ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

 

তরমুজ আলীর বড় পরিচয় তিনি একজন সাংবাদিক। এছাড়া দেশ-বিদেশের আরো বহুত লম্বা, বেঁটে কিংবা বিশাল ডিগ্রি তার রয়েছে। ইদানিং তাকে এই ডিগ্রিগুলোকে পকেটে ঢুকিয়ে কিংবা হাত-পায়ে বেঁধে রাস্তাঘাটে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। ভাষা নিয়েও তরমুজ আলীর যথেষ্ট পড়াশোনা আছে। ভাষা বিজ্ঞানের উঁচু-নিচু কোনো ডিগ্রিই তরমুজ আলীর আয়ত্বের বাইরে না। ডিগ্রিগুলোকে বস্তা কিংবা বিশাল ব্যাগে পুরে তিনি ঘুরতে চান না। এতে বাড়তি কষ্ট পোহাতে হয়। তাই ভ্যাণ্টিব্যাগে ডিগ্রি বহনেই তরমুজ আলীর স্বাচ্ছন্দ্য। একবার দেখা গেল, সাড়ে পাঁচখান ভ্যাণ্টিব্যাগ ভর্তি ভাষা বিজ্ঞানের ‘ডিগ্রি সমগ্র’ নিয়ে তিনি বাংলা একাডেমীতে উপস্থিত হলেন। দাবী করলেন, এদেশে ভাষা গবেষণার জরুরী কাজে কেবলমাত্র তিনিই নাকি নিয়োজিত আছেন। আজব ব্যাপার হলো, এমন বাম্পার ডিগ্রিধারীর সঙ্গেও বাংলা একাডেমীর কোনো উর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেখা দিতে রাজি হলেন না। তরমুজ আলী হতাশ হলেন। কিন্তু একেবারে নিরাশ হলেন না। শেষমেষ একাডেমীতে অবস্থানরত বাবুর্চি, ঝাড়–দার এবং দারোয়ানদের একত্রিত করতে তিনি সক্ষম হলেন। তার মারাত্মক কিসিমের ভাষা গবেষণা তিনি তাদের কাছেই বয়ান করে শোনাতে লাগলেন। পাঠক! আমরাও গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো জেনে নিতে পারি। তরমুজ আলীর ভাষায়: ‘ডিয়ার ভাই ও বোনেরা! আমার এই লিখিত বক্তব্যটি বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক বরাবর লেখা হয়েছিল। হুবহু সেই পত্রটিই আমি আপনাদের সম্মুখে পাঠ করে শোনাচ্ছি।’

‘শুরু খোদার নামে’
আদুরে মহাপরিচালক সাহেব! আপনি আমাকে হালকা-পাতলাভাবে চিনেন। আমার জ্ঞানের বিশালতাও আপনার অজানা নয়। শুধু ভাষা বিজ্ঞানে পিএইচডি করার ডিগ্রি, পদক আর সার্টিফিকেট মিলিয়ে সাড়ে পাঁচখান ভ্যাণ্টিব্যাগ আমি ভরে এনেছি। এমনকি কত মিটার উঁচু গবেষণা আমি এই দেশ ও জাতির ভাষা নিয়ে করেছি। তা খানিকবাদেই আপনি জানতে পারবেন।

মহাপরিচালক! বাংলাদেশ একটা স্বাধীন সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। তাই এদেশে অযৌক্তিক এবং নীতি বিবর্জিত কোনো ভাষাকে চলতে দেয়া যায়না। সুতরাং, অনতিবিলম্বে এই দেশ থেকে ইংরেজি ভাষা বহিষ্কার উচিত। এটা সাড়ে পাঁচখান ভ্যাণ্টিব্যাগ ভর্তি ডিগ্রিধারীর উচ্চতর গবেষণার ফল। বুঝিয়ে বলি। আমার নাম তরমুজ আলী। ইংরেজিতে হয় ‘tarmuj’ কিংবা ‘tormuj’ লিখতে হবে। যা পর্যায়ক্রমে ‘তারমুজ’ ও ‘তোরমুজ’ হয়। তরমুজ কিন্তু হচ্ছেই না। এই ভাষা দিয়ে কি তাহলে আমরা আলু মাখাবো? আরো দেখুন! ভালোবাসাবাসির যুগ এখন। তাই ভালোবাসার ইংরেজি শব্দটাও বেশ ব্যবহৃত হয় ইদানিং। সবাই একে ‘লাভ’ বলে। আমি চোখে আঙ্গুল দিয়ে সবাইকে আসল বানানটা দেখিয়ে দিচ্ছি। Lo- লো, ve- ভী = লোভী। ‘লাভ’ কেন হবে! অযৌক্তিক বানান নির্ভর এই ভাষার কোনো দরকার আছে কি!

উদাহরণের শেষ নেই। তাও বলি আরেকটা। ইন্টারনেট এখন খুব বেশি ব্যবহার করা হয়। যারা ব্যবহার করেন, তারা অবশ্যই ‘গুগল’ চিনেন। ইংরেজি থেকে আমি এখন আসল বানানটা করে দেখাবো। goog- গোগ, le- লী = গোগলী। এটা ‘গুগল’ কেন হবে! গবেষণারত অবস্থায় আমি অবাক হয়ে ভাবতাম, এই ভাষা যারা সৃষ্টি করেছেন, তারা কতটা গণ্ডমূর্খ ছিল! ন্যাশনাল বানানটা নিয়ে আমরা একটু ভাবতে পারি। শুরুতে na- ন্যা এবং শেষে nal- ন্যাল হয়, এটা বুঝলাম। কিন্তু tio দ্বারা কিভাবে ‘শ’ হয়, এটা দুনিয়ার কোনো ইংরেজি ভাষা গবেষকও বলতে পারবে না। ‘tio’ দ্বারা ‘টিও’ হবে। ভাববার কী আছে!

মহাপরিচালক! আপনি জ্ঞানী মানুষ। এই ভাষার দুর্নীতি এবং প্রতারণা অবশ্যই ইতোমধ্যে বুঝে ফেলেছেন। এখন ভাষাটা প্রত্যাহার করে নিন। কেল্লা ফতে হয়ে যাবে!’

উপস্থিত দারোয়ান ও ঝাড়ুদার মণ্ডলীর বেশিরভাগ তরমুজ আলীকে বকতে বকতে আগেই ভেগেছে। যারা ছিল, তারাও এখন মুখ খুলতে শুরু করেছে। একজন মনে মনে বলল, ‘ফুরান পাগলের ভাত নেই, নতুন ফাগলের আমদানি।’ এক বাবুর্চি বলল, ‘এসব পাগল-ছাগল যে কোত্থেকে আসে। আমার খাবারটাও পুড়ে এখন নষ্ট হয়ে গেলো।’

দ্রষ্টব্য : লেখাটি আমার অন্যান্য ব্লগে প্রকাশিত