭১ আর ৯০-এর মত, ঝাঁপিয়ে পরি অধিকার আদায়ের আন্দোলনে, প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে, বেঁচে থাকার সংগ্রামে ।

(প্রিয় পাঠক, লেখাটিতে আমার আনারি মস্তিষ্কের চিন্তা-চেতনা প্রকাশ পেয়েছে, আমি শুধু আমার চিন্তা-চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে চেয়েছি । আপনার মন্তব্য একান্তভাবে কাম্য ।)